![]() |
Bangla Short Story |
আপনার এই বাড়ি, উঠোন, এই তাল পুকুর সব আমার পৈতৃক সম্পত্তি। আমি এসবের দখল চাই। আপনি সেচ্ছায় এসব ত্যাগ করে চলে যাবেন। ভুবন চৌধুরী যেন থ মেরে রইলেন। কিছুই বলছেন না। মনে হচ্ছে তিনি কিছুই শুনেননি। তমাল আবার বলল আপনি কবে চলে যাবেন বলেন? আপনি চলে গেলেই আমি এ বাড়ি নিলামে তুলবো। চারপাশে থাকা পালোয়ানের এক দল ত্যাড়ে আসছিল তমালের দিকে। ভুবন চৌধুরী তাদের ইশারায় থামিয়ে দিয়ে হাসিতে ফেটে পড়লেন। সবাই হতবাক ! চৌধুরী মশাই এই অপরিচিত ছেলের কথার কোন জবাব না দিয়ে এমন হাসছেন কেন? কেউ কেউ বলছে চৌধুরী সাহেব, আপনি হুকুম করেন তো এই ছেলের হাড় ভেঙ্গে দিই। পল্লীর আমজনতা সমাজের হেডদের এতটায় তেল দেয় যে, যদি তারা বিনা অপরাধে কাউকে মেরে ফেলার হুকুমও দেয় তাহলে তারা প্রতিবাদ না করে বরং, বলবে হুজুর আপনার ছুরিতে মরতে পারা পরম সৌভাগ্যের। আর যদি উসকানি দেয়ার কোন উছিলা পেয়ে বসে তাহলে তো হলোই। পারে তো হুজুরের অন্যায় কাজটা তারা নিজ হাতে করে দেয়। হাসি থামিয়ে চৌধুরী সাহেব এবার বললেন তোমার নাম কি বাবা?
: তমাল, তমাল চৌধুরী।
: খুব সুন্দর নাম তোমার। চৌধুরী কি তোমার বংশগত উপাধি?
: আপনার কি মনে হয় চুরি করা উপাধি?
: চৌধুরী সাহেব সবার মুখের দিকে একবার নজর বুলিয়ে বললেন তা কেন হবে বাবা? আচ্ছা তুমি ভিতরে গিয়ে বস। আমি আসছি। বলে তিনি এক পালোয়ানকে ডেকে তমালকে মেইন ঘরের দিকে পাঠিয়ে দিয়ে গ্রামের মানুষদের যার যার বাড়ি যেতে বললেন। তমাল কোনপ্রকার আপুত্তি ছাড়াই ভিতরে চলে গেল। গ্রামের মানুষদের মাঝে শুরু হয়ে গেল জল্পনা। কেউ কেউ বলছে নিশ্চয় কোন রহস্য আছে। নাহয় চৌধুরী মশাই, যিনি একটা পিঁপড়েকেও নিজের মুখের উপর কথা বলার অভয় দেন না তিনি বাড়ি ঘর ছেড়ে যাবার হুকুম শুনেও এই অচেনা অপরিচিত ছেলেকে কিছু বললেন না কেন। একেক জন একেক কথা বলছে। কেউ কেউ আবার চুপিচুপি বলছে হয়তো এই ছেলে পাগল টাগল হবে। নাহয় এতবড় দুঃসাহস দেখায় ! তমাল বাড়ির ভেতরটা তীক্ষ্ণ চোখ দিয়ে অবলোকন করেই যাচ্ছে। ভুবন চৌধুরী এবার একটু চিন্তায় পড়ে গেলেন। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন এই ছেলে হয়তো সহজ সরল। কেউ হয়তো উসকানি দিয়ে চৌধুরীর কাছে পাঠিয়েছ। কিন্তু না। ওর চাল চলন কথা বলার স্টাইল সব চৌধুরী সাহেবকে কেমন ভাবিয়ে তুলছে। দুপুরে যখন গ্রামের মানুষদের সাথে নিয়ে বাড়ির আঙ্গিনায় এসেছিল তখন তিনি ভেবেছিলেন এ আবার কে? কোথাকার কোন হাধারাম? যদিও তখন তিনি কিছুই বলেননি। ভেবেছিলেন দুপুরে খাবার টেবিলে একসাথে বসে খেয়ে বিদায় করে দিবেন। কিন্তু ঘটছে উল্টা। খাবার খেয়ে তমাল বিশ্রামঘর খুঁজতে লাগল। মনে হচ্ছে এ যেন তার পূর্বপরিচিত বাড়ি। মনে কোনরকম দ্বিধা ভয় নেই। চৌধুরী সাহেব যেন কিছুটা ভীতই হলেন তার ব্যবহারে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। শীতের দিনের গ্রামের মানুষ এত বেশি বের হোন না। গ্রাম যেন নিরব নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। তমাল একটু বের হলো। যদি সমনে চায়ের দোকানটা খোলা পাওয়া যায় তাহলে একটু চা খেয়ে আসবে আর দুইএক জনের সাথে একটু কথা বলে আসবে। চৌধুরী সাহেব সন্ধ্যার একটু পরেই পাশের গ্রামে থেকে ফিরলেন। পাশের গাঁয়ে রায়দের বাড়িতে দুই ভাইয়ের জমিজমা নিয়ে বহুদিন ধরে জঞ্জাল লেগেই আছে। দুই ভাই জমিজমা কোনভাবেই বণ্টন করতে পারছিল না। আজ চৌধুরী মশাই জমি বণ্টনের কাজ সমাধান করে আসলেন। বাড়ি ফিরেই তিনি আগে তমালের খুঁজ করতে লাগলেন। কিন্তু তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথায় গেছে কেউ বলতেও পারছে না। অবশেষে তামাল নিজেই এসে হাজির চৌধুরী মহলে। আংকেল আপনারা সবাই এমন জড়ো হয়ে আছেন কেন?
: তুমি কোথায় গিয়েছিলে?
: ওহ, আসলে আমি একটু চায়ের দোকানে চা খেতে গিয়েছিলাম। তা আপনি কখন ফিরলেন? আর কি ভাবলেন। কবে ছাড়ছেন?
: ছাড়ব মানে! ভুবন চৌধুরী চিকন বুদ্ধির মানুষ। তাছাড়া তিনি সহজে ভিতরের রূপ প্রকাশ করেন না। আজকেও তাই করলেন। তমালের কথায় তিনি যতেষ্ট ভীত হয়েছে এবং চিন্তায় পরে গেছেন। কিন্তু এমন ভাব দেখালেন যেন তিনি কিছুই বুঝতেই পারেননি।
: আমার পৈতৃক সম্পত্তির এক কানাকড়ি ভাগ আমি কাউকে ভোগ করতে দেব না। আপনি আমাকে নির্দিষ্ট সময় দিন কবে ছাড়ছেন সব।
: ভুবন চৌধুরী আবারও হাসলেন। তুমি দেখনি দুপুরে আমার পালোয়ানদের ত্যাড়ে আসা? নাকি গাঁয়ের লোকদের কথা কানে পৌঁছাইনি? তুমি একবার ভেবেছ তখন আমি অনুমতি দিলে গাঁয়ের লোকে তোমাকে দিয়ে তবলা বাজাতো।
: যারা আজকে আমাকে তবলা বাজাতো কিন্তু বাজায়নি। তারা আপনাকে তবলা বাজানো শেখায় কিনা তাই ভাবুন।
: তোমার তো দেখছি সাহস কম না !
: সাহসী বংশে ভীরু সন্তান যে বড্ড বেমানান হয়ে যায়।
: তা তুমি কোন গাঁয়ের সাহসী বংশের বংশধর বাবা?
: সময় হলে সব জানবেন। বাড়ি ছাড়ার ব্যবস্থা করেন। আমি ঘুমাতে গেলাম। তমাল নির্ভয়ে গেস্টরুমে গিয়ে শুয়ে পরল। ভুবন চৌধুরীর যেন রক্ত মাথায় উঠে যাচ্ছে। এই ছেলেকে মেরে গুম করে দেওয়া উনার এক আঙ্গুলের ইশারা কেবল। আর এই ছেলে আমার মুখের উপর যা তা বলেই যাচ্ছে সেই দুপুর থেকে। দারোয়ান এসে একটা কাগজ দেখিয়ে বলছে চৌধুরী সাহেব ওই ছেলে ঘরে বাড়িতে প্রবেশ করার সময় ওর পকেট থেকে এই কাগজটা পরে গেছে আমি দেখতে পেয়ে তুলে নিলাম। তাড়াতাড়ি কাগজটা নিয়ে খুলে দেখলেন, একটা ফোন নাম্বার। হয়তো এই নাম্বারে কল করলে কিছু জানা যাবে এই ছেলের বেপারে। ফোন বের করে কল করলেন। ওপাশ থেকে কথা ভেসে আসছে ; চৌধুরী সাহেব আমরা জানি তমাল চৌধুরী নামের একজন আপনার বাড়িতে আছে। তার কোন ক্ষতি হলে হয়তো আপনাকেই বিপত্তি পোহাতে হতে পারে তাই বলছিলাম কি আপনি যদি একটু দেখে রাখেন তাকে।
:কে বলছেন আপনি?
:আমি পলাশ। আপনাদের থানার নতুন ওসি।
: ও আচ্ছা। আপনি আমাকে কি করে চিনলেন?
: কি যে বলেন! আপনার ফোন নাম্বারটা যদি আমি না চিনি তাহলে কি আর আমি আপনাদের থানায় চাকরি টিকিয়ে রাখতে পারব বলেন?
:আচ্ছা রাখছি এখন পরে কথা হবে আপনার সাথে। বলেই ভুবন চৌধুরী ফোন রাখলেন। এই ছেলে তো সাধারণ ছেলে নয়। নিশ্চয় কোন ঘাপলা আছে। আর সে ইচ্ছে করেই কাগজটা ফেলে রেখে গেছে। কে এই ছেলে? নানান চিন্তায় পাগলপ্রায়। কল করলেন শহরে নিজের ছেলের কাছে।
: বাবা তুই আগামী কালকেই বাড়ি আসবি।
: কেন বাবা, কি হয়েছে? মা কেমন আছে?
: কিছু হয়নি। তুই সকাল সকাল রওনা দিবি। জরুরি কথা আছে। কল কেটে গেল। ধূর কিছু বলতেও পারলাম না। বাবা কল কেটে দিল। আমার এতবড় ব্যবসায় রেখে হঠাৎ করেই কিভাবে বাড়ি যাব কাল ! সকালের সূর্য দেখা হয় না অনেক দিন। বাড়ি যেতে হবে তাই সকালে তাড়াতাড়ি উঠেছে আজ। ফ্রেশ হয়ে রওনা দিল অর্জুন। ভুবন চৌধুরীর হুকুম না মেনে উপায় আছে? আগে তিনি চৌধুরী সাহেব তারপর আমার বাবা। কতদিন পর মা,বাবা নিজের গ্রাম দেখা হবে। দুপুরেই বাড়ি পৌঁছে গেল গাড়ি। কিন্তু সেই আনন্দ নেই। সবাই কেমন মুখ ভার করে আছে। কারো মনে
অর্জুনকে দেখে কোন উচ্ছ্বাস নেই। অর্জুন অবাক হয়ে গেল। লম্বা জার্নির ক্লান্তির কারণে কারো সাথে তেমন কথা না বলেই নিজের রুমের দিকে চলে গেল। কিন্তু নিজের রুমে তমালকে দেখে সে যেন হতবাক ! তমাল নিজেও অবাক।
: কিরে তুই?
:আরে সালা তুই এখানে কেন বল? আর তুই আমাদের বাড়িতে এসে বসে আছিস সেটা আমি কেন জানি না?
তমাল বুঝতে পারল অর্জুন এই চৌধুরীর ছেলে।
: কিরে কথা বলিস না কেন? তুই কিভাবে চিনলি আমাদের বাড়ি। আর কখন আসলি?
: আজ দুইদিন।
: তারমানে গতকাল এসেছিস। দুইদিন হয়ে গেল আমাকে কেউ জানালো না?
: অর্জুন, তোদের বাড়িতে আমি আসিনি।
: তাহলে?
: আমি আমার বাড়িতে এসেছি।
: কোথায় সেটা?
: এই বাড়ি, যেখানে তুই এখন দাঁড়িয়ে আছিস সেটা আমার বাপের ভিটা। তোর কোন অধিকার নেই। যা আছে সেটা অবৈধ।
: তুই তো ভালোই গল্প বানাতে পারিস। তা আমার রুমটাও দখল করে নিলি? আমি একটু বিশ্রাম করতে পারব নাকি সেটাতেও গল্প আছে?
:তোর বাবাকে সময় দিয়েছি বাড়ি ছেড়ে যাবার। তোর বাবা বাড়ি ছেড়ে যাবার আগ পর্যন্ত থাকতে পারিস।
: তমাল দেখ বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু। ফাজলামোর একটা সীমা থাকা দরকার। আমার সাথে কথা বলছিস বাবাকে কেন টেনে কথা বলছিস?
: তোর বাবাকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর।
তমাল বাইরে চলে গেল। অর্জুন মাথা গরম করে বাপের ঘরে গেল। বাবা তমাল কি বলে এসব?
: তুই এই ছেলেকে চিনিস?
: হুম। ঢাকায় আমরা একসাথে কলেজে পড়তাম। ভুবন চৌধুরী যেন স্বস্তি ফিরে পেয়েছেন। কিছু একটা জানা যাবে হয়তো।
: ঢাকায় ওর কে কে আছে জানিস কিছু?
: ঢাকায় ওর এক পিসিমা আছে। আমরা বন্ধুরা সবাই উনাকে তুলসি পিসি বলে ডাকতাম।
: তুলসি !
: বাবা তুমি তুলসি নামটা শুনে এমন চমকে উঠলে কেন? তুমি চেন?
: ওর বাবা নেই?
: হুম আছে। তবে চলাফেরা করতে পারে না। প্যারালাইজড।
: অর্জুন, গাড়ি বের কর।
: কোথায় যাবে?
: থানায় যাব।
:কেন?
: থানায় নতুন ওসি এসেছে। তার সাথে দেখা করতে হবে। বিকাল তিনটা। ভুবন চৌধুরী আর তার ছেলে অর্জুন বসে আছে ওসির রুমে। পলাশ রুমে প্রবশ করে সালাম জানালেন। আপনি না এসে আমাকে একটা কল করলে আমি নিজেই পৌঁছে যেতাম আপনার চৌধুরী মহলে। শত হলেও তো আসামী ধরতে একটু কষ্ট না করলে কি চলে বলেন?
:আপনি জানেন আপনি কার সাথে কথা বলছেন?
:অর্জুন চুপ করো। ওসি সাহেব চাকরি বাঁচাবার কোন ভয় নেই দেখছি।
: ভয়কে জয় করতে শিখুন চৌধুরী সাহেব। নাহয় ফাঁসির দঁড়িতে গিয়ে যে ভয়ে কেঁপে উঠবেন।
ভুবন চৌধুরী এক লাফে দাঁড়িয়ে চোখ লাল করে কি যেন বলতে গেলেন কিন্তু পলাশ ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করলেন চুপ থাকতে। ফোন বাজছে। হ্যালো। পলাশ, বাবা ছেলে দুজনকে এরেস্ট করুন। বাকী কথা সরাসরি হবে।
ওকে।
.২০১৯ সাল। পৌষ মাস। কনকনে শীত। চৌধুরী মশাইয়ের মামলার শুনানি আজ। আদালতে গ্রামের সকল মানুষ এসে জড়ো হয়েছে। এখনো তারা কেউ জানে না ভুবন চৌধুরী কেন জেলে। কি তার অপরাধ। নিজের গ্রামসহ পাশের গ্রামের জোয়ান-বয়স্ক সবাই এসেছে আদালতে। আসামীর কাঠগড়ায় ভুবন চৌধুরী আর বাদীর কাঠগড়ায় দাঁড়ানো পঞ্চাশ একান্ন বছরের এক মহিলা । ভদ্র মহিলা বলতে শুরু করলেন ; জাঁহাপনা ১৯৮০সালে যুদ্ধ বিধ্বস্ত পরিবার বলতে ছিল তুলসি আর তার ছোট ভাইয়ের এক পরিবার। বাবা স্বপন চৌধুরী
অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আর দুই বছরের মেয়ে তুলসিকে রেখে দেশ স্বাধীন করার তাগিদে ঘর ছেড়েছিল '৭১ এ। আর মা বিনা চিকিৎসায় মারা যায় '৭৫ এ। ছোট ভাইটার বয়স তখন ৫ বছর। তুলসির বয়স নয়। নয় বছরের তুলসির দিকে কামবাসনার নজর পড়ে আপন কাকা ভুবন চৌধুরীর। ভুবন চৌধুরি স্বপন চৌধুরির আপন ছোট ভাই হওয়া সত্ত্বেও তার সম্পত্তি বলে কিছু ছিল না। কারণ সে জুয়ার ভানে নিজের ভাগের সব ভাসিয়ে দিয়েছে অনেক আগেই। স্বপন চৌধুরী তবু নিজের ভাইকে ত্যাগ করেননি। পরিবারকে ভাইয়ের হাতে রেখে যুদ্ধে যান। আর ফিরে আসেননি। স্বপন চৌধুরীর এত সম্পত্তি কোন কাজে আসেনি তার স্ত্রীর অসুখে। ছেলে মেয়ে পায়নি বাবার সম্পত্তির কোন ভোগ বিলাস। আপন কাকা কোন খোঁজ নেন নি সেদিন। তবু ছোট ভাইটাকে নিয়ে দিন পার করছিল তুলসি। মেয়েটা আস্তে আস্তে বড় লাগল। গ্রামের উঠতি বয়সের ছেলের নজরকাড়া রূপ ছিল তার। কিন্তু কেউ সাহস পায়নি কিছু বলার। সাহস পায়নি কুনজর দেয়ার। তাদের ভয় ছিল ভুবন চৌধুরীর প্রতি। কিন্তু জাঁহাপনা, আপন কাকার কুনজর এড়াতে পারেনি তুলসি। নয় বছরের মেয়েটার উপর জাপিয়ে পরে এই ভুবন চৌধুরী। রাগে অপমানে সেদিন রাতেই ছোট ভাইকে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে পালায় তুলসি। শহরে এক মুসলমান পরিবারে কাজ করে দুই ভাই বোনের সংসার চলত। ভাই বড় হলে বিয়ে দেয়। নিজে বিয়ে করেনি। ভাইয়ের বৌ এক ছেলের জন্ম দিয়ে মারা যায়। ভাইকে আর বিয়েতে রাজী করাতে পারেনি তুলসি। নিজের হাতে ভাইপোকে মানুষ করতে লাগল সে। ভাই একটা ভাল কাজ পায়। রাজমিস্ত্রির কাজ। তাদের পরিবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। ভাইপো তমালকে ভর্তি করে ভাল একটা স্কুলে। মেধাবী ছেলে তমাল। তমালের মেধার জন্য ওর বাবা, পিসিমা পরিচিত হতে শুরু করে। তমালের বাবা একদিন কাজ করতে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে যায়। উন্নত চিকিৎসা করাতে পারেনি। বা'পাশ প্যারালাইজড হয়ে যায়। তুলসি পিসি আবার কাজে নামে। ভাইপোর পড়া চালিয়ে যায়। ভাইপো একদিন উঁচ্চ শিক্ষিত হয় নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখে। এখন শহরে তার বিরাট ব্যবসায়। ডাকনাম বেশ। নয় বছরের মেয়ে সেদিন বুঝতে পেরেছিল পায়ের তলার মাটি শক্ত না করে বিচার চাইলে এদেশে বিচার তো পাওয়া যাবেই না। নিজেকে হতে হবে শিয়াল, শকুনের তৃষ্ণা মেটাবার পাত্র। তাই সেদিন ঘর ছেড়েছিল তুলসি। আর আমিই সেই তুলসি। তমাল আমার ভাইপো। জাঁহাপনা, আমি কি পেয়েছি আমার মুক্তিযোদ্ধা বাবার বিনিময়ে? আমি কেন হারিয়েছি আমার মাকে? কেন আমার ভাইয়ের প্যারালাইজডের চিকিৎসা করাতে পারি না? আমার গ্রামের একটা কেউ আমার পাশে দাঁড়ায়নি সেদিন। কেউ আমার মায়ের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেয়নি। আমি আজ শুধু আমার চল্লিশ বছর আগে হারিয়ে ফেলা সম্ভ্রম এর শাস্তি চাই। কান্নায় ঢলে পড়ে তুলসি। গ্রামের বয়স্ক মানুষেরা তুলসিকে চিনতে ভুল করেনি। ১৯৮০ সালে কেউ কেউ কিছু টের পেয়েও কিছু করেনি। তবে আজ তারা মুখ খুলেছে। হুংকার দিচ্ছে ভুবন চৌধুরীর ফাঁসি চাই। ফাঁসি চাই, ফাঁসি চাই। ভুবন চৌধুরী সমাজের বিচার করে বেড়ান। আর আজ সমাজ তাকে ধিক্কার দেয়।
যেই গাঁয়ে কেউ আপন ছিল না। সেখানে সম্পত্তি রেখে কি লাভ? সকল সম্পত্তি নিলামে তোলে শহরে আবার পাড়ি জমিয়েছে তুলসিরা। শহরে যে তাদের প্যারালাইজড আপনজন আছে।
( সমাপ্ত )
লেখা: জেমি সুলতানা
