গভীর রাতে কে যেনো গলা ছেড়ে গান গাইছে। রাশভারী, পুরুশালী ভরাট কন্ঠে ছিন্নভিন্ন বিচ্ছেদের গান। কি যেনো আছে সেই সুরে। প্রেম জিনিস টাকে দুমড়ে মুচড়ে , গুলিবিদ্ধে ঝাঁঝরা করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। আমার ঘুম কেটে গেলো মূহুর্তেই। শীতকাল চলছে। দরজা জানালা সব বন্ধ হওয়া সত্তেও কন্ঠটা স্পষ্ট। পাশে বড়আপু ঘুমাচ্ছে। আমি কম্বল সরিয়ে উঠে বসলাম। মশারি টানানো। বের হয়ে ফ্লোরে পা রাখতে রাখতে কন্ঠটা মিলিয়ে গেলো। দূরে সরতে সরতে একসময় শব্দতরঙ্গ নি:স্ব হয়ে গেলো। থেমে গেলো সব। আবারো নিরবতায় ডুবকি দিলো হঠাৎই সরব হওয়া পৃথিবী। আপু ঘুম ঘুম কন্ঠে চিল্লাচ্ছে,"তুই একটা মশা ঢুকা চৈতি, দেখিস! রাতের বেলা চৌদ্দবার বাথরুমে যাওয়া লাগে।"
আমি তাকালাম। আপু আবার চিল্লালো,"এতক্ষণ লাগে বের হতে? তাড়াতাড়ি বের হয়ে গুঁজে দে।"
আমি কথা না বাড়িয়ে বের হয়ে গেলাম। হবার আগে ফোনে একবার সময়টা দেখে নিলাম। উঠে আছে "3:37am"।
তিনটা সাইত্রিশ। অবশ্য আমি স্ক্রীন বন্ধ করার আগেই আটত্রিশে পা দিয়ে ফেলেছে মিনিটের কাঁটা। সময় তো থেমে থাকেনা।
চোখেমুখে পানি দিয়ে এলাম। অন্ধকারে গামছা পাচ্ছিনা। মরণজ্বালা!
জানালার পর্দাটা একটু সরিয়ে রাস্তায় চোখ বুলালাম অযথাই। সাদা আলোর ল্যাম্পপোস্ট ঘিরে উড়ন্ত পোকা ছাড়া একটা কাকপক্ষীও নজরে এলোনা।
আপু উল্টোদিকে ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছে। আমার কানে এখনো গানের বিষাক্ত লাইনগুলো বাজছে।
সে রাতে ঘুমটা খুব খাপছাড়া হলো। একটু পরপরই জেগে উঠছিলাম কেনো যেনো। সকালে কলেজ যাওয়া হলোনা। আপু ভার্সিটি চলে গেলো আটটার দিকে। পরীক্ষা আছে ওর। বিছানায় মোড়ামুড়ি করতে করতে উঠলাম সাড়ে দশটার দিকে। বাসায় শুধু আমি আর আব্বু। মা নানুবাড়ি গিয়েছে গতকাল। আপু পরীক্ষার জন্য যায়নি। আর আমি আপু যায়নি বলে যাইনি। আব্বু অন্যকোথাও থাকতে পারেনা। মা কে পৌছে দিয়ে চলে আসে। আসার দিন আবার যেয়ে নিয়ে আসে।
রান্নার কাজটা আমিই সাড়লাম।
আব্বু দুপুরে খেয়ে বাড়িতেই রইলো। বাইরে গেলোনা। আমি খুব ভীতু গোছের। বাসায় একা থাকতে ভয় পাই। মা না থাকলে আব্বু কখনোই একা একা রেখে যায়না। হাজার কাজ থাকলেও যায়না। আপু ভার্সিটি থেকে ফিরে ছ'টার দিকে। তারপর আব্বু বাইরে যায়।
সন্ধ্যার দিকে ঘুমিয়ে ছিলাম। মাথা ধরেছে। রাতে ঘুম না হলে সারাটাদিন ঝিমঝিম করে সব।
আপু এসে ডাক দিলো,"ওই উঠ, অবেলায় ঘুম কিসের?"
আমি চোখমুখ কুঁচকে তাকালাম। আপু গামছা নিয়ে গোসলে ঢুকতে ঢুকতে বললো,"ভেলপুরি এনেছি। নরম হওয়ার আগে খেয়ে শেষ করবি।"
টেবিলের উপর পলিথিন রাখা। আমি উঠতে উঠতে গলা বাড়িয়ে বললাম,
---"তুই খাবি না?"
আপু বাথরুম থেকেই চেঁচালো,"খেয়ে এসেছি।"
আমি একা একাই ব্যঙ্গ করে অনুকরণ করলাম,"হুহ! খেয়ে এসেছি।"
রাত হলো। আজকে শীত পড়েছে বেশি। জানালা একটু খুললেই ঠান্ডায় দাঁত কাঁপুনি শুরু হয়ে যাচ্ছে। কম্বল মুড়ি দিয়ে তিনটে অবধি মোবাইল নিয়ে বসে রইলাম আমি। ঘুমে চোখে পানি চলে এসেছে। তবু কেনো যেনো জেগে রইলাম। কারণটা আবছা। আমি মনেপ্রাণে নিজেকে বোঝাতে চাচ্ছি যে,"এভাবেই জেগে আছি।" আর অবচেতন মন ওদিকে চিৎকার চেঁচামেচি করছে,"তুই ওই কন্ঠ শোনার জন্য বসে আছিস। ওই কন্ঠের গান শোনার জন্য জেগে আছিস গাধা।"
সে রাতেও ঘুম হলোনা। গানও শোনা গেলোনা। পরের দিন কলেজ গেলাম। শীতকালিন ছুটি শুরু হবে আর ক'দিন পরই। দিনটা গেলো কোনরকম। রাতের দিকে আপু তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লো। কাল নাকি তার কাঁপানো পরীক্ষা। শান্তিমত না ঘুমালে নিশ্চিত ফেল করবে।
তিনটা এগারোর দিকে গান শোনা গেলো। সময়টা কাটকাট বলতে পারছি। ফোন মুখের সামনে ধরে সময়ের দিকেই চেয়ে ছিলাম।
ধরফরিয়ে উঠে বসলাম। 'এই লোককে আমার দেখতেই হবে', এমন একটা উত্তেজনা নিয়ে বের হতে যাবো। বিছানার চাদর একটু ছিঁড়ে ছিলো। পায়ে বেজে ফরফর করে ইয়া বড় ফাঁক হয়ে গেলো। আপু হুড়মুড় করে উঠলো। হতভম্ব কন্ঠে বললো,"একটু আস্তেধীরে কর।"
গান ততক্ষনে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। আমি অদৃশ্য হাতে কপাল চাপরালাম। আপু গজগজ করছে,"তোর জন্য আমার ঘুম ভাঙলো। কাল যদি পরীক্ষা খারাপ হয় রে।"
আমার কানে ঢুকলোনা কিছুই। আরে! গান গাবেন তো একটু রয়ে সয়েই গান। হেঁটে হেঁটে গাবেন? একটু আস্তে আস্তে হাঁটেন। তাইলেই তো হয়।
মা নানুবাড়ি থাকবে আরো সপ্তাহখানেক। অনেকদিন পর গিয়েছে।
পরেরদিন রাতে শেষমেষ সফল হলাম আমি। লোকটার কন্ঠ শোনা মাত্র বেরিয়ে পরেছি। এখনো শোনা যাচ্ছে। একই টান, একই সুর। দরাজ কন্ঠ। শিরা- উপশিরা কেঁপে যায়। রক্তবাহিকারা আন্দোলন করে যেনো। প্রেমান্দোলন।
কন্ঠের প্রেমেও মানুষ পরে? পরতেই পারে।
বারান্দায় পৌছোতে পৌছোতে সে আগে চলে গেছেন। আপু যেনো টের না পায় সেজন্য চেপে চেপে দরজা খুলতে খুলতেই কন্ঠপুরুষ লাপাত্তা। উদ্ভ্রান্তের মতো রেলিং ধরে অনেকখানি ঝুঁকে গেলাম।
দেখা গেলো, একটা দীর্ঘকায় ছায়া। পিছনটা দেখা যাচ্ছে আবছা আবছা। সাদা শার্ট বোধহয়। আহ্! আরেকটু হলেই দোতালা থেকে উল্টে পরতাম। মানুষটা আমাকে মেরেই ফেলবে। মেরেছেও তো। পুরো গলা টিপে ধরেছে যেনো। সারাক্ষণ হাঁসফাঁস করি কন্ঠ শোনার জন্য।
দেখার জেদটা পুরোপুরি না মিটলেও আংশিক মিটলো। ঠান্ডায় তখন রক্ত জমা অবস্থা! হাড় অবধি কেঁপে যাচ্ছে। রি রি করে ঘরে ঢুকে গেলাম। ঘুম হলো ভালোই।
আছেনাই লুকোচুরির মধ্য কাটলো তিনদিন। দু'দিন উনি আসেননি। মাঝের দিন এসেছিলেন। আমার প্রস্তুতি ছিলোনা। ভেবেছি কাল আসেননি আজও আসবেননা। তাই সময়মতো উঠতে পারিনি। আজব একটা ঘটনা। রাত বিরেতে আমি নাকি জেগে থাকি এক পথচারীর সামান্য কন্ঠ শোনার জন্য? উহু! সামান্য নয়তো। সে কন্ঠেতো বিচ্ছেদের যন্ত্রনা থাকে। থাকে অভিশাপ। প্রেমের জন্য ছোঁড়া অভিশাপ। আচ্ছা, লোকটা কি তবে ঘোর প্রেমবিরোধী? ইশশ, আমি যে তার কন্ঠের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি তা জানলে কি করবেন?
ভাবনায় এলোনা। কন্ঠটা শোনা যাচ্ছে আবার। ঘড়ি না দেখেই বুঝে গেলাম সময়ের কাঁটা তিনটের ঘরে পা মাড়িয়েছে। রাত তিনটের প্রেম। অদ্ভুত আকর্ষণ।
আমি একছুঁট লাগালাম। আপু হা করে ঘুমাচ্ছে। উঠার সম্ভাবনা শূন্যতে।
দৌড়ে রেলিংয়ের কাছে দাড়াতেই একটা অপ্রস্তুত ঘটনা ঘটে গেলো চোখের পলকে।
প্রথমবারের মতো মানুষটার চেহারা দেখছিলাম আমি। গাঢ় শ্যামবর্ণের পুরষ। আগাগোড়া বলিষ্ঠ দেহের সুপুরুষ যাকে বলে। মাত্র একটু দেখছি তখনই লোকটা বেখেয়ালিতে এদিকে তাকালো। কন্ঠের গান থেমে গেলো সাথেসাথেই। একসেকেন্ডের চোখাচোখি হয়তো। মানুষটা দ্রুত চোখ নামিয়ে হেঁটে চলে গেলো। গটগট শব্দটা মিলিয়ে গেলো অন্ধকারে। আমি হাভাতের মতো থমকে গেছি। যেভাবে দৌড়ে এসেছিলাম ঠি ক সেভাবেই দৌড়ে ওয়াশরুমে ঢুকলাম। লাইট জ্বেলে আয়নার দিকে চেয়ে রইলাম কতক্ষণ।
এলোমেলো খোলা চুল। অনেকটা পাগলের মতো লাগছে। তাড়াহুড়োয় ওড়না নিতে ভুলে গেছি। পরণে সবুজ রংয়ের একটা সাদামাটা কামিজ। ঠান্ডায় মুখ শুকনো হয়ে আছে। ইশ! মানুষটা কি একটা অবস্থায় দেখে ফেললো। কি না কি ভেবেছে। ধ্যাত!
সেদিনের পর টানা চারদিন তিনি আসলেননা। আমি চাতকের মতো অপেক্ষা করলাম। হাড় কাঁপানো ঠান্ডাও দমাতে পারলোনা। কাঁপতে কাঁপতে দাড়িয়ে থাকতাম। কিন্তু সে এলোনা।
শেষমেষ এলো যেদিন, সেদিনও আমি দাড়িয়ে ছিলাম। মোড় থেকে তার ছায়ামূর্তি দেখেই তাড়াতাড়ি করে চুল, ওড়না ঠি ক করলাম। কন্ঠটা অষ্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
মানুষটা বাসার কাছে আসার আগেই গান থামিয়ে দিলো। নিস্তব্ধ রাস্তায় জুতোর ফ্যাসফ্যাসে শব্দটা একটুক্ষণের জন্য থামলো। আমি বুঝলাম সে দাড়িয়ে পরেছে। কিন্তু কেনো? আমার উপস্থিতি অস্বস্তি দেয় তাকে?
মন দুরুদুরু কাঁপছে। উনি কি এদিকে তাকাবেন?
প্রহর পেরোলো। উনি এলেন। একঝলক তাকালেনও। আমি সেই চাহনীতেই কেঁপে উঠলাম। অবিচল দৃষ্টি এদিক ওদিক ঘোরাতেই উনি চট করে মাথা নামিয়ে আগেরবারের মতোই হেঁটে চলে গেলেন। পরণে একটা কালো রংয়ের শার্ট ছিলো। এই ঠান্ডায় সোয়েটার ছাড়া মানুষটা আছে কিভাবে?
একটা রুটিন হয়ে গেলো যেনো। রোজকার একটা খুব প্রয়োজনীয় কাজ। আমার দাড়িয়ে থাকা আর তা দেখে উনার চুপচাপ হেঁটে চলে যাওয়া। যদিও রোজ না। এখন সে খুব কম আসে এদিকে। গতসপ্তাহে মাত্র দুদিন এসেছেন। তাও গান শুনতে পাইনি। আমাকে দেখলেই উনি গান থামিয়ে দেন। বাকি রাস্তাটুকু আর শব্দই করেননা। মোড় টুকু হেঁটে আসা অবধি যতটুকু শোনা যায় আরকি। কন্ঠে এখন সেই আগেকার মতো বিচ্ছেদের সুরটা নেই। সেই ভেঙে যাওয়া মানুষটা নেই।
কন্ঠ ছাপিয়ে শেষমেষ বোধহয় আস্ত মানুষটার প্রেমেই পড়ে গেলাম আমি। এত অবহেলা করে তবুও বেহায়ার মতো দাড়িয়ে থাকি। শেষমেষ সপ্তাহ পেরোলো, উনার দেখা নেই। আমি ভেতরে ভেতরে কাতরালাম। সেই চেহারা, রক্তলাল চোখ, গাল, সিগারেট পোড়া ঠোঁট। ঘুমাতে পারিনা রাতে। ছটফট করি একপলক দেখার জন্য। কলেজের ছুটি শুরু হয়েছে। মা এসে পড়েছে বাসায়। ধরাবাঁধা জীবন। এক বিকেলে বান্ধবীর বাসা থেকে ফিরছি।
মাঝরাস্তায় আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর মূহুর্তটা ঘটে গেলো। রিকশায় বেখেয়ালি বসে ছিলাম। কে যেনো চোখের পলকে হাত টেনে মুঠোয় একটা সাদা কাগজ ধরিয়ে দিলো। আমি যে ভয় পাবো সেই সময়টাও পেলামনা। পিছনে ফিরে তাকালাম কিন্তু মানুষের ভীড়ে তেমন কাউকেই ঠাওর করতে পারলাম না। কিন্তু...!
লোকটা যখন হাত ধরলো। কেমন শিরশির করে উঠলোনা? এইতো! হাতের লোম দাড়িয়ে গেছে।
তবে কি সে- ই ছিলো? আমার ব্যাক্তিগত মধ্যরাতের গায়ক? আহা! ব্যাক্তিগত বলছি! কি অধিকার!
কাগজটা খুলতেও কেমন একটা উত্তেজনা, ত্রাস, ভয়। হাত কাঁপছে। অবশেষে খুললাম। কাগজে চমৎকার হাতের লেখায় কালো কলমের কালিতে দুটো লাইন লিখা-
"আর কখনো বারান্দায় দাড়াবে না। আমি আর কোনোদিন প্রেমে পড়তে চাইনা।"
সারা রাস্তা কাগজটার দিকে চেয়ে রইলাম। বিরবির করে লাইনগুলো পরলাম। প্রেমে ব্যর্থ, ভেঙে যাওয়া মানুষের আর্তনাদ কালিগুলোর অন্তরালে। প্রেমের প্রতি চরম ঘৃণা, আক্রোশ। দ্বিতীয়বার প্রেমের ধারেকাছে না ঘেষার স্পষ্ট বারণ।
একটা অংশ ভিজে গেছে। কালিগুলো ছড়িয়ে যাবে ভেবে দ্রুত চোখ মুছলাম আমি। কাগজটা সযত্নে ভাঁজ করে ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখলাম। নাহ্! এই ভীষণভাবে ভেঙে গুড়িয়ে যাওয়া মানুষটাকেই লাগবে আমার। যে করেই হোক।
কিশোরী বয়সের আবেগগুলো ভয়াবহ হয়। খুব ভয়াবহ। এতোটা ভয়াবহতা আগুনের দাবানলেও থাকেনা।
আমি বারণ শুনিনি। ঠিক সময়ে দাড়িয়ে গেছি বারান্দার রেলিং ঘেঁষে। আপু জানে বিষয়টা। যদিও এখন ঘুমাচ্ছে কিন্তু উঠে গেলেও ভয় নেই।
উনি সেদিন এলেন সাড়ে তিনটার পর। অবাক লাগে! রাস্তায় একটা কুকুরও নেই। গা ছমছমে পরিবেশ। আমার মতো জন্মভীতু মেয়ে নাকি দিব্যি একা একা দাড়িয়ে থাকে এখানে। সত্যি অবাক লাগে।
উনি হয়তো ভেবেছেন আমি দাড়াবোনা আজ। বাড়ির কাছে এসেও গান থামাননি। আজ কন্ঠে সেই প্রথমদিনের মতো সুর ছিলো। নাকি তার থেকেও করুণ? এক অদৃশ্য দ্বিতীয় বিচ্ছেদে হয়তো আরো ভরাট হয়েছে কন্ঠনালি।
আমি বড় বড় ঢোক গিলে শক্তচোখে চেয়ে রইলাম। দূর্বল হওয়া চলবেনা। উনি এদিকে তাকাতেই ভুত দেখার মতো চমকে উঠলেন। কি ভীষন লাল চোখ! সেই অবাকচোখে আরো একবার মরলাম আমি।
এই প্রথম এতক্ষনের চোখাচোখি। উনি চোখ ফিরাচ্ছেননা। পা থেমে গেছে। আমি জেদ নিয়ে চেয়ে আছি। একসময় গাল বেয়ে অবাধ্য অশ্রু গড়িয়েই গেলো। উনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। দৃষ্টি ফেরালেন। যাবার জন্য পা বাড়াতেই আমি কোনরকমে বলে উঠলাম,
---"শুনেন, একটু দাড়ান প্লিজ।"
উনি দাড়ালেন না। আমি সশব্দে ফুঁপিয়ে উঠলাম। নির্জন রাস্তায় আওয়াজটা প্রতিধ্বনির মতো শোনালো। উনি একটু থামলেন। পরমূহুর্তেই স্বউদ্যমে পায়ের গতি বাড়ালেন। এতো অবহেলা করতে পারে মানুষ? নিজে ভেঙেছে বলে অন্যকেও ভেঙে দেয়ার অধিকার কে দিয়েছে তাকে?
আমি কাঁদতে কাঁদতেই বেহায়ার মতো বললাম,
---"একটু দাড়ালে কি হয় আপনার?"
কথাটা আস্তে হলেও উনার কানে পৌছালো ঠি কই। উনি থামলেন। বোঝা যাচ্ছে আমার জন্যই থেমেছেন। কাঁদতে কাঁদতেই চোখ মুছলাম। মেইন গেটের চাবি বাবার রুমে। কিভাবে আনবো? ভয় লাগলো খুব। তবুও গেলাম। পা টিপে টিপে ড্রয়ের খুলে চাবিটা বুকে চেপে ধরলাম। শব্দ করা যাবে না।
পুরো বাড়ি অন্ধকার। ভীষণ ভীতু এই আমিটার কি যেনো হলো। অন্ধকারেই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলাম। প্রেমে পরলে মানুষ সাহসী হয়ে যায় নাকি? হয় বোধহয়।
মেইন গেটের তালা খুলছি। কেউ তো নেই। মানুষটা চলে গেছে তবে? আমার তালা খোলা শেষ হতেই উনি কোথ থেকে যেনো এগিয়ে এলেন দ্রুত। আমি বেরোতে নিলাম। উনি হাতের ইশারায় থামিয়ে আস্তে করে বললেন,
---"বাইরে এসোনা। রাত হয়েছে।"
আমি থেমে গেলাম। উনি নিচের দিকে চেয়ে আছেন। আমার দিকে তাকাচ্ছেননা। আমি কি বলবো বুঝে উঠতে পারলামনা। এতো কথা জমে গেছে। অথচ মুখ দিয়ে একটা শব্দ বের হতেও যেনো মৃত্যু যন্ত্রনা।
---" বারণ করেছিলাম।"
উনার গম্ভীর কন্ঠে কেঁদে উঠলাম আমি। অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললাম,
---"আপ.. আপনি.."
---"অযথা কাঁদবে না।"উনার কাঠকাঠ উওর। লোকটার মধ্যে একটু কোমলতা নেই। মানুষ নয়, রক্তমাংসের পাথর যেনো।
আমি ঠোঁট চেপে টলমলে চোখে তাকালাম। উনি চেয়ে ছিলেন। আমি তাকাতেই চোখ নামিয়ে নিলেন। কেনো? কন্ঠে একসমুদ্র কষ্ট নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
---"আমার দিকে তাকালে কি আপনি অন্ধ হয়ে যাবেন?"
উনি নিরুত্তর। পাষান লোক একটা। কিছুক্ষণ নিরবতা। আমি কিছু একটা বলতে যাবো তখনই উনি
এদিক ওদিক দেখে বললেন,
---"বাসায় যাও। ভালো ঘরের মেয়েরা এতোরাতে বাহিরে আসেনা।"
---"আমি..."
---"ভেতরে যেতে বলেছি।"
আমি নড়লামনা। উনি ধমকে বললেন,
---"কথা শোনোনা কেনো?"
আমি আক্রোশে ফেটে বললাম,
---আপনি... আপনি... আপনি প্রচন্ড খারাপ। আর কোনোদিন এদিকে আসবেননা। কক্ষনো আসবেননা"
গেট লাগিয়ে দিলাম। লাগবেনা আমার। কাউকে লাগবেনা। তালা দিচ্ছি, উনি আচমকাই লোহার শিকের ফাঁক দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। নরম গলায় বললেন,
---"আমি ভাঙা কাঁচের মতোন। এই কাঁচ জোড়া লাগানো যায়না। ভাঙা টুকরো মানুষ ফেলে দেয়। জোড়া লাগাতে গেলে হাত কেটে যাবে। আমাকে খারাপই ভেবো। পাগলামো করোনা আর। আসি।"
উনি চলে গেলেন। আমার বলা শেষ কথাটা বোধহয় সত্যি সত্যি মেনে নিয়েছিলেন। সেদিনের পর আর কোনোদিনও দেখিনি তাকে।
একটা অপ্রেমের বিচ্ছেদ হয়ে গেলো। প্রেম হবার আগেই বিচ্ছেদ। অদ্ভুত না? খুব অদ্ভুত!
_______সমাপ্ত_______
Writer:- মালিহা খান