-'তবুও! যন্ত্রণার কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলছি, এই শূণ্য হৃদয় শুধু তোরই নামে খোদাই করা।'
কথাটা শুনে শিফা দিগন্তের বুকের উপর থেকে সরে গেল। পাশ ফিরে শুলো। কেন জানি অশ্রু ঝরছে। কষ্ট হচ্ছে! বুকের ভেতর তোলপাড় শুরু হয়েছে। দিগন্তের বলা কয়েকটা উক্তি শুনে নয়। আবেগের বর্শিভূতও নয়। কষ্টকে গুরুত্ব দেয় না,
ভালো মন্দের পরোয়াও করে না। সে বাস্তবাদী। নির্মম বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার ধৈর্য আছে। তা যতই কষ্ট হোক না কেন!তবুও দিগন্ত যদি সাফার মৃত্যুতে বাঁধা দিতো। মামাকে নিখোঁজ না করত। হসপিটাল নিজের নামে না করত। কিডনি বেচা চক্রের সঙ্গে জড়িত না হতো। খুনী না হতো। ওই
সরল মানুষগুলোকে কৌশলে ফেলে কিডনি না নিতো। পর-নারীতে আসক্ত না হতো। তাহলে ওদের গল্পটাও অন্য রকম হতো। সবাই তো সুখ চাই। ভালোবাসা চাই! সেও ব্যাতিক্রম নয়। সব স্বাভাবিক থাকলে ওরাও সুখী হতো। সুখ দিয়ে সংসার সাজাত। দিগন্তকে প্রণয়ের বাঁধনে আষ্টে পিষ্টে জড়িয়ে রাখত। কখনো ছাড়ত না। পাপী নয় বরং পারফেক্ট সঙ্গী হতো। দিগন্ত নামক ওই সুদর্শন পুরুষটা একান্ত তার হতো। প্রশস্ত বুকটা ওর দখলে থাকত। সূখপূর্ণ জীবন হতো। অথচ সেটা আর সম্ভব না। দিগন্ত কোন কাজটা ক্ষমার যোগ্য আর কোনটা অযোগ্য? যোগ্য কার্যক্রম আছে কি? চোখে তো পড়ে না। বরং পাপ হচ্ছে জেনেও সে নিশ্চুপ ছিলো। অথচ ওর অজানায় থেকে যাবে, দিগন্ত সাফা, মামা, আর তনয়ের ঘটে যাওয়ার ঘটনার কথা পরে জেনেছে। তখন জানলে, সে পদক্ষেপ নিতে পারত। বাঁধা দিতে পারত। যদিও, দিগন্ত তখন ডুবে থাকত নিজের জগতে। বাবা আর ভাইয়ের দিকে নজর দেওয়ার সময় কই!
এসব ঘটার পর, প্রশান্ত যখন শিফার দিকে হাত বাড়াচ্ছিল। তখন দিগন্ত সতর্ক হয়েছিল। ওদের নজরে রেখেছিল। বুঝেছিল, এবার ওদের থামাতে হবে। নয়তো শিফাকে হারাবে। যেটা ওর জন্য কষ্টসাধ্য। সে খারাপ। তবে তার প্রণয় নয়,
অনুভূতিও নয়! খুব ভালোবাসতেও জানে। আর ভালোবাসা রক্ষার্থে সে মরতেও পারবে ;মারতেও পারবে। এমন ধাঁচের মানুষ সে। দিগন্ত খারাপ হলো কেন? এর উত্তর জানা নেই। খারাপ হতে কারণ লাগে না। বরং ভালো থাকাই, কষ্টসাধ্য। হয়তো মর্জিমতো চলতে চলতে'ই পথভ্রষ্ট হয়েছে। সঙ্গদোষে ভালোকে অতিক্রম করে সে খারাপকে বেছে নিয়েছে। তাছাড়া, যখন কেউ টাকার প্রতি মত্ত হয়। তখন তার সবকিছুতে আপনা-আপনি পরিবর্তন চলে আসে। কাজে, ব্যবহারে, চাল- চলনে। দিগন্তেরও তাই! শিফার অজানায় থেকে যাবে এসব। থাকুক। মন্দ কী? সব জানতে হবে? কেন? দিগন্ত আগেও জানতে দেয় নি। এখনো জানাল না। সে খারাপ, খারাপই। নিজেকে সাধু প্রমাণ করার ইচ্ছে নেই। চেষ্টাও করবে না।করেও
লাভ নেই; তিক্ত অতীত।
শিফাকে কাঁদতে দেখে দিগন্ত বাঁধ সাধল না।চুপ
করে দেখছে। শিফার বলা কথাগুলো তাকে ক্ষত বিক্ষত করে দিয়েছে। নিজের প্রতি'ই ঘৃণা ধরিয়ে দিয়েছে। বুকে যন্ত্রনায় তীর ছুঁড়েছে। সেই তীরের আঘাতে বুকে অদৃশ্য রক্তক্ষরণ হচ্ছে। কষ্টে দম আঁটকে আসছে। দিগন্ত ওর কনিষ্ঠ আঙুল দিয়ে অশ্রু মুছে বলতে বলতে বেরিয়ে গেল।
সুখ রাজ্যেও নই রে সুখী
দুঃখের রাজা আমি।
আমার আয়ুটুকু চাই যে দিতে।
যাকে, আমি ভালোবাসি।
(আলোমনি)
শিফা ঘাড় ঘুরিয়ে অবাক হয়ে তাকাল। কথাটা কি ওকে বলল? ওর আয়ু শিফাকে দিবে? দিগন্ত ততক্ষণে স্থান ত্যাগ করেছে। শিফা ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে মুখে বিষ্ময়! একোন দিগন্তকে দেখছে? তখন সুখু এসে বাইরে দাঁড়িয়ে কোথাও যাওয়ার তাগাদা দিলো। খুব'ই জুরুরি। যেতেই হবে। শিফা উঠে চোখে মুখে পানির ছিঁটা দিয়ে সুখুর সঙ্গে বেরিয়ে গেল। কোথায় যাচ্ছে?সুখুকে জিজ্ঞাসা করলেও বলছে না। ওর মুখটা থমথমে হয়ে আছে। ব্যবসাতে লস গেছে? নাকি
কাস্টমার টাকা মেরে দিয়েছে? হবে, কিছু একটা! নয়তো মুখ থমথমে কেন? তখন সুখু মাথা নিচু করে কান্নারত কন্ঠে বলল,
-'আমার মৃত্যু না হওয়া অবধি আপনার সঙ্গে
থাকার হুকুম জারি কইরা দিছে।'
-'মানে? কে করেছে?'
-'ছ্যার! বিনিময়ে দশ কোটি ট্যাহা আর একখান বাড়ি দিছে।'
শিফা হাঁটা থামিয়ে দিলো। প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে ওর দিকে তাকাল। সুখু মাথা নিচু করে নিলো। ওর চোখে পানি। শিফা তা খেয়াল করল না। দেখার আগেই সুখু অন্য দিকে তাকিয়ে মুছে নিলো। সে নিরুপায়। দিগন্ত ভরসা করে ওকে একটা দায়িত্ব দিয়েছে। তাকে ওই দায়িত্বে অনড় থাকতেই হবে।
শিফা রেগে গেল সুখুকে মাথা নিচু করতে দেখে।
এটা কোনো কথা? সুখুর মৃত্যু না হওয়া অবধি মানে? দিগন্ত চাচ্ছে টা কি? এই লোকের ফালতু কাজকারবার! সুখুকে রাখবে কেন? তাও টাকার বিনিময়ে। এসবের মানে হয়? শিফা তখন গর্জে উঠে বলল,
-'আমি কানা নাকি খোঁড়া যে তোমাকে আমার সঙ্গে থাকতে হবে?'
-'আমার দায়িত্ব আপনাকে রক্ষা করা। রাগুন, মারুন, কাটুন, তবুও আমি যাবো না। আমার ছ্যারের হুকুম।'
-' দিগন্ত কোথায়?'
-'বলা বারণ আছে।'
শিফা বিরক্ত নিয়ে হাঁটা শুরু করল। সুখুর হাতে থাকা ফোনে দিগন্ত এসব শুনছিলো। শিফা এই প্রথম ওর নাম উচ্চারণ করল। ডাকল।ওর কথা জিজ্ঞাসা করল। দিগন্তর মুখে হাসি ফুটল। প্রাণ জুড়িয়ে গেল। প্রিয় মানুষটা নাম ধরে ডেকেছে!
এটাও কম নয়! বেলাশেষে অনাকাঙ্খিত প্রাপ্তি।
দিগন্তর ঝাপসা চোখে শিফার মুখ ভেসে উঠছে।
চিরচেনা ওই রাগান্বিত মুখভঙ্গি। শিফা ওর সঙ্গে কখনো হাসি মুখে কথা বলে নি। মায়ার দৃষ্টিতে তাকায় নি। চোখে চোখে প্রণয়বাক্যে রচনা করে নি। মোহময় দৃষ্টিতে কাছে ডাকে নি। খুনশুটির
মুহূর্তও নেই।তবে দিগন্ত ওর চোখে ঘৃনা দেখেছে। তীব্র ঘৃণা। যেটা দিগন্ত জন্য প্রচন্ড কষ্টের। প্রিয় মানুষটার চোখে ঘৃণায় দৃষ্টি কতটা বেদনাদায়ক। সেটা এক ব্যর্থ প্রেমিকই অবগত। সেই বুঝবে এ দহনের জ্বালা। দিগন্তের হাতে চকচকে ছুরি। তবে সাধারণ ছুরির মতো নয়। প্যাঁচানো। ঠিক বাঁকা সিঁড়ির মতো। হাতলেও নিখুঁত কারুকাজ করা। অদ্ভুত সুন্দর ছুরিটা। ধারালোও বটে। সে বাইরে দেশ থেকে এনেছিলো। দুটো সুইচ আছে। একটা সুইচে প্যাঁচানো ছুরিটা বের হবে। অন্যটাতে খুব সাধারণ ছুরি। তবে সাধারণ ছুরিতে এক ধরনের তরল মিশানো থাকে। যেটাতে, মানুষের মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দেয়। তারপর শ্বাসনালীও। এবং ক্ষণিকের ব্যবধানে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়ে মৃত্যু। দিগন্ত কব্জিতে ছুরি রেখে চোখজোড়া বন্ধ করে বলল,
-'প্রণয়হীন যন্ত্রনার তীর'টা এই বুকেই মারলি। আমিও শূন্যতাকে পূর্ণতাভেবেই গ্রহন করলাম।'
কথাটা বলে দিগন্ত ছুরি হাতে চেপে ধরল। সঙ্গে সঙ্গে রক্ত গড়িয়ে গেল। লাল রক্ত। দেখতে বেশ লাগছে। দিগন্ত হাসছে। হাসতে হাসতে দু'চোখে পানি এসে গেছে। হয়তো এটা জ্বালাময়ী হৃদয়ের
নিরব আর্তনাদ। গগনবিদারী আর্তনাদের থেকে নিরব আর্তনাদ ঘাতক বেশি। আর ওইদিকে, সুখু শিফাকে নিয়ে নিচ তলার এক রুমের প্রবেশ করল। অদ্ভুত জায়গা। ঘুটঘুটে অন্ধকার। শিফা
সুখুর পেছন পেছন হাঁটছে। ঘাড়-ঘুরিয়ে আশে পাশে তাকাচ্ছে। আরো কয়েক ধাপ হাঁটার পর, সুখু একটা দরজা খুলল। শিফাকে ঢুকতে দিয়ে নিজেও ঢুকল। রুমে কেউ নেই। বেশ পরিপাটি করে সাজানো। অভিজাত্যে ভরপুর। দেওয়ালে দিগন্তের ছবি টানানো। মুখে ফিচেল হাসি। সেই কথা বলা চোখ। ওয়াশরুমে পানির শব্দ ভেসে আসছে। দিগন্ত হয়তো। শিফা বসে সুখুর দিকে তাকাল। পাশেই নতমুখে দাঁড়িয়ে। শিফা পাশের সোফায় বসল। মুখে বিরক্তির ছাপ। একটুপরে, ওয়াশরুম থেকে স্বপ্নীল বেরিয়ে আসল। পরণে শুভ্র তোয়ালে জড়ানো। শিফা হতভম্ব। স্বপ্নীল
এখানে? তাহলে দিগন্ত কই? দিগন্ত ওকে এখানে
আসতে দিলো? কেন? স্বপ্নীল দ্রুত পোশাক পরে শিফার মুখোমুখি বসল। কতদিন পর দেখা। সে আলতো করে শিফার গাল ছুঁয়ে দিলো। শিফার অবাক চাহনি। স্বপ্নীল অক্ষত অবস্থায়! কিভাবে সম্ভব? স্বপ্নীল তখন মুখভর্তি হাসি নিয়ে বলল,
-'অবশেষে পেলাম। আমরা নতুন করে সূচনা করব। তোকে প্রচন্ড ভালোবাসি, শিফা।'
শিফা নিশ্চুপ! স্বপ্নীলের মুখে তৃপ্তির হাসি। প্রিয় মানুষটা এখন তার। আর সুখু রুমের এককোণে দাঁড়িয়ে বাহুতে মুখ চেপে কাঁদছে। নিরবে। যেন কেউ বুঝতে না পারে। শিফা সত্যিই খুব পাষাণ। নয়তো দিগন্তকে বুঝতে চেষ্টা করতো। সে পাপী। কিন্তু অবুজ মন তো পাপ পূর্ণের হিসাব বুঝে নি। নিষিদ্ধ মানুষটাকেই চেয়ে বসেছে। তাকে পেতে রঙিন স্বপ্ন বুনেছে। সুখু ওদের দিকে তাকালেও না। শিফাকে অন্যের সঙ্গে মানতে পারছে না।
শিফা দিগন্তের। সেও তো রত্নাকে ভালোবাসে। কই রত্না তো ছেড়ে যায় নি। বরং মারলে উল্টো ওকেই জড়িয়ে ধরে। ভালোবাসার আবদার করে। রত্নার বাচ্চা হয় না। সে তো রত্নাকে ছুঁড়ে ফেলে নি। হৃদপিন্ড কে ছুঁড়ে ফেলা যায়? শিফা তো দিগন্তের হৃদপিন্ড। কেউ না জানুন সে তো জানে। নয়তো কাউকে এত ভালোবাসতে পারে?
তাহলে শিফা কেন পারছে না? শিফার প্রণয়ের পরশে দিগন্তকে কেন বদলাচ্ছে না? সুখু মনে মনে একটা কথা আওড়ালো।
-' স্যার পাপী বিধায় এত অভিযোগ। যারা ভালো তাদের ভালোবাসা স্বচ্ছ তো?
স্বপ্নীলের মুঠোয় শিফার হাত। সে আলতো করে
ধরে আছে। যেন শক্ত করে ধরলে ব্যথা পাবে।
নয়তো গলে যাবে। স্বপ্নীলের চোখে মুখে খুশির ঝলক। মুখভর্তি হাসি সরছেই না। দিগন্ত কথা দিয়েছিল, শিফাকে ফিরিয়ে দিবে। দিগন্ত খারাপ হলেও কথা রেখেছে। বিনা বাঁধায় শিফাকে ছেড়ে
দিয়েছে। এই ঢের। শিফা স্বপ্নীলের মুঠোয় থেকে হাত ছাড়িয়ে নিলো। নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল।ওকে উঠতে দেখে স্বপ্নীল সুখুকে বাইরে যাওয়ার ইশারা করল। সুখু নড়লো না। ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল। মুখ ফিরিয়ে অন্য দিকে তাকাল। রাগে মুখ থমথমে
হয়ে আছে। যেন, স্বপ্নীলকে পুঁতে দিতে পারলেই ক্ষান্ত হবে। শিফা সুখুর দিকে তাকিয়ে স্বপ্নীলের দিকে তাকাল। দু'জনের মুখে রাগ। এদের এমন করার কারণ অবগত নয়। তবে কিছু আন্দাজ
করছে। মন কু-ডাকছে। অশান্ত লাগছে। অস্থির হয়ে ঘামছেও। হঠাৎ এমন লাগছে কেন? বাসার সবাই ঠিক আছে তো? স্বপ্লীল এখানে কেন? ওর অক্ষত অবস্থায় থাকার কথা না। দিগন্ত ছাড়ার মানুষও না। দিগন্তের মনে কি চলছে? কি করতে চাচ্ছে? শিফা এসব চিন্তায় মগ্ন। তখন স্বপ্নীল সুখুকে ধাক্কিয়ে বলল,
-'যেতে বলেছি তোকে।'
-'ম্যাডাম বলুক।'
-'সুখু ভাই দিগন্ত কোথায়?'
-'জানি না ম্যাডাম।'
-'অকারণে মিথ্যা বলা আমার পছন্দ নয়।'
-'দুঃখিত ম্যাডাম।'
-'সত্যিটা বলুন।'
-'বারণ আছে ম্যাডাম।'
কথাটা বলে সুখু মাথা নিচু করে নিলো। অর্থাৎ বলবে না। স্বপ্নীল বেশ বিরক্ত হলো। ওই জঙ্গাল বিদায় হয়েছে। ভালো হয়েছে। ওর খোঁজ নিতে হবে কেন? অযথা সময় নষ্ট। একমাত্র দিগন্তের জন্য সবাই কষ্ট পেয়েছে। বোনকে হারিয়েছে। ওর পরিবারও নেই। একে একে সবাই চলে গেছে। সে এখন একা। শিফাও কম কষ্ট পায় নি। তাহলে?
এদেরকে প্রশ্রয় দেওয়ার মানেই হয় না। নরপশু এরা। স্বপ্নীল সুখুকে ধাক্কিয়ে রুম থেকে বের করে দিলো। স্বজোরে দরজা আটকাল। পিছনে ঘুরে শিফাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কাঁধে থুতনি রাখল। আলতো স্পর্শে ঠোঁট ছোঁয়াল। শিফার শরীরে জেন্স পারফিউমের সুগন্ধ লেগে আছে।
যেটা দিগন্তের শরীর থেকে পাওয়া যায়। দিগন্তের সবচেয়ে পছন্দের পারফিউম। স্বপ্নীল ভ্রু কুঁচকে নিলো। ওহ,দিগন্ত শিফাকে ব্যবহার করে এখানে পাঠিয়েছে? অমানুষ একটা। স্বপ্নীল নিশ্চুপ হয়ে গেল। শিফা ওকে সরিয়ে চোখে চোখ রেখে ধীর কন্ঠে বলল,
-' আমাকে মারতে চেয়েছিলে, মারবে না?'
স্বপ্নীল বিস্মিত! শিফা ছলছল চোখে হাসল। সে সব জানে। জানে বিধায় এতদিন পর ওকে দেখে ব্যাকুল হয় নি। হাসেও নি।বরং যথেষ্ট স্বাভাবিক আছে। স্বপ্নীল কানাডায় যায় নি।দিগন্তের লোক ওকে শুটও করে নি। শিফার দেহরক্ষীর ব্যাপারে
স্বপ্নীল জানত। এতটা বোকা সে নয়! কেউ ওকে নজরে রাখবে আর সে বুঝতেই পারবে না। এটা ভাবাও নেহাৎ বোকামি। উল্টে সেই, দেহরক্ষীকে তিনগুন টাকা দিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছিল। এবং নিজের হাতে শুট করে নিখোঁজও হয়ে দিয়েছিল।
যাতে শিফা দিগন্তকে দোষী ভাবে। হয়েছেও তাই।
এসব করার বিশেষ কারণও ছিলো। প্রশান্ত ওকে ডেকে তার পাপকর্ম শিফা আর দিগন্তের ঘাড়ে চাপিয়েছিল। সাফাকে দিগন্ত মেরেছে আর শিফা সব জেনেও কিছু বলে নি। দিগন্তকে শিফা প্রশ্রয় দিয়েছে। আর দিগন্ত সুযোগ বুঝে মজা লুটেছে।
অসংখ্যবার সাফার সঙ্গে সঙ্গমে লিপ্তও হয়েছে।
ফেইক আইডির চ্যাটও সে স্বপ্নীলকে দেখিয়েছে।
এসবের মধ্যে শিফা সাফার ময়নাতদন্তে মিথ্যা রিপোর্টও বানিয়েছিল। কেউ যেন ধরতে না পারে তাই চটজলদি বিয়েও করে নিয়েছিল। প্রশান্ত এসব বলে ভুল বুঝিয়েছিল। স্বপ্নীল প্রমাণ পেয়ে মেনে নিয়েছিল। একটা ভাইয়ের পক্ষে বোনের এ কথা শোনা কতটা কষ্টকর। স্বপ্নীলও বুঝেছিল।
তখন থেকে শিফার পেছনে লোক লাগিয়েছিল। বেইমানীর শাস্তি দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল।কিন্তু
দিগন্তের জন্য সফল হয় নি। দিগন্ত শিফাকে সব সময় বাঁচিয়েছে। সর্বদা ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে আর প্রশান্ত বহুবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিল।
হ্যাঁ, এটাও সত্যি স্বপ্নীল শিফাকে ভালোবাসাত।
তা এখন অতীত। পছন্দের মানুষকে চাইত।তবে
বোনের খুনিকে নয়। শিফা খুনি। একজন খুনি তার প্রিয় হতেই পারে না। শিফা ওর পরিবারকে, বোনকে, ভালোবাসা, সুখ, মন, সবকিছুকে খুন করেছে। কষ্টের অনলে দগ্ধ করেছে। ছাড় নেই ওর। কিছুতেই না! এর মধ্যে হাসিব কিভাবে যেন সত্যটা জেনে গিয়েছিল। এজন্য স্বপ্নীল'ই ওকে সরিয়ে দিয়েছে। হাসিব গোপনে শিফাকে রেকর্ড পাঠিয়েছিল। শিফা তাতেও চমকায় নি। কারণ কঙ্কালের পার্সেল পাওয়ার পর, শিফা স্বপ্নীলকে খুঁজতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। একজন দেহরক্ষীর মাধ্যমে সব সত্যিটা জেনেছিল। সেদিন থেকে সে মানুষকে বিশ্বাস করা ভুলে গেছে।আপনজনদের
প্রতিও না। এই পৃথিবীতে কেউ স্বার্থহীন না,কেউ
না। নিজ স্বার্থে ঘা লাগলে কেউ আপন পরের পরোয়া করে না। স্বপ্নীলও তাই। ওর মনে প্রণয় নয়। বর্তমানে ঘৃণা আর প্রতিশোধের জেদ কাজ করছে।শিফার মামার মৃত্যুর পর কষ্ট পেতে পেতে কষ্টসওয়া হয়ে গেছে। কষ্ট না পেলে অস্বাভাবিক লাগে। স্বপ্নীল ওর ভালোলাগার মানুষ ছিলো। ভালোবাসার কেউ হলে এত সহজে ঘৃণা করতে পারত না। এটাও টের পেয়েছে। যাকে প্রিয় বলে সম্বোধন করেছিল, সেই প্রাণে আঘাত করেছে।
বেশ তো! শিফার ক্ষতি করার জন্য দিগন্ত ওকে এখানে তুলে এনেছিলো। প্রচন্ড মেরেও ছিলো।
এত মার খেয়ে দিগন্ত ওখানে বসে ওর লোকদের
শিফার পিছু নেওয়ার আদেশ দিতো। দিগন্ত তা ধরে ফেলাতে ওকে এই রুমে আঁটকে রেখেছিল।
বার্তা পাঠানোর গোপন ফোন ভেঙ্গে ফেলেছিল।
এসব কিছু শিফা অবগত। শিফার চোখে পানি দেখে স্বপ্নীল হাসতে লাগল। সে এখনো বিশ্বাস করে; শিফা খুনি।
স্বপ্নীল হাসতে হাসতে শিফার গালে স্বজোরে এক থাপ্পর বসিয়ে দিলো। শিফা গালে হাত দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ক্ষনিকের জন্যও অবাক হচ্ছে না। স্বপ্নীলের এরুপটা এতদিন চাপা পড়ে ছিলো। আজ স্বচক্ষে দেখছে। স্বপ্নীল গর্জে উঠে আবার শিফাকে থাপ্পর দিতে গেলে শিফা ধরে ফেলল। ওর আঙ্গুলে ভাঁজে আঙ্গুল রেখে মুচড়ে দিয়ে বলল,
-'তুইও অমানুষ। তোকেও প্রচুর ঘৃণা করি।'
-'তো?'
-'অপেক্ষা কর বুঝে যাবি।'
স্বপ্নীল হাত ছাড়িয়ে শব্দ করে হাসতে লাগল। এ মেয়ের তেজ এখনো কমে নি। সে কমিয়ে দিবে।
এই দিনেরই অপেক্ষায় ছিলো। এজন্য দিগন্তের
কাছে ভালোও সেজেছে। যেন শিফার জন প্রাণ দিয়ে দিবে। দিগন্ত ওর কথা বিশ্বাস করে ছেড়ে দিয়েছে।শিফাকে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা রেখেছে।
বোকা দিগন্ত। যদিও সে বর্তমানে দেবদাস। উফ, ছেলেটা ছ্যাকা খেয়ে বাঁকা হয়ে আছে। তার সব জারুজুরি শেষ। স্বপ্নীল শিফার থুতনী চেপে ধরে বলল,
-'দিগন্ত খেয়ে ছেড়ে দিয়েছে। ভেবেছিলি, আমার কাছে আসবি। আর আমি গ্রহন করব?'
-'এরচেয়ে মৃত্যু ভালো।'
-'মেরে তোর শখ পূরণ করছি।'
-'তাই কর।'
স্বপ্নীল সত্যি সত্যি শিফার গলা চেপে ধরল।যেন
মেরে'ই ফেলবে। শিফা বাঁধা দিচ্ছে না। মরলেই শান্তি। আপনজনকে জঘন্য দেখলে এমনিতেই মরে যেতে ইচ্ছে করে। চেনা কেউ'রা অচেনা হলে কষ্ট হয়। যন্ত্রণা'রা ঘিরে ধরে। শিফার অঝরে
অশ্রু ঝরছে। হঠাৎ একটা বুলেট এসে স্বপ্নীলের হাতে লাগল। নিঃশব্দে। খোলা জানালা দিয়ে দিগন্ত শুট করেছে। ওর টার্গেট মিস যায় না। ওর রাগান্বিত দৃষ্টি। স্বপ্নীল হাত ঝাড়া দিয়ে ব্যথাতুর শব্দ করে উঠল। লাল রক্ত ঝরছে। বুলেট গেঁথে গেছে। তখন সুখু রুমের ভেতরে প্রবেশ করল।
দিগন্ত রুমে ঢুকে স্বপ্নীলকে লাথি দিলো। রাগে ওর শরীর কাঁপছে। শিফার জন্য ভাইকেও ছাড়ে নি। র্নিদয়ের মতো মুন্ডুচ্ছেদ করেছে। বাবাকেও মাফ করে নি। যার হাসি দেখতে এতকিছু করছে,
আর স্বপ্নীল কি না তার শরীরে'ই হাত দিয়েছে। এটা মানা যায়? মানা সম্ভব কি? সে তো মানবে না। তাছাড়া দিগন্ত স্বপ্নীলকে বুঝিয়েছেও ; শিফা র্নিদোষ। স্বপ্নীল মানতে নারাজ। এখানে দিগন্ত বা করবে? আর ওকে এত তেল মারবে কেন? সে কে? ওকে পরীক্ষা করতেই শিফাকে পাঠিয়েছিল।
আর সে না ভেবেই খোলস থেকে বেরিয়ে এলো।
যাকে মনে প্রাণে নিজের করে চাচ্ছে। তাকে নাকি অন্যের হাতে তুলে দিবে, হাস্যকর। সে এতটা দয়াবান না ছিলো; আর না এখন আছে। তখন
স্বপ্নীল ঝট করে উঠে সুখুর থেকে পিস্তল কেড়ে শুট করল। ওর টার্গেট মিস হওয়াতে দিগন্ত বেঁচে গেল। ততক্ষণে সেও শুট করে দিয়েছে। স্বপ্নীলের বুক বরাবর। শিফা হতভম্ব! স্বপ্নীল মুখ থুবকে নিচে পড়ে গেল। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে সে
মৃদু হেসে বলল,
-'তোকে আমি মাফ করবো না শিফা। কখনোই না। তুই আমার হৃদয় ভেঙ্গেছিস।'
দিগন্ত পরপর আরো দু'টো শুট করে হাসল।যাক
এবার শান্তি লাগছে। স্বপ্নীর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল। চোখে তার ঘৃণা। দিগন্ত তখন শিফাকে বলল,
-'তোর শহরের আমি নগন্য ধূলিকণা মাত্র।তবুও আমার তোকেই চাই।'
শিফা নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে আছে। একে সুযোগ দিতে চেয়েছিল। যার হৃদয়ে মায়া কিচ্ছু নেই।এর মধ্যে পরিবর্তন এসেছে ভেবেছিল। আচ্ছ সে কি আদৌ মানুষ? কোনো মানুষ এতটা জঘন্য হয়?
তখন দিগন্ত এগিয়ে এসে ধীর কন্ঠে বলল,
-'আমার অতীতটাকে কত খন্ড করলে তোমায় পাবো, বললে না তো?
-'আমার অতীতটাকে কত খন্ড করলে তোমায় পাবো, বললে না তো?
শিফা নির্লিপ্ত দৃষ্টি তাকিয়ে আছে। মুখভঙ্গি দেখে কিছু বোঝার উপায় নেই৷ দিগন্ত হাসি মুখে তাকিয়ে আছে। উত্তরের আশায়। সুখু মাথা নিচু করে হাসছে। যাক শান্তি লাগছে। অবশেষে এক হচ্ছে। প্রাপ্তিও নিশ্চিত। পাগল প্রেমিকরা এমনই হয়। দিগন্তও হচ্ছে। এতে দোষের কিছু নেই। যে
ভালবাসতে জানে; সে বিনাবাক্যে মারতে এবং মরতেও পারে। নয়তো সে প্রেমিক নামে কলংক।
রত্নাকে খবর'টা দিতে হবে। আজ খুশির দিন। এত খুশি ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। দিনটা
মনে রাখতে, কাস্টমারদের ফ্রিতে গাঞ্জা বিলাবে। আজ নেশাখোরদের মুখে হাসি ফুটুক। দিগন্তের গাঢ় প্রণয়ের নেশা আর বাকিরা পুরিয়ার নেশায় ডুবুক। মত্ত হোক যার যার নেশায়। হাসি ফুটুক সকলের মুখে। এসব ভেবে সুখু দ্রুত সরে গেল। পূর্নতা পেলে অথবা পেতে দেখলেও সুখ লাগে।
মনে প্রশান্তি বিরাজ করে। তবে সবাই তো আর পূর্ণতা পায় না। পূর্ণতা সৌভাগ্যবানের জিনিস।
দিগন্ত নিশ্চুপ! ওর দৃষ্টিতে শিফাকে নিজের করে পাওয়ার সিক্ত আশা স্পষ্ট। মনে চলছে হাজারো
ব্যাকুলতা। তখন শিফা এগিয়ে দিগন্তকে জড়িয়ে ধরল। খুব শক্ত বাঁধনে। স্ব-জ্ঞানে! স্ব-ইচ্ছায়!সুস্থ মস্তিস্কে! ওর বাঁধন এতটা শক্ত যেন বুকের মধ্যেই ঢুকে যাবে। দিগন্ত স্তম্ভিত। অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাপ্তি। শিফা দিগন্তের গলায় মুখ লুকিয়ে পিঠের শার্ট খামছে উচ্চশব্দে কাঁদতে লাগল। অবাধে ঝরছে অশ্রুধারা। যদি কষ্টটা লাঘব হয়। বুকের ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছে। দম আটকে আসছে।যেন
মহামূল্যবান কিছু চিরতরে হারাচ্ছে। যদিও তার হারানোর কিছু বাকি নেই।শিফার অশ্রু দিগন্তের বুক ভিজিয়ে দিচ্ছে। দিগন্তে চোখ বন্ধ করে সেটা অনুভব করছে। প্রশান্তিতে ছুঁয়ে গেছে ওর অশান্ত বুকটা। সুখ অনুভূত হচ্ছে। ইস, সময়টা থমকে গেলে বেশ হতো। সেকেন্ড, মিনিট, ঘন্টা, দিন, মাস, বছর এসে যুগও এভাবেই পেরিয়ে যেতো।
শিফা গোড়ালি উঁচু করে বাঁধন'টা আরো শক্ত করল। দিগন্তের মুখে হাসির ফুটলো। সেও শক্ত করে বাহুডোরে টেনে কপালে, গালে, থুতনীতে, ঠোঁটে, অসংখ্য আদর দিলো। শিফাও জবাবে
দিগন্তের কপালে আদর দিলো। সময় নিয়ে।ঠিক
তখন ওর অশ্রু গড়িয়ে পড়ল দিগন্তের বুকের বাঁ পাশে। তখন দিগন্ত ওর গাল ধরে আদুরে কন্ঠে বলল,
-'স্ব-ইচ্ছায় তোর আদুরে স্পর্শ পাওয়ার বড্ড
শখ ছিলো আমার।'
-'(শিফা নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে আছে)'
-'আমি প্রস্তুত, জান।'
শিফার কান্নার গতি বেড়ে গেল। আর দিগন্তের ব্যথাতুর কন্ঠে 'আহ্' শব্দ উচ্চারণ করল। ওর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। জোরে জোরে নিঃশ্বাসও নিচ্ছে।
তবুও কেউ কাউকে ছাড়ল না। দিগন্ত শক্তভাবে জড়িয়ে রাখল। শিফা ছাড়তে জুরাজুরি করলেও ছাড়ল না। বরং শিফাকে ব্যথিত কন্ঠে বলল,
-'শক্রতার বশে বৈধ সম্পর্কে জড়িয়েছিলাম।বউ হয়ে এসে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিয়েছিলি এই বুকে। থমকে দিয়েছিলি আমার অতীত। আর স্তব্ধ হয়ে হয়েছিলাম আমি। ছাড়লাম পাপকর্ম। করলাম মাথা নত। হেরেও গেলাম দৃঢ় সংকল্পের কাছে। তবুও বলবো না ভালোবাসি। আটকাবো না পথ। দেখাব না গাঢ় অধিকার। ক্ষত-বিক্ষত এ হৃদয়ে শুধু গেঁথে রাখব তোকে। তোরই হেলায়
গড়ে উঠেছে এই বুকে যন্ত্রনার সমুদ্রপাড়। সেই
যন্ত্রনায় পুড়তে থাকে আমার দগ্ধিত হৃদয়। শুধু তোরই কারণে। তবুও রাখিনি অভিযোগ করিনি অভিশাপ। তুই ভালো থাক। বিষেপূর্ণ অতীতের সুমিষ্ট স্বপ্নগুলো ভিড় করে। নিরব আত্মনার্দে ডুকরে কেঁদে ওঠে মন। তোকে পাওয়ার আকুলতা
জারি করে। শুধু জেনে রাখ,পাপী মনেও আঘাত হানে। কষ্ট জমে বুকের গহীনে। অশ্রুও ঝরে দুটি
নয়নে।শুধু তোর'ই কারণে।তোর'ই প্রণয়াসক্তে।
আমার ভারাক্রান্ত আকাশে অপ্রাপ্ত নক্ষত্র তুই। যে নক্ষত্রের আলো পড়বে না আমার গায়ে। না পারব ছুঁয়ে দেখতে। আমি নামক মায়াতে তোকে জড়াতে পারে নি। পারবেও না। তবুও তুই সুখে থাক। তোর ঘৃণার দৃষ্টির চেয়ে ছুরিকাঘাত ঢের ভালো। ছুরির আঘাতে মৃত্যু। চিরতরের বিদায়। তোর চাহনিতে বার বার মরার চেয়ে এটা উত্তম। জানিস, আমার কষ্ট হয়। বুকে অদৃশ্য রক্তক্ষরণ বাড়ে। না দেখাতে পারি না আর না বোঝাতে। আমি প্রচন্ড লোভী প্রেমিক।তাই বিনাশ নিশ্চিত জেনেও ভালোবেসেছি। তোকে পাওয়ার কত স্বপ্ন বুনেছি। তবুও আফসোস নেই।
কারণ, আমি তোর কাছে অভিশাপস্বরুপ হলেও তুই আমার কাছে আর্শিবাদস্বরুপ।'
এসব বলে শিফাকে ছেড়ে দিলো। নিজের ভর রাখল পারল না। মুখ থুবকে পড়ে গেল। লাল রক্তে ভিজে আছে সাদা শার্ট। ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে। দিগন্ত হাসছে। কষ্টমাখা হাসি। ছলছল চোখ। শিফা রক্তাক্ত ছুরি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। কথার ছলে সে ছুরিটা বসিয়েছে। দিগন্ত বুকের বাঁ পাশে। একবার নয় পরপর তিন বার। দিগন্ত বাঁধা দেয় নি। টু শব্দও করে নি। মেনে নিয়েছে প্রিয়তমার উপহার। শিফা দিগন্তের সামনে বসে পড়ল। বুকফাটা চিৎকার দিয়ে কাঁদতে লাগল।
দিগন্তের রক্তে সেও রঙিন। হাতের ছুরিটা ছুঁড়ে ফেলে চিৎকার করে বলতে লাগল,
-'সব পাপকর্মের হিসাব বরাবর। এটা না করলে বিবেকের কাছে হেরে যেতাম। প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ হতো।
সব পাপ ক্ষমার যোগ্য না। জীবনও খেলার বস্তু নয়। পারতাম না ক্ষমা করতে। দেওয়াও যেতো না পরবর্তী সুযোগ। আপনি'ও শুধরাতেন না।আপনার শাস্তির জন্য কারাগারও উপযুক্ত নয়। মৃত্যু'ই আপনার জন্য উপযুক্ত শাস্তি। হ্যাঁ মৃত্যু।
মৃত্যু।'
শিফা পাগলের মতো কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলল। যাকে মারতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। তাকে মেরেই কলিজা ফেটে যাচ্ছে। কাটা মুরগির মতো ছটফট করছে। দিগন্তের প্রতিটা কাজ সম্পর্কে সে অবগত। ওর ঢাল হওয়ার কথাও। ভালোবাসলে পাপ মাফ হবে না। সে বাস্তবাদী। আবেগকে সে প্রশ্রয় দেয় না। যদি দিতো তাহলে অনেক আগে
দিগন্তকে মেনে নিতো। সুখে সংসার করতো। সব
ভুলে দিগন্তকে সুযোগ দিতো। কিন্তু তা সম্ভব না।
সে এমন একজন মানুষ যাকে অপছন্দ তাকে'ই শেষ করে দিবে। এছাড়া, পালাবার পথ'ও নেই।
কতদিন দেশের বাইরে থাকত? দিগন্ত সত্যি খুব ভালোবাসে। সেও জানে। তবুও নিরুপায়। সে পাপী। পাপীর শাস্তি অবশ্যিক। সব অন্যয় তার সঙ্গে হয়েছে। তাই সেই শাস্তি দিবে। তাই দিলো।
আর দিয়ে সেই দগ্ধ হচ্ছে। শিফার চিৎকারে সুখু দৌড়ে এসে থমকে গেল। দিগন্ত বুক চেপে ধরে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। সুখু যেতে গেলে দিগন্ত নিষেধ করে থেমে থমে উচ্চারণ করল,
-'আমার প্রিয় বউয়ের দেওয়া সর্বপ্রথম ও শেষ উপহার। আমি খুশি জান। খুব খুশি।'
-'ছ্যার, ছ্যার হসপিটালে যেতে হবে। উঠুন, প্লিজ উঠুন।'
-'কাঁদবি না সুখু। ছাড় আমাকে! আমি একদম
ঠিক আছি।'
-'ম্যাডাম ছ্যারকে হসপিটালে নিতে হবে। নাহলে ছ্যার মরে যাবে, ম্যাডাম প্লিজ কিছু বলুন। ছ্যার, তাকান। ম্যাডাম ছ্যার মরে যাবে, মরে যাবে।'
শিফা থম মেরে গেছে। সুখুর চিৎকার ওর কানে যাচ্ছে না। সুখু পাগলের মতো কাঁদছে। দিগন্তের হাত ধরে টেনে উঠানোর চেষ্টা করছে। দিগন্ত'ই উঠছে না। বরং ওর হাতটা ছাড়িয়ে অনেক কষ্টে শিফার কোলে মাথা রাখল। দুই হাতে শিফার কোমর চেপে পেটে মুখ গুজল। যে মারল আবার তাকেও জড়িয়ে নিচ্ছে। ঠিক কতটা বেহায়া হলে কেউ এমন করে! সত্যিই সে বেহায়া, লজ্জাহীন, এক প্রেমিক পুরুষ। নয়তো এত ঘৃণা, অবহেলা,
কটুবাক্যের পরেও এত ভালোবাসত না। দিগন্ত
চাইলে শিফাকে আটকাতে পারতো। জোরপূর্বক বন্দি করতে পারত। বন্দি পাখিকে করে। প্রিয়কে নয়! দিগন্ত জানে ওর কিছু শিফা নিবে না।তবুও
সব শিফার নামে।অনেক আগে হসপিটালও ওর
নামে করে দিয়েছে। শিফা অঝরে কাঁদছে। দিগন্ত তখন অস্পষ্ট স্বরে বলল,
-'সবটাই কি আমার কর্মফল নাকি নিয়তি?'
-'জানি না। কিচ্ছু জানি না।'
-'স্মৃতির চৌকাঠে আমার প্রেমটুকু গেঁথে রাখিস। আর মনে করিস, এই পাপীর প্রণয়ের গল্পকথা।'
শিফা দিগন্তের মুখে অসংখ্য আদর দিলো। সে ব্যাতিব্যস্ত হয়ে ডাকতে লাগল। স্বপ্নীলের জন্য এতটা কষ্ট হয় নি। তাহলে দিগন্তের জন্য হচ্ছে কেন? ওরা দু'জনই তো খারাপ। শিফাকে এমন করতে দেখে দিগন্তের অশ্রু ঝরছে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। খুব কষ্ট হচ্ছে। দিগন্ততে ছটপট করতে দেখে শিফা ওর মাথাটা বুকের সাথে চেপে ধরে চিৎকার করে বলল,
-'বোধহয় আমিও ভালোবাসি তোমায়।'
-'আমি স্বার্থক।'
-'আমাকেও মেরে দেন।'
-'তোমার মাঝেই আমি জীবিত থাকব, প্রিয়।'
-'অভিযোগ? '
-'নেই। তবে?'
-'কী?'
-'ভালোবাসি।'
শেষ মুহূর্তে এসে দিগন্তের মুখে হাসি ফুটল। এই মধুমাখা কথাটা শুনতে অপেক্ষারত ছিলো। সে
সত্যিই স্বার্থক। দিগন্ত শেষবার শিফাকে জড়িয়ে ধরল রক্তাক্ত বুকে। তারপর অনেক কষ্টে বলল,
-'মরে গেলে ভেবে না ফাঁকি দিয়েছি। সাঁঝক বাতি হয়ে এসে বলব; তোমায় ভালোবাসি।'
সমাপ্ত....
(বিঃদ্রঃ- পরিসমাপ্তিতে পাপ এবং প্রণয়ের জয়)
Writer:- নূরজাহান আক্তার (আলো)