> সাঁঝক বাতি পর্ব ২১, ২২ | Bangla Fiction | বাংলা জনপ্রিয় উপন্যাস
-->

সাঁঝক বাতি পর্ব ২১, ২২ | Bangla Fiction | বাংলা জনপ্রিয় উপন্যাস

রুমজুড়ে সুনশান নিরাবতা। দুপুর গড়িয়ে এখন বিকেল। দিগন্ত শিফার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে। প্রায় ঘন্টা খানিক হলো। দুপুরে খায় নি।
শিফার ওড়না হাতে পেঁচিয়ে কোমর ঝাপটে ধরে আছে। খুব শক্ত বাঁধনে। শিফা যেন পালাতে না পারে। অথবা স্বপ্নীলকে খুঁজতে না পারে।এজন্য 
এই বুদ্ধির প্রয়োগ। শিফা খাটে হেলান দিয়ে চুপ করে বসে আছে।দৃষ্টি ঘূর্ণায়মান সাদা সিলিংয়ের দিকে। গভীর ভাবনায় মগ্ন। দিগন্ত ঘুমের ঘোরে ওর পেটে নাক ঘষে পুনরায় ঘুমে তুলিয়ে গেল। তবে হাতের বাঁধন নরম করল না। শিফার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে গেল। এই মানুষটার সঙ্গে সে 
বৈধ সম্পর্কে আবদ্ধ। তার স্বামী! এছাড়াও জাত
শত্রু। মামার খুনি। বান্ধবীর খুনির ভাই।পাপী। 
অসংখ্য অপকর্মে লিপ্ত। যা মাফেরও অযোগ্য।
এর পরিণতিও ভয়ংকর। শিফা দিগন্তের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। নিদারুণ মুখের গড়ন।এই মানুষটা এত জঘন্য বোঝার উপায়ও নেই। যাকে
বাবা বলে ডাকত, তাকেও নিজের হাতে মেরেছে। 
তাও নৃশংসভাবে। বুক কাঁপে নি। মায়াও হয়নি।
এত খারাপ হয়েও, সে বাবা হওয়ার স্বপ্নও দেখে।
তাও শিফার গর্ভের বাচ্চার। যে সম্পর্কের ভীত নেই। প্রণয়ের ছিঁটেফোঁটাও নেই। সেই সম্পর্কের 
জোরে নিষ্পাপ প্রাণকে আনা বোকামি। তার তো দোষ নাই। শিফা দিগন্তের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে দিবে না। সম্ভবও না। কারণ, দিগন্তের যে রাগ, বাচ্চাকে মারতেও দু'বার ভাববে না। স্বার্থে লাগলে ভুলে যাবে তার বাচ্চা। 

দিগন্তের কামড়ে শিফার ভাবনার ছেদ ঘটল। সে গভীর ভাবনায় ডুবে ছিলো। দিগন্ত হাসছে! যেন খুব মজা পেয়েছে। শিফা বিরক্তিতে মুখটা কুঁচকে নিলো। হাতে কামড়ের দাগ বসে গেছে। জ্বলছে।
দিগন্ত শিফাকে পুনরায় জাপটে ধরে বলল,

-'ভাগ্যে কি আছে জানি না। তবে যতক্ষণ বেঁচে  আছি, খুব বিরক্ত করব, খুব।'
-'বাসায় যাব, সরুন।'
-'উহুম, এখন না।'
-'অতিরিক্ত কোনোকিছুই ভালো নয়।'
-'সহমত। আমরা এখন গোসল সেরে, খাবো।'
-'না, আমি বাসায় যাবো।'
-'দিবো না যেতে। ইমাজেন্সি পিল আর কতবার খাবে? কি, ভেবেছ আমি কিছু জানি না। আমার সঙ্গে চালাকি! যেতেও দিবো না, ইমাজেন্সি পিল খেতেও পারবে না। এটাই ফাইনাল ডিসিশন।' 

শিফা রেগে দিগন্তকে সরাতে চাইলেও পারল না। 
বরং উঠে বসে শিফাকে বুকে জড়িয়ে নিলো।খুব শক্ত করে। ঠোঁটের কোণে ফিচেল হাসি। দিগন্ত 
চোখজোড়া বন্ধ করে কিছু বলল। খুব'ই আস্তে। 
শিফা ওর কথা বুঝল না। বোঝার চেষ্টাও করল না। ফোনে কল আসায় দিগন্ত সেভাবে জড়িয়ে ধরেই কথা বলল।শিফাকে সরালোও না, যেতেও দিলো না। বরং খুব যতনে আগলে রাখল, ওর 
বক্ষপিঞ্জারায়। যেখানে হৃদপিন্ডের অবস্থান। সে শিফাকে হৃদপিন্ডের কাছে স্থান দিয়েছে।স্বজ্ঞানে!
স্ব-যতনে! তখন সুখু দরজা নক করল। দিগন্ত সাড়া দিলো না। কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। সময়টাকে থামিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে। ঘড়ির কাঁটাকে স্থির করার সাধ জাগছে। এ আলিঙ্গনে  শতযুগ পেরিয়ে যাক। জীবনও থমকে যাক। এই অবস্থায় মৃত্যু আসুক। নিয়ে যাক ওর প্রাণপাখি। অাফসোস থাকবে না। অনুশোচনাও হবে না।চারদিকে অফুরন্ত সুখ আর সুখ। এতবছর পর, জীবনে যেন সুখের সন্ধান মিলেছে।স্বস্তি পাচ্ছে। 
শিফা নিশ্চুপ! এ প্রথম কোনো ছেলের বক্ষঃস্থলে 
মাথা রেখেছে। হৃদপিন্ডের শব্দ শুনছে। খুব দ্রুত হার্টবিট চলাচল করছে। অদ্ভুত শব্দ।যেন ছিঁটকে
বেরিয়ে আসার উপক্রম। নিঃশ্বাসের গতিবিধি'ও অনুসরণ করছে।তবুও শরীরে শিহরণ বইছে না। কোনো অনুভূতি কাজ করছে না। মন অকেজো, 
অনুভূতিশূন্য। শিফাকে চুপ থাকতে দেখে দিগন্ত ওর কপালে আদর দিয়ে বলল,

-'ভালোবাসি না। একটুও না, একফোঁটাও না।'
-'আচ্ছা।'
-'যেতেও দিবো না।'
-'আপনার চোখ অন্য কথা বলছে।'
-'এ চোখের মায়ায় অনেকেই পড়েছে। তবে কেউ চোখের ভাষা পড়তে সক্ষম হয় নি। এমনকি সে, তুমিও না।'
-'আপনার চোখ প্রণয়ের স্বপ্ন বুনছে। বিনাশকে আহ্বান করছে। সাবধান, পরে সামলানো দুষ্কর হয়ে যাবে।'

দিগন্ত শিফার গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে সরে গেল। সুখু
ডাকছে। হয়তো বিশেষ কাজে। নয়তো এতবার 
ডাকত না। তাও শিফার সঙ্গে থাকাকালীন। ওর এত সাহসও নেই। দিগন্তকে প্রচুর ভয় করে। যেন
ওকেই গিলে খাবে। দিগন্ত শার্ট ঠিক করে সামনে 
পা বাড়াল। শিফাও বের হচ্ছে। এই তো সুযোগ। 
দিগন্ত ব্যস্ত হলে সেও বেরিয়ে যাবে। কিন্তু, দিগন্ত বাইরে থেকে দরজা আঁটকে চলে গেল। তাও খুব দ্রুত। শিফা দৌড়ে গিয়েও বের হতে পারল না। 
চেঁচিয়ে দরজা ধাক্কালো। লাভ হলো না। শিফার ডাক দিগন্ত শুনেও শুনল না। যেন বধির! বরং
মুখে শীষ বাজাতে বাজাতেই দো'তলায় নামল। 
ফোনে কথা বলতে বলতে কর্ণারের একটা রুমে প্রবেশ করল। এখানেই স্বপ্নীলকে রাখা হয়েছে।অদূরে বসে সুখু গাঞ্জার পুরিয়া বানাচ্ছে।আজই
কাস্টমারকে সাপ্লাই দিতে হবে। দিগন্তকে ঢুকতে দেখে সুখু গাঞ্জার পুরিয়া লুকিয়ে ফেলল। দিগন্ত গাঞ্জা দেখতে পারে না। সবচেয়ে সস্তা নেশাদ্রব্য এটা। সুখুকে নিষেধ করে এসব না করতে। তবুও এতদিনের ব্যবসা সুখু ছাড়তে রাজি না।ব্যবসায়
নাকি মায়া পড়ে গেছে। তাই সে বিশেষ অনুরোধ করেছে, কাজটা যেন করতে দেওয়া হয়। এজন্য
দিগন্তও আর কিছু বলে না। স্বপ্নীলের প্রচন্ড জ্বর এসেছে। জ্ঞান নেই। মার খেয়ে জ্বরে ভুগছে।ওর শরীরে কালশিটে দাগ স্পষ্ট। দিগন্ত ওকে একটা ইনজেকশন পুশ করল। একটুপরেই, শরীর ঘেমে জ্বর ছাড়বে। জ্ঞানও ফিরবে। বেচারা অনেক কষ্ট পাচ্ছে। মুক্তি দিতে হবে। চির-মুক্তি। ওর সময়ও ঘনিয়ে এসেছে। বেশিদিন অপেক্ষা করাবে না।
সুখুকে খেয়াল রাখতে বলে দিগন্ত বেরিয়ে গেল।
এখন ওর বউকে সামলাতে হবে। আদরের বউটা খুব রেগে আছে।

ওইদিকে, শিফার পুরো পরিবার দিগন্তের সম্পর্কে সব জেনে গেছে। সবার মাথায় যেন মস্ত আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে। দিগন্ত আর শিফা নিখোঁজ। ওরা কই? গতকাল, কেউ মাথা কাটা লাশ দিগন্তদের বাসার সামনে ফেলে গেছে। লাশের মাথা নেই। শুধু রক্তাক্ত দেহ। প্রতিবেশীরা দেখে পুলিশকে খবর দিয়েছে। পুলিশ এসে,  প্রশান্ত বা দিগন্তের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে নি। এমনকি অন্য সদস্যেদেরও না। যেহেতু ওদের'ই বাসার সামনে। 
তাই ওদের প্রয়োজন ছিল। যদি লাশটা শনাক্ত করতে পারে। পরে, প্রতিবেশীদের তথ্যানুসারে দিগন্তের বাবা-মা, প্রশান্ত-নিহা, দিগন্ত-শিফা ও সাবিনা খালার সম্পর্কে জানা গেছে। এরা সবাই উধাও। কাউকেই খুঁজে পায় নি। তারপর বাড়িটা তল্লাসি করে পাতালঘরের সন্ধান মিলেছে।এত 
কঙ্কাল এবং তাদের ঠিকানাও। টিভিতে এটাই ব্রেকিং নিউজ। প্রতিটা চ্যানেলে ওই পাতালঘর, কঙ্কালের স্তুপ আর এসিডের কূপটাকেই বার বার দেখানো হচ্ছে। সব জেনে শিফার পুরো পরিবার হতবাক। পাড়া-প্রতিবেশি ,আত্মীয়-স্বজন এসে নানান কথা বলছেন। স্বান্ত্বণা দিচ্ছেন। কেউ বা খোঁচা মারছেন। শিফার বাবা-মা, ভাই, শিফার
চিন্তায় কাঁদছে। শিফা উনাদের প্রাণ।তমার এসব অজানা নয়। তাই শক'ও খায় নি। শুধু শিফার জন্য চিন্তিত। লাশটা কার? আর কে বা মারল? 
মারল তো দিগন্তের বাসার সামনে রাখল কেন?
শিফা নয় তো! কিন্তু সে কোথায়? হাসিবও নেই।
কোনো খবরও পাচ্ছে না। দিগন্তের সঙ্গে শিফা নেই তো? তমা এসব চিন্তায় অস্থির। 

শিফা রেগে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আছে। যেন 
চোখ দিয়েই ভষ্ম করে দিবে। দিগন্ত হাসছে। তাও উচ্চশব্দে। দিগন্ত গোসল সেরে খাবার এনেছে।
শিফা খাবে না। সে এই মুহূর্তেই বাসায় যাবে।ওর কথা দিগন্ত পাত্তা না দিয়ে দুই হাত ওড়না দিয়ে বেঁধে দিলো। শিফার দুই পায়ের পাতার উপর পা রাখল। জোরে চাপ দিচ্ছে। তবুও সে খাচ্ছে না। দিগন্ত শিফার গাল চেপে খাবার ঢুকিয়ে দিলো। 
তারপর নাক চেপে ধরল। শিফা শ্বাস আটকে
যাচ্ছে। অর্থাৎ নিঃশ্বাস নিতে গেলে খেতে হবে।
নয়তো খাবার ফেলতে হবে। দিগন্ত মুখও চেপে ধরেছে। উপায়ান্তর না পেয়ে শিফা দ্রুত খাবার গিলে নিলো। দিগন্তও নাক, মুখ, ছেড়ে দিলো। শিফা জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। চোখ দিয়ে অঝরে পানি ঝরছে। সে রেগে দিগন্তকে থাপ্পড় দিতে গেল। অমানুষ একটা। দিগন্ত ওর হাতটা ধরে হাতের উল্টো পিঠে আদর দিলো। বেহায়া পুরুষ! শিফার জেদ, ওর হাতে খাবেই না। আর দিগন্তের জেদ, খেতেই হবে। এই নিয়েও কিছুক্ষণ যুদ্ধ চলল। দিগন্ত নিজে খেয়ে আরাম করে শুয়ে টিভিতে সংবাদ দেখছে। রুমের দরজায় তালা।
শিফা সোফায় বসে গজগজ করছে। রাগে পুরো শরীর কাঁপছে। তখন দিগন্ত শীষ বাজিয়ে ওকে টিভি দেখার ইশারা করল। শিফা একবার দেখে 
স্তম্ভিত হয়ে গেল। সবাই এসবকিছু জেনে গেছে! 
নিউজে পাতালঘরটা দেখাচ্ছে। কঙ্কালগুলোও।
তাহলে ওর বাব-মা, ভাইরাও জেনে গেছে। ওদের কি অবস্থা? শিফা অবাক দৃষ্টিতে দিগন্তের দিকে তাকাল। ওর কোনো হেলদোল নেই। এসব যেন স্বাভাবিক। হওয়ারই কথা ছিল। দিগন্ত শিফাকে পানি এগিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

-' টেনশনের কিছু নেই। আমি আছি, পাগলি।'
-'এসবের মানে কী? ওই মৃত লোকটা কে?'
-'তোমারই খুব চেনা কেউ।'
-'আমাকে মারছেন না কেন? আপনার পায়ে পড়ি আমাকে মারুন, প্লিজ।'
-'নিজের হৃদপিন্ডকে কেউ মারে? ব্যথা যে নিজে পাবো।'

শিফা অবাক চাহনি তাকিয়ে আছে। দিগন্ত ওকে ভালোবাসে! ওর ধারণায় সঠিক। বিপরীত মেরু আকষর্ণ করা চুম্বুকের কাজ। তেমনি বিপরীত লিঙ্গের মানুষ খুব দ্রুত আকৃষ্ট হয় একে-অন্যের প্রতি। কিন্তু এমন হওয়া কথা ছিলো না। দিগন্ত! যে কি না ওকে সহ্য'ই করতে পারত না। সম্পর্কও তৈরি হয়েছিল শত্রুতার জোরে। যাকে মারতে সে মরিয়া হয়ে উঠেছে। সে নাকি তাকে ভালোবাসে!
ব্যাপারটা হাস্যকর হলেও হাসতে পারছে না।সব ওর কাছে ধোঁয়াশা লাগছে। দিগন্ত ওকে উঠিয়ে বিছানায় বসাল। তারপর দুই গালে হাত রেখে আদুরে কন্ঠে বলল,

-'দেশের বাইরে চলে যাবো। সবকিছু নতুনভাবে শুরু করব। শুধু তোমাতে বিলীন হতে দাও।'

কথাটা বলে দিগন্ত উঠে চলে গেল। শিফা হাঁটু মুড়ে মুখ গুঁজে বসে রইল। সে সমীকরণ মিলাতে
ব্যস্ত। দিগন্ত আর রুমে আসল না। সন্ধ্যার পর, শিফা উঠে বাইরে বের হলো। কেউ নেই। নিচে নেমে হঠাৎ সুখুকে দেখে ডায়নিং টেবিলে বসল। আপেল তুলে খেতে লাগল।যেন আপেল খেতেই এসেছে। সুখু কিছু না বলে হেসে চলে গেল। ওর কাস্টমারকে গাঞ্জা দিতে। শিফা উঠে আশেপাশে কাউকে না দেখে ম্যানহলের দিকে গেল। প্রথম
সিঁড়িতে পা দেওয়ার দিতেই কেউ পেছন থেকে বলল,

-'জান, পালাচ্ছো? যেতে না নিষেধ করলাম।'

দিগন্তের কন্ঠে রাগ স্পষ্ট। শিফা নির্বাক।আবার ধরা পড়ে গেল। তবুও স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে রইল। অথচ দিগন্তকে দেখে ভয়ে বুকটা কাঁপছে। 
দিগন্ত এগিয়ে এসে শিফার গাল শক্ত করে চেপে ধরে বলল,

-'বেইমানীর জন্য ভাইকেও ছাড়ি নি। দেহ থেকে গলাটা আলাদা করে দিয়েছে। এখন তুইও একই পথেই হাঁটছিস!'




-'বেইমানীর জন্য ভাইকেও ছাড়ি নি। দেহ থেকে গলাটা আলাদা করে দিয়েছে। এখন তুইও একই পথে হাঁটছিস!'

শিফা নির্বাক। ভাই মানে প্রশান্ত? প্রশান্তর লাশ ছিল! দিগন্ত প্রশান্তকেও মেরে দিয়েছি? কেন? সে কিসের বেইমানী করেছে? ভাইকে মেরে দরজার সামনে ফেলে এসেছে। তাও নৃশংসভাবে। বুকও কাঁপে নি? সে আদৌ মানুষ! আবার ইচ্ছে করেই এসব সবাইকে জানিয়েছে। এতে ওর লাভ কি? দিগন্ত কেন সবাইকে জানাচ্ছে? সে কেন'ই বা মৃত্যুকে আহ্বান করছে? এখন পুলিশ তো উঠে পড়ে লাগবে। একে একে সবার পাপকর্ম বেরিয়ে আসবে। শিফা আর ভাবতে পারছে না। মস্তিষ্ক কাজ করছে না। দিগন্ত শিফাকে টেনে রুমে নিয়ে গেল। স্বজোরে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় বসিয়ে দুই গালে হাত রেখে বলল,

-' ভালবাসতে হবে না। তবে ভালোবাসতে দে।'
-'কেন এসব করছেন?'
-'আসক্তিতে ডুবে গেছি। তাই একটা তুই এর প্রয়োজন।'
-'ভালোবাসা ভালো। তবে ভুল মানুষকে নয়।'
-'মুগ্ধতায় আঁটকে গেলে এ মন ঠিক ভুল খুঁজতে যায় না। শুধু চায়, ভালোবাসায় সিক্ত হতে।'

শিফা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। দিগন্তকে বড্ড  অচেনা লাগছে। এই কি সেই দিগন্ত? যার শরীরে অহংকার আর ইগোতে পরিপূর্ণ ছিলো। কথায় কথায় অপমান করত। মারত! অকারণে কষ্ট'ও দিতো। ওরা একে অন্যের প্রতিপক্ষ। এ শত্রুতার জোরে ওদের সম্পর্ক। লোক দেখানো বিয়ে। এত অভিনয়। এত পাপ। হাড্ডা-হাড্ডি লড়াই। সেই শত্রু'ই ঘুরে ফিরে ওর প্রেমে পড়ল? এটা আদৌ বিশ্বাসযোগ্য? নাকি এটাও অভিনয়? সে নিখুঁত অভিনেতা। ওর পক্ষে সব সম্ভব। তাছাড়া দিগন্ত এক নারীতে সন্তুষ্ট ছিল না। সে ভিন্ন স্বাদ নিতে অভ্যস্ত। তাহলে? তখন দিগন্ত মৃদু হেসে শিফার দুই গালে ঠোঁট স্পর্শ করল।শিফা দিগন্তের থেকে 
সরে বসে বলল,

-'প্র প্র প্রশান্ত..!'
-'মেরে দিয়েছি। সব বেইমানদের নিঃশেষ করে ফেলেছি।'
-'কেন?'
-'আমার কলিজায় হাত বাড়িয়েছিল। সাবধান করেছিলাম, শুনি নি।'
-'সত্যি নাকি এটাও নতুন কোনো চাল?'
-'দেখবে?'

কথাটা বলে দিগন্ত ওকে দো'তলায় নিয়ে গেল। 
সর্বশেষ রুমটাতে প্রবেশ করল। শিফার একহাত দিগন্তের হাতের মুঠোয়। শক্ত করে ধরে আছে।
রাত তখন সাড়ে দশটা। চারদিকে নিস্তব্ধতা। এ বাড়িতে ওরা তিনজন ছাড়া কেউ নেই। শিফার অজানা ভয়ে বুক কাঁপছে। দরদরিয়ে ঘামছেও।
দিগন্ত কি দেখাতে নিয়ে এসেছে, কে জানে! তবে
রুমটা প্রচুর ঠান্ডা। শরীর শিউরে উঠছে। দিগন্ত 
ওকে দাঁড় করিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। সামনে অনেক বড় বক্স। কফিনের মতো। উপরটা বেশ চকচকে। দিগন্ত শিফাকে কাছে ডেকে বক্স খুলতে ইশারা করল। শিফা এগিয়ে এসে কম্পিত হাতে
বক্স'টা খুলল। আর খুলে'ই চিৎকার করে উঠে দিগন্তের বুকে মুখ লুকালো। থরথরিয়ে কাঁপছে।
দিগন্তের বুকের শার্ট শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছে।
যেন বুকের মধ্যেই ঢুকে যাবে। শিফার হাত হঠাৎ 
ঢিলে হয়ে গেল। দিগন্তের বুকে ঢলে পড়ে জ্ঞান হারাল। ওর মস্তিষ্ক অতিরিক্ত চাপ নিতে পারে নি। ফলস্বরুপ, মস্তিষ্কও কিছুক্ষণের জন্য কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। দিগন্ত ওকে জাপটে ধরে বুকে আগলে কফিনের ঢাকনা দিয়ে শিফাকে কোলে তুলে নিলো। ওর মুখে ফিচেল হাসি। সে হাসতে হাসতে শিফাকে কোলে নিয়ে রুমের দিকে পা বাড়াল। কফিনের মধ্যে পড়ে রইল, প্রশান্তর মাথা। শুধুই মাথা। চোখ দুটো খোলা। তাকিয়ে আছে। দিগন্ত ইচ্ছে করে ওর চোখ বন্ধ করে নি।
ঠান্ডা বরফে রাখার ফলে সেভাবেই আছে।আর 
ওর কপালে লিখা 'বেইমান'। হঠাৎ কেউ দেখলে ভয় পাওয়াও স্বাভাবিক। যেমন, শিফা পেয়েছে।

সেদিন, শিফা প্রশান্তর বেরিয়ে যাওয়া পর দিগন্ত উপস্থিত হয়েছিল। খুব স্বাভাবিক ছিল সে। তবে প্রশান্ত ওকে দেখে ঘাবড়েও গিয়েছিল। কারণ সে এখানে আসত না।আর এ স্থানটা চেনারও কথা না। প্রশান্তের কার্যকলাপে দিগন্ত খোঁজও রাখত না। যে যার মতো চলতো।প্রয়োজন ছাড়া কথাও বলত না। এজন্য প্রশান্ত অবাক হয়েছিল।দিগন্ত  শিফার পিছু এসেছিল? নাকি অন্যকিছু? একথা
জানতে প্রশান্ত জিজ্ঞাসাও করেছিল।

-'হট'স্ আপ ব্রো?'
-'লেটস্ টক এবাউট দা মেইন পয়েন্ট?'
-'ইয়াহ্, হুয়াই নট!'

তখন দিগন্ত আরাম করে বসে প্রশান্তকে সুন্দর করে বলেছিল,

-' শিফাকে রেপ করার জন্য তুলে আনতে লোক পাঠিয়েছিল। ছোট্ট তনয়ের হাতটাও কেটেছিলে।
ওর বাবাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করেছিলে। সাফাকে মেরেছো তাও আমার নাম জড়িয়ে। হাসিবকেও মারলে। শিফার বাবাকে পুলিশের দেওয়ার ফন্দি এঁটেছো। আমাদের ইন্টিমেন্ট অবস্থার ভিডিটাও রাখতে চেয়েছিলে। শিফাকে ইন্টিমেন্টের প্রস্তাবও দিয়েছিলে। তাও আমার'ই কাছে। এসব মেনেও নিয়েছিলাম। এখন আবার শিফাকে আমার'ই বিরুদ্ধে উসকে দিচ্ছো, কেন? তোমার বাবাকে মেরেছি তাই? 

-'ভাই তোর এত বুদ্ধি কেন রে? সবকিছু বুঝেও নিয়েছিস? তা সত্যি করে বলত, শিফাকে তুই ভালোবাসিস?'
-'না।'
-'তাহলে ওকে রেপ করলে তোর লাগছে কেন?'
-'আমার কলিজায় টান মেরে আবার আমাকেই জিজ্ঞাসা করছো, লাগছে কেন?'
-'ওহ হো। কিন্তু ভাই ওকে আমার চাই-ই চাই।'
-'সেই সুযোগ তুমি পাবে না।'

প্রশান্ত ওর কথা শুনে হাসতে লাগল। দুই হাতে তালি বাজিয়ে হাসছে। হাসতে হাসতে বেডে বসে পড়ল। যেন মজার কাহিনী শুনেছে। দিগন্তর যা 
বলেছে সত্যি। এসব কাজগুলো সব করেছে।তবে
কয়েকটাতে সফল হতে পারে নি। দিগন্ত'ই হতে দেয় নি। কিভাবে যেন দিগন্ত জেনে যেতো।আর 
ওর কাজে বাঁধা পড়ে যেতো। নিহাকে দিয়ে ওদের রুমে ক্যামেরা লাগিয়েছিল। কিন্তু সেই ক্যামেরা আর হাতে পায় নি। শিফাকে রেপ করে মারা ওর বড্ড শখ। শিফার মৃত্যু যন্ত্রনা উপভোগ করতে
চাইত। করতোও। আজ অথবা কাল। বাবাকে 
স্বচক্ষে মরতে দেখেছে। সেদিন কিছু বলতে পারে নি। আড়ালে দাঁড়িয়ে শুধু দেখেছে। বদলা তো নিতে হবে।এজন্য শিফাকে উসকে দিয়ে দিগন্তকে মারতে চেয়েছিল। দিগন্ত মারা গেলে রাজত্ব আর রাণী দু'টোই তার। মূলত, এই কারণেই শিফাকে সেদিন ছেড়ে দিয়েছিল। আর নোংরা পরিকল্পনা 
করে রেখেছিল। কিন্তু দিগন্ত ওকে সুযোগই দেয় নি। সে পানি খেয়ে গ্লাস রেখে আচমকা প্রশান্তর
গলায় ছুরি চালিয়েছিল। প্রশান্ত টু শব্দ করতেও পারে নি। ধারালো ছুরিতে একনিমিষেই গলা'টা পার করে দিয়েছে। আর একটা কথায় উচ্চারণ করেছে,

-'তোমায় বাঁচিয়ে রাখলে আমার বুকেই ছুরি'টা চালাতে। সুযোগ দিতে না পারার জন্য আমি সরি।'

তারপর দিগন্ত প্রশান্তর মাথাটা সঙ্গে এনেছিল। আর রক্তাক্ত দেহটা ওদের বাসার সামনে রেখে এসেছিলো। যখন কেউ বেইমানী করে। তখন সে ভুলে যায়; ব্যাক্তিটাকে চিনে। অথবা ওর কাছের কেউ। শিফাতে হারাতে গিয়ে নিজেই হেরে গেছে। প্রাণ নিতে গিয়ে মন উৎসর্গ করে ফেলেছে। ওর
রন্ধে রন্ধে ছড়িয়ে গেছে, প্রনয়ের ব্যাধি। শিফাতে আসক্ত সে। এই আসক্তির লাগাম টানতে ব্যর্থ।
কমানোর চেষ্টা করলে শতগুন বেড়ে যাচ্ছে। মন পুড়ছে।আবার অপ্রকাশিত রাখতেও অক্ষম সে। কুলুষিত মনে পবিত্র প্রণয়ের আগমন ঘটেছে।যা কল্পনাও করে নি। একটু একটু করে জেদী মানবী ওর মনটা ছিনিয়ে নিয়েছে। উন্মাদ করে দিয়েছে।
ওকে প্রেমিক পুরুষ করে তুলেছে। যেটা ক্ষুণাক্ষরে টেরও পায় নি। আর যখন টের পেয়েছে তখন অনেকটা দেরী হয়ে গেছে।

রাত তখন আড়াইটার কাছাকাছি। গভীর রাত।
নিস্তব্ধ চারিপাশ। শিফা দিগন্তের বাহুডোরে। সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মুখজুড়ে সিগ্ধতায় ভরপুর। 
আদুরে দু'টো গাল। চিকন গোলাপি রাঙা ঠোঁট। এলোমেলো চুল। জুবুথুবু পোশাক। একজোড়া চোখের মালিক নিষ্পলকভাবে ওকে দেখছে।তার
মোহময় দৃষ্টিতে। দেখার শেষ নেই। তৃষ্ণা মিটছে না। এই তৃষ্ণা হয়তো মিটবে না। মিটাতেও চায় না। দিগন্ত এতক্ষণে কতবার শিফার গালে ঠোঁটে ছুঁইয়েছে হিসাব নেই। কতবার বুকে চেপে ধরেছে, তাও অজানা। কতশত উক্তি বলেছে তাও হুশে নেই। সে শুধু জানে, রাগ, জেদী, এই মেয়েটাই
ওর মানসিক সুস্থিরতা। এর মাঝেই ওর ভালো থাকা। ওকেই ওর চায়।দিগন্ত হেসে শিফার ঠোঁটে আঙ্গুল বুলিয়ে দিলো। শিফা বিরক্তিতে দিগন্তর
বুকে মুখ ঘষে ঘুমে তলিয়ে গেল।নিশ্চিন্তের ঘুম।
দিগন্ত নিঃশব্দে হাসছে।শিফাকে জ্বালাতে ভালো লাগে। দিগন্ত একটু এগিয়ে শিফার কানে কানে বলল,

-'তুই যত দূরত্ব বাড়াবি। আমি তত ভালোবাসা বাড়িয়ে দিবো। আমার মৃত্যুর পূ্র্ব মুহূর্তেও তোকে পাওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টাটুকু করব। কারণ, তুই আমার অপরিপূর্ণ জীবনের; 'একমাত্র সাঁঝক বাতি।'





চলবে...





Writer:- নূরজাহান আক্তার (আলো)


NEXT ARTICLE Next Post
PREVIOUS ARTICLE Previous Post
NEXT ARTICLE Next Post
PREVIOUS ARTICLE Previous Post
 

Delivered by FeedBurner