> শেকড় - Bangla Short Story - Boipoka365
-->

শেকড় - Bangla Short Story - Boipoka365


Bangla Short Story

আজ মোহাম্মদপুরে একটা ফ্লাট কিনলাম।রত্নাকে বললাম, ব্যালকনি লাগোয়া ঘরটা মাকে দেই, আলো বাতাস থাকে সারাক্ষণ। এই কথা শুনেই সে ঘোঁৎ করে পত্রিকাটা টি-টেবিলের উপর ছুড়ে ফেলে বেডরুমে ঢুকে ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিলো।

তার এমন আচরণে আমি পুরোপুরি হতবাক! আমাদের নিজেদের ফ্ল্যাট, মা থাকবে সবচেয়ে ভালো ঘরটাতে, খুবই সিম্পল একটা ব্যাপার। এখানে আমার পড়ালেখা জানা বুদ্ধিমতী স্ত্রীর কোনো অপত্তি থাকার কথা না।

রত্না ঘর ঝাড়ু দিচ্ছে,এইজন্য বেড রুমের দরজা খানিকটা খোলা। আমি পরিস্কার শুনতে পাচ্ছি সে গজর গজর করতে করতে বলছে, আম্মা নতুন ফ্লাটে গেলে আমি ওখানে যাবো না। নিশাতকে নিয়ে আমি এখানেই থাকবো, তুমি তোমার মাকে নিয়ে নতুন ফ্লাটে উঠবা। তার সাথে এক ফ্লাটে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব না, এটাই আমার শেষ কথা। এবার সত্যি সত্যি আমার মাথায় রক্ত উঠে গেলো।

রোজার মাস।অনেক কিছুতেই সংযম করতে হয়।তাই সংযম করছি।ভাগ্যিস মা এখন বাসায় নেই।তিন দিন হলো গ্রামে গেছে।তাঁর প্রতি মাসে একবার গ্রামে না গেলে ভালো লাগে না।আসার  সময় গাড়ির ব্যাকডালাভর্তি করে ফলফ্রুটস নিয়ে আসে।নিষেধ করলেও সে এটা করে।বলে,আমি নিশাতের জন্য এইগুলা আনি।মা নিশাত বলতে পাগল।নিশাত আমাদের একমাত্র ছেলে।নিশাতও দাদি বলতে অজ্ঞান। 

আমি অল্পতে মাথা গরম করা মানুষ না।ঝামেলা না করে চুপচাপ পত্রিকায় নজর দিলাম।প্রথম পাতার দুই কলাম জুড়ে তিমি মাছের খবর ছেপেছে আজ।দুইটা তিমি মাছ মরে কক্সবাজারে ভেসে এসেছে।গবেষকরা বলছে,এদের মধ্যে পুরুষ তিমিটা বড়ো কোনো জাহাজের সাথে ধাক্কা খেয়ে মারা গেছে।সঙ্গীর মৃত্যুশোক সইতে না পেরে মেয়ে তিমিটা আত্মহত্যা করছে।কী অদ্ভুত কান্ড!ভালোবাসাবাসির পুরো ব্যাপারটাই অদ্ভুত! 

বিকালে গিয়েছিলাম ফ্লাটের দলিলের জন্য কিছু কাগজপত্র দিতে।ফ্লাটটা আসলেই সুন্দর।আমি আর মা যখন প্রথম ঢাকায় আসি,তখন মা-ই এই জায়গাটা পছন্দ করেছিলো।তাজমহল রোডের সি ব্লক।ডান পাশে জাপান সিটি গার্ডেন।সামনে মাঠ।পিছনে কৃষি মার্কেট।আরেকটু এগোলেই মিনার মসজিদ।চমৎকার পজিশন।তার সাথেই পার্ক।

ইফতার করে আমি রত্নাকে বললাম ডাইনিং টেবিল গুছিয়ে ফ্রী হয়ে একটু রুমে আসো,জরুরী কথা আছে।প্রায় আধা ঘন্টা পর সে এলো।মুখটা এখনো অসম্ভব রকম ভার,যেন কেউ এক পোজ কালি মেখে দিয়েছে।

চিন্তা করলাম,কথাবার্তার কোনো পর্যায়েই তার সাথে অযথা চিৎকার চেচামেচি করা ঠিক হবে না।কারণ রোজার মাস,অতিরিক্ত রান্নাবান্না,একজন গৃহিণীর অন্যান্য মাসের চেয়ে এই মাসে অনেক বেশী কাজ।তার উপর নিশাতকে  সামলানোও অনেক বড়ো প্যারা।

রত্না এসে খাটের অন্য পাশে বসলো,আমি বললাম এতো দূরে বসেছো কেন?কাছে এসে বসো।কথা বলতে সুবিধা হবে।ও কাছে এলো।

আমি বললাম,নতুন ফ্লাটে মাকে নিতে চাচ্ছো না,এর কারণটা কী?সে বললো,আম্মা পান খায়।নিশাতও পান খাওয়া শিখছে।আম্মা গ্রাম্য ভাষায় গ্রামের মহিলাদের মতো করে কথা বলে,নিশাতও তাই শিখছে।ইভেন সে কিছু কুৎসিত গালিও শিখে ফেলেছে দাদির কাছ থেকে।এভাবে আমি আমার ছেলেকে নষ্ট হতে দিবো না।

রত্নার কথা শুনে কষ্টে আমার বুকটা কেমন ফেটে যাচ্ছে।কী পরিমাণ কষ্ট আমি পাচ্ছি,তা সে জানে না।আমি অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে রত্নাকে বললাম,তুমিও একটা ছেলের মা এবং আল্লাহ চায় তো আরেকটা কন্যার মা হতে যাচ্ছো খুব শিগগির।আজ কিছু কথা তোমাকে বলবো,আমার আর্ধাঙ্গী হিসেবে কথাগুলো তোমার জানা খুব জরুরী।

আমার যখন পাঁচ বছর বয়স,তখন আব্বা মারা যায়।মা তখন একবারে ইয়াং।মামারা চাইলো বোনকে অন্য জায়গায় বিয়ে দিতে।আমাকে তারা তাদের কাছে রেখে দেখাশোনা করবে।সম্ভব হলে পড়াশোনাও করাবে।মা রাজি হলো না।সে তাঁর ভাইদেরকে সাফ জানিয়ে দিলো,সে আর বিয়ে করবে না।নিজের সুখের জন্য ছেলেকে জলে ভাসিয়ে দেয়া তাঁর পক্ষে কিছুতেই সম্ভব না।

বড়ো মামা উত্তেজিত হয়ে বললো,মার সিদ্ধান্ত যদি এটা হয়,তাহলে সে যেন ভাইদের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে।মা সেদিন কোনো উত্তর দেয়নি মামার কথার,তবে তাদের ভাই বোনদের সম্পর্কটা সেদিনের পর থেকে সত্যি সত্যি নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো।

চাচারাও ছিলো গরীব,তারাও সেভাবে সাহায্য সহযোগিতা করতে পারেনি আমাদেরকে।তবে হ্যাঁ,কোনদিন আমাদের মা-ছেলেকে তারা খারাপ চোখে দেখেনি।

মা আমাকে মানুষ করতে গিয়ে মানুষের বাড়িতে ঝিঁ এর কাজ করতো।আমাদের গ্রামে একটা ধনি পরিবার ছিলো।তাদের বাড়ি কাজে যাওয়ার সময় আমি মার সাথে যেতাম।একদিন আমি ওদের বাড়ির আমার বয়সী একটা ছেলের খেলনা নষ্ট করে ফেলেছিলাম,ছেলেটার মা আমাকে অনেক জোরে চড় মেরেছিলো,আমার ঠোঁট কেটে অনেক রক্ত পড়েছিলো।আমি বুঝতে পারিনি সেদিন একজন কাজের মহিলার ছেলে হয়ে বাড়ির মালিকের ছেলের খেলনায় হাত দেয়া যায় না।বুঝতে পারিনি,খেলতে গিয়ে খেলনা নষ্ট হয়ে যাওয়া এতো বড়ো অপরাধ। 

সেই রাতে আমার জ্বর হলো। সারারাত ঘুমাতে পারিনি।মাও সারারাত দুই চোখের পাতা এক করেনি।যতবার চোখ মেলেছি,ততবার দেখেছি মা আমার কপালে জলপট্টি দিচ্ছে।তার কোলে আমার মাথা।সেদিন মা সারারাত জেগেছিলো তোমার স্বামীর জন্য।

এরপর থেকে মা আমাকে তাঁর কাজ করা বাড়িগুলোতে নিয়ে যায়নি আর কখনো।আমি একা একা বাড়িতেই থাকতাম।

একটা ঘটনা আমার এখনো মনে আছে,কাজ করা এক বাড়ি থেকে মাকে খেতে দেওয়া ভাত সে একা না খেয়ে আঁচলের তলে লুকিয়ে বাড়ি নিয়ে আসছিলো।প্রায়ই আনতো।অতিরিক্ত আনতো না,তাঁকে যা দেওয়া হতো শুধু ওইটুকুই আনতো।আমাদের দুইজনের পেট ভরতো না কখনো সেই ভাতে।

অন্যান্য দিনের মতো সেদিন মার লুকিয়ে ভাত আনার ব্যপারটা টের পেয়ে যায় বাড়ির মুরব্বি মহিলা।সে মাকে অনেক কটু কথা বলে।একপর্যায়ে মাকে সে চোরও বলে।মা নাকি ওই বাড়ির জিনিসপত্র চুরি করে এভাবে আঁচলের তলে রেখে নিয়ে আসে।সেদিন আমার মাকে চোর হতে হয়েছিলো শুধুমাত্র তোমার স্বামীর জন্যে।

আমাদের উঠোনে একটা সাধারণ কল ছিলো।তার পানি খাওয়া যেতো না।আর্সেনিক ছিলো প্রচুর।ধোয়া মাজা,গোসল,সবই ওখানে করতাম আমরা।বাড়ির পাশে একটা বড়ো পুকুর ছিলো,পুকুরের মালিক আমাদের দেখতে পারতো না।যার একমাত্র কারণ,আমরা ছিলাম গ্রামের সবচেয়ে অসহায়।এতিম।

একদিন আমি বায়না ধরলাম,আজ কলের পানিতে গোসল করবো না।সাবান মেখে পুকুরে গোসল করবো।অনেক পীড়াপীড়ির পর মা রাজি হলো।

ওদের পুকুরের ঘাটে বসে মা কেবল আমার গায়ে পানি দিয়ে মুখে আর হাতে সাবান মাখিয়ে দিয়েছে,অমনি বাড়িওয়ালা এসে খুব বাজে ব্যবহার শুরু করলো।

গরম কালে তাদের পুকুরে এমনিতেই পানি কম,তার উপর আমরা নাকি রোজ রোজ সাবান  ডলে গোসল করে তার পুকুরের পানি একবারে নষ্ট করে ফেলছি।জামাই বেঁচে নেই,তারপরও রোজ সাবান ডলে গোসল করে।এতো সাবান কোত্থেকে আসে,তা নাকি সে ভালো করেই জানে।এইসব শুনে মা সেদিন কাঁদতে কাঁদতে সাবান মাখা অবস্থায় আমাকে পুকুর ঘাটলা থেকে নিয়ে আসে।সেদিন আমার ফুলের মতো মার চরিত্র নিয়ে ওই লোকটা কটু কথা বলতে পেরেছিলো শুধুমাত্র আমার জন্য।তোমার স্বামীর জন্য।

আমার এসএসসি পরীক্ষার ফর্ম ফিলাপের টাকাটা দিতে চেয়েছিলো আমাদের গ্রামের মেম্বর।অনেক মানুষের সামনে সে এই ওয়াদা করেছিলো।কিন্তু সময়মতো সে টাকাটা দেয়নি।সে নাকি প্রচন্ড অভাব কষ্টে পড়ে গিয়েছিলো।এই কথা সে আগেও আমাদেরকে বলেনি।বলেছে দেখি,দেখবো,এমন।অবশেষে ফর্ম ফিলাপের শেষদিন হেড স্যার বললো,তুই টাকা জমা দিসনি,তুই তো পরীক্ষা দিতে পারবি না।

আমি কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি গিয়ে মাকে বললাম,মা স্কুলে এসে হেড স্যারের পা পর্যন্ত  ধরেছিলো একটা ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য,কিন্তু গরীবদের জীবনেরই যেখানে কোনো দাম নেই,সেখানে তাদের সামান্য পা ধরা ধরিতে এতো বড়ো একটা সমস্যা সমাধান হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

সেদিন হেড স্যারের রুমে কেরানী এবং দুই তিনজন স্যারের সামনে আমার মা একজন শিক্ষকের (!) পা ধরেছিলো শুধুমাত্র তাঁর নাড়িছেঁড়া ধন,একমাত্র ছেলের জন্য।

পরে উপায়ন্ত না পেয়ে তখনই মা বাড়ি এসে তাঁর সবগুলো হাঁস মুরগী বিক্রি করে দেয়।এরপরও পাঁচশো টাকার শর্ট ছিলো,ওইটা এলাকার এক সুদী মহাজনের কাছ থেকে নিয়ে তারপর আমার পরীক্ষা দেওয়া নিশ্চিত করে।

আমার আর মার জীবনটা একটা সময় পর্যন্ত কেটেছে রাস্তার নেড়ী কুকুরের মতো মানুষের লাথি-ঝাটা খেয়ে।সেই পুরো সময়টা মা আমাকে বুকের ভিতর আগলে রেখেছে যেমন একটা ঝিনুক তার খোলসের ভিতর মুক্তা দানা আগলে রাখে।

ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পর ডিগ্রিতে ভর্তি হয়ে আমি একটা ডেকোরেশনের ব্যবসা শুরু করি।আল্লাহর রহমত আর মার দোয়ায় ওখান থেকেই আমাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করে।এরপর ঢাকায় এসে বিহারি ক্যাম্পে ছোট্ট একটা ভাতের হোটেল,তারপর তাজমহল রোডে  বড়ো রেস্টুরেন্টে।এভাবেই একসময় অবস্থা পরিবর্তন হলো।

এই কথাগুলো তোমাকে বললাম, কারণ তুমি আমার অতীতের  অনেক কিছুই জানো না।স্ত্রী হিসেবে স্বামীর এইসব ইতিহাস তোমার জানা দরকার।আমার সাথে তোমার যখন বিয়ে হয়েছে,তখন আমি সমাজের একজন মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী,কিন্তু এই ব্যবসায়ীর রক্তের প্রতিটি কণায় জড়িয়ে আছে তার হতভাগা মায়ের রক্ত,ঘাম,মানুষ নামের পশুদের দেয়া লাঞ্চনা,অপমান আর অবহেলা। 

তোমার একটা ছেলে আছে,সেও একদিন বড়ো হবে।তারও বিয়ে হবে।ছেলেমেয়ে হবে।নিজেদের সংসার হবে।আমরা তাদের সেই সংসারে হয়তো অনেকটা বেমানান হয়ে পড়বো,তখন তারা আমাদের সাথে এমন আচরণ করলে তুমি মেনে নিতে পারবে?

আমি বুঝতে পারছি রত্না অনেক্ষণ ধরে কাঁদছে।কথা শেষ করা মাত্র সে আমার পা জড়িয়ে ধরে বললো, আমি অনেক বড়ো ভুল করেছি,তুমি আমাকে মাফ করে দাও।আম্মাকে না নিয়ে আমি নতুন ফ্লাটে যাবো না।এবং বাকি জীবনে আম্মা সম্বন্ধে কোনো নেতিবাচক কথা বলবো না।আমি তার মাথায় হাত রাখলাম।

রত্না এখনো কাঁদছে।কাঁদলে যে মেয়েটাকে অসম্ভব সুন্দর লাগে,এই কথা কি সে জানে?

 


( সমাপ্ত )





Writer: S Tarik Bappy 

NEXT ARTICLE Next Post
PREVIOUS ARTICLE Previous Post
NEXT ARTICLE Next Post
PREVIOUS ARTICLE Previous Post
 

Delivered by FeedBurner