![]() |
Romantic Love Story |
তুরা দরজা খুলে থমকে দাঁড়িয়ে গেল। অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথি দেখলে মানুষের মস্তিষ্ক নিজের করণীয় ঠিক করতে কিছুটা সময় নেয়। তুরার ক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে। সে প্রথমে বুঝে উঠতে পারলো না কি করবে।কোনো কথাও বলতে পারলো না। খানিকক্ষণ পর অতিথি নিজেই কথা বললেন,
"ভালো আছো, মা?"
অতিথি হলেন আসাদ সাহেব। উনার প্রশ্নের উত্তর তুরা দিলো না। উল্টো প্রশ্ন করলো,
"আপনি হঠাৎ? মা ঠিক আছেন?"
প্রশ্নটা করে তুরা অপ্রস্তুত হয়ে গেল।এমন প্রশ্ন করা হয়তো ঠিক হয় নি।আসাদ সাহেব উত্তর দিলেন,
"ঠিক আছে।আবার ঠিক নেইও।"
তুরা বুঝতে পারলো না।এত রহস্য করে কথা বলার কোনো মানে হয় না।অতিথিকে ভেতরে আসতে বলার আগেই সেখানে টুকুনকে নিয়ে উপস্থিত হলো রায়না আর তনয়।তুরা খুশি হয়ে বলল,
"আপু,দুলাভাই!এসো,এসো।"
রায়না গম্ভীর মুখে বলল,
"উনি নাকি আমাদের কিছু কথা বলতে চান।"
তুরা একবার আসাদ সাহেবের দিকে তাকালো।তারপর মৃদু গলায় বলল,
"ভেতরে আসুন।আপু,তোমরাও এসো।"
সবাইকে ড্রয়িং রুমে বসিয়ে তুরা ধীর পায়ে ঘরের দিকে পা বাড়ালো।আবরারকে কিভাবে বলবে সেটা তুরা ভেবে পাচ্ছে না।
আবরার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে।তুরাকে দেখে বলল,
"কে এসেছে,তুরা?"
তুরা ইতস্তত করে বলল,
"আপুরা এসেছে।তুমি চলো।"
আবরার চিরুনি রাখতে রাখতে বলল,
"চলো।"
তুরা একবার ঢোক গিলে বলল,
"আরও একজন এসেছেন।"
আবরার ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো,
"কে?"
তুরা আমতা আমতা করে বলল,
"ফারাবী ভাইয়ের বাবা।"
আবরারের চোখমুখ শক্ত হয়ে এলো।সে চাপা গলায় বলল,
"উনি কেন?"
তুরা আবরারের বুকের কাছে সরে এসে বলল,
"তুমি কিন্তু রাগারাগি করবে না প্লিজ।উনি কিছু বলতে এসেছেন।বলেই চলে যাবেন।"
"উনার কি বলার থাকতে পারে বুঝতে পারছি না।"
"যাই বলার থাকুক।তুমি রেগে যাবে না একদম।মাথা ঠান্ডা রাখবে।"
আবরার কিছু না বলে বিছানায় বসে পরলো।তুরা বলল,
"কি হলো?যাবে না?"
আবরার উত্তর দিলো না।কিছুক্ষণ উত্তরের অপেক্ষা করে তুরা আবার বলল,
"আমি চা বানাতে যাচ্ছি।তুমি বাইরে এসো।আপু দুলাভাইও অপেক্ষা করছে তোমার জন্য।"
কথা শেষ করে তুরা চলে গেল।আবরার উঠে দাঁড়ালো।সে ঠিক করেছে আজ লোকটাকে মুখের উপরে বলে দেবে যেন এখানে আর কখনো না আসে।
_____________________________
তুরা একটা ট্রে তে চা আর মিষ্টি নিয়ে ড্রয়িং রুমে এলো।টি টেবিলে ট্রে রেখে বলল,
"নিন।চা নিন।"
আবরার গম্ভীর হয়ে বসে আছে।রায়নার ভীষণ অস্থির অস্থির লাগছে।টুকুন খুব মনোযোগ দিয়ে মিষ্টি খেতে শুরু করলো। তনয় হাত বাড়িয়ে এক কাপ চা নিলো।অনেকক্ষণ যাবৎ সবাই নীরবে বসে আছে।নীরবতা ভেঙে তনয় বলল,
"আপনি কি বলতে চান বলুন।আমরা শুনছি।চাইলে চা খেয়ে গলা ভিজিয়ে নিতে পারেন।"
আসাদ সাহেব হালকা কেশে গলা পরিষ্কার করে নিলেন।তারপর বললেন,
"আমি জানি তোমরা আমাকে পছন্দ করো না।তবুও আমি এসেছি।আমার কথাগুলো একটু ধৈর্য সহকারে শুনবে তোমরা।তোমাদের কাছে এটা আমার অনুরোধ।আর আমি কথা দিচ্ছি,এরপর আর কখনো বিরক্ত করতে আসবো না তোমাদের।"
আবরার বিরস মুখে বলল,
"এত ভূমিকা ভালো লাগছে না।আসল কথা বলুন।"
তুরা আবরারের পাশে বসে নিচু আওয়াজে বলল,
"এভাবে কথা বলছো কেন?"
আবরার উত্তর দিলো না।আসাদ সাহেব বললেন,
"তোমাদের জীবনে যা যা ঘটেছে তার দায় আমার।তোমাদের মায়ের কোনো দায় নেই।আমিই তোমাদের কাছ থেকে তোমাদের মাকে দূরে রেখেছিলাম।"
আবরার বিরক্তি নিয়ে বলল,
"ভালো করেছেন।এখন আমরা কি করতে পারি?"
তুরা আবরারের হাত শক্ত করে ধরে বলল,
"প্লিজ,থামো।উনাকে বলতে দাও।"
তনয় বলল,
"আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে করেছিলেন কাজটা?"
আসাদ সাহেব মাথা নিচু করে বললেন,
"অনেকটা তাই।"
তুরা বলল,
"আপনি নিজেকে দোষারোপ করছেন?কিন্তু কিছুদিন আগে মা এখানে এসেছিলেন।মা আমাকে সবটাই বলেছিলেন।উনি তো বলেছেন,শ্বশুর বাড়ির সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে আপনিই মাকে ঢাকায় এনেছিলেন।"
আসাদ সাহেব হতভম্ব হয়ে বললেন,
"রাবেয়া তোমার কাছে এসেছিল?"
"হ্যাঁ,উনি এসেছিলেন।আমাকে দুটো সোনার আংটিও দিয়েছেন।ওই আংটি দুটো নাকি বাবা বানিয়ে রেখেছিলেন।"
আসাদ সাহেব কিছুটা নড়েচড়ে বসলেন।জিজ্ঞেস করলেন,
"রাবেয়া তোমাকে ঠিক কি কি বলেছে,মা?"
"মা বলেছেন,বিয়ের আগে আপনি বা আপনার পরিবারের কেউ জানতেন না যে মায়ের দুটো সন্তান আছে।বিয়ের পর জানাজানি হয়।আর তখন সংসারে অশান্তি শুরু হয়।আপনার বাড়ির কেউ চায় নি মা তার সন্তানের খোঁজ নিক।কিন্তু আপনি মাকে নিয়ে গ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছিলেন।"
আবরার অবাক হয়ে বলল,
"উনি যে এসব বলেছেন তা তো আগে বলো নি আমাকে।"
তুরা অপরাধীর মতো বলল,
"তুমি রেগে যেতে পারো তাই বলি নি।"
আসাদ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
"বুঝেছি।আসলে মা,রাবেয়া যা যা বলেছে তার সবই ভুল।ও কি বলেছে,কেন বলেছে সেটা হয়তো ও নিজেও বুঝতে পারে নি।অথবা ওর অবচেতন মন হয়তো আমাকে ভালো মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছে।ও কখন কি করে,তার কোনো মানে নেই।"
তনয় ভ্রু কুঁচকে বলল,
"মানে?"
"মানে হলো,রাবেয়া মানসিকভাবে সুস্থ নয়।ও বিরল এক মানসিক রোগে আক্রান্ত।"
আসাদ সাহেবের কথায় সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।ঘর জুড়ে নীরবতা নেমে এলো।রায়না কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
"এ...এসব কি বলছেন আপনি?উনাকে দেখে তো মনে হয় না!"
তুরা বলল,
"হ্যাঁ,উনাকে দেখে তো সুস্থই মনে হয়।উনি স্বাভাবিকভাবেই আমার সাথে কথা বলেছিলেন সেদিন।এমনকি এও বলেছিলেন যে আমি যে অন্তঃসত্ত্বা ছিলাম সেটা উনি জানেন।উনি নাকি আমাদের সব খবর রাখেন!"
আসাদ সাহেব হতাশ গলায় বললেন,
"ও আসলে কিছুই জানে না।সবটা ওর কল্পনা।কাকতালীয়ভাবে হয়তো সেটা বাস্তবের সাথে মিলে গিয়েছিল।আচ্ছা মা,তুমি মনে করে বলো তো।সেদিন কি কিছুই অসংলগ্ন বা অস্বাভাবিক লাগে নি তোমার?"
তুরা একটু ভেবে বলল,
"উনি....উনি আমাকে না বলেই চলে গিয়েছিলেন।"
আসাদ সাহেব মৃদু হেসে বললেন,
"ও সেদিন বাড়ি থেকেও কিছু না বলেই বেরিয়ে এসেছিল।আর আমি ওকে কোথায় খুঁজে পেয়েছিলাম জানো?রাস্তার ধারে।"
আসাদ সাহেব থামলেন।সবাই অগোছালো মস্তিষ্কে উনার দিকে তাকিয়ে আছে।কেউই কিছু বুঝতে পারছে না।তনয় প্রশ্ন করলো,
"কবে থেকে উনি এই রোগে আক্রান্ত?সবটা প্রথম থেকে বলুন প্লিজ।"
আসাদ সাহেব কিছুটা সময় নিয়ে বলতে শুরু করলেন,
"রাবেয়ার বলা একটা কথা সত্য।বিয়ের আগে আমি বা আমার পরিবার জানতাম না যে রাবেয়া একজন বিধবা এবং ওর দুজন সন্তান আছে।রাবেয়ার ভাই ব্যাপারটা গোপন করেছিলেন।কিন্তু উনি রাবেয়াকে বলেছিলেন যে আমি নাকি আবরার রায়নার দায়িত্ব নিতে চেয়েছি।এই কথা বলেই উনি রাবেয়াকে বিয়েতে রাজি করিয়েছিলেন।এটা নিয়ে যাতে ঝামেলা না হয় সেজন্য উনি বিয়ের দিনই আবরার আর রায়নাকে অন্য একটা ভাড়া বাড়িতে রেখে এসেছিলেন।আমি সবটা জানতে পারি বিয়ের দিন রাতে।প্রথমে মেনে নিতে পারছিলাম না।পরে ভাবলাম,আমিও এক সন্তানের বাবা।আমার ফারাবীর তখন পাঁচ মাস বয়স।ওর জন্য একজন মা দরকার ছিল।তাই আমি বিয়েটা করেছিলাম।সে যদি...."
আসাদ সাহেবের কথা শেষ হলো না।রায়না উনাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
"থামুন থামুন!কি বললেন আপনি?ফারাবীর তখন পাঁচ মাস বয়স!মানে?ফারাবী মায়ের গ...গর্ভের সন্তান নয়?"
আসাদ সাহেব ছোট করে নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
"না,মা।ফারাবী আমার আগের পক্ষের সন্তান।ওর জন্মদাত্রী অন্য একজনের হাত ধরে চলে গিয়েছিল।"
রায়না স্তব্ধ হয়ে গেল।আবরার হতভম্ব হয়ে আসাদ সাহেবের দিকে তাকিয়ে আছে।তুরার মাথা ঝিমঝিম করতে শুরু করেছে।তনয় বলল,
"এরপর কি হলো বলুন।"
আসাদ সাহেব আবার বলতে লাগলেন,
"রাবেয়া যখন জানলো যে আমি কিছুই জানতাম না তখন ও খুব কান্নাকাটি শুরু করলো।আমি ভেবে দেখলাম,রাবেয়া যদি আমার সন্তানের মায়ের দায়িত্ব নিতে পারে,তবে আমি কেন ওর সন্তানদের দায়িত্ব নিতে পারবো না?আমি রাজি হলাম।আমার বাড়ির লোকজনকে তখনও কিছু জানাই নি।বিয়ের পরের দিন রাবেয়ার ভাইয়ের বাড়িতে গেলাম।গিয়েই প্রথমে উনাকে কিছু কথা শুনিয়ে দিলাম সত্য গোপন করার জন্য।কথা ছিল,পরদিন ফেরার সময় আবরার রায়নাকে আমাদের সাথে নিয়ে যাবো।আমি দুপুরবেলায় ঘরে বসে ছিলাম।হঠাৎ তুমুল চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ কানে এলো।আমি ঘর ছেড়ে বাইরে গেলাম।দেখলাম,রাবেয়ার ওর ভাইয়ের সাথে প্রচন্ড কথা কাটাকাটি হচ্ছে।রাবেয়া কেঁদে কেঁদে বলছে,আমার বাচ্চারা কোথায় বলো।শেষে রাবেয়ার জেদের সাথে পেরে না উঠে উনি রাবেয়াকে সেই বাসার ঠিকানা দিলেন,যেখানে উনি আবরার আর রায়নাকে রেখে এসেছেন।রাবেয়া পাগলের মতো ছুটে বেরিয়ে গেল।আর নাটকীয়ভাবে ওর একটা রোড এক্সিডেন্ট হলো।ছোটখাটো নয়,বেশ বড়সড় এক্সিডেন্ট।"
আসাদ সাহেব সামনে থাকা গ্লাস নিয়ে পানি খেলেন।তারপর আবার বলতে শুরু করলেন,
"ওকে প্রায় দুই মাস হাসপাতালে থাকতে হলো।এই দুই মাসের মধ্যেই ও মানসিক রোগী হয়ে উঠলো।ও কল্পনা করতে লাগলো যে রায়না আর আবরার ওর সাথেই আছে।ওকে যখন হাসপাতাল থেকে ছাড়া হলো তখন ওকে আর ফারাবীকে নিয়ে আমি খাগড়াছড়ি চলে গেলাম।ওখানেই আমাদের সংসার শুরু হলো।আমি এতটাই স্বার্থপর যে রাবেয়ার রোগের সুযোগ নিতে থাকলাম।ও কল্পনা করতো যে ওর সন্তানেরা ওর সাথেই আছে।আমিও ওর মিথ্যা কল্পনায় সায় দিতাম।আমি এত খারাপ মানুষ যে তোমাদের খোঁজও নেওয়ার চেষ্টা করি নি কখনো।রাবেয়ার চিকিৎসাও করাই নি।ভেবেছিলাম,ভালোই হয়েছে।অন্যের সন্তানের ঝামেলা থেকে বেঁচেছি।প্রায় সাত বছর রাবেয়ার অসুখের সুযোগ নিয়ে আমি সুন্দর মতো সংসার করেছি ওর সাথে।ওর এই রোগের কারণে ও এটাও ভুলে গিয়েছিল যে ফারাবী ওর গর্ভের সন্তান নয়।ও ভাবতো ফারাবী ওরই ছেলে।এখনও তাই ভাবে।আর ফারাবীও তাই জেনেই বড় হয়েছে।ওর আসল মায়ের পরিচয় আমি কখনো ওকে জানাই নি।যে সন্তান ফেলে চলে যায়,তার কোনো অধিকার নেই সন্তানের কাছে পরিচিতি পাওয়ার।"
আসাদ সাহেব থামলেন।কারোর মুখেই কোনো কথা নেই।তনয় বলল,
"উনার চিকিৎসা করালেন কবে?"
"একটা সময় পর ওর অসুখটা বেড়ে গেল।ও তখন আমাকেও এড়িয়ে চলতো।আমাকে বিশ্বাস করতো না।ভাবতো,আমি নাকি ওকে খুন করবো।ওর সন্তানদের খুন করবো।মাঝে মাঝে তো আমাকে চিনতেই পারতো না।নিজের দ্বিতীয় বিয়ের কথা ভুলে যেতো।চিৎকার করে বলতো,আমাকে এখানে এনেছেন কেন?আমাকে পুরান ঢাকায় আমার বাসায় রেখে আসুন।
পরিস্থিতি যখন এই পর্যায়ে,তখন আমি প্রথম ওকে ডাক্তার দেখাই।ওকে নিয়ে ঢাকায় আসি।ডাক্তার খুব রাগারাগি করলেন।বললেন,এত বছর পর চিকিৎসা করে কোনো লাভ নেই।আর তখন চিকিৎসা পদ্ধতি এত উন্নতও ছিল না।তবুও রাবেয়ার চিকিৎসা শুরু হলো।দীর্ঘ ছয় বছর চিকিৎসার পর রাবেয়া সুস্থ হলো।ফারাবীর তখন ১৪ বছর বয়স।তখন ও প্রথম বার বুঝতে পারলো যে আবরার রায়না আসলে এত বছর ধরে ওর সাথে ছিল না।তখনই ওর প্রথমবার স্ট্রোক হলো।এরপর থেকে রাবেয়া কখনো সুস্থ স্বাভাবিক আচরণ করে,আবার কখনো অস্বাভাবিক আচরণ করে।পুরোপুরি সুস্থ ও আর হয় নি।"
রায়নার বুকের ভেতর ধুকধুক করছে।আবরার শান্ত চোখে তাকিয়ে সব কথা শুনছে।তুরার চোখে পানি আসতে চাইছে।কেন চাইছে সে বুঝতে পারছে না।তনয় বলল,
"রায়না আর আবরারকে কি তখন খুঁজতে শুরু করলেন?"
আসাদ সাহেব মাথা নিচু করে বললেন,
"হ্যাঁ।কিন্তু এত বড় ঢাকা শহরে কাউকে খুঁজে পাওয়া অত সহজ নয়।তাছাড়া ১৪ বছর আগের ছোট দুটো বাচ্চা ততদিনে নিশ্চয়ই বড় হয়ে গিয়েছিল।তাদের কিভাবে খুঁজে পাবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না।তারা বেঁচে আছে কিনা তাও বুঝতে পারছিলাম না।পরে আমি বিভিন্ন অনাথ আশ্রমে খোঁজ নিতে শুরু করি আবরার রায়না নামের দুই ভাই বোন সেখানে থাকে কিনা।দীর্ঘ চার বছর পর এক আশ্রমে খোঁজ পাই।কিন্তু তখন আর তোমরা সেখানে থাকতে না।কোথায় থাকো তার খোঁজ পেতে আরও কিছু সময় লাগলো।তার পর থেকেই রাবেয়া তোমাদের কাছে ছুটে ছুটে আসে।কিন্তু তোমরা ওর কথা শুনতে চাও না।ও প্রত্যেক বার হতাশ হয়ে ফিরে যায়।"
আসাদ সাহেব থেমে গিয়েছেন।গাঢ় নীরবতা সবাইকে ঠেসে ধরেছে।টুকুন খেলছিল।দৌড়ে তুরার কাছে গিয়ে বলল,
"মামী,পানি খাবো।"
তুরা নিঃশব্দে পানির গ্লাস এগিয়ে দিলো।আসাদ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
"রাবেয়ার দ্বিতীয় বার যখন স্ট্রোক হলো,যেবার তোমরা ওকে হাসপাতালে দেখতে গেলে,তখনও ও স্বাভাবিক ছিল।ইদানীং বড্ড বেশি খারাপ অবস্থা ওর।এক মুহূর্ত স্বাভাবিক থাকলে,পরমুহূর্তে আবার অস্বাভাবিক হয়ে যায়।"
আবরার এতক্ষণ চুপচাপ ছিল।এবার কাঠ কাঠ গলায় বলল,
"আপনার এসব গালগল্প আমি বিশ্বাস করি না।আপনি এখন আসতে পারেন।"
আসাদ সাহেব থমথমে গলায় বললেন,
"বিশ্বাস না করাই স্বাভাবিক।কিন্তু আমি সত্যি বলছি।আমাকে ক্ষমা করার কোনো কারণ নেই।আমার ক্ষমা চাওয়ার মুখও নেই।কিন্তু তোমাদের মাকে ক্ষমা করে দিও।না না,আমি তোমাদেরকে মায়ের সাথে সম্পর্ক ঠিক করে নিতে বলছি না।তোমাদের কোনো দায়িত্ব পালন করতেও বলছি না।তোমরা যেমন আছো থাকো।শুধু রাবেয়া মাঝে মাঝে চলে এলে ওকে আঘাত দিও না।আর তোমাদের মায়ের জন্য যে ঘৃণা মনে জমিয়ে রেখেছ,সেটা মুছে ফেলো।এটুকুই আমার অনুরোধ।আমি আসি।তোমরা ভালো থেকো।"
আসাদ সাহেব ক্লান্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালেন।তারপর টলোমলো পায়ে বেরিয়ে চলে গেলেন।
আবরার বলল,
"বুবু,লোকটার কথা বিশ্বাস করিস না।সব বাজে কথা।"
রায়না কথা বলল না।তার ভেতরে বিশ্বাস,অবিশ্বাস,ভালো লাগা,খারাপ লাগা,কোনো অনুভূতিই কাজ করছে না।এই মুহূর্তে তার ভেতরটা একেবারে অনুভূতি শূন্য।
.
চলবে.......
Writer: Alo Rahman
