> ঝুলন্ত লাশ - Mysterying Story - Boipoka365
-->

ঝুলন্ত লাশ - Mysterying Story - Boipoka365


Mysterying Story

সকাল ৬ টাঃ

কয়েকবার কলিং বেলের আওয়াজ শুনে আয়েশা দরজা খুলে কাওকে দেখতে পেল না। নিচে 'পত্রিকা' পড়ে আছে। পত্রিকাটি তুলতে যাবে এমন সময় তার চোখ গেল তাদের বাসার সামনের একটি নির্মাণাধীন বিল্ডিংয়ের দিকে। একটি ঝুলন্ত লাশ। আয়েশা চিৎকার দিতে গিয়েও থেমে গেল। ঘরের ভেতর শুভকে ডাকতে যাবে কিন্তু তার পা চলছে না যেন কেও শীকল দিয়ে বেধে রেখেছে। 

[শুভ এবং আয়েশা। ২ বছর আগে তাদের বিয়ে হয়েছে। শুভ একজন CID অফিসার। ঢাকার মিরপুরে তারা একটি এপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে থাকে]

ঘটনাস্থলে প্রচন্ড ভিড়। কিছুক্ষন পর ভিড় ঠেলে শুভ এগিয়ে আসলো। শুভ পুলিশকে খবর দিলে তারা এসে লাশটাকে নামায়। 

লাশের শরীরে কোনো কাপড় ছিল না। দুই হাতের অবস্থা এমন যে,কোনো হিংস্র পশু হয়তো মাংস তুলে খেয়ে নিয়েছে। চোখগুলোকে টেনে তুলে নেওয়া হয়েছে এমন অবস্থা। 

শুভ লাশটিকে পোস্টমর্টেম এর জন্য পাঠালো। 

খবরের কাগজে একটি বিজ্ঞাপন দেওয়া হলো।

"CID অফিসার শুভ'র বাসার সামনে এক অজ্ঞাত যুবকের ঝুলন্ত লাশ"

৭ ঘন্টা পর একজন লোক শুভকে ফোন দেয়। শুভ তাকে অফিসে দেখা করতে বলে। 

অফিসে যে লোকটি বসে আছে তার নাম রাকিবুল ইসলাম। বয়স ৩৯-৪০ এর মত। 

তার কাছ থেকে মৃতব্যক্তি সম্পর্কে জানা গেল।

মৃত ব্যক্তিটির নাম আরিফ হোসেন। রাকিবুল ইসলামের ভাই। বাসা ময়মনসিংহ। ৬ দিন আগে ঢাকায় তার বন্ধু নাঈমের সাথে দেখা করতে এসেছিলো। কি কাজে এসেছিলো সেটা বাড়ির কাওকে জানায়নি।

-- আপনার সাথে আরিফের শেষ কবে কথা হয়েছিল? (শুভ)

-- ওর ঢাকায় আসার ৪র্থ দিন (রাকিবুল)

-- কি কথা হয়েছিল?

-- তেমন কিছু না। তার ফিরতে আর কিছুদিন সময় লাগবে সেটা বলেছিলো কিন্তু ঢাকায় তার কি কাজ সেটা বলেনি। 

-- চা খাবেন?

-- পানি খাব। 

শুভ পানির বোতলটা রাকিবুল সাহেবকে এগিয়ে দিলেন। তিনি পানি খেয়ে আবার বলা শুরু করলেন।

-- আমি যখন পত্রিকায় আরিফের ছবিটা দেখলাম,ভেবেছিলাম যে হয়তো স্বপ্ন দেখছি। তাই চোখ মুছে আবারো দেখলাম। আব্বা আম্মাকে এ কথাটা আমি কিভাবে জানাবো!! 

রাকিবুল সাহেবের চোখে পানি আসা দেখে শুভ অন্যদিকে তাকাল। কান্নার সময় কারো দিকে সহানুভূতির দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকলে কান্না বাড়বে বৈ কমবে না। 

-- আরিফের বন্ধু নাঈমের ঠিকানা আছে আপনার কাছে? (শুভ)

-- হ্যা আছে। (রাকিবুল) 

শুভ কাগজ আর কলম এগিয়ে দিল। 

সন্ধ্যায় দুইজন পুলিশকে সাথে নিয়ে শুভ নাঈমের বাসায় গেল। নাঈম বাসায় নেই। তার মা জানালেন সে গতকাল আরিফের সাথে দেখা করতে ময়মনসিংহ গিয়েছে। 

রাত ৯ টাঃ

খাবার টেবিলে আয়েশাকে অন্যমনস্ক দেখে শুভ তাকে জিজ্ঞেস করলো

-- কি ব্যাপার? খাবে না?

-- বারবার সেই ভয়ানক দৃশ্যের কথা মনে পড়ছে। 

-- কোন দৃশ্য?

-- ওই ঝুলন্ত লাশ। 

-- আরে ওসব নিয়ে ভেবোনা। খেয়ে নাও। 

-- আচ্ছা লাশটা আমাদের বাসার সামনেই কেন ঝুলিয়ে রাখলো?

-- খুনিকে পাওয়ার পর তার কলার ধরে তুমি জিজ্ঞেস করিও। (শুভ হাসতে হাসতে উত্তর দিল)

আয়েশা রাগ করে উঠে চলে গেল।

পরের দিন সকাল ৬ টাঃ

কলিংবেলের আওয়াজ শুনে আয়েশা ঘুম ঘুম চোখে দরজা খুলে দিতে গেল। দরজা খুলেই দেখে আরিফ দাড়িয়ে আছে। 

আয়েশা জোরে একটা চিৎকার দিতে দিতে বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠলো। চিৎকারে শুভ'র ঘুমও ভেঙে গেল। পাশে থাকা পানির গ্লাস এগিয়ে দিতে দিতে শুভ বললো, দুঃস্বপ্ন দেখেছ নাকি? আয়েশা কোনো জবাব না দিয়ে থ মেরে একদৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে রইলো। 

দুপুরে শুভ রাকিবুল সাহেবকে অফিসে আসতে বললেন। 

-- নাঈম আপনাদের বাসায় গিয়েছিল সেই সংবাদ গোপন করেছেন কেন? (শুভ)

-- নাঈম কখন আমাদের বাসায় গেল? (রাকিবুল সাহেব কৌতুহলী হয়ে প্রশ্ন করলেন)

-- নাঈমের মা বললেন সে আরিফের সাথে দেখা করতে ময়মনসিংহ গিয়েছে। 

-- কি উল্টাপাল্টা বলছেন? আরিফ ত নিজেই ঢাকায় এসেছে নাঈমের সাথে দেখা করতে। নাঈম কেন ময়মনসিংহ যাবে? 

-- আরিফের কোনো রিলেশান ছিল? 

রাকিবুল সাহেব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেনঃ

-- হ্যা, কলেজে পড়ার সময় ছিল। কিন্তু পরে মেয়েটার অন্য কোথাও বিয়ে হয়ে যায়। সেজন্য আরিফ মানষিকভাবে অনেক ভেঙে পড়েছিল। সেখান থেকে বের হওয়ার জন্য সে বন্ধুদের সাথে বেশি সময় কাটাতে থাকে।

-- নাঈম কি শুভকে খুন করতে পারে?

-- আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। আপনারা প্লিজ খুনীকে খুজে বের করুন। প্লিজ। 

রাকিবুল সাহেব হাত দিয়ে তার চোখ মুছলেন।

সন্ধ্যা ৭ টাঃ (নাঈমের বাসা)

নাঈম ময়মনসিংহ থেকে ফিরেছে। শুভ তার সাথে কথা বলার জন্য বিকেল থেকে তার বাসায় অপেক্ষা করছে। 

-- আমি শুভ। সিনিয়র ইন্সপেক্টর। CID ব্রাঞ্চ। আরিফের খুনের ব্যাপারে তোমার সাথে কথা আছে। 

-- কিহ! কি বললেন! আরিফ খুন হয়েছে?

-- তুমি জানতে না? 

-- কখন খুন হয়েছে? 

-- তুমি ময়মনসিংহ যাওয়ার ঠিক আগের দিন। 

নাঈম হতভম্ব হয়ে সোফায় বসে পড়ল। 

-- ময়মনসিংহ কেন গিয়েছিলে তুমি? (শুভ)

-- আরিফ সেদিন সকালে বাসা থেকে বের হয়। দুপুরের মধ্যে ফেরার কথা। রাত হয়ে যায় তবুও ফিরছে না দেখে ফোন করি কিন্তু ফোন অফ।  টেনশান হচ্ছিল। ভাবলাম যে বাড়িতে চলে গেল কি না! তাই পরেরদিন আমি সকালে উঠেই তার বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা দেই। 

-- আরিফের ভাই বলছিলো তুমি নাকি তাদের বাড়িতে যাও নি? 

-- আমি বোকার মতো তাদের পুরনো বাড়ির ঠিকানা নিয়েই চলে গিয়েছিলাম। নতুন বাড়ির ঠিকানা নেয়া হয়নি আরিফের কাছ থেকে। রাতটা হোটেলে কাটিয়ে সকালে ঢাকার বাসে উঠে চলে আসলাম। 

-- আরিফ তোমার কাছে কেন এসেছিল? 

নাঈম থতমত খেয়ে বললোঃ 

-- ওর গার্লফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে। 

-- তার কলেজের গার্লফ্রেন্ড? 

-- আপনি কিভাবে জানলেন?

-- যা বলছি তার উত্তর দাও।

-- হ্যা। 

-- তারপর? দেখা করেছিল?

-- অন্তরা (আরিফের গার্লফ্রেন্ড) প্রথমে আসতে চায়নি। আরিফ অনেকটা জোর করেই দেখা করেছিল। 

-- তোমরা ৩ জন ত কলেজ ফ্রেন্ড ছিলে। তাই না?

-- হ্যা 

-- তুমি অন্তরাকে পছন্দ করতে না? সে দেখতে সুন্দর,হট, যে কেউ তার প্রেমে পড়বে। 

-- আপনি অন্তরাকে কোথায় দেখলেন?

-- যা বলছি তার উত্তর দাও। 

-- না, আরিফের সাথে তার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। আমি তাকে ভাবির নজরেই দেখতাম। 

-- গুড। তোমার কি ধারনা? অন্তরা আরিফকে খুন করতে পারে?

-- না। অসম্ভব। অন্তরা আরিফকে অনেক ভালবাসে। তাছাড়া অন্তরা রক্তকে প্রচন্ডভাবে ভয় পায়। সে এই কাজ কখনোই করবে না। 

-- দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ সবই সম্ভব করতে পারে।

শুভ চলে যাবার সময় লক্ষ্য করলো,নাঈমের মা একগ্লাস পানি হাতে দাড়িয়ে থেকে কাপছেন। সম্ভবত পানি দিতে এসে তাদের কথাবার্তা শুনে ফেলেছেন।

(২ দিন পর)

-- রাকিবুল সাহেব, আপনার বাবা-মাকে বিষয়টা জানিয়েছেন? (শুভ)

-- হুম জানিয়েছি। তারা একনজর আরিফকে দেখতে চাচ্ছে ভাই। (রাকিবুল ইসলাম)

-- আপনি আরিফকে বাসায় নিয়ে যেতে পারেন। আমরা খুনিকে পেয়ে গিয়েছি। 

-- পেয়েছেন! কে সেই শু*রে* বা*? 

-- উত্তেজিত হবেন না। বলছি।

-- বলুন তাড়াতাড়ি। আমি তাকে দেখতে চাই। 

-- আপনি তাকে দেখতে পারবেন না। সে এখন নিউইয়র্কে। 

-- আপনি বলুন কে সে?

-- অন্তরা। 

-- হোয়াট? সে কিভাবে আরিফের সাথে এরকম করতে পারে?

-- মেয়েরা সবই পারে। অন্তরার প্রতি আরিফ দুর্বল ছিল। আরিফকে মারা তার জন্য কোনো কঠিন কাজ ছিলনা। 

-- অন্তরা কেন আরিফকে খুন করবে?

-- খুনের কারন টা স্পষ্ট না। তাকে ধরার পর আমরা জানতে পারব। 

রাকিবুল সাহেব ভেঙে পরলেন। 

-- আপনারা প্লিজ তাকে ধরে এনে যথাযথ শান্তি দিবেন। আমি হাতজোর করছি। 

-- অবশ্যই। আপনি চিন্তা করবেন না। আরিফের বডি নিয়ে বাসায় যান। আপনার বিশ্রাম দরকার।

(৭ মাস পর)

একটা শপিং কমপ্লেক্সে শুভ'র সাথে নাঈমের দেখা। 

-- আরে নাঈম, কি খবর তোমার? 

-- ভাল স্যার। আপনি কেমন আছেন?

-- আমরা ভাল থাকতে পারি,বল? সারাদিন খুন, মারামারির খবর শুনে দিন কাটাতে হয়। 

-- তা অবশ্য ঠিক। স্যার আরিফের মামলার কি নিষ্পত্তি হয়েছে? 

-- হ্যা,কেন তুমি জানো না?

-- না স্যার। আরিফের ওই ঘটনার পর মা আমাকে বন্ধুদের সাথে আর মিশতে দিত না। আপনাদের থেকেও দুরে থাকতে বলেছেন। তাই কিচ্ছু শোনা হয়নি। 

-- কফি খাবা?

-- চলুন। 

কফিতে চুমুক দিয়ে শুভ বলা শুরু করলোঃ

-- আরিফকে খুন করে অন্তরার হাজবেন্ড। আরিফ আর অন্তরা যখন লুকিয়ে দেখা করতে যায় তখন তার হাজবেন্ড কোনোভাবে তাদের দেখে ফেলে। অন্তরার স্বামী একটা পাগল শ্রেনীর মানুষ। আরিফ অন্তরাকে যে হাত দিয়ে ছুয়েছে সেই হাত "ভেনাস ফ্লাইট্র‍্যাপ" (এক ধরনের মাংসাশী উদ্ভিদ) দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। অন্তরাকে যে চোখ দিয়ে দেখেছে সেই চোখে আরিফেরই হাতের মাংস রেখে কুকুর দিয়ে খাইয়েছে। সবশেষে অন্তরার বাসার সামনেই তাকে উলঙ্গ করে দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছে। 

নাঈম এতক্ষন শুধু শুভ'র দিকে হা করে তাকিয়ে ছিল। তৎক্ষনাৎ তার ৭ মাস আগের একটি নিউজ মনে পড়লো "CID অফিসার শুভ'র বাসার সামনে এক যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার"। 

নাঈম কিছু একটা বলতে যাবে সেসময় শুভ মুচকি হেসে বললো, আমি জানি তুমি কি ভাবছো। কফিটা তাড়াতাড়ি শেষ করো। ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। আয়েশার শপিং এতক্ষনে হয়ে গিয়েছে। আজ তাহলে উঠি। 

নাঈম ঘোরের মধ্যে ঠান্ডা কফি হাতে নিয়েই বসে রইলো। ঘোরের মধ্যে তার মনে পড়লো অন্তরার পুরো নাম " আয়েশা চৌধুরী অন্তরা"



( সমাপ্ত )




Writer: Ashik Rahman

NEXT ARTICLE Next Post
PREVIOUS ARTICLE Previous Post
NEXT ARTICLE Next Post
PREVIOUS ARTICLE Previous Post
 

Delivered by FeedBurner