![]() |
Bangla Short Story |
যতদিন টিউশন করে সংসার চালিয়েছি মা আমার বিয়ের কথা মুখে আনেননি। করোনা পরিস্থিতিতে দফায় দফায় লকডাউন ঘরে বসেই কাটাতে হচ্ছিল। বাবা অসুস্থ তাই বাইরে যাওয়ার ঝুঁকিটা নিতে চাইনি কখনো, পাছে ভয় হয় আমিই যদি ভাইরাসটা ঘরে বয়ে আনি! আমার টিউশন বন্ধ হয়েছে তাতে সংসারে টানাপোড়েন ছিলো সত্যি কিন্তু আমরা যে না খেয়ে মারা যাচ্ছি এমনও না। বাবার পেনশনের টাকায় চলে যাচ্ছিল কোনমতে। কিন্তু আমার এই ঘরে বসে থাকা নির্ঝঞ্ঝাট জীবন মায়ের সহ্য হলো না। হঠাৎ বিয়ের কথা পাড়লেন আর ওমনি কয়েকদিনের মধ্যে পাত্রপক্ষও চলে এল। প্রচন্ড মেজাজ খারাপ করে বসে আছি। কিন্তু শেষমেশ রক্ষা হবেনা দেখে পাত্রের পরিবারের সামনে যেতে রাজি হলাম। পাত্র দেখতে যাওয়ার মত মনস্থির করলাম। মায়ের অনেক জোরাজুরি সত্ত্বেও শাড়ি পড়লাম না। সাধারন সালোয়ার কামিজ পড়ে বাসায় যেভাবে থাকি ওইভাবেই গেলাম। সালাম দিলাম, বসলাম। মনে মনে গুনে দেখলাম মোট দশজন এসেছেন। এদেরমধ্যে একের পর এক করে পাঁচ ছয়জনই প্রশ্ন করে ফেললেন তাও একবারে দুই তিনটা। যেমন একটু বয়স্ক দেখতে মহিলা, সম্ভবত পাত্রের মা বা খালা উনি নাম জিজ্ঞেস করলেন, রান্না পারি কিনা, সেলাই পারি কিনা। আবার মাঝবয়সী ভদ্রলোক, উনি সম্ভবত ছেলের ভ্রাতৃ স্থানীয় কেউ, জানতে চাইলেন কিসে পড়ি, কোথায় পড়ি। এইসবই প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন। কিন্তু একটা মেয়ে, আমার থেকে বয়সে ছোটও হতে পারে নইলে সমবয়সী, বড় হবে না কিছুতেই, শুরু থেকেই বাঁকা বাঁকা কথা বলছিল।
"মেয়ে তো ফরসা না, তবু চলে।
কিন্তু আরেকটু লম্বা হলে ভালো হতো, কই পা দেখি, হিল পড়তে হবে বুঝেছো? নইলে আমার ভাইয়ের পাশে দাঁড়াতেই পারবে না,"
বলেই হাসতে লাগল যেন কত মজার কথা বলেছে। উপস্থিত আরও কয়েকজন হেসে উঠল। আমি মায়ের মুখের দিকে তাকালাম, তিনিও হাসছেন। পরে জিজ্ঞেস করলে হয়ত বলবে সমাজ রক্ষার হাসি। অপমানে আমার চোখে পানি চলে এলো। অপমানের পালা তো কেবল শুরু হয়েছে তখন।
এভাবে ঘটা করে পাত্রপক্ষের সামনে বসা আমার জন্য এবারই প্রথম। দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করছি প্রতিটি কথা। পুরো ইন্টারভিউ চলতে লাগল। আমার অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ নিয়ে হাজারটা প্রশ্ন। আমি উত্তর দিয়েই যাচ্ছি, দিয়েই যাচ্ছি। তাদের কৌতুহল মেটেই না। মেয়েটার মন্তব্যও থামছে না।
"তোমার কোন বয়ফ্রেন্ড আছে? বিয়ের মধ্যে পালিয়ে যাবে নাতো! নাকি বিয়ের পর পরকীয়া করবে?"
সবাই আরেক দফা হাসল। সত্যি বলতে এবার আমিও হেসে ফেললাম। না হেসে উপায় কোথায়? একটা মেয়ে ভরা মজলিশে আরেকটা মেয়েকে এমন অবলীলায় এত বাজে কথা কিভাবে বলতে পারে! এদের পারিবারিক শিক্ষা দেখে আমি মুগ্ধ। আমি আবারও মায়ের দিকে তাকালাম। এবার আমাদের চোখাচোখি হয়ে গেল। মা এমন একটা মুখভঙ্গি করলেন যেন এসব খুব সাধারন কথাবার্তা।
এতক্ষন ছেলের ব্যাপারে একটা কথাও হয়নি। শুধু প্রশ্নকর্তারা বারংবার উল্লেখ করছিলেন ছেলে সরকারী চাকুরী পেয়ে বংশের গৌরব এতটাই বাড়িয়ে তুলেছেন, বিয়ের পর তার খানিকটা আমিও পেতে পারি! কিন্তু আমার সামনে বসা ব্যক্তিদের মধ্যে তিনি ঠিক কোনজন আমি এখনও বুঝতে পারছি না, আগ্রহও দেখালাম না।
আমাকে সামনে বসিয়ে রেখেই তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করলেন। পন্য কিনতে এসে ক্রেতারা তার দোষগুন নিয়ে যেমন বিচার বিবেচনা করেন তেমনই মন্তব্য শুরু হলো।
"মেয়ে দেখতে কালো তবে চলনসই। ঘরের সব কাজ করতে পারবে। কথায় বলে, রূপবতী প্রেমিকা, গুনবতী বউ। বউ ঘরের কাজ করতে পারলেই চলে। রূপ তো হাত বাড়ালেই যত্রতত্র পাওয়া যায়।"
বাহ! বেশ ভালো কথা বলেছেন।
"মেয়ে পড়ালেখায় ভালো, ছেলেমেয়েদের জন্য টিচার রাখতে হবে না। কিন্তু চাকরি করতে দেয়া যাবে না।"
আমার মা সাথে সাথে সম্মতি জানালেন। মোটা ভুঁড়িওয়ালা লোকটা দুই বাটি ফল শেষ করে তৃতীয় বাটি হাতে নিয়ে বললেন,
গরিব ঘরের মেয়ে তাই অহংকার করতে পারবে না, শ্বশুড়বাড়ির কথা শুনে চলবে। তবে মেয়ের ঘর সাজিয়ে দিতেই হবে, তাতে বাবা মায়ের কোন অজুহাত চলবে না।
খানিকটা উশখুশ করে মা তাতেও রাজি হলেন। শেষমেশ সেই
ভুঁড়িওয়ালা আঙ্কেল পাঁচশত টাকার একটা নোট আমার হাতে গুজে দিয়ে বললেন,
আমরা নিজেরা আলোচনা করে পরে জানাবো। সোনার টুকরো ছেলের বিয়ে দিচ্ছি, আরও দু'চার জায়গায় মেয়ে দেখতে হবে তো, এমন হুট করে সিদ্ধান্ত নিলে চলে? তোমার ব্যাপারে আমরা ভেবে দেখবো।
এতক্ষন আমি মাথা নিচু করে বসে ছিলাম আর তাদের প্রত্যেকটা কথায় প্রতিবার মাটিতে মিশে যাচ্ছিলাম। এবার আমার চোখ তুলে তাকানোর পালা। তাদের এমন সিদ্ধান্ত হীনতার সিদ্ধান্ত শুনে মা যারপরানই হতাশ হয়েছেন। আমার আশার প্রদীপ কিন্তু দপ করে জ্বলে উঠলো।
আমি মানুষের গড়ন বরন নিয়ে কখনো কোনদিন নিন্দা করিনি। কিন্তু আজ নিজে এতটা অপমানের স্বীকার হয়েও চুপ করে বসে থাকা অন্যায়। আর আমি নিশ্চিত, এরা আরও দশ জায়গায় মেয়ে দেখতে গিয়েও এই একই অসভ্যতা করবে। তাই এবার এদের পরিচিত ভাষাতেই এদের একটা পাঠ পড়িয়ে না দিলেই নয়।
বড় একটা দম নিয়ে সোজা হয়ে বসলাম। মা আমার এই প্রস্তুতির মানে জানেন, তাই বাঁধা দিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। আমি হাসি মুখে বললাম,
: মা, এখন আমি কথা বলব।
এত লোকের সামনে তামাশা এড়াতেই মা চুপ করে গেলেন, কারন আমি দমবার পাত্রী নই।
: জ্বি, আপনাদের পাত্রী দেখা হয়ে গেছে?
বয়স্ক ভদ্রমহিলা কিছুটা তাচ্ছিল্যের সাথে বললেন,
--হ্যাঁ, এ আবার কেমন প্রশ্ন। বললাম তো।
: এবার তাহলে আমার পালা? আমি পাত্র দেখা আরম্ভ করি?
উপস্থিত সবাই আমার কথায় হতবাক হয়ে গেলো। আর আমি দ্বিগুন উৎসাহে বলতে আরম্ভ করলাম।
: শুরুতে আপনাদের পরিচয়, শিক্ষাগত যোগ্যতা জেনে নেয়া উচিত, কিন্তু জনে জনে দুই তিনটা করে প্রশ্ন করা খুবই বিরক্তিকর আর আপনাদের কথা বার্তায়ও পরিচয় অনেকটা স্পষ্ট হয়ে গেছে। তাই ওই ঝামেলায় আর গেলাম না। ছেলের সাথেই কথা বলি?
এক সাথে তিনটা ছেলে বসা। তাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা রুগ্নকায় ব্যক্তিটি লজ্জায় নিজের কালো মুখ যথাসম্ভব লাল করে জবাব দিলো,
--আমার সাথে আবার কি কথা! বড়রা যা বলেছেন তাই হবে।
আচ্ছা ইনিই তবে পাত্র।
বাবা মায়ের বাধ্য ছেলে বটে। অবাক চোখে তাকিয়ে ছিলো, আমার সাথে চোখাচোখি হতেই হকচকিয়ে গেলো। তার বোধহয় ইন্টারভিউ ভীতি আছে। আমি গায়ে মাখলাম না। সোজা সাপ্টা প্রশ্ন করে বসলাম।
: পাত্র সাহেব, আপনি পড়ালেখা কতদূর করেছেন?
ছেলেটির মুখ খুলতেও অনুমতি লাগে হয়ত। মায়ের দিকে তাকিয়েই মৌন হয়ে রইল। আমিই কথা এগোলাম।
: স্নাতক? ওহ স্নাতকোত্তর?
সে শুধু মাথা নেড়ে সায় জানায়।
: আচ্ছা! আচ্ছা! তো কোন সাবজেক্ট?
--সমাজবিজ্ঞান।
: কই আপনার পরিবারকে তো ততটা সামাজিক মনে হচ্ছে না।
: না না জাস্ট মজা করলাম আরকি!
আর আপনার শরীরের এ হাল কেন? কতখানি লম্বা হয়েছেন, গায়ে এক তোলা মাংস নেই। কি নেশা টেশা করেন নাকি?
সেই বয়স্ক ভদ্রমহিলা এবার বেশ ধমকে উঠলেন।
"খবরদার! মেয়ে, আমার ছেলেকে কি সব আবল তাবল বলছ।"
ছেলের অপমানে মায়ের এমন গা পোড়াটা আমার বেশ লাগল। আমার অপমানে মা যদি এমন রুখে দাঁড়াতেন! কিন্তু ছোট্ট মেয়েটার আবার নাক গলানোতে আমার হৃদয়ের কোমল ভাবটুকু নিমিষে উধাও হয়ে গেলো। মেয়েটা চিল চিৎকার দিয়ে উঠলো।
--আম্মু, মেয়েটা তো বেয়াদব!
আমি তবুও বেশ হাসি হাসি মুখে কথা বলছি।
: আচ্ছা! আদবে ভরপুর খুকী তুমি কোন ক্লাসে পড়ো?
--ইলেভেন।
: মাই গড! এত বড় তুমি, কিন্তু আমি যে তোমার চেয়েও বড়! ভার্সিটিতে পড়ি শুনলে তো। তবু তোমাকে বুদ্ধিমতী বলতেই হবে। বয়ফ্রেন্ড, পরকীয়া সব বোঝো দেখি। গুড, ভেরী গুড! একম ইঁচড়ে পাকা বুড়ি।
তুমি দেখছি এত উঁচু হিল পড়ে আছো? অনেক খাটো নাকি?
মেয়েটির মুখে আর কথা সরে না।
পাত্রের মায়ের সাথে সাথে আমার মায়ের চোখ মুখও দেখি লাল হয়ে উঠছে। যাইহোক এ নাটকটা বেশিক্ষন চলতে দেয়া যাবে না। আমি দ্রুত উঠে পড়লাম।
: আপনারা একটু বসুন, আমি আসছি।
ড্রয়ার থেকে একটা পাঁচশ টাকার নোট বের করে নিলাম, ভাগ্যিস মাঝে মধ্যে একটু টাকা জমাতাম! আর হাতে ওদের দেয়া পাঁচশ। মোট এক হাজার টাকা নিয়ে ফিরে এলাম। ভুঁড়িওয়ালা আঙ্কেলের হাতে টাকাটা দিয়ে বললাম,
আঙ্কেল ছেলে পছন্দ হয়নি তাই ছেলের হাতে দিলাম না। আপনারা এতজন মানুষ গাড়ি ভাড়া করে এসেছেন, এক কেজি মিস্টিও এনেছেন খরচ তো আছে একটা নাকি? এই টাকাটা রাখুন।
ফ্যান চলছে তবু দেখুন ঘরটায় কেমন ভ্যাপসা গরম আটকে আছে। দরজাটা খুলেই দেই বরং সব বেরিয়ে যাক।
দরজা খোলার সাথে সাথেই সবাই কাচুমাচু মুখ নিয়ে বেরিয়ে গেলো। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম যেনো! এই পুরো নাটকে নিরব দর্শক ছিলেন আমার বাবা। অ্যাকসিন্ডেন্টের পর যেদিন থেকে তিনি হুইলচেয়ারে বসলেন, সেদিন থেকেই একপ্রকার মৌন হয়েই থাকেন। এখন মায়ের কথাই শেষ কথা। আজও মা আমাকে ধমকে উঠতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু বাবা বহুদিন পর উঁচু গলায় কথা বললেন,
খবরদার! রেবেকা, আমার মেয়েকে একটাও বাজে কথা বলবে না। আর এমন ছোটলোকের দল যেন কখনো আমার বাসায় পা না রাখে।
আজকে বড় শান্তি লাগছে। আমার মেয়েকে আমি ঠিকই মানুষ করতে পেরেছি।
বাবার শেষ কথাটা আমার চোখে পানি এনে দিলো। আমি প্রানপনে তাদের রুখবার চেষ্টা করছি। নয়ত বাবা বলবেন, আমার মায়ের চোখে কি কান্না মানায়!
( সমাপ্ত )
লেখা: ফেরদৌসি নাবিলা
