> মিষ্টি প্রীতি - Bangla Comics - Boipoka365
-->

মিষ্টি প্রীতি - Bangla Comics - Boipoka365


Comics

ইফতারিতে আমাকে বরং এক গ্লাস নরমাল পানিই দিস, শরবত বা জুসের কপাল নিয়েতো জন্মিনি। খাওয়ার জন্য কপাল  করে দুনিয়াতে আসতে হয়। আমি দুনিয়াতে এসেছি এক পাহাড় লাল আটার বস্তায় সাইন করে। 

বলেই এক বুক কষ্ট নিয়ে মুখ কালো করে ডাইনিংরুম থেকে সরে গেলেন আব্বা। 

দৃশ্যটি নতুন নয়, প্রতিনিয়তই আব্বার এমন মন খারাপের কথামালার সাথে আমাদের পুনঃপরিচয় ঘটে।

এ দৃশ্যগুলোতে প্রায় প্রতিদিনই চোখ বুলাতে হয়, তাই  অনেক ঘটনাই স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়। তবে কিছু কিছু ঘটনা থাকে যা কখনোই ভোলার নয়।

এই যেমন গতবছরের মাঝামাঝি সময়ের কথা। তখন আঁখের ঋতু চলছিল। ভ্যানভর্তি দেশি, গেন্ডারি বোঝাই করে আঁখ বিক্রেতাকে হরহামেশাই দেখা যেত রাস্তাঘাটে। এমনই এক বিকেলে আমি ফিরছিলাম অফিস শেষ করে। গাড়ি থেকে নামার পরই পরিচিত এক আঁখবিক্রেতার সাথে দেখা। দরদাম জিজ্ঞেস করতেই লোকটা বললেন,

--এই ভ্যানের সব গেন্ডারিই চল্লিশ টাকা পিস। ন্যান আপা খুব ভালো আঁইখ। আপনের আব্বার কাছে একটু আগেই এক পিস বেচলাম। হেই তো আঁইখ কিন্যাই এইখানে বইস্যা বইস্যা খাওয়া শেষ কইর‍্যা ফেলাইলেন। খুব মিষ্টি আঁইখ, আপনের আব্বায় খাইয়্যা অনেক প্রোশোংসা করতে ছিল।

লোকটার কথা শুনে ভ্রু কুঁচকাচ্ছিলাম। লোকটার কথা যদি সত্যি হয় তবে আজ আব্বার একদিন কী আমার একদিন! আমি আর দরদাম না করে দুইটা আঁখ নিয়ে বাসায় ফিরলাম।

গিয়েই দেখি আব্বা-মা-ভাই সবাই বারান্দায় বসে গল্প করছে। আঁখের বান্ডেলটা ফ্লোরে রেখেই আমি বললাম,

--নাও, এবার সবাই আঁখ খাও আর গল্প কর।

আমার কথা শুনেই আব্বা বলে উঠলো,

মিষ্টিজাতীয় জিনিস আমার সামনে কেউ একদমই আনবি না। ঐসব আমি আর দেখতেও চাই না। গতবছর যে অবস্থা হয়েছিল আমার, এরপর থেকে  মিষ্টি খাওয়ার সাধ মিটে গেছে।

আমি বললাম,

--বছরকার জিনিস একবার খেতে হয়, একখান খাও আব্বা।

--তোর মাথা খারাপ। আঁখ খাওয়া বাদ দিয়েছি আজ দুই বছর হয়! আমি কিছুতেই খাবো না তুই এগুলো সরা আমার সামনে থেকে।

আমি বললাম,

কতবছর ধরে আঁখ খাও না, আব্বা? এত বছর মিষ্টি জিনিস না খেয়ে তোমার ঘুম হলো কেমনে, আমি তো সেই চিন্তাই করছি! 

--পারা লাগে, বাঁচার জন্য কতকিছু ছাড়তে হয়!

আব্বার মুখে এসব বড়বড় বুলি শুনে হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারছিলাম না। আমি বলতে লাগলাম,

--সেজন্যইতো যার কাছ থেকে আঁখ কিনলাম সেই লোকটা বললেন, 

--আপনের আব্বা একটু আগেই আঁখগুলি নাড়াচাড়া করছিলেন আর বলছিলেন,

-- আজ আমি মিষ্টি খাই না বলেই এই সপ্তমাশ্চর্যের ভ্যান থেকে একটি আশ্চর্যময় জিনিস কিনে খেতে পারতেছি না। এই কষ্টে নাকি তুমি বসে বসে কান্নাকাটি করেও এসেছো কতক্ষণ।

--তুই আঁখ কিনেছিস কার কাছ থেকে? 

আব্বার চোখে মুখে আতঙ্ক.....

আমি আর ঘটনা না লুকিয়ে চিল্লাপাল্লা করে মাকে সবটা জানালাম। কিন্তু অবাক হলাম, আমাদের রাগারাগি আব্বা গায়েই মাখল না বরং বোকা বোকা হাসিই হাসতে থাকল।

গত শীতে বাড়িতে শীতের পিঠাপুলির আয়োজন করা হল অনেক দেরিতে। আব্বার ডায়বেটিকস এর পয়েন্ট বাড়তি তাই পিঠার আয়োজন করবে না করবে না করতে করতেও অগত্যা করতেই হল। আব্বাকে যেদিন বলা হল বাড়িতে ভাঁপা পিঠা আর দুধ চিতই বানানো হবে, সেদিন আব্বার ফুর্তি আর দেখে কে? তখনই বাজারে গিয়ে গুড় আর চিনি কিনে আনল পরিমাণের চেয়েও ডবল। ভাঁপা বানাতে গিয়ে আব্বাকে জিজ্ঞেস করলাম,

--একটা ঝাল ভাঁপা পিঠা বানাবো। কি কি দিয়ে বানালে খেতে ভালো লাগবে বলো?

আমার কথা শুনেই সে রেগেমেগে আগুন। বলে,

--পিঠা খাওয়ার কপাল আমার নাই। ঐসব দিয়ে পিঠা বানাতে হবে না, আমি ঐ পিঠা খাবো না। বলেই হাতে থাকা প্লেটটি ঠাস করে নিচে ফেলে দিল।

মা আবার আব্বার একটু এমন রাগী ভাব বা ইমোশনাল কথা শোনামাত্র দ্রুতই দূর্বল হয়ে পড়ে। তারপর দেখা যায় আমার অগোচরে পিঠা পাঠিয়ে দেয় আব্বার রুমে। আমার চোখে ধরা পড়লে মা আমাকে বোঝাতে থাকে,

--দেখিস না কেমন করে? চোখের সামনে এমন করলে না দিয়ে পারা যায়? এই পিঠা না খেতে দিলে তোর আব্বা সারারাত বড় বড় নিঃশ্বাস ছাড়বে আর বলবে সবাই আমার শত্রু। কেউ আমার খাওয়াই দেখতে পারে না। আমি এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাব যেদিকে চোখ যায়। 

এমনিতে খাওয়ার ব্যাপারে আব্বা খুব চুজি। মাংসের টুকরো দুই পিসের বেশি কখনোই খাবে না, এক টুকরো মাছ দিলেও ভেঙে রেখে দিবে। আবার, কারো বাড়িতে দাওয়াত পড়লে খেতে যেতেই চাইবে না। গেলেও বাড়ি থেকে খেয়ে বের হবে যাতে কোনরকমে খেয়ে চলে আসতে পারে। সেজন্যই অবাক হই, এই মিষ্টি নিয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলির সাথে লোকটাকে মেলাতে বড্ড কষ্টই হয়। 

এইতো ক'দিন আগে ঘোষদের মিষ্টির দোকানের পাশ দিয়ে যেতেই তাকিয়ে দেখি, আব্বা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গরম মুচমুচে জিলাপি খাচ্ছে। আমার কাছে হাতেনাতে ধরা খেয়েই আব্বা সেই বোকা হাসি হাসতে লাগল। আমিতো রেগেমেগে সাথে সাথেই সব কটা মিষ্টির দোকানে বলে এসেছি,

-- আব্বার কাছে যদি কেউ আর কখনও মিষ্টি বিক্রি করেন তবে সবাইকে কিন্তু আমি পুলিশে দিবো।

সেই জিলাপি খেয়ে আসার পর থেকেই তার শরীর খারাপ। এই অবস্থায় রমজান শুরু হল। রোজা রাখতে গিয়েই আব্বা ঘেমে-নেয়ে, বমি করে একাকার। একেতো ডায়বেটিকস বেড়ে গেছে সাথে আবার প্রেসারের উঠানামা। আল্লাহর রহমতে

ডাক্তারের কাছে গিয়ে এ যাত্রায় রক্ষা পেয়েছে কোনমতে। 

ফোনে আব্বা অসুস্থ শুনেই গতপরশু বাড়িতে এসেছি,

গতকাল ইফতারি তৈরির সময় লেবুর শরবত বানাচ্ছিলাম। আব্বার জন্য লেবু আর পানি আলাদা গ্লাসে রাখতেই তিনি বলল,

--এটা আলাদা রাখলি কেনো? 

বললাম,

-- এটা তোমার জন্য। লেবুপানি অনেক উপকারি।

সাথে সাথেই মুখ কালো করে আব্বা বলল, 

--আমি এই বিচ্ছিরি পানি পান করতে পারি না। পোড়া কপাল নিয়ে জন্মেছি যখন তখন শুধু পানি খেয়েই রোজা ভাঙতে পারব। 

আমি ওসব কথায় কান না দিয়ে ইফতারিগুলো ডাইনিং টেবিলে নিয়ে সাজিয়ে রেখে আবার রান্নার রুমে আসলাম।

এর একটুপরই ফল কেটে খাবার টেবিলে রাখতে যাব বলে দরজার সামনে দাঁড়িয়েছি, তখনই দেখি আব্বা লুকিয়ে লুকিয়ে কন্টিনার থেকে একমুঠো চিনি এনে গ্লাসটাতে ছেড়ে দিচ্ছে। প্রচন্ড দুঃখের মধ্যেও ভীষণ হাসি পাচ্ছিল। কোনরকমে হাসি থামিয়ে আরেকটি লেবু কাটলাম। তারপর ঠিক ওরকমই একটি গ্লাসে একগ্লাস লেবুপানি বানিয়ে নিয়ে আগের গ্লাসটি সরিয়ে নতুন গ্লাসটি রেখে দিলাম।

ইফতারির জন্য সবাই একসাথে বসেছি। কয়েক মিনিট পরেই ইফতারির বাঁশি বাজবে। আব্বাকে দেখলাম  গ্লাসটা যক্ষের ধনের মতো করে হাতে ধরে রেখেছে। 

আমি বললাম

--লেবুপানি নাকি খাবে না? ঐ গ্লাসটা আমাকে দাও,  আমি লেবু পানি ভালো খাই। তোমাকে অন্য একটি গ্লাসে ঠান্ডা পানি ঢেলে দিচ্ছি।

আব্বা বলল  

--থাক লাগবে না, আজ থেকে লেবুপানিই খাবো। সুগার লেভেল আর বাড়তে দিবো না।

আমি হাসছি তার লেবুপানি খাওয়ার বড় বড় বুলি আওড়ানো শুনে। একটুপরই আসল ব্যাপারটা দেখা যাবে। আর তখন আব্বার রাগী মুখটা দেখতে কেমন হবে, আপাতত সেই দৃশ্যই চোখের ক্যানভাসে এঁকে  বসে আছি।



( সমাপ্ত )




লেখা: মিনা শারমিন

NEXT ARTICLE Next Post
PREVIOUS ARTICLE Previous Post
NEXT ARTICLE Next Post
PREVIOUS ARTICLE Previous Post
 

Delivered by FeedBurner