![]() |
Mysterying Story |
স্যার নায়িকার খুনিরা তো ধরা পড়েছে সিলেট কেন যাবেন?
সোয়েবের কথায় বুঝতে পারলাম। ওসি সাহেব কাজ শুরু করে দিয়েছেন। জানি কিছু মানুষ হয়ত হয়রানির শিকার হবে। কি বা করার আছে! স্রোতের মতো মানুষের আবেগ কে নিয়ন্ত্রণ করতে এতটুকু না করলে চলবে কেন! উতরে উঠা আবেগে একটু পানি ছিটা না দিলে টিকা থাকা দায় হয়ে যাবে যে।
আ্যসিসট্যান্ট কে বললাম, আমি ফিরে আসার আগে। ওসি সাহেব নায়লার একবছরের যে মুভমেন্টের লিস্ট দিয়েছে তা যাচাই করবি। কোন কোন জায়গায় গেছে, কেন গিয়েছে? কার কার সাথে দেখা করেছে। সব ডিটেইল চাই আমার।
ওসি সাহেব কে কল দিলাম একটা ব্যাপার হুট করে মাথায় এল। " হ্যাল ওসি সাহেব।"
"আরে রায়হান সাহেব কী খবর বলেন।"
"তেমন কোনো খবর এখন নেই! আপনি তো ধরপাকড় শুরু করেছেন দেখি? "
"কিছু করার নাই ভাই! বড় ঝামেলায় আছি। একদিকে মিডিয়া অপর দিকে পাবলিক, বনাস হিসাবে ওপরের চাপ তো আছেই। "
"আচ্ছা খুনিদের জোর করে ঢুকার লক্ষ্মণ পাওয়া যাইনি। তারমানে পরিচিত কেউ হবে। তাই যদি হয় তাহলে বাসায় আসার আগে নিশ্চয় যোগাযোগ হয়েছে? পরিচিত কেউ বাসায় আসার আগে যোগাযোগ করবেই। এত বড় স্টারের বাসায় হুট করে চলে আসবে না"
"ভালো পয়েন্ট বের করেছেন।"
"আপনি নায়লার মোবাইল কলের রের্কড চেক করেছেন?"
"দেখেছি সন্দেহজনক কিছু তো পেলাম না।"
"নায়লার সব নাম্বার দেখেছেন কি?"
"সব নাম্বার বলতে যেগুলো জানা গেছে, তলে তলে অন্য নামে চালালে ভিন্ন কথা। আপনাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনিও দেখেন।"
মোবাইলে যোগাযোগ না করে অনলাইনে যোগাযোগ করতে পারে। সেক্ষেত্রে ইমু বা মেসেঞ্জারে হতে পারে। নায়লা কী এ সব অনলাইনে ছিল? ঠিক জানা নেই। প্রথমে মোবাইল নাম্বার চেক করে দেখতে হবে। এখান থেকে কিছু বের করা যায় কিনা। মোবাইল হলো এখন বিকল্প মানুষ বলা যায়। মোবাইল ছাড়া মানুষ কল্পনা করা যায় না। একজন মানুষের মাঝে যেমন ভিন্ন ভিন্ন মানুষ থাকে তেমন মানুষের ভিন্ন ভিন্ন নাম্বার থাকে। একেক নাম্বার মানে একেকজন মানুষ! আলাদা একটা জগৎ।
সিলেট শহরে এসেছি। শহরে প্রবেশপথে আছে বিখ্যাত ক্বীন ব্রিজ। ব্রিজটা অনেক উঁচু হওয়ায় রিকশা উঠতে কষ্ট হয়। কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে রিকশা তুলতে সহায়তা করতে। একটা রিকাশা ওপরে তুলে দিলে দশ টাকা পাওয়া যায়। এ মানুষগুলো দিনে কয় টাকা আয় করে?
সিলেট শহরটা ছিমছাম গুছানো। খুব ভালো লাগে দেখতে। সিলেটে এসে হযরত শাহজালাল এর মাজারে না গেলে চলে। যে কাজেই আসা হোক এখানে একটু ঢু মারতেই হয়। প্রয়াত নায়ক সালমান শাহ বাড়িটাও দেখলাম এক ফাঁকে। দেয়াল ঘেরা টিনসেড একটা বাড়ি। বাড়ির সামনে নেম প্লেটে সোনালি অক্ষরে সালমান শাহ লেখা। শাহজালাল এর মাজারে আসলে শাহ পরানের মাজারেও নাকি যেতে হয় এমন একটা কথা এখানে শোনা যায়। আমার হাতে সময় কম তাই শাহ পরানের মাজরে যাওয়া হয়নি।
সিলেটের নাম করা পাঁচ ভাই রেস্তোরাঁয় খাবার খেলাম। খাবারের স্বাদ সত্যি খুব ভালো।
নায়লার মামা বাড়ি শাহেব বাজার নামক একটা এলাকায়। এখানে পাঁচ কিলোমিটার ভিতরে গেলো প্রকৃতির সুন্দৌর্যের লিলাভুমি রাতারগুল। নানা রকমের গাছের একটা জঙ্গল বলা যায়। এখানে আসলে মনে হবে সত্যি কোনো বনে চলে এসেছেন। নৌকা চড়ে ঘুরতে গাছে ঘেরা বিশাল এলাকা। মাঝে একটা ওয়াচ-টাওয়ার আছে। এখান থেকে পুরো বনটা দেখা যায়।
নায়লার মামাদের অবস্থা খুব ভালো না। বাড়ি ঘর দেখে বুঝা যায়। একটা সময় অবস্থা ভালো ছিল দিনে দিনে ফিকে হয়ে গেছে। খসে পড়া দেয়াল কোনো মতে দাঁড়িয়ে আছে। অগোছালো কয়েকটি ঘর। একটা ঘরে আমাকে বসানো হয়েছে। ঘরটিতে মানুষজন থাকে বলে মনে হয় না। অনেক আগের ঘুনে ধরা একটা টেবিল গুটিকয়েক চেয়ার এলোমেলো করে রাখা। একটা চেয়ার টেনে বসলাম। কিছু কাটিয়ে একজন লোক রুমে প্রবেশ করলেন। দেখে বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি মনে হলো। চুল সাদা রং ধরেছে। ভাঙ্গা কন্ঠে বললেন," কী জানতে চান?"
"জি, নায়লা সম্পর্কে কিছু জানতে চাচ্ছিলাম।"
গোল গোল চোখে তাকিয়ে, "কে নায়লা!"
"এ বাড়ির নাতি নায়লা।"
"ও, আমাদের নাসিমা। " এরা কী নায়লার কোনো খবর রাখে না! না, জানাটা অস্বাভাবিক না। অনেক আগে বাড়ি ছাড়া নায়লা। কোথায় আছে তা জানাটা তাদের কাছে কঠিন বটে।
"জি, নাসিমা।"
"কী জানতে চান আপনি? এত দিন বাদে! "
তার চোখে তেমন কৌতূহল নেই! এতদিন খবর না জানলে জানার জন্য একটা অস্থিরতা থাকার কথা তা নেই। ভাগ্নীর প্রতি টান নেই! নাকি অভিমান? রাগ?
"আপনাদের এখান থেকে চলে গেল কেন?" প্রশ্নটা শুনে মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। এভাবে জিজ্ঞেস করাটা বোধহয় ঠিক হয়নি। এখন কিবা করার আছে। বলা কথা তো ফেরত নেয়া যায় না।
"ওর বাপ মা দুইজনে এক্সিডেন্টে মারা যায়! তারপর থেকে মা ওকে এখানে নিয়ে আসে। এখানে ভালোই ছিল। মা মারা যাওয়ার পর ওভাবে আদর যত্ন হয়ত পায়নি। আমরা চেয়েছিলাম ভালো একটা বিয়ে দিয়ে জীবনটা গড়ে দিতে। পালিয়ে গেল!" একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।
এরপর ওনারা খবর নেয়ার খুব একটা চেষ্টা করেনি। এদের কাছে তেমন খবর পাওয়া গেল না।
নায়লার দাদির বাবার বাড়ি খুব একটা দূরে না। নানা বাড়ি থেকে হাঁটা পথ বলা যায়। বাড়ি বলতে একটা বহুদিনের কোনোরকম ঝুলে থাকা একটা ঘর। বহুদিন মানুষের পা পরেনি। এ গ্রামে এসে বেশ কিছু তথ্য যোগান পেলাম।
অনেকদিন পর একটু আরাম করে ঘুমিয়েছি। একটা কাজ মাথায় নিয়ে ঘুমানো যায় না। কঠিন কাজ সমাধান করার পর যে তৃপ্তি পাওয়া যায়! আমাকে সজাগ দেখে এক কফি হাতে করে রুমে এসে দাড়িঁয়ে আছে সোয়েব। ওর মন ছটফট করছে সব কিছু জানতে। কিন্তু ভয়ে কিছু জিজ্ঞেস করছে না। এতদিন থেকে আমায় অনেকটাই বুঝে ফেলেছে ছেলেটা। ঘুম ভাঙা সময়টাতে কফি খেতে আমার ভালো লাগে। না বলতেই কফি নিয়ে হাজির হয়েছে।
কফিটা নিয়ে আলত করে চুমুক দিয়ে বললাম, "কিছু বলার আছে তোর?"
কাচুমাচু করছে, হাত দিয়ে মাথার পিছনে চুলকাচ্ছে। আমতা আমতা করে, "স্যার সমাধান করে ফেলেছেন? "
"একটা প্রোবলেম সমাধান হয়েছে আরেকটা বাকি। "
চোখেমুখে জানার কৌতূহল! এখন বলতে ইচ্ছে করছে না। এখনও সম্পূর্ণ সমাধান হয়নি। খুনিদের বের করতে হবে। কিছু নির্দোষ মানুষ কষ্ট পাচ্ছে! মানুষ হিসাবে আমাদের ক্ষমতা সীমিত চাইলেও অনেক কিছু করতে পারি না।
ওসি মামুন সাহেব সাথে তিনজন তিনজন অফিসার নিয়ে বসেছি। এখনো পর্যন্ত আমাদের হাতে কোনো ক্লু নেই যা দিয়ে খুনির কাছে পৌঁছাতে পারি। এটা ঠিক আমার দিক থেকে বেশ কিছু তথ্য আছে যা আমি পুলিশের সাথে শেয়ার করতে চাচ্ছি না। পুলিশের মতো করে খুনির কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছি।
চারজন মানুষ বসে আছে সামনে। এটা হলো একটা ট্রেনিং রুম। দেয়ালে একটা সাদা পর্দা ঝুলানো। একটা ছোট বোর্ড আছে কোনো কিছু লিখে দেখানোর জন্য। দাড়িঁয়ে সবার উদ্দেশে বললাম, "এখন আমার হাতে কী কী আছে?"
ওসি সাহেব একজন কে ইশারা করলেন, রবিন নামে একজন এস,আই বলা শুরু করল।" একটা পোস্টমেটাম রিপোর্ট, কল রের্কড, ছাড়া কিছুই নাই। খুনের মোটিভ ধরতে পারছি না।"
" মোবাইল দিয়ে চলা শুরু হোক এ ছাড়া উপায় হাতে নেই। খুনটা হয়েছে ছয়টা -সারে ছয়টার মধ্যে। এ সময় উত্তরা দশ নাম্বার সক্টরে কতগুলো মোবাইল নাম্বার চালু ছিল বের করেন।"
আইটি অফিসার উত্তর দিলেন,"ওই সময়ে মোট দশ হাজার মোবাইল নাম্বার পাওয়া গেছে। "
" এ নাম্বারেরে মধ্যে কতগুলো নাম্বার নায়লার বাড়িতে ছিল?"
"একশোর মতো নাম্বার এদের সবার পরিচয় পাওয়া গেছে?"
"হ্যাঁ, এরা সবাই বাড়ির থাকে বা কারো কাছে এসেছে এমন। সন্দেহ করার মতো কেউ নেই।"
"আচ্ছা, দেখেন তো কতগুলো নাম্বার পাঁচটা থেকে -ছয়টার মধ্যে এ এলাকায় বন্ধ হয়েছে? "
সবাই চেয়ে আছে আইটি অফিসারের দিকে। সে ল্যাপটপে কাজ করছে। কিছু সময় কেটে যাওয়ার পর বলল, "মোট পাঁচ শত নাম্বার ও সময় বন্ধ হয়েছে। "
"এ পাঁচ শো নাম্বার আপাতত আমাদের টার্গেট। আরেকটা জিনিস দেখেন এদের মধ্যে কোন নাম্বার আর চালু হয়নি।"
আবার বেশ কিছু সময় কাটল,"পঞ্চাশটা নাম্বার আজ পর্যন্ত চালু হয়নি। "
"এদের মধ্যে কোনো নাম্বার নায়লার নাম্বারের সাথে যোগাযোগ আছে কিনা দেখেন। থাকলে আমরা টার্গেটের কাছাকাছি চলে এসেছি। "
নায়লার সবগুলো নাম্বারের কল রেকর্ডের সাথে এ পঞ্চাশটা নাম্বার মিলিয়ে দেখা হচ্ছে একটা একটা করে। অবশেষে একটা নাম্বার পাওয়া গেল যা নায়লার সাথে কথা বলার পর বন্ধ হয়েছে। আপাতত এটাই আমাদের টার্গেট।
"এই একটা নাম্বার আমাদের টার্গেট।"
"এ নাম্বারের ডিটেইলস বের করুন। দেখা যাক মানিকধন কে?"
ওসি সাহেব উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, "ব্রিলিয়ান্ট' এই জন্যই আপনাকে আমার এত ভালো লাগে।" একজন এস,আই কে লক্ষ্য করে বললেন, রবিন সাহেব দ্রুত এ নাম্বারের ডিটেইলস বের করুন।"
জানি নাম্বারের পরিচয় ভুয়া হওয়ার সম্ভব নাই বেশি। কিছু তো পাওয়া যাবে। সেখান থেকে পরের পথ বের করতে হবে।
নাম্বারটার ডিটেইলস থেকে নাম ভোটার আইডি সংগ্রহ করে যা দেখা যাচ্ছে। একজন মধ্যবয়স্ক পুরুষ মানুষ। এর মতো মানুষের নায়লার সাথে সম্পর্ক থাকাটা সম্ভব না। তারপরও বের করা দরকার। হয়ত জানা যাবে কেউ ওনার সিম নিয়েছে কি-না।
অনেক জল পেরিয়ে যা জানা গেল লোকটি মারা গেছে পাঁচ বছর আগে! ভুয়া আইডি দিয়ে সিম কার্ড কেনা হয়েছে। মোবাইল কোম্পানি থেকে বের করলাম কোন পয়েন্ট থেকে সিমটা বিক্রি হয়েছে। সিম বিক্রেতা কে ধরা আনা হয়েছে।
ওসি সাহেব সিম বিক্রেতা আব্বাস কে প্রথমে উত্তম মাধ্যম দেয়ার ব্যবস্থা করলেন। তার বড় দোষ কেন ভুয়া সিম মানুষ কে দিলো। ঢলার পর যেটা জানা গেল তা খুব কাজের। এ সব সিম সে নিজে ভুয়া আাইডি দিয়ে রেজিষ্ট্রশন করেছে তা নয়। কিছু মানুষ আছে যারা রেজিষ্ট্রেশন করা সিম দিয়ে যায়। ওদের কাছ থেকে কিনে রাখে। কিছু মানুষ আইডি ছাড়া সিম চায় তাদের কে দেয়। একটা সিম নতুন সিমের দশগুন বেশি দামে বিক্রি! এতটা কাছে এসে আবার আধাঁর ডুবে গেলাম। একটু আলো সিম বিক্রেতা আছে!
ওসি সাহেব বললেন, "কোনো চিন্তা করবেন না ভাই। আরেকটু ঢলা দিলে মুখে খই ফুটবে।" দ্বিতীয় দফায় থ্রার্ড ডিগ্রি দেয়ার পর আব্বাসের মুখে সত্যি সত্যি খই ফুটছে। যাদের এ সব সিম দিয়েছে তাদের সবার একটা পরিচয় সে খাতায় লিখে রাখে। তারমানে ও জানে এ সব সিম দিয়ে অপরাধ করা হয়।
সিম ক্রয়কারির ঠিকানা এবং ওর মাধ্যমে স্কেচ আর্টিস দ্বারা সিম ক্রয়কারির স্কেচ আর্ট করে প্রত্যেকটা থানায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।
ওসি সাহেবের ফোন, "রায়হান সাহেব কী খবর? " কেমন হাসির আভাস টের পাচ্ছি কন্ঠে। মনে হয় খুব আনন্দিত!
"ভালো, আপনার? "
"আপনার জন্য ভালোই আছি। যে একটা কেস আপনি সমাধান করলেন!"
"না, না আমি আর কি করলাম? যা করার আপনারা করছেন। আপনার টিম খুব ভালো কাজ করেছে।"
"দেখলেন শেষে কিনা ঘরের মধ্যে খুনি পাওয়া গেল! "
"যা বলেছেন। এটা আমিও ভাবতে পারিনি জানেন!"
"একদিন আসেন সময় করে। জম্পেশ আড্ডা মারি। "
"সে আসব। তাছাড়া আপনার প্রোমোশনের খাবারটা খেতে হবে না?"
"হাসিতে ফেটে পড়লেন ওসি সাহেব।"
পত্রিকার হেডলাইন বিখ্যাত পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম কে গ্রেফতার করা হয়েছে নায়িকা নায়লার খুনের অপরাধে। পুলিশ বাহিনীর অক্লান্ত পরিশ্রমে এ খুনের রহস্য উদঘাটন হয়েছে। সিম ক্রেতা কে ধরে জাহাঙ্গীর আলম পর্যন্ত পৌছাঁতে পুলিশের খুব একটা কষ্ট হয়নি। ভাড়াটে খুনির মাধ্যমে সে খুনটা করায়।
এত নির্জন এলাকা। শহর থেকে অনেকটা দূরে দেয়াল ঘেরা একটা সুন্দর বাড়ি।
এ এলাকয়া এমন বাড়ি আর একটাও নাই। বাড়ির ভিতরে ঢুকে দেখি একজন বৃদ্ধা বসে আছে। আমাকে দেখে হতচকিত হয়ে গেলেন। এ বাড়িতে মানুষজন আসে না! বা আমার মতো শহরে মানুষ এখানে দেখা যায় না খুব একটা। কাঁপা কাঁপা স্বরে বললেন, "কে বাবা তুমি?"
"আমি রায়হান। আপনি বোধহয় আমায় চিনবেন না।" অবাক দৃষ্টিতে আমার প্রানে চেয়ে রইলেন। এ সময় গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে ঘরের ভিতরে থেকে বাহিরে এসে আমায় দেখে ভুত দেখার মতো চমকে ওঠল নায়লা! "আ-আ আপনি! এখানে?"
বাড়িটা খুব সুন্দর করে সাজিয়েছে। বাড়ির ছাঁদটা এত ভালো সুন্দর লাগছ! ঠিক বুঝাতে পারব না। নানা ধরনের ফুলের গাছ। চারদিকে খোলা পরিবেশ। যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। চোখ জুড়িয়ে যায়। মনটা কেমন শীতল হয়ে গেছে। হাতে দুকাপ ধূমায়িত কফি হাতে নায়লা এসে বসল আমার সামনে রাখা একটা চেয়ারে। গোল একটা টেবিল চারদিকে চেয়ার বসানো। কাপটা আমার দিকে ঢেলে দিয়ে বলল, "আমি জানতাম আপনি একদিন এখানে আসবেন। এত তাড়াতাড়ি চলে আসবেন ভাবতে পারিনি!"
"চেকটা না দিলে কিন্তু আসাটা খুব কঠিন হয়ে যেত!"
"তাই! আমার মনে হয়না। আপনি ঠিক কোনো কোনো উপায়ে খুঁজে বের করতেন। আপনাকে তো আমি জানি। "
"এমন কথায় হাসা ছাড়া কোনো ভাষা থাকে না।"
আপনার সমাধান করার পদ্ধতিটা শুনতে খুব ইচ্ছে করছে। আপনি থাকুন কয়টা দিন আমার এখানে। জানেন তো আমার একন অফুরন্ত অবসর। কিযে ভালো লাগে! এখানকার মানুষগুলো কি মায়ার বাঁধনে আঁটকেছে আমায়। শহরের কাঠখোট্টা মানুষগুলো কে আর ভালো লাগছিল না। একটা সময় বড় টাকার অভাব ছিল মায়ার কমতি ছিল না। টাকাতো এলে কেমন করে যেন ভালোবাসা হারিয়ে গেল। হাফিয়ে ওঠছিলাম জানেন। একটু ভালোবাসা পাবার জন্য। ভাবছেন আমি এ সবের সাথে জড়িত?
"সে আমি জানি। আপনি কিছুই করেননি। কিছুটা জেনেছি আপনার কাছ থেকে শোনি।"
কফির কাপে আলত করে চুমুক দিলো। এমন করে ভালোবেসে কফি খেতে সবাই পারে না। খাওয়ার মাঝেও ভালোবাসা থাকে। একটা চাপা শ্বাস নিয়ে বলা শুরু করল, "আমরা জমজ দুবোন দেখতে অবিকল একরকম জানেন। আপিও দেখলে ধরতে পারতেন। ছোটবেলা দুজন কে বাবা একই রকম জামা কিনে দিত। আত্মীয় স্বজনরা আমাদের আলাদ করতে পারত না। দেখতে একরকম হলেও আমরা দুই মেরুর মানুষ। আমার আর নিলুর মত পুরো আলাদা। ও পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল।
বাবা মা মারা যাওয়ার পর নানি চেয়েছিল আমাদের দুজন কে নিয়ে আসতে। কিন্তু দাদি দিতে রাজি ছিল না। শেষমেশ সিদ্ধান্ত হয় আমি নানির কাছে থাকব আর নিলু থাকবে দাদির কাছে।
নিলুটা ভালোই ছিল দাদির কাছে। আমাদের খুব একটা দেখা হত না। ইদের সময় কখনসখন দাদি বাড়ি যাওয়ার সুযোগ হত। নিলু আমার সাথে মিশতে চাইত না! আমার দিন ভালোই কাটছিল। বিপত্তি ঘটল নানি মরার পর। মামারা আমাকে জোর করে বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। পালিয়ে যাই বাবার এক বন্ধুর কাছে। বাবার বন্ধু খুব গরীব মানুষ আমাকে রাখা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। একটা গার্মেন্টসে চাকুরি ঠিক করে দেয়। তারপরের ঘটনা তো আপনি জানেন। একটানা কথাগুলো বলল নায়লা। চেয়ার থেকে উঠে ছাঁদের রেলিং ধরে দাঁড়াল।
কখন যে সূর্য মামা চলে গেছে ছুটি নিয়ে। চাঁদ এসে দখল করে নিয়েছে সেখানটাতে। চাঁদের মায়াবি আলোয় বসে আছি। "আপনি তো দাদির কাছে যেতে পারতেন?"
"সে সময়টাতে মনেই ছিল না। শুধু পালাতে হবে অনেক দূরে এমনটা ভেবেছিলাম। কিছুটা ভয়ও ছিল দাদি বাড়ি থেকে মামারা নিয়ে আসতে পারে।"
নিলুর সাথে দেখা হলো অনেক বছর পরে। তখন তো আমি সুপার স্টার। হঠাৎ একদিন নিলু আমার বাসায় উপস্থিত হলো। আমি ওকে দেখে এত আনন্দিত হয়েছিলাম। ওকে আমার সাথে থাকতে অনুরোধ করলাম। থাকল না। ও এ দেশে থাকতে চায় না। আমার জন্য ও স্বাভাবিকভাবে চলা ফেরা করতে পারে না। মানুষ জন ঘিরে ধরে তাই বিদেশ চলে যেতে চায়।
ছোট একটা মেয়ে বয়স পনেরো ষোল হবে। একটা ট্রেতে কয়েক রকম পিঠা দিয়ে গেল। নায়লা হাতের ইশারায় পিঠা নিতে বলল। একটা পিঠা মুখে পুরে দিলাম। আঃ! কী স্বাদ।
নায়লা আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা বড় শ্বাস নিলো! " জানেন আমার কী ভালো লাগছিল নিলু আমার কাছে এসেছে। আমি ওর বিদেশে যাওয়ার সব ব্যবস্থা করলাম। লন্ডনে চলে গেল নিলুু। মাঝে মাঝে আমার সাথে কথা বলত।
দেশ থেকে দাদি কে নিয়ে এলাম কিন্তু শহর দাদির ভালো লাগে না। তখন এ বাড়ি করার চিন্তা মাথায় এল। অনেক আগে একবার এসেছিলাম এখানে। খুব ভালো লেগে যায় এলাকাটা। অবসর জীবনটা এখানে কাটাব।
নিলু জানাল ও লন্ডনে থাকা বাংলাদেশী একটি ছেলের প্রেমে পড়েছে। ছেলেটা ওকে খুব ভালোবাসে। নিলুর অনেক জায়গায় ঘুরতে যাওয়া ছবিগুলো দেখে আমার খুব ভালো লাগত।
নিলুর ভালোবাসার খবর আমাকে খুবই আনন্দিত করেছিল। বরাবরই আমরা দুবোন অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত হয়েছি জীবনে। নিলুটা যদি একটু ভালো থাকে। সে সময়টাতে নিলু আমার সাথে খুব কথা বলত। কেমন খুশি মনে হত ওকে। মনে হয় সুখের সাগরে ভাসছে। আচমকা নিলুর সাথে কথা হয় না।
নিলুর নাম্বারটা বন্ধ! আমাকেও কল দেয় না। বুঝতে পারছিলাম না কী হলো ওর। কোনো বিপদ হলো কি? লন্ডনে যাওয়ার একটা পরিকল্পনা করলাম। গিয়ে খবর নিতে হবে কী হয়েছে। যাওয়ার সব কিছু যখন চুড়ান্ত তখনি হুট করে নিলু আমার বাসায় উপস্থিত। উসকো- খোসকু চুল, মলিন চেহারা। ও, নিলু সবসময় আমার বাসায় বোরকা পরে আসত। বুঝেন তো দেখতে আমার মতো হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই চলাটা ওর জন্য কঠিন! দেখেই ভিতরটা মোচড় দিয়ে ওঠলো!
"কী হয়েছে রে নিলু?"
ছলছল চোখে আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। মুখে কোনো শব্দ নেই! পাশে বসে বুকের মাঝে টেনে নিলাম। আমায় জড়িয়ে ধরে কাদঁতে লাগল। কিছুই বললাম না। পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম। ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদতে কাঁদতে নিলু জানাল। যে ছেলেটি ওকে ভালোবেসেছিল সে নাকি ওকে নায়িকা নায়লা মনে করে ভালোবেসেছে! শোনো ভিতরটা কেমন করে ওঠল!
"আমরা কী শুধুই দুঃখ পেতোই এসেছি দুনিয়ায়! একট সুখ বুঝি আমাদের সহে না।"
নিলুর এমন কথার জবাবা দিতে পারিনি। কী উত্তর আছে? আমার তো জানা নেই! নিলু জেদ ধরেছে ও অভিনয় করবে। এ যে বড় পাগলামি ওকে কী করে বুঝাই! কিছুতেই ওকে বুঝানো গেল না।
রাত বোধহয় তার জীবনের মধ্যভাগে চলে এসেছে। খেয়াল হতেই নায়লা অপ্রস্তুত হয়ে গেল।" এই দেখুন কথার তালে আপনাকে রাতের খাবার দিতেই ভুলে গেছি।" জিহবা কামড় দিয়ে বলছে, " স্যরি, কিছু মনে করবেন না।"
"না,না, আপনি মোটেই ব্যস্ত হবেন না। পিঠাগুলো খুব মজার ছিল বেশ কয়েকটা খেয়েছি। একবারে ক্ষুধা নাই। আপনি বরং বলে যান। যদি আপনার খারাপ না লাগে।"
"আপনাকে বলতে পেরে ভিতরটা হালকা লাগছে। একাই যে বয়ে বেড়াচ্ছি এ যন্ত্রণা! " জানেন দাদি আজও জানে না আমি নিলু না নায়লা।" একটা চাপা শ্বাস নিলো।
আমাদের রক্তে অভিনয় আছে। নিলু কী সুন্দর অভিনয় করল প্রথম ছবিতে। কেউই ধরতে পারল না। আমি না নিলু অভিনয় করেছে। নিলু আমার চেয়ে ভালো অভিনয় করেছে। নিলু তো আমার মতো বর্ণ জানা নয় রিতিমতো বিলিতি ডিগ্রিধারি। জানি বলবেন অভিনয়ের সাথে ডিগ্রি ফিগ্রির কী সম্পর্ক? তবুও ব্যক্তিত্বে কিছুটা প্রকাশ পায় তাই না?
আমি খাদ থেকে উঠেছিলাম। বলতে জাহাঙ্গীর আলম স্যার আমাকে তুলেছিলেন। তাকে মানতে আমার একটা দায় ছিল। আমি তাকে গুরুর মতো মান্য করতাম। নিলুর তো তা না! নিলু কেন তাকে এত মানতে যাবে? ওর কিসের ঠেকা। জাহাঙ্গীর স্যার তো আর তলের খবর জানে না। সে ওর ওপর কর্তৃত্ব ফলাতে চাইলে ওকি তা মানবে বলেন? মানেওনি তাই মনোমালিন্য হয়েছে।
এটা এত দূর গড়াবে আমি বুঝতে পারিনি। স্যার এত ভয়ংকর মানুষ আমার জানা ছিল না। মানুষের কত রুপ থাকে। এ জগতে সবাই তো অভিনয়ে দক্ষ্য এদের বুঝা বড্ড কষ্টকর!
"আপনি বুঝতে পেরেছিলেন জাহাঙ্গীর আলম খুনটা করেছে? "
"না, কী করে বুঝব বলেন? আমি তো ও জগতে ছেড়ে চলে এসেছিলাম পাকাপাকি ভাবে। কোনো খবর রাখিনি তো। নিলু কতটা ভালো করল তার একটা খবর রাখতাম ব্যস। "
"খুন হওয়ার খবর পান কখন? "
"সন্ধায় টিভি দেখে। সাথে সাথে আপনার কাছে ছুটে যাই। আমার বিশ্বাস ছিল একমাত্র আপনিই পারবেন প্রকৃত খুনি কে ধরতে। পুলিশ কোনোমতে কেসটা কে ধামাচাপা দিয়ে গা বাঁচাত। আমার বোনটাকো ওরা বাঁচতে দিলো না। "
ভিজা চোখ মুছল! কাদঁলে মানুষ কে সুন্দর লাগে! নায়লা কে না দেখলে জানতাম না। কিছুটা নীরব কাটল। চারদিকে সুনসান নীরবতা। দুজম বসে আছি চাঁদের আলোয়। মৃদু হিমেল হাওয়া বইছে। কেমন কেমন শীত শীত লাগে।
এখানে মেয়েদের নিয়ে একটা প্রতিষ্ঠান চালু করেছে নায়লা। দশ বার জন মেয়ে কাজ করে। ছোট ছেলে মেয়েদের পড়ার জন্য একটা স্কুল খোলছে। ভালো জমিয়ে নিয়েছে। শহরের চাকচিক্য হয়ত নেই আছে নির্মুল প্রশান্তি। এদের কাছে নায়লা স্টার নয় তাদের এক বড় বোন। বড় আপন একজন।
সবার সাথে কথা হলো। সবগুলো মেয়ে আত্মা তৃপ্তি নিয়ে কথা বলছে। নিজেরা আয় করতে শিখছে টুকটাক পড়ালেখা শিখেছে। চোখে এক ধরনের স্বপ্ন দেখলাম। বিদায় নিয়ে চলে আসছি নায়লা সুন্দর করে হাসলো। চলচ্চিত্র জগত এমন সুন্দর হাসি থেকে বঞ্চিত হলো। সবাই জানে তারা একজন ভালো অভিনেত্রী হারিয়েছে শুধু আমি জানি একজন নয় দুজন কে হারিয়েছে!
( সমাপ্ত )
লেখা: নাবিল মাহমুদ
