নরওয়ের আকাশে এখন সূর্যের আলো নেই অনেক দিন হয়ে এলো।ডিসেম্বর মাসের শীতের বেশ প্রকোপ।এখন এখানে ডার্ক পিরিয়ড চলছে।
নভেম্বর ২১ থেকে সূর্যের আলো নেই।দুই মাস চলবে এই অন্ধকার সময়। আকাশে তখন অরোরা বুরিয়ালের লাল,সবুজ রঙের আলোর খেলা। অসলো শহরের কোনো একটা ছাত্রীবাসে ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে মাধুর্য।
তীব্র শীতে বিছানা তাকে বড্ড টানছে।
যেদিন প্রথম এই দেশে সে পা রেখেছিল!সে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল এই এক টুকরো স্বর্গের দিকে। বইতে পড়েছিলএখানে না কী সূর্য ডুবে না অনেক দিন।
হ্যাঁ, এখানে আসার পর মাধুর্য দেখেছে জুলাই মাসে মধ্য রাতেও সূর্যের আলো।
হস্পিটালের গ্রিল ধরে দাড়িয়ে ভেবেছে তার গ্রাম,মাম্মাই,মামা সবার কথা।
ফোনের স্ক্রিনে তাদের দেখে নিজেকে শান্ত করেছে।
সেদিন সকাল হতেই তার অবস্থা বেগতিক হলে পাগল প্রায় তার মামীরা তাকে নিয়ে ছুটেছিলেন শহরে।
মাথার পিছনে আঘাত পেয়েছিল মাধুর্য।
তার ছটফটানি দেখে সবাই শাপ-শাপান্ত করলো তারেকা বানুকে।
ডক্টর বললেন দ্রুত সিটিস্ক্যান করাতে। মাথায় লাগা আঘাত ছিল বেশ মারাত্মক। যা সরাসরি ইফেক্ট করবে মাধুর্যের দৃষ্টি শক্তিতে।
মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে রক্তচলাচল তখন প্রায় বন্ধ। নিয়ে যেতে বলা হলো উন্নতমানের চিকিৎসার জন্য বাহিরের দেশে নিয়ে যেতে বলা হয়। এদিকে অর্ণির ঝামেলা অন্য দিকে মাধুর্য।
মাধুর্যের মামারা বসে সিদ্ধান্ত নিলেন প্রয়োজনে আবাদি জমি বিক্রি করে হলেও তার চিকিৎসা আগে প্রয়োজন। ধীরে ধীরে মেয়েটি নিস্তেজ হয়ে যাবে এটা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
সাকিব দিন রাত মাধুর্যের আশেপাশে থাকতো।দেশের সকল প্রকার চিকিৎসা এবং চিকিৎসকদের সাথে তার কথা বলা শেষ। সবার একই কথা ছিল।
তারেকা বানু তবুও যেন থামেনি। একদিন জেরিন ইনিয়েবিনিয়ে খুব কাঁদলো বাড়ির সবার সামনে। বাধ্য হলো সাকিব সেদিন জেরিনকে বিয়ে করতে। তবুও বিয়ের রাতে সে ছিল মাধুর্যের বাড়ি। বার বার গা কাঁপিয়ে জ্বর এলো মেয়েটার। পরদিন আবার হস্পিটালে ভর্তি করতে হলো।বলা হলো দ্রুত চিকিৎসা না করলে মাধুর্যের অন্য অঙ্গ বিকলাঙ্গ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্ণি বা তার শ্বশুরঘরের কেউ এসব জানতে পারলো না।প্রায় এক মাস পর বিভিন্ন স্থান ঘুরে এসে তারা যখন এসব জানতে পারে তখন দ্রুত বোনের কাছে চলে এলো সে।
ইনহান চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল দরজার কাছে। মেয়েটা এজন্য বুঝি কল ধরতো না।সেদিন ও মাধুর্যের চুল থেকে টুপটুপ করে পানি ঝড়ছিল। যে ভেজা চুলে তাকে ভীষণ মায়াবতী লাগতো সেই মেয়ে বিছানায় মিশে আছে।
অর্ণিকে না মানার কোনো কারণ ছিল না কিন্তু তবুও অর্ণির মামারা তার সাথে কথা বললেন না। কিন্তু ওয়াহেদদের অসম্মান ও করলেন না। তাদের যথেষ্ট যত্নাতী করলেন।
মাধুর্যকে কোথায় কে নিয়ে যাবে এটা নিয়েই তাদের ব্যস্ততা। তখন আরহানের বাবা মাধুর্য কে দেখতে এসে তার বড় মামার সাথে অনেক কথা আলোচনা করলেন। তখন কথায় কথায় তিনি বললেন,
"বেয়াই সাহেব,আপনাদের কারো পাসপোর্ট নাই। আমরা সাধারণ মানুষ আমাদের ওসব লাগে না। কিন্তু এখন এই পাসপোর্ট করার সময় অনেক লাগবে।"
"কাজ চলতেছে। মেডিকেল পাসপোর্ট করার জন্য।এতে না কী সময় কম লাগে।"
"কিন্তু মেয়ের হাতে সময় নাই। আমার ছেলে পরশু নরওয়ে যাচ্ছে। ওইখানের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার চাকরি হয়েছে। যদি কিছু মনে না করেন আমার ছেলের সাথে ওখানে পাঠান। দ্রুত চিকিৎসা হবে।"
"বেয়াই আমরা সিংগাপুর পাঠাতে চাইছিলাম আরকি।"
"ওখানের চিকিৎসাও কিন্তু মন্দ না।একটু ভেবে দেখেন। মা মরা মেয়েটা।"
বড় মামা কথাটা সবাইকে বললে তারা রাজি হলেন। সাকিবের মন টানছিল না কারণ সিংগাপুর পাঠাতে পারলে বেশি ভালো হতো। এদিকে তার ছুটিও শেষের দিকে।
বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে জরুরী ভিত্তিতে মাধুর্যের মেডিকেল ভিসা এবং অন্যান্য কাগজপত্র তৈরী হলো।
যেদিন দেশ ছেড়েছিল সেদিন সাকিব পুরো সময় তার হাত ধরেছিল।এরপর টানা চারমাসের চিকিৎসার পর সুস্থ হয় মাধুর্য। সম্পূর্ণ সুস্থ না হলেও অনেকটা সুস্থ সে।
প্রতিনিয়ত সবার সাথে কথা হয়। এদিকে আরহান তার যথেষ্ট খেয়াল রেখেছে। প্রতিদিন হস্পিটালে এসে দেখা করেছে, সাহস জুগিয়েছে।
এরপর একদিন সাকিবের সাথে পরামর্শ করে মাধুর্য এখানে থাকতে এবং বাকী লেখাপড়া শেষ করতে যা যা কাগজপত্র ঠিক করা প্রয়োজন সব ঠিক করেছে৷
মাধুর্য এখন এখানে লেখাপড়া করছে সাথে একটা স্কুলে বাচ্চাদের ভায়োলিন শেখায়।
পত্রী,খুশবুকে খুব মনে পড়ে। মাম্মাই,মামা,রৌদ্রর জন্য রাতে বালিশ ভিজে যায়।
ইনহানের সাথে সবসময় যোগাযোগ হয়।
ইনহান এখনো তার মনের কথা মাধুর্যকে বলেনি। কারণ তারা বন্ধু এটাই কী অনেক নয়?খুব দ্রুত সে পারি জমাবে মাধুর্যের কাছে।
ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ না হয় সামনাসামনি চোখে চোখ রেখেই হবে।
সপ্তাহে একটা দিন আরহান মাধুর্যকে নিয়ে বের হয়। আজ সেই দিন।
হোস্টেল থেকে বেরিয়ে মাধুর্য দেখলো আরহান দাঁড়িয়ে আছে তার ব্যক্তিগত গাড়িতে হেলান দিয়ে।
মাধুর্য হেসে তার দিকে এগিয়ে যেতেই আবার দাড়ালো। ফিরে চলে এলো রুমে। এরপর একটা অর্কিড নিয়ে ছুট লাগালো আরহানের দিকে।
আরহান কে হাতে দিয়ে সে জানালো,
"শুভ জন্মদিন,সেঝ ল্যাডা ব্যাঙ।"
"রেস্পেক্ট মিস.আ'ম ইউর প্রফেসর"
"এখন নয়। এখন আপনি আমার বেয়াইমশাই। প্লিজ দ্রুত চলুন ক্ষুধা পেয়েছে। আজ আপনি ট্রিট দিবেন বলে কাল রাত থেকে খাইনি।"
"কখন বললাম ট্রিট দিবো?"
"আজ আপনার জন্মদিন না?আমি বুঝে নিয়েছি। জলদি চলুন।"
পুরোদিন একসাথে কাটিয়েছে তারা।আরহানের সাথে মাধুর্যের বয়সের পার্থক্য প্রায় নয় বছরের। তবুও তাদের বন্ডিং বেশ গভীর হচ্ছে। এদিকে এখানে চলে আসার পর এক দিনের জন্য কথা হয়নি সাকিবের সাথে। মাধুর্য চেষ্টা করেছিল, সাকিব নিজেই যেন হারিয়ে যেতে চাইছে।
দেখতে দেখতে পার হলো অনেক সময়। হঠাৎ একদিন ক্লাস শেষে ফেরার সময় মাধুর্য দেখলো জেরিন দাঁড়িয়ে আছে। তাকে পাক্কা মেম সাহেব লাগছে। চোখের ভুল ভাবলেও পরক্ষণে বুঝতে পারলো এ আর কেউ নয় জেরিন।
কিছু দূরে সাকিব কে দেখা গেলো।আরহানের সাথে কথা বলছে।
মাধুর্য যেন বরফ হয়ে জমে পুতুল।একসময় সবাই এসে তার সাথে কথা বললেও সাকিব কিছুই বলছে না।আরহান হোস্টেল প্রধানের থেকে পারমিশন নিয়ে এলো। মাধুর্য আজ তাদের সাথে থাকবে বলে।
আরহানের সাথে কথা বললেও সাকিব মাধুর্যকে পাত্তাই দিচ্ছে না।
আরহানের বাড়িতে আজ সব রান্না জেরিন,মাধুর্য করেছে। খাওয়ার সময় সাকিবের সামনাসামনি বসলেও সে উঠে তার তামসী কে এক টুকরো খাবার মুখে তুলে দিলো।খাওয়া শেষে জেরিনের মনে হলো আজ
অনেক মাস পর সাকিব যেন তৃপ্ত।
আরহানের ডাকে সাড়া দিয়ে মাধুর্য তার রুমে প্রবেশ করতেই বেশ কড়া চোখে তাকালো আরহান।মাধুর্যের ট্রিটমেন্টের পর থেকে তাকে বেশ নমনীয়তার সাথে রাখে সে।
তবুও আজ ক্ষিপ্ত হয়ে তার গাল চেপে ধরে বলল,
"ভাই সে, না হয় বুঝলাম। তবে কীসের এত প্রয়োজন? না খাইয়ে খাওয়া যায় না?তুমি কোন সাহসে খাবার মুখে তুলে নাও?লজ্জা শরম নেই না কী?তার বউ এখানে আর তুমি?"
"দাদা ভাই অনেক আগে থেকেই এমন করে। এটা উনার অধিকার।"
মাধুর্যের জবাবে দপ করে নিভলো আরহান।তাকে ছেড়ে দিয়ে চলে যাচ্ছিলো তবে ফিরে এসে তার অধরে শক্ত কঠিন এবং ভয়ংকর চুমু খেয়ে বলল,
"তার অধিকার মুখে তুলে খাওয়ানো অবধিই এবং আমার অধিকার তোমার সর্বত্র।"
সমাজটা বড্ড অদ্ভুত। যদি একটা মেয়ে ছেলেদের সাথে স্বাভাবিক ভাবেও কথা বলে তাকে বলা হয়
"মাইয়্যার স্বভাব চরিত্র ভালা না।সবার লগেই ঢলাঢলি করে।"
আবার সে মেয়েই যদি সমাজের মানুষের কথার ভয়ে পুরুষ মানুষকে এড়িয়ে চলে তবে লোকে বলে
"মাইয়্যার কী দেমাগ রে? দেমাগে মাটিতে পা পড়ে না।কি এমন রূপবতী হইছে রে?এত কিসের গড়িমা?"
নরওয়ের সমুদ্র তীরের বালিগুলো সবুজ। সবুজ বালি হাতে নিয়ে মাধুর্য এক মনে দেখে যাচ্ছে।
বাহ্ বাহ্ সবুজ বালিও হয়?
"এটা অলিভাইনের কারণে সবুজ।"
"শৈবাল নয়?"
"না। এক প্রকার স্ফটিক কণার জন্য।"
"আচ্ছা। সমুদ্রে পা ভেজাবেন?"
"আপনি আমাকে প্রশয় কেন দিচ্ছেন?"
"আপনিই তো বলেছেন,আমার সর্বত্র আপনার অধিকার।"
"ঝোকের বশে বলেছি।সাবিহার জায়গা কাউকে দেওয়ার নয়।"
আরহানের এমন কথায় মাধুর্য হাতের বালি ফেলে তার দিকে তাকায়। এগিয়ে আসে আরহানের দিকে।
পায়ের জুতো খুলে সম্পূর্ণ ভর আরহানের পায়ে দাঁড়িয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরলো।
ভর সামলাতে আরহান হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে মাধুর্যের কোমর৷ চোখে চোখ রেখে মাধুর্য বলল,
"তাহলে কীসের এত জেদ আমায় নিয়ে?"
"যদি বলি সব'টা মায়া?"
"তাহলে বেধে ফেলুন না সেই মায়ায়।"
"নাহ্! তারপর একদিন হারিয়ে যাবেন।"
"যাবো না। অধিকার দিন সব দুঃখের ভাগ দিবেন। আগলে রাখতে দিবেন,ভালোবাসতে দিবেন, শাসন করতে দিবেন,আদর করতে দিবেন।আমার ইচ্ছে মতোন।"
"আর যদি না দেই?".
" বালক তাহলে ডাকাতি করবো তোমার মনের শহরে।"
আরহান জবাব না দিয়ে মুচকি হাসে।কোমরে ধরে সামান্য উঁচু নয় অনেকটা উঁচু করে মাধুর্যকে।
প্রণয়ের অধরের বিষ ঢেলে দেয় মাধুর্যের অধরে।
পাশ থেকে তখন একদল শিষ বাজিয়ে উল্লাস করে ওদের প্রেমের প্রথম চুম্বনে।
পত্রীর ইদানীং কিছুই ভালো লাগে না।সব সময় মাথার বা দিকে চিনচিনে ব্যথা করে।দম বন্ধ হয়ে আসে।
কিছুক্ষণ পর তাকে যেতে হবে কলেজে।কলেজের নাম মনে হলেও ভয়ে কেমন মিইয়ে যাচ্ছে।
মাধুর্য দেশে নেই প্রায় ন'মাস হতে চলল।এদিকে অর্ণি খুব একটা আসে না।খুশবু নিজের লেখাপড়া সাথে মাধুর্যের কোচিং ক্লাস নিয়ে ব্যস্ত।
মাস খানি সময় হলো তাদের দাদাভাই মাধুর্যকে দেখে এসেছে। সেসব ভাবতে ভাবতে
মুখে এক কোষ তেতুল পুরে দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে পত্রী।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মা আসবে। এসেই শুরু হবে একদফা কথা বলবে৷
গা গুলানো ভাব কিছুইতেই কমছে না যে, আজ তাই কলেজে যাবে না পত্রী৷
কিছুক্ষণ পর তার মা এসে শুরু করে দিলো নিত্যকার কথা।মেয়ে মানুষ লেখাপড়া না করলে গতি আছে?আজ মাধু শিক্ষিত তাই এই বাড়ির মুখের উপর বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলে গেছে। কারো ধার ধারেনি। শুয়ে বসে থাকলে পারবে না কী?
মায়ের কথা শুনে খুব আস্তে শ্বাস ফেলে পত্রী। অনিচ্ছায় তৈরী হয়ে বের হয় কলেজের উদ্দেশ্যে।
রাস্তা দিয়ে একমনে হেঁটে যাচ্ছিলো সে। হঠাৎ হাতে হ্যাঁচকা টান লাগে।
মুখ তুলে তাকিয়ে দেখতে পায় আশিক দাঁড়িয়ে আছে।
চোখে মুখে বিরক্তির ভাব। হিসহিসিয়ে সে বলল,
"কল দিচ্ছি ধরো না ক্যান?"
"বাড়িতে ঝামেলা।"
"কল ধরতে ঝামেলা না কী আমিই ঝামেলা।"
পত্রী জবাব দেয় না। মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকে। এদিকে রাস্তা ফাকা পেয়ে আশিক খুব বাজে ভাবে স্পর্শ করে পত্রীর কোমরে। পত্রী সরে গিয়ে চিৎকার করতে নিলে তার মুখে হাত দিয়ে চুপ থাকতে বলে।
পত্রী সরে যেতে চায়,ফুপিয়ে কাঁদে। আশিক ততই হিংস্র হয়। হঠাৎ বাইকের শব্দ। আশিক ভিতরের গলিতে ঢুকে।
ততক্ষণে পত্রী দু হাতে মুখ ঢেকে ফুপিয়ে কেঁদেই চলেছে।
বাইক থেকে কেউ একজন নেমে তুড়ি বাজিয়ে পত্রীর দৃষ্টিআকর্ষণ করে। তার সামনে শয়ন কে দেখে কিছুটা সাহস পায় পত্রী।
হেচকি তুলে বলল,
"ভাইয়া বাসায় যাবো।"
শয়ন কিছুটা আন্দাজ করতে পারে। কিছু না বলেই তাকে নিয়ে বাইকে উঠে।এরপর কলেজের পাশে ক্যাফেতে এসে বসেছে দুজন।
পত্রী এখনো হালকা ফুপিয়ে কাঁদছে।
"ছেলেটা কে পত্রী?"
"আমার পরিচিত।"
"প্রেমিক?"
"না।"
"প্রেমিক না হলে কী ওভাবে কেউ স্পর্শ করে?আর প্রেমিক হলেই কাঁদছিলে কেন?"
"বাড়িতে বলে দিবে।ওর সাথে কথা না বললে ও বাড়িতে সব বলে দিবে।"
"কি বলে দিবে?"
"ও বলবে আমি ওকে আমার ফোন নাম্বার দিয়েছি। আমাদের প্রেম আছে।"
"তুমি ওকে দাওনি?"
"না। ও আমার অন্য বান্ধবী কে পছন্দ করতো কিন্তু ভুলে আমার নাম্বার পায়। আমি ওর সাথে কথা বলতে চাইনি।শুরু থেকে আমাকে বলেছে আমি কথা না বললে বাড়িতে বলে দিবে আমার ছবি এডিট করে বাজে ছবি বানাবে।"
"এই জন্য তুমিও মেনে নিলে?"
"মা মারবে।"
এই পর্যায়ে শয়ন না হেসে পারে না।বাচ্চা একটা মেয়ে। তার থেকে কমপক্ষে বছর দশের ছোট হবে। বিয়ে বাড়ির বেয়াইন তথা সামনে বসে থাকা এই কলেজ ছাত্রীর সাহসে তফাৎ দেখে হাসি পাচ্ছে। কিছুটা গম্ভীর কণ্ঠে শয়ন বলল,
"ছেলের নাম্বার দাও। আর আজ থেকে একা আসবে না।নইলে পা ভেঙে হাতে ধরিয়ে দিবো।"
আরহানের জন্য কফি বানিয়ে তাকে বার বার তাগাদা দিচ্ছে মাধুর্য। আজ তার রেগুলার চেকাপের কথা ছিল।তাই ক্লাস শেষে এখানে নিয়ে এসেছে আরহান।
অথচ সে এই যে ফোনে ব্যস্ত এদিকে তাকানোর নাম নেই। তার কপালের বা পাশের শিরা ফুলে উঠেছে। এটা তার রাগের লক্ষণ। মাধুর্য চুপচাপ কফির মগ রেখে আরহানের বাম হাত ধরে। আরহান তার দিকে না তাকিয়েই হাত ছাড়িয়ে খুব কাছে টেনে নেয় মাধুর্যকে। বাহিরে তখন বরফ পড়ছে। আকাশে নানা রঙের বাতি। মাধুর্য অনুভব করছে আরহান অস্থির। ফোনের অপর পাশ থেকে কেউ একজন কেঁদেই চলেছে। কন্ঠটা পরিচিত।
হঠাৎ মাধুর্যের হুশ হলো এটা অর্ণির গলা। মাধুর্য একটু উঁচু হয়ে শুনতে চেষ্টা করলেই শুনতে পেল,
"তোমার ভাই রুচিকে বিয়ে করে নিয়ে এসেছে। আমি কী তাহলে সত্যি ভুল করলাম পরিবারের বিরুদ্ধে চলে এসে?
ওয়াহেদ দুহাতে মাথা চেপে ধরে বসে আছে৷ প্রচন্ড মাথা ব্যথা করছে তার। চোখ জ্বলে যাচ্ছে। তার এখন ঘুমের প্রয়োজন।
অথচ অর্ণি বাসায় মাথায় তুলে নিয়েছে। রুমের দরজা আটকে বসে আছে। এখন সে ডাকাডাকিও করতে পারছে না। কারণ বাড়ির মানুষ এত রাতে জেগে উঠলে সমস্যা হবে৷
এই দিকে মাধুর্য ধাক্কা দিয়ে আরহান কে সরিয়ে দিয়েছে। তার হাত-পা কাঁপছে। নার্ভাস এট্যাক হচ্ছে। আরহান জোর করে তাকে বসাতে গেলে মাধুর্যের চশমা ভেঙে গেলো।
আরহান ফোন রেখে বলল,
" Love তাকাও আমার দিকে। তাকাও বলছি। শান্ত হও। আমি দেখছি কী হয়েছে। তাকাও আমার দিকে?"
এক্সিডেন্টের পর মাধুর্যের মাথায় আঘাত লাগে। এরপর থেকে শুরু হয়েছে নানান সমস্যা।সে দূরের বস্তু চোখে কিছুটা কম দেখে তাই চশমা লেগেছে চোখে।
অতিরিক্ত টেনশন বা এক্সাইটেড হলেই সমস্যা হয়।
বাহিরে তখন কনকনে ঠান্ডা। ফায়ার প্লেসে আগুন জ্বালিয়ে পাশের দোলনায় মাধুর্য কে বসিয়ে দিলো আরহান।মাথার নিচে বালিশ দিয়ে পা থেকে তার জুতো খুলে দিলো।
মেয়েটা এখনো সম্পুর্ণ সুস্থ নয়৷ ঘুমের মেডিসিনের কারণে মাধুর্য তখন তন্দ্রাঘোরে।
আরহান প্রথমে হোস্টেলে কল দিয়ে আজ ওর বাহিরে থাকার পারমিশন নেয়, এরপর কল দেয় শয়ন কে।
"ভাবী কী বলছে এসব?"
"তুই কী জানিস ভাই?আমরা এই বাচ্চা মেয়েদের মধ্যে ফেসে গেছি?"
"মানে?"
"আগেই বলেছিলাম, এসব বাচ্চা মেয়েকে বিয়ে করে লাভ নেই। এরা কথার কথা কিছুই বুঝে না।"
"কী হয়েছে বলবি তো?"
"রুচি আজ পায়ে ব্যথা পেয়েছে। সামান্য নয় মারাত্মক। পায়ের গোড়ালিতে লেগেছে। ওয়াহেদ এর বাইকেই লেগেছে। এই অবস্থায় যেহেতু ওয়াহেদ দায়ী তাই ওকে আজ রাতের জন্য বাড়ি আনতে হলো।কারণ রুচির বাসায় কেউ নেই। এখন আবার এটা ভাববি রুচি ইচ্ছা করে করেছে? এমন নয়। যা হয়েছে সম্পূর্ণ দূর্ঘটনা মাত্র।ভাবী রুচিকে দেখে রাগারাগি না করলেও বেশ রাগ৷ ওয়াহেদ কে জিজ্ঞস করতেই ও বলেছে
" বিয়ে করে এনেছি। তোমার সতীন বানিয়ে এনেছি। যাও ওর সেবা করো।"
ব্যস শুরু হয়েছে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ।"
এক শ্বাসে কথাগুলো বলে ঢকঢক করে পানি খেয়ে নিলো শয়ন। ওদিকে আরহান স্বস্তির শ্বাস ফেলল।
মাধুর্যের যখন ঘুম ভাঙলো তখন তারা অসলো শহর ছাড়িয়েছে। আরহান ড্রাইভ করছে। ডক্টরের কাছে নিশ্চয় যাচ্ছে, এমন ধারণা ছিল মাধুর্যের। কিন্তু অবাক করা বিষয় যখন জানতে পারলো তারা ফিরে আসছে। এমনকি এতটা সময় সে ঘুমিয়ে কাটিয়েছে।
একটা কফিশপের সামনে গাড়ি পার্ক করে আরহান দ্রুত কফি নিয়ে এলো। মাধুর্য মুখে আষাঢ়ের মেঘ জমিয়েছে। বৃষ্টি নামলো বলে।
ঠিক তখন আরহান শয়নের সাথে কথা বলা কল রেকর্ড অন করে দিলো। সব'টা শুনে ধীরেধীরে মেঘ সরে দেখা দিলো এক টুকরো সূর্য।
চকলেট ডোনাটে কামড় দিয়ে মাধুর্য জিজ্ঞেস করলো,
"আপনারা ওয়াহেদ ভাইকে ভাই ডাকেন না কেনো?"
"কারণ আমরা সমবয়সী।"
" ভাইয়া তো বড়।"
"আমাদের সবার বয়সের পার্থক্য শুনবে?
ওয়াহেদ,শয়ন এবং আমার বয়সের পার্থক্য মাত্র মাস খানেক।অর্থাৎ আমরা একই মাসেই জন্মেছি৷
এবং আমাদের নয় মাসের ছোট ছিল সাবিহা৷ ইনহান আমাদের সবার ছোট৷ তাই ও সবাইকে ভাই ডাকে৷"
"আপনি তো তাহলে বেশ বয়স্ক।"
"তা বলতে পারো।"
"ঠিক সময় বিয়ে করলে আমার বয়সের মেয়ে থাকতো।"
বিড়বিড় করে কথ বলে বাহিরের দিকে তাকালো মাধুর্য । এদিকে ওয়াহেদ প্রায় ঘন্টা দুই পর রুমে প্রবেশ করে দেখতে পেলো অর্ণি চুপচাপ টেবিলে মাথা রেখে বসে আছে। সে ভেবেছিল ঘরে ঢুকতেই তুলকালাম বাজবে অথচ এমন কিছুই নয়৷
নারীর নীরবতা পুরুষের অন্তরকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়।
ওয়াহেদ সেই পথের পথযাত্রী। ক্লোজেট থেকে কাপর নিয়ে সে ফ্রেশ হয়ে এসে দেখতে পেলো অর্ণি একই জায়গায়।
হয়ত ঘুমিয়েছে, কাছে এসে স্পর্শ করতেই হুংকার দিয়ে উঠলো সে।
ওয়াহেদ কিছু না বলে চুপচাপ শক্ত বাহু বন্ধনে তাকে আবদ্ধ করে নিলো। অর্ণি যে ছাড়ানোর চেষ্টা করেনি এমন নয় অথচ শক্তিতে পেরে উঠেনি। তাই চুপচাপ নিজেকে সপে দিয়েছে ওয়াহেদের দেহের বন্ধনে।
এক চোট বৃষ্টির পর যেমন আকাশ শান্ত হয়ে যায়, বাতাস হয় মৃদু। ঠিক তেমনভাবে ঘামে ভিজে যাওয়া অর্ণিকে নিজের কাছাকাছি টেনে নিয়ে ওয়াহেদ তাকে সব'টা বলল।
প্রতিউত্তরে অর্ণি কিছুই বলেনি। খুব শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ওয়াহেদ কে। মুখ ডুবিয়ে দেয় ওয়াহেদের বুকে।
মাধুর্য-আরহানের সম্পর্কের কথা মাম্মাই শুরু থেকে জানতো। শুধু আরহানকে একটা কথা বলেছিল,
"আগুন, বারুদ পাশাপাশি রাখলে কিন্তু বিস্ফোরণ ঘটে৷ এতে শুধু ক্ষতিই হয়।বিয়ের আগে এমন কিছু করো না যাতে লোকে কিছু বলতে পারে।"
পুরো বছর খানেকের প্রেমে অসংখ্য বার মাধুর্যকে চুমু খেয়েছে আরহান।
চুমু না খেলে ভালোবাসা প্রকাশ পায়?পরিণয়ের প্রথম ধাপ চুমু। যে ব্যক্তি তার ভালোবাসার মানুষকে কখনো চুমু খায়নি, সে এখনো স্বর্গের অনুভূতি পায়নি।
আজ তাদের দেশে ফিরতে হচ্ছে। তাদের দেশে ফেরার সব'চে বেশি অপেক্ষা করছে ইনহান।
কারণ এবার এলে সে সম্পূর্ণ ভাবে বাঁধবে তার ধানী লংকা কে।
কোথাও যেতে দিবে না।একদম বুকের ভিতর ঢুকিয়ে রাখবে। যাতে কেউ নজর না দিতে পারে।
বিমানবন্দরে পা রাখার পর থেকে বেশ থমথমে অবস্থা আরহানের মুখে। মাধুর্য তার হাত ধরেই আছে। আরহান এক পলক তাকায় ওর দিকে।মেয়েটা বড্ড খুশী।সুখ সবে ধরা দিলো যে।
অথচ এই হাসিখুশি মেয়েটা জানতোই না যে তার জীবন থেকে ততক্ষণে হারিয়ে যেতে শুরু করেছে তার কাছের একজন।
দূর থেকে চলে যাচ্ছে বহুদূরে।
সি আই সি ইউ এর সামনে দাঁড়িয়ে আছে মাধুর্য। পাশে তার ছোট মামা এবং আরহান।রাজধানীর অন্যতম একটি বিলাসবহুল প্রাইভেট হস্পিটালের কার্ডিয়াক ইউনিটের ওয়েটিং রুমে বসে থাকার সময় বার বার অস্বস্তি হচ্ছিলো মাধুর্যের। ফিরে এসে সরাসরি বাড়ি যায়নি। হোটেলে উঠেছে। ফ্রেশ হয়েই এসেছে এখানে।
দুজন মাত্র ভিতরে যাওয়ার অনুমতি পাবে। তবুও এক সাথে নয়। মাধুর্য বার বার জিজ্ঞেস করছে অথচ মামা বা আরহান জবাব দেয়নি। স্পেশাল ভাবে অনুমতি নিয়ে মাধুর্যকে ভিতরে যেতে দেওয়া হলো। যাওয়ার আগে তার ছোট মামা জানালেন ভিতরে আছেন মাধুর্যের জন্মদাতা পিতা।
মাধুর্য জেদ ধরে বসে রইল সে কিছুতেই সেই মানুষকে দেখতে যাবে না।যে সারাজীবন খোঁজ নেয়নি এখন কেন তাকে দেখতে যাবে?সে কিছুতেই যাবে না।কিন্তু তার মামার কথায় সে ভিতরে যায়। অক্সিজেন মাস্ক পড়িয়ে রাখা হয়েছে ভদ্রলোককে। ডক্টর জানালেন ওপেন হার্ট সার্জারী করা হয়েছে তবে তার লিভারে পানি ধরেছে। বার বার বমি হয় তেমন কিছুই খেতে পারে না৷
হয়তো অন্তিম সময় চলে এসেছে।
মাধুর্য পাশে গিয়ে বসতেই ভদ্রলোক নার্সকে ইশারায় বললেন বেড খানিকটা উঁচু করে দিতে। উঠে বসেই সে মাধুর্য কে ডাকলেন। এরপর তার এক হাত দিয়ে তার হাত ধরে ঝরঝরিয়ে কাঁদছিল। জন্মের পর বাবার স্পর্শ পায়নি মাধুর্য। এই সেই ব্যক্তি যার জন্য তার মা নেই।সে বড় হয়েছে মামার ঘরে। অপমান সইছে সব সময়। তবুও একবার এই মানুষ তার খোঁজ নেয়নি।আজ কেন কাঁদছে সে?
ভদ্রলোকের কন্ঠস্বর ডেবে গেছে। শুকিয়েছে অনেক।দাড়ি গোফে মুখের আদল খুব বোঝা যায় না তবে চোখ দুটো যেন মাধুর্যের।
দশ মিনিট ভদ্রলোক মেয়ের হাত ধরেই কাঁদলেন। শুধু বার বার মাফ চাইলেন।মাধুর্য চুপচাপ বসেছিল।কানে বাজছিল তারেকা বানুর অকথ্য গালাগালি, এক্সিডেন্টের দিনের কথা। এই মানুষটা তার মাথায় হাত রাখলে এত কিছু সইতে হতো না।
তবুও মানুষটা বাবা। মৃত্যু পদযাত্রী। মাধুর্য কাঠ কাঠ গলায় বলল সে মাফ করে দিয়েছে।
তার বাবা তার কাছে একটু পানি চাইলো, সে পানিটুক খাইয়ে দিতেই বলল,
"মা! মা গো! আমি খুব খারাপ গো মা। আমাকে তুমি মাফ করিয়ো। আমার কানে একটু কালেমা পড়বা? একটু হাত বুলিয়ে দিবা আমার মাথায়?"
ডক্টর নিষেধ করলেন। কারণ সে অসুস্থ। বাহিরের মানুষ তাকে স্পর্শ করতে পারে না।মাধুর্য তবুও বার দুয়েক হাত বুলিয়ে দিলো মাথায়। কানের কাছে পড়ল কালেমা।
ভদ্রলোক বললেন,
"মা তুমি চলে যাও। আমি একটু ঘুমাবো।"
এই ছিল ভদ্রলোকের শেষ কথা।বাহিরে এসে মামার কাছে শক্ত হয়ে বসেছিল মাধুর্য । যেন কান্না, শ্বাস আটকে রেখেছে সে। তার সামনেই বসেছিল তার বাবার স্ত্রী,সন্তানেরা। সাথে মাধুর্যের চাচাতো ভাই।
একজন অপরজনকে বলে উঠল
"এ তো দেখতে পুরাই মডেলদের মতো। কি ফিগার রে মাইরি!"
তাদের দিকে আরহান কটমটিয়ে তাকাতেই চোখ নামিয়ে নিলো তারা।মিনিট দশেক পর খবর এলো ভদ্রলোক আর নেই।
এবার মাধুর্য কাঁদলো। খুব কাঁদলো। তার কান্নায় সবাই অবাক হয়ে তাকিয়েছিল।ছোট মামা শক্ত করে তাকে ধরে রইলেও আরহান বলল,
"কাঁদতে দিন মামা।আজ ও কাঁদবেই।বাবা- মা মৃত্যুর শোক আজ না হয় কাটবে।আজ ও সত্যিকারের অর্থে এতিম হলো।সারা জীবন খোঁজ না নেওয়া বাবার মৃত্যু আজ ওর সকল কষ্ট দূর করবে।"
বাড়ি ফিরে মাধুর্য সবার সাথেই কথা বলল।বাবার লাশের সাথে তাকে যেতে দেয়নি।তার মামারা চায় না সে বাড়িতে যাক। মাধুর্য মেনে নিয়েছে।
সাকিব নরওয়ে থেকে ফিরে দক্ষিণ আফ্রিকা শান্তিরক্ষা মিশনে চলে যায়৷ কবে আসবে বা কোনো যোগাযোগ সে করে না।সব দায়িত্ব পালন করে। একজন ছেলে,ভাই, স্বামী হলেও সে যেন কই হারিয়েছে।
তারেকা বানু ব্রেইন স্ট্রোক করে বিছানায় প্যারালাইজড।
ঘরের একটা বিছানায় এখন তার সব। যে মুখে খই ফুটতো সেই মুখে এক গ্লাস পানি চাইবার ক্ষমতা নেই।
ইনহান প্রয়োজনীয় কাজে এলাকার বাহিরে ছিল।ফিরে এসে জানতে পারে মাধুর্য ফিরেছে। তাই দেরি না করে সে আগামীকাল তার মনের কথা জানিয়ে দিবে বলে ঠিক করেছে।
সে অনুযায়ী তার জন্য একটা কলাপাতা রঙের শাড়ি এবং কালো গোলাপ কিনেছে।
বাড়ি ফিরেই আরহান কে দেখে তার সাথে আলিংগন করে ইনহান।
তখন চায়ের আড্ডা চলছে। অর্ণির এখন সাত মাস চলে
।খুব দ্রুত নতুন অতিথি আসতে চলেছে।
ঠিক সে মুহূর্তে ইনহানের মা বলে উঠেন,
"কালকের কাল মাধুর্য কে এই বাড়ি নিয়ে আসবো।আগে চার হাত এক করবো এরপর সব। আমার ছেলের ইনকাম কম নয়। তার চাকরি না করলেও চলবে।"
মায়ের কথা শুনে বিষম খায় ইনহান।মা কী করে জানলো?সে তো কিছু জানায়নি। কিন্তু ভুল ভাংতে দেরি হলো না। বিয়ের কথাটা আরহান এবং মাধুর্যের চলছে।
এতদিন পর আরহান নিজের জীবন গুছিয়ে নিবে এটা ভেবে সবাই অনেক খুশি।সব'চে খুশি ইনহানের মা। কারণ তার মেয়ে মারা যাবার পর আরহান একদম ভেঙেছিল।বাহিরে কঠোর হলেও ভিতরে সে ফোকলা ছিল।
ইনহান চুপচাপ বসে আছে সে কী করবে বুঝতে পারছে না কারণ এই মাত্র সে জেনেছে আরহান-মাধুর্য রিলেশনশীপে আছে বছর খানেক।
দেখতে দেখতে সময় পার হয় এক সপ্তাহ। এই এক সপ্তাহ ইনহান বাসায় এসেছে নাম মাত্র। কিছু একটা তার গলায় আটকে আছে। সে খেতে পারে না, ঘুমাতে পারে না।
যে ছেলে সিগারেট হাতে নিতো না সেই ছেলে সাত দিনে চেইন স্মোকার হয়ে গেল।
সিগারেট ছাড়া সে এক কদম চলে না।
আজ বিকেলে মাধুর্য-আরহানের বিয়ে হয়েছে। চারপাশে আলোয় ভরপুর। সেই আলোয় মাঝেও অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সিগারেট হাতে নিয়ে তার জীবনের সব'চে তেঁতো স্বপ্নের কথাটা ইনহান বলল
রৌদ্র এবং খুশবুকে।
আরহান ভেবেছিল মাধুর্য বারো হাত কাপড়ে তেরো হাত ঘোমটা দিয়ে অপেক্ষা করছে।কিন্তু রুমে এসে দেখলো সে বসে বসে সিগারেট ভাংছে।
একটা, দুটো, এক প্যাকেট সব প্যাকেট।
আরহান তার পাশে বসে বলল,
"কেন ভাংছো?"
"আজ থেকে খাওয়া বাদ।"
"একবারে বাদ হয় না।"
"হবে। হলেই হবে।"
"বাড়াবাড়ি হচ্ছে।"
"বিয়ের রাতেই ধমকাচ্ছেন?"
"নাহ্।"
"নেশা করা ভালো না।আপনাকে বাঁচতে হবে আমার জন্য।"
মাধুর্যের কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই আরহান তাকে কোলে তুলে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"তুমি হও গহীন যমুনা। আমি ডুইবা মরি।"
সকালবেলা খুব ভোরে ইনহান সিগারেটের প্যাকেট নিয়ে ছাদে বসে ছিল।সিগারেট টানছে তার দৃষ্টি তখন সামনের বারান্দায়।
সদ্যস্নাত এক রমনী চুলে গামছা প্যাচিয়ে খোপা করেছে।লাল সাদা হলুদ রঙের মিশেলে শাড়ি। নারী তার হাতের ভেজা তোয়ালে শুকাতে দিয়ে মেলে দিলো ভেজা চুল। মুক্ত চুলগুলো তখন অবাধ্য হয়ে খেলা করছে রমনীর কোমরের দিকে।
টুপটুপ করে ঝরে যাওয়া পানিতে নারীকে দেখছিল ইনহান। ঠিক যেন প্রথম দেখায় দেখেছিল।
হাতের গামছা রোদে মেলে দিতেই আরহান এগিয়ে এলো ঘর থেকে। ঘুমন্ত চেহারায় পিছন থেকে জড়িয়ে নিয়েছে মাধুর্যকে। পাশের দোলনায় তাকে বসিয়ে নিচে বসে পড়ে আরহান। মাথা রাখে মাধুর্যের কোলে।
ইনহান সেদিক থেকে সরে আসে। ফিরে তাকায় না সেদিকে। তাকে মেনে নিতে হবে। এই তার নিয়তি।
কারণ সে নিজ জীবন অভিজ্ঞতা থেকে জানে,
"প্রত্যেকটা মানুষের জীবনে একটা দীর্ঘশ্বাস থাকে। কাউকে না পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস। এই দীর্ঘ শ্বাস ভাটা পড়ে যায় নতুন কাউকে পাওয়ায়। সংসার, ক্যারিয়ার এসবের ভীড়ে না পাওয়া দীর্ঘশ্বাস শুধুই একান্ত হয়৷লুকানো থাকে হাজারো হাসির আড়ালে।"
সমাপ্ত...
Writer:- সাদিয়া খান (সুবাসিনী)