> ছোট্ট নীনা এবং বাঙ্গি - Inspiration - Boipoka365
-->

ছোট্ট নীনা এবং বাঙ্গি - Inspiration - Boipoka365


Inspiration

ইফতার করতে বসছি,আম্মু গম্ভীর মুখে বললো, " ইদানীং তুমি কি নিজেকে খুব লায়েক ভাবতে শুরু করেছো? "আব্বু আর ভাবি সাথে সাথে বললো,থাক না এখন, এইসব নিয়ে পরে কথা বলা যাবে। আম্মু বললো রাতে অবশ্যই তুই আমার সাথে দেখা করবি। মনে থাকে যেন।

সাময়িক স্বস্তি পেলেও গলায় একরকম অস্বস্তির কাঁটা বিধেই রইলো। কী অপরাধ করেছি বুঝতে পারছি না। তবে গুরুতর অপরাধ যে একটা করে ফেলেছি, এইটা নিশ্চিত। আম্মু শুধু শুধু কিছু করে না, বলেও না, এইটা নিপাতনে সিদ্ধ ব্যাপার। মনের মধ্যে এই খুঁদবুদি নিয়েই ইফতার করে ফেললাম।

খাটে শুয়ে ফেসবুক চালাচ্ছিলাম।দুপুরে বাঙ্গি নিয়ে একটা ট্রল পোস্ট দিয়েছিলাম,বন্ধুদের অনেকেই সেখানে মন্তব্য করেছে,তারমধ্য থেকে কিছু মজার মন্তব্যের উত্তর দিচ্ছিলাম।বড়ো ভাবি এসে বললো,আম্মা তোমাকে ডাকছে।

ভাবিকে বললাম,ঘটনা কী ভাবি?আম্মু হঠাৎ এভাবে চটলো কেন আমার উপর?ভাবি বললো,জানি না।তবে আম্মা যাই বলুক তুমি চুপ করে শুনবা।কোনো তর্ক করবা না।

আম্মু খাটে পা তুলে কায়দা করে বিচারকের মতো বসে আছে।লক্ষণ খারাপ।আমাদের বাড়ি মাঝেমধ্যে এমন বিচারসভা বসে।অধিকাংশ সময় আসামী থাকি আমি,মাঝেমধ্যে ভাইয়াও থাকে।যেদিন এমন বিচারসভা বসে,সেদিন বাড়ির পরিস্থিতি পালটে যায়।

আম্মু বললো,দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না,বস।আজ কিছু কথা বলবো,মন দিয়ে শুনবি।কথার মাঝখানে কোনো কথা বলবি না।মুখে আচ্ছা বললেও তেমন নির্ভার হতে পারলাম না।

আম্মু শুরু করলো-তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি।ভাইবোনদের মধ্যে আমি মেজ।তোর বড়ো মামা সবে কলেজে উঠেছে।আমাদের তখন খুবই অভাব কষ্ট।শুধুমাত্র অর্থনৈতিক কারণেই আমাদের সব ভাইবোনের স্কুল কলেজ যাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো অনির্দিষ্ট কালের জন্য।আব্বা সিজনাল ফলের ব্যবসা করতো।তরমুজ,বাঙ্গি,কাঁঠাল, আম,এইসব। 

গৃষ্মের প্রচন্ড দাবদাহে জনজীবন অতিষ্ঠ।আব্বা আর বড়োভাই গঞ্জে গিয়েছে মহাজনের কাছ থেকে পাওনা টাকা আনতে।দুই তিন চালান বাঙ্গি দিয়েছে মহাজনের মোকামে,কিন্তু সে এখন টাকা নিয়ে ভীষণ গড়িমসি করছে।

বাগেরহাট সদরে ছিলো সেই মহাজনের আড়ত।নৌকায় করে যেতে হতো।এদিকে দেপাড়া অঞ্চলের কৃষকদের থেকে বাঙ্গি এনেছে বাকিতে,তারা রোজ বাড়ি এসে টাকার তাগাদা দিচ্ছে।

আব্বা বারবার তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করলো,তাদের থেকে আনা বাঙ্গি মহাজনের আড়তে দিয়ে এসেছে,মহাজন টাকা দিলেই তাদের টাকা পরিশোধ করা হবে।কিন্তু তারা নাছোড়বান্দা,তারা কোনো মহাজন ফহাজন চেনে না।তারা তোর নানাকে বাঙ্গি দিয়েছে,তার কাছ থেকেই টাকা নিবে।এবং ওইদিনই টাকা লাগবে।টাকা না নিয়ে তারা উঠোন থেকে এক পা'ও নড়াবে না।কী যে বিশ্রী একটা পরিস্থিতি!

পরে গ্রামের মাতুব্বরদের মধ্যস্থতায় তারা দুই দিনের সময় দিলো আব্বাকে।সকালে মা শুধু পানির নাস্তা রান্না করে আমাদের খেতে দিলো।আমরা একটু বড়ো ছিলাম,সংসারের পরিস্থিতি কিছুটা বুঝতাম।তোর নীনা খালা ছিলো সবার ছোটো,সংসারের এই জটিলতার সাথে পরিচিতছিলো না।এইসব পানির নাস্তা খেতে চাইতো না।

সম্প্রতি আব্বার ব্যবসার টাকা আটকে যাওয়ায় পানির নাস্তাও অনিয়মিত হয়ে উঠলো আমাদের পরিবারে।কারণ আগে থেকেই আব্বার নূন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা।মাঝেমধ্যেই তরমুজ-বাঙ্গি খেয়ে থাকতে হতো আমাদের।

মহাজন টাকা নিয়ে খুব টালবাহানা শুরু করে দিয়েছিলো।এদিকে ঘরে চাল নেই,পাঁচ পাঁচটা ছেলেমেয়ে প্রায়ই অনাহারে থাকছে।অন্যদিকে পাওনাদার কৃষকদের ক্রমাগত চাপ আব্বা আর কোনোভাবেই  নিতে পারছিলো না।

হঠাৎ এক দুপুরে আব্বা মহাজনের মাথা তরমুজ - বাঙ্গি পরিমাপ করা বাটখারা দিয়ে থেঁতলে দিয়ে জেলে গেলেন।বড়োভাই বাড়ি এসে এই খবর দিলে মা কেমন যেন পাথর হয়ে গেলো।

মা পরদিন বড়ভাই আর আমাকে মামাবাড়ি পাঠিয়েছিলো সংসারের বিস্তারিত হালচাল লেখা একটা চিঠি দিয়ে।মামাদেরকে লিখেছিলো,যেকোরেই হোক কিছু টাকা আমাদের সাথে যেন তারা পাঠায় এবং আব্বার জামিনের ব্যাপারে একটু চেষ্টাচরিত্র করে। কিন্তু সেদিন মামারা এক টাকা দিয়েও সহযোগিতা করেনি।

শুধু মামারাই না,পরিচিত সবাই সেদিন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো।কারণটা খুব পরিস্কার,এমন অসহায় একটা  পরিবারের জন্য পয়সা খরচ করলে তা আর কোনদিন ফেরত আসবে না।আমি আর তোর সেজ খালা ছিলাম বয়সে কিছুটা বড়ো।যাদের কাছে সাহায্যের জন্য হাত পেতেছি,তাদের ভিতরের হিংস্র রূপ দেখেছি।

পরবর্তীতে আব্বা মামাদেরকে অনেক সাহায্য সহযোগিতা করেছে।মা কখনোই দিতে চাইতো না,আব্বা দিতো।বলতো,বিপদে ওরা পাশে দাঁড়ায়নি,আমরাও যদি ওদের দেখানো পথে হাটি, তাহলে ওদের আর আমাদের মধ্যে পার্থক্য থাকলো কোথায়?কিন্তু মা তার ভাইদের সাথে আর কোনোদিনও সহজ স্বাভাবিক সম্পর্কে যায়নি।ভাইরা মারা গেলেও মা আর কোনদিন বাপের ভিটায় পাড়া দেয়নি।

আমাদের এক চিলতে জায়গা ছিলো খাল পাড়ে।সেখানে বাঙ্গি লাগিয়েছিলো আব্বা।আমরা ভাই-বোনেরা রোজ বিকেলে খাল থেকে পানি তুলে সেই গাছে দিতাম।নিয়মিত পরিচর্যা করতাম।মা বাধ্য হয়ে সেই জমি গ্রামের এক মাতুব্বরের কাছে বন্ধক রাখলো পাওনাদারদের পাওনা মেটাতে।

নিজের বিয়ের শেষ স্মৃতিচিহ্ন গলার একটা পদ্মহার বিক্রি করে বাবার জামিনের ব্যবস্থা করলো মা।আব্বা একদিন বিকেলে ছাড়া পেলো।সেই রাতে আব্বাকে নিয়ে আমরা উঠোনে পাটি পেতে বসলাম।দীর্ঘ রাত পর্যন্ত আব্বার জেলখানার গল্প শুনলাম। 

খাবার সময় গড়িয়ে গেলেও সে রাতে মা কোনো খাবার দিতে পারেনি আমাদেরকে।পরিশেষে অনেক রাতে মা একটা বাঙ্গি কেটে দেয় আমাদের সবার সামনে।সবাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও খেলাম।শুধু তোর ছোটো খালা তুমুল বায়না ধরলো।সে বললো,গত কয়েকদিন শুধু বাঙ্গিই খাচ্ছে,সে আর এসব খাবে না।ভাত খাবে।আব্বা যেন তাকে ওই রাতে গরম ভাতের ব্যবস্থা করে দেয়।

মা তাকে বললো বাঙ্গি খেতে।পরদিন ভাতের ব্যবস্থা করে দেয়া হবে।কিন্তু সে এক কথার মানুষ,ভাতই খাবে,বাঙ্গি কিছুতেই খাবে না।প্রতিদিনই তাকে ভাত দেয়া হবে বলা হলেও ঘুরেফিরে খাবার সময় শুধু বাঙ্গিই দেয়া হয়।

এক পর্যায়ে মা পিঁড়ি দিয়ে নীনার কপালে একটা বাড়ি দেয়।আব্বা নীনাকে কোলে নিয়ে খুব ছোটাছুটি করে।আমি আর তোর বড়মামা জার্মুনির লতা রস করে নীনার মাথায় চেপে ধরি।নীনা কাঁদতে কাঁদতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে।

আব্বা ঘুমন্ত নীনার কপালে চুমু দিয়ে বলতে থাকে,আমার এই জেদি মেয়েটার একদিন অনেক টাকা পয়সা হবে।তার ঘরের ভাত খাবে হাজার হাজার মানুষ, তবুও ভাতের কোনো কমতি হবে না।এই বলে আব্বা শিশুদের মতো কাঁদলো অনেক্ক্ষণ। আমরা সব ভাইবোন তাকে জড়িয়ে বসে রইলাম উঠোনে।

তোর ছোটখালা এখন গুলশানের শ্রেষ্ঠ ধনীদের একজন।মোহাম্মদপুরে সে তোর নানা নানির নামে দুইটা এতিমখানা চালায়।আব্বার কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেছে।কিন্তু আফসোস,মানুষটা আমাদের ভাইবোনদের এমন সুখ দেখে যেতে পারেনি।

আব্বা পরদিন বড়ভাইকে সাথে নিয়ে ঢাকায় চলে আসে।দুই তিনদিন রিকশা চালিয়ে চালডাল কিনে গামছায় বেঁধে বড়ভাইর কাছে পাঠিয়ে দেয়।আমরা প্রায় দেড় থেকে দুই সপ্তাহ পরে ভাতের মুখ দেখি।

বড়ভাই তোর সেজ মামাকে নিয়ে পরদিনই আবার বাগেরহাট থেকে ঢাকা চলে আসে।আব্বা সদরঘাটের বাদামতলায় ফলের একটা ছোটো দোকান দেয়।মানুষটা ব্যবসা খুব ভালো বুঝতো।সাথে ছিলো তোর কর্মঠ দুই মামা।

তিনজন মিলে দুই হাতে টাকা কামাতে লাগলো।ভাগ্য সহায় হলো তাদের।ওই মাসেই কামরাঙ্গির চরে একটা ছোট্ট বাসা ভাড়া করে আমাদেরকে ঢাকায় নিয়ে এলো।পরে ওই জায়গাটা কিনে আব্বা ফলের গোডাউন বানায়। ওইটাই এখন তোর মেজ মামার বাসা।

বাড়িতে আমরা তিন বোন আর মা,এই চারজন মিলে কাগজ কেটে ঠোঙ্গা বানাতাম।আমাদের বানানো সেই ঠোঙ্গা আমাদের আড়ত সহ আশপাশের সব আড়তে বিক্রি হতো।একসময় পুরো বাদামতলি ফল আড়তে আমাদের বানানো ঠোঙ্গা ছাড়া কোনো ঠোঙ্গা চলতো না।রাতারাতি আমাদের অবস্থার পরিবর্তন হতে শুরু করলো। 

আস্তে আস্তে আব্বার সেই দোকান বড়ো হলো।ঘাটেই আব্বা আর ভাইরা মিলে জায়গা কিনে পাকা আড়ত দিলো।আব্বা তার ব্যবসার শেষদিন অব্ধি তরমুজ- বাঙ্গির ব্যবসার সাথে যুক্ত ছিলো। 

এরপর একে একে আমাদের ভাইবোনদের বিয়ে দিলো।তোর আব্বু ছিলো তোর নানার বাঙ্গির আড়তের ম্যানেজার।তোর ছোট খালার শ্বশুর ছিলেন আব্বার তরমুজ বাঙ্গির কোল্ড স্টোরেজ ব্যবসার অংশীদার। 

এইযে আমরা আজিমপুরে যে এতো বড়ো বাসাটায়  থাকছি এখন,এইটা তোর নানার তরমুজ বাঙ্গির ব্যবসার পয়সায় কেনা জায়গা।পাঁচতলা পর্যন্ত তোর নানাই করে দিয়েছিলেন বাঙ্গি বিক্রির টাকায়। পরবর্তীতে তোর আব্বু বিল্ডিং বাড়িয়েছে।

এতো কথা বলার উদ্দেশ্যে হচ্ছে,ফেসবুকে কাউকে যখন দেখি বাঙ্গি নিয়ে অমূলক ঠাট্টা- বিদ্রুপ করতে তখন আমাদের সেই না খেয়ে থাকা দিনগুলোর কথা মনে পড়ে।দেড় -দুই সপ্তাহ শুধু বাঙ্গি খেয়ে থাকার কথা মনে পড়ে।নীনার কপাল কাটার কথা মনে পড়ে।

তোর সামান্য এই ঠাট্রা বিদ্রুপের কারণে একজন মানুষও যদি একটা বাঙ্গি কিনতে নিরুৎসাহিত হয়,তাহলে প্রকারান্তরে একজন কৃষকের বিক্রি কমে যায়।

হয়তো তার ঘরেও একটা ছোট্ট নীনা আছে।যে তার বাঙ্গি বিক্রেতা বাপের পথ চেয়ে রাতে উঠোনে বসে থাকে।বাপ বাঙ্গি বেচে চাল কিনে বাড়ি ফিরবে।সেই চাল রান্না হবে।সবাই মিলে আনন্দ করে ভাত খাবে।বাঙ্গি খেতে খেতে সে বড্ড ক্লান্ত। 

শিক্ষিত মানুষজন নীনাদের কপাল কাটার কারণ কেন হবে?তারা তো দেশের হাজারো কপাল কাটা নীনাদের কপাল জোড়া লাগাবে।

মাথা উঁচু করে দেখলাম চোখের পানিতে আমার ট্রাউজার আর টি-শার্ট ভিজে জবজবা হয়ে গেছে।আব্বা চোখ মুছছে। ভাবি বারবার কেঁপে কেঁপে উঠছে। কান্নায় তার চোখ ভেজা।দরজা ধরে ভাইয়াও কাঁদছে।

একটা ছোট্ট তরমুজ-বাঙ্গির সাথেও যে এতোগুলো হৃদয়ছোঁয়া ব্যপার জড়িয়ে থাকতে পারে,তা কখনো কল্পনাই করতে পারিনি।সিদ্ধান্ত নিলাম বাকি জীবনে আর কোনো ফল ফ্রুটস নিয়ে এভাবে বেহুদা ঠাট্টা তামাশা করবো না।



( সমাপ্ত )





Writer: S Tarik Bappy 

NEXT ARTICLE Next Post
PREVIOUS ARTICLE Previous Post
NEXT ARTICLE Next Post
PREVIOUS ARTICLE Previous Post
 

Delivered by FeedBurner