![]() |
Romantic Love Story |
শহরে রাত নেমে এসেছে। রঙ বেরঙের আলোয় রাতের অন্ধকারের বুক চিড়ে যাচ্ছে। আকাশে চাঁদ দেখা যাচ্ছে না,কোনো নক্ষত্রও চোখে পরছে না। সম্ভবত আকাশে মেঘ করেছে।বারান্দায় সবুজ রঙের টিমটিমে আলো জ্বলছে।তুরার গোলাপ গাছে চারটা কলি এসেছে।নিয়ন বাতির আলোয় লাল রঙের কলিগুলো অদ্ভুত রং ধারণ করেছে।আবরার একদৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে আছে।তার হাতে জ্বলন্ত সিগারেট।মাঝে মাঝেই সিগারেটে লম্বা টান দিচ্ছে সে।বদলে যাওয়া রঙের নামটা আবরার মনে করতে পারছে না।সে এসব রং টং অত ভালো চেনে না।তুরা খুব ভালো রঙ চিনতে পারে।
তুরা গুটিগুটি পায়ে বারান্দায় এলো।আবরারের পাশে বসে বলল,
"সিগারেট ফেলে দাও তো।"
আবরার চোখ তুলে তাকালো।সিগারেট নিচে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলল,
"তুমি ঘুমাও নি?"
"রাত নয়টা বেজেছে মাত্র।এত তাড়াতাড়ি আমার ঘুম আসে না।আর না খেয়ে তো একেবারেই নয়।"
"তুমি এখনও খাও নি?"
তুরা মুখভার করে বলল,
"আমরা কেউই এখনো খাই নি।"
আবরার স্বাভাবিক গলায় বলল,
"ও!হ্যাঁ,তাই তো।খাওয়া যে হয় নি,তা তো খেয়ালই ছিল না।"
"সারা দিনরাত সিগারেটের ধোঁয়া খেলে তো খেয়াল থাকবেই না।"
আবরার হেসে ফেললো।তুরা রাগ দেখিয়ে বলল,
"হাসবে না তো।কি হয় সিগারেট খেয়ে?বাদ দিয়ে দাও না!"
আবরার মৃদু হেসে বলল,
"নেশা হয়ে গেছে;বাজে নেশা।তাই ছাড়তে পারি না।"
"পারি না বলে কিছু হয় না।মানুষ চাইলেই সব পারে।"
আবরার হেসে বলল,
"আচ্ছা,ঠিক আছে।ছেড়ে দেবো সিগারেট।"
তুরা মুখ ফুলিয়ে বলল,
"মনে থাকে যেন।এবার কথা না রাখলে কিন্তু আমি চলে যাবো।তোমার সাথে আর থাকবো না।তুমি থেকো তোমার সিগারেট নিয়ে।"
আবরার তুরার হাত নিজের হাতের মাঝে নিলো।আদুরে গলায় বলল,
"রাগ করো না।আমি সত্যি চেষ্টা করবো।আমি কিন্তু এখন আগের চেয়ে অনেক কম সিগারেট খাই।"
তুরা কিছু বলল না।আবরার সত্যিই সিগারেট খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে।এই মানুষটা মন ভোলানো কথা বলতে পারে না।তুরা আবরারের কাঁধে মাথা রাখলো।মৃদু গলায় বলল,
"তোমার কি মন খারাপ?"
আবরার ভ্রু কুঁচকে বলল,
"না তো।মন খারাপ কেন হবে?"
তুরা ইতস্তত করে বলল,
"বিকালের ঘটনার জন্য?"
আবরার বড় করে শ্বাস নিলো।তারপর স্বাভাবিক গলায় বলল,
"আমি ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছিই না।উনার বলার কথা উনি বলেছেন।আর আমি শুনেছি।এর বাইরে কিছু ভাবতে চাই না আমি।সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছি।এ জীবনে আর কারোর প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই।এসব নিয়ে আমি একেবারেই ভাবতে চাই না।যে কদিন বেঁচে আছি,সেই কটাদিন তোমার সাথে শান্তিতে বাঁচতে চাই।তুমি কি বুঝতে পারছো আমার কথা?"
তুরা মৃদু হেসে বলল,
"পারছি।আমি কথা দিচ্ছি,আর কখনো এই ব্যাপারটা নিয়ে কোনো কথা বলবো না।"
আবরারকে স্নিগ্ধতা ছুঁয়ে গেল।সে তুরাকে একপাশ থেকে জড়িয়ে নিলো।এই মেয়েটা তাকে এত বোঝে!
তুরা বলল,
"কাল অফিসে যাবো।তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠতে হবে।চলো,খেয়ে নিই।"
আবরার উঠে দাঁড়ালো।বলল,
"চলো।"
তারপর তুরাকে নিয়ে ঘরের ভেতরের দিকে পা বাড়ালো।
.
রায়না টুকুনকে খাইয়ে দিচ্ছে।তনয় ভাত খেতে খেতে রায়নার দিকে আড়চোখে দেখছে।রায়না স্বাভাবিক আছে কিনা সেটা তনয় বুঝতে পারছে না।চোখমুখ দেখে স্বাভাবিকই লাগছে।
টুকুন সবসময়ের মতোই খেতে চাইছে না।রায়না প্রচন্ড ধমক দিয়ে বলল,
"টুকুন,আজকে সত্যি মার খাবি কিন্তু।"
তনয়ের ভ্রু কুঁচকে গেল।টুকুন তো প্রতিদিনই খেতে চায় না।প্রতিদিনই কি রায়না এত রেগে গিয়ে কথা বলে?নাকি আজই বলছে?মনে করতে পারলো না তনয়।
টুকুন বলল,
"আমি খাবো না।খেতে ভালো লাগছে না।খাবো না,খাবো না,খাবো না।"
রায়না এবার সত্যি সত্যিই টুকুনের গালে সজোরে চড় বসিয়ে দিলো।টুকুনের ঠোঁট বেঁকে গেল।তার চোখ থেকে পানি পরতে শুরু করেছে।তনয় হকচকিয়ে গেছে।এই প্রথম রায়না টুকুনের গায়ে হাত তুলেছে।সে তাড়াহুড়ো করে বলে উঠলো,
"একি!খাওয়ার সময় ছেলেটাকে মারলে কেন,রায়না?"
রায়না রাগী গলায় বলল,
"তো কি করবো?প্রতিদিন খাওয়ার সময় এক ঝামেলা আমার আর ভালো লাগে না।"
তনয় টুকুনকে কোলে তুলে নিয়ে বলল,
"আয়,বাবা।তোকে আমি খাইয়ে দিচ্ছি।"
তনয় টুকুনকে খাইয়ে দিতে শুরু করলো।রায়না দ্বিগুণ রেগে বলল,
"বাবার হাতেই তো খাবি।আমার কাছে খেতেই যত ঝামেলা তোকে করতে হয়।আর কখনো আমাকে তুই মা বলে ডাকবি না।বজ্জাত ছেলে!"
কথা শেষ করে রায়না প্লেটে হাত ধুয়ে ফেললো।তারপর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে চলে গেল।
.
রায়না বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে।বাইরে অন্ধকার।কেমন একটা ভ্যাপসা গরম লাগছে।রায়নার মন খচখচ করছে।ছেলেটাকে এভাবে মারা উচিত হয় নি।একটু বেশি জোরে আঘাত হয়ে গিয়েছে।ছেলেটা নিশ্চয়ই খুব ব্যাথা পেয়েছে।
তনয় বারান্দায় এসে বসলো।তার হাতে খাবারের থালা।সে রায়নাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলো।খাবার মুখের সামনে ধরে বলল,
"খাও।"
রায়না প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
"টুকুন....?"
"টুকুনের খাওয়া শেষ।বিছানায় চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে।এবার তুমি খেয়ে নাও।"
রায়না একবার ভেতরের দিকে তাকালো।বিছানার মাঝখানে গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে ছোট্ট একটা শরীর।রায়না ছোট করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
"কেন যে মাথাটা গরম হয়ে গেল!ছেলেটা না জানি কত ব্যাথা পেয়েছে!"
তনয় হেসে ফেললো।রায়নার মুখে খাবার পুরে দিয়ে বলল,
"জানো?ছোটবেলায় একবার রাগ করে না খেয়ে শুয়ে পরেছিলাম বলে মা আমাকে তরকারির চামচ দিয়ে পিটিয়েছিল।তারপর মা নিজেই বসে বসে কেঁদেছে।"
বলেই তনয় হেসে উঠলো।রায়নাও হেসে ফেললো।তনয় বলল,
"বিকালের ঘটনায় কি তুমি আপসেট?"
রায়না স্বাভাবিকভাবেই জবাব দিলো,
"আমি এত সহজে আপসেট হই না।"
"সামান্য হলেও এলোমেলো হয়ে পরেছিলে তুমি।সে কারণেই এত রাগারাগি করে ফেলেছ।"
"ছিলাম হয়তো।এখন আর নেই।এসব নিয়ে আমি ভাবছি না।ভেবে লাভও নেই।যা হওয়ার তা হয়ে গেছে।যে সময় চলে যাওয়ার সেটাও চলে গেছে।এখন এ ব্যাপারে ভেবে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না।"
তনয় মৃদু হেসে বলল,
"তোমার কাছ থেকে এই কথাগুলোই আশা করেছিলাম,রায়না।"
রায়না হেসে বলল,
"হয়েছে।আর খেতে ইচ্ছা করছে না।খাবার রেখে এসো।আমি দেখি টুকুন ঘুমিয়েছে কিনা।"
রায়না ঘরের ভেতরে গেল।ধীরে ধীরে বিছানায় উঠে টুকুনের পাশে বসলো।টুকুন ঘুমিয়ে পরেছে।রায়না পরম মমতায় ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে গালে চুমু খেলো।তারপর ছেলেকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে বলল,
"ব্যাথা পেয়েছিস,বাবা?আর কখনো এভাবে মারবো না।"
তনয় মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগলো, আগাগোড়া মমতায় মোড়ানো একজন বাঙালি মাকে!
.
ঘড়িতে সকাল আটটা।আবরার নাস্তার টেবিলে বসে তুরার জন্য অপেক্ষা করছে।তুরা নাস্তা বানিয়ে অফিসের জন্য তৈরি হতে গেছে।আবরার রুটি ছিড়ে মুখে দিয়ে তুরাকে ডাকলো,
"তুরা,হলো তোমার?"
তুরার সাড়া পাওয়া গেল না।খানিকক্ষণ পর তুরা বেরিয়ে এলো।তুরার হাতে একটা ব্যাগ।খয়েরি রঙের সালোয়ার কামিজ আর খোলা চুলে তুরাকে ভীষণ সুন্দর দেখাচ্ছে।সে খানিকটা সাজগোজও করেছে।যদিও সে আজ প্রথম বার অফিসে যাচ্ছে,তবুও কোনো নার্ভাসনেস কাজ করছে না।সম্ভবত নিজের বাবার অফিস বলেই এমনটা হচ্ছে।
তুরা হাতের ব্যাগ পাশের চেয়ারে রেখে বসলো।আবরার বলল,
"তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও।তোমাকে অফিসে পৌঁছে দিয়ে তারপর আমি অফিসে যাবো।"
তুরার মন খারাপ হয়ে গেল।আবরার তার দিকে ভালো করে তাকালো না কেন?সে এত যত্ন করে সাজলো,আর আবরার কিনা দেখলোও না।কেমন লাগছে তাও বলল না।এমন কেন লোকটা?আবরারকে সরাসরি জিজ্ঞেস করে ফেললে কেমন হয়?অষ্টাদশী প্রেমিকাদের মতো লজ্জা লজ্জা মুখ করে "আমাকে কেমন লাগছে?" জিজ্ঞেস করলে কি আবরার তাকিয়ে দেখবে তাকে?তুরা একবার ভাবলো জিজ্ঞেস করেই ফেলবে।কিন্তু পরমুহূর্তেই সিদ্ধান্ত বদল করলো।নিজে থেকে যখন দেখে নি,তখন দেখার দরকারও নেই।
খাওয়া শেষ করে আবরার উঠে পরলো।তুরা তাড়াতাড়ি সব গুছিয়ে রাখতে শুরু করলো।
তারপর আবরারের পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
"তোমার ব্যাগে দুপুরের খাবার দিয়ে দিয়েছি।মনে করে খেয়ে নেবে।"
আবরার হেসে বলল,
"আর তোমার খাবার?"
"আমারটাও নিয়েছি।না নিলেও সমস্যা নেই।আজ যেহেতু আমি অফিসে যাবো,মা নিশ্চয়ই বাবাকে বেশি করে খাবার দিয়ে দেবে।"
আবরার হাসলো।তুরাকে কাছে টেনে এনে কপালে চুমু দিয়ে বলল,
"চোখে এত সুন্দর করে কাজল পরেছ কেন?"
তুরা খুশি হয়ে উঠলো।এর মানে হলো আবরার তাকে খেয়াল করেছে।পরক্ষণেই তার মন খারাপ হয়ে গেল।'কাজল' শব্দটা হঠাৎ তাকে তীর বিদ্ধ করে দিলো।তার দু'চোখ জলে ভরে উঠলো।
আবরার থতমত খেয়ে গেল।হুট করে কি বলে ফেললো!এবার কি করবে সে?প্রথমটায় কিছু বুঝে উঠতে পারলো না আবরার।তুরার চোখের কাজল ইতোমধ্যে লেপ্টে গেছে।
আবরার পকেট থেকে রুমাল বের করে তুরার চোখের জল মুছে দিলো,লেপ্টে যাওয়া কাজল ঠিক করে দিলো।তারপর কোমল গলায় বলল,
"সরি!প্লিজ কেঁদো না।"
তুরা আর্দ্র গলায় বলল,
"আমি ঠিক আছি।"
আবরার এবার তুরাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
"আমাদের কাজল আল্লাহর কাছ থেকে আমাদের কাছে এসেছিল।আবার আল্লাহর কাছেই সে ফিরে গেছে।আল্লাহ চাইলে আবার ও আসবে আমাদের কাছে।চলো না তুরা,আমরা আমাদের কাজলকে আবার এই পৃথিবীতে নিয়ে আসি।"
তুরার এবার লজ্জা করতে শুরু করলো।সে সরে এসে বলল,
"আব...দেরি হচ্ছে।চলো যাই।"
বলেই ব্যাগ হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেল।আবরারও মৃদু হেসে তুরার পিছু নিলো।
.
রিকশায় পাশাপাশি বসে আছে আবরার তুরা।সকাল বেলাতেই রাস্তায় ভিড় জমে গেছে।ঢাকা শহরের মানুষগুলোর প্রধান কাজই হলো যন্ত্রের মতো ছুটে চলা।এই যে সারাক্ষণ এত বিতিকিচ্ছিরি শব্দ,শহরটার কি ক্লান্ত লাগে না?
রিকশা ধীরে ধীরে সামনে এগোচ্ছে।তুরা বলল,
"তুমি আমার সাথে না গেলেও পারতে।তোমার দেরি হয়ে যায় যদি?"
আবরার স্বাভাবিকভাবে জবাব দিলো,
"হলে হবে।মাঝে মাঝে দেরি হলে তো অসুবিধা নেই কিছু।"
তুরা এবার ব্যাগ থেকে একটা চাবি বের করলো।আবরারের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
"এই নাও।এটা তোমার কাছে রাখো।"
আবরার ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো,
"কিসের চাবি?"
"দরজার চাবি।আর কিসের?"
আবরার বুঝতে পারলো না।বলল,
"আমাকে দিচ্ছো যে?"
"এখন থেকে একটা চাবি তোমার কাছে থাকবে,আরেকটা চাবি আমার কাছে।যদি আমার আগে তুমি বাড়ি ফিরে আসো তাহলে কি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে নাকি?"
আবরারের মুখ মলিন হয়ে গেল।এই ব্যাপারটা সে ভেবে দেখে নি।তুরা কি তার আগে বাড়ি ফিরবে না?সে কি বাড়ি এসে প্রথমেই তুরার মুখটা দেখতে পাবে না?
সে চাবিটা নিয়ে ব্যাগে রাখলো।মলিন গলায় বলল,
"তুরা,তুমি আমার আগে বাড়ি ফিরবে না?"
তুরা ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে বলল,
"আমি সেটাই চেষ্টা করবো।কিন্তু বিপদ আপদের কথা তো বলা যায় না।তাই চাবিটা নিজের কাছে রাখা ভালো।"
আবরারের কিঞ্চিৎ মন খারাপ হলো।প্রতিদিন বাড়ি ফিরেই তুরাকে দেখতে পায় সে।তুরা চা বানিয়ে তার পাশে এসে বসে।এটা রীতিমতো অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে।আচ্ছা?বাড়ি ফিরে তুরাকে দেখতে না পেলে কেমন লাগবে তার?
.
চলবে.......
Writer: Alo Rahman
