১৩
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। প্রচন্ড ভ্যাপসা গরম আর জ্যামকে উপেক্ষা করে আড়ংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে শ্রবণা। শীতুল ওভারব্রীজের ওপর থেকে শ্রবণাকে দেখে কয়েক মুহুর্তের জন্য চমকালো। শ্রবণার পড়নে একটা সুতি আসমানী রংয়ের শাড়ি । শ্যাম্পু করা চুল গুলো পিঠের উপর বিস্তৃত হয়ে আছে। শীতুল ধীরেধীরে ওর পাশে এসে দাঁড়াতেই শ্রবণা বললো, 'অনেক্ষণ ধরে ওয়েট করছি।'
- 'হুম। এই গরমে শাড়ি!'
শ্রবণা কিছুটা অবাক হওয়ার ভান করে বললো, 'কি অদ্ভুত লোক বাবা। একটা মেয়ে শাড়ি পড়েছে, তাকে কেমন দেখাচ্ছে সেটা না বলে উলটো বলছে এই গরমে শাড়ি।'
শীতুল ছেলেটা বরাবরই এরকম। সৌন্দর্যের থেকে পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর বিষয়টা ওর কাছে বেশি জরুরি। একগাল হেসে বললো, 'একজন মানুষ তোমাকে কেমন দেখাচ্ছে তারচেয়েও তোমার কমফোর্টের ব্যাপারটা চিন্তা করছে, সেটা কি সামান্য হয়ে গেলো?'
শ্রবণা কোনো উত্তর দিতে পারলো না। কিঞ্চিৎ ভ্রু ভাঁজ করে শীতুলের দিকে একবার তাকালো। শীতুলের গাল, গলা ঘেমে একাকার। কারো চেহারার ঘামও এতটা আকর্ষণ করতে পারে এটা জানা ছিলো না শ্রবণার। সে চোখ বড়বড় করে শীতুলের দিকে তাকিয়েই রইলো।
শীতুল হেসে বললো, 'নাহ, তোমাকে সুইট লাগছে। ঠিক আজকের সন্ধ্যার মতন।'
শ্রবণা তৎক্ষনাৎ জবাব দিলো, 'বারে, এই সন্ধ্যা আপনার সুইট মনে হচ্ছে? যা গরম রে বাবাহ।'
শীতুল দুষ্টুমি করে বললো, 'তাহলে ধরে নাও সিস্টেমে তোমাকে হট লাগছে বললাম।'
শ্রবণা ক্ষেপে চোখ পাকিয়ে শীতুলের দিকে তাকালো। যতটা দুষ্টু ধারণা করেছিলো, এখন বোধহচ্ছে তারচেয়েও বেশি। শীতুল দুষ্টুমি হাসি হেসে বললো, 'আবার রাগ কোরো না। আমি কিন্তু জাস্ট ফান করলাম। মানবাধিকার লংঘন করিনি।'
শ্রবণা হেসে বললো, 'ঠিক আছে বাবা সমস্যা নেই। আন্টি কেমন আছে?'
দুজন মিলে টুকটাক কথা বলতে বলতে হাঁটতে শুরু করলো। শ্রবণা পিছন দিক দিয়ে শাড়ির আঁচল টেনে নিয়ে ধরে রেখেছে। আরেকহাতে মাঝেমাঝে কুঁচি ধরে সামলিয়ে হাঁটছে। শীতুল বিষয়টা সুক্ষ্মভাবে খেয়াল করলেও শ্রবণাকে বুঝতে দেয় নি।
শীতুল ওর কয়েকজন বন্ধুর সাথে শ্রবণার পরিচয় করিয়ে দিলো। পাঁচজন ছেলের সাথে দুজন মেয়েও আছে। সবার সাথে কুশল বিনিময় করার পর সংসদ ভবনের সামনে ফুটপাতে বসে ফুচকা ও পেয়ারা খাওয়া হলো। শীতুলকে আজ অনেক হাস্যোজ্জ্বল দেখাচ্ছে। এতটা উৎফুল্লতার কারণ বুঝতে পারছে না শ্রবণা। বারবার আড়চোখে শীতুলের দিকে তাকাচ্ছিলো ও। শীতুল যখন কথা বলে, অন্যদিকে তাকিয়ে থেকেও গভীরভাবে ওর কথাগুলো অনুভব করতে থাকে শ্রবণা। শীতুল আশেপাশে থাকলেই ওর অন্যরকম এক ধরণের অনুভূতি হয় যার উপস্থিতি টের পেলেও বিষয়টা ব্যাখ্যা করার সাধ্য নেই শ্রবণার। এ এক অদ্ভুত যন্ত্রণাময় অনুভূতি। আবার একইসাথে সমান ভালোলাগা ও।
সবাই মিলে গান ধরলে শ্রবণা মুগ্ধ হয়ে শুনছিলো। আজ বহুদিন পর নিজেকে পরিপূর্ণ মনে হচ্ছে। জীবনে বন্ধুদের অবদান অনেক। বন্ধু ছাড়া সবকিছু থেকেও ফাঁকা ফাঁকা লাগে। এই শহরে এত মানুষ অথচ একজন কথা বলার মানুষের বড্ড অভাব শ্রবণার। আজকে মনেহচ্ছে, না; কথা বলার জন্য অনেকেই আছে। শীতুলের বন্ধুরা ওর সাথে এত সহজে মিশে যাবে এটা ভাবতেও পারেনি শ্রবণা। আড্ডা ও গান বাজনা চলতেই লাগলো। রাত যখন সাড়ে নয়টার মতন, এলোমেলো বাতাস বইতে শুরু করলো। শহরের ভ্যাপসা গরম থেকে খানিকটা স্বস্তি মিলবে এই আশায় সবার মুখে দেখা গেলো স্বস্তির হাসি। গানের ফাঁকে আয়াশ কয়েকবার শ্রবণার সাথে গল্প জমানোর চেষ্টা করেছিলো কিন্তু পাত্তা পায়নি। শ্রবণা তো গভীর মনোযোগ দিয়ে শুধু শীতুলকেই অনুভব করছে।
গান গাইছে শীতুলের বন্ধু পিয়াস। সবাই সাথে সুর মিলাচ্ছিলো। কয়েকজন ছেলে মেয়ে দূর থেকে ওদের গান শুনছে। কেউ আবার ওদের পাশে জটলা বেঁধে দাঁড়িয়ে গান শুনছে। শহুরে ছেলেমেয়েরা অবশ্য ফিরেও তাকাচ্ছে না। কে কোথায় বসে গান গাইছে, কে কাকে জড়িয়ে ধরে হাঁটছে এসব ছোটখাটো বিষয়ে নজর রাখার অভ্যাস শহুরে ছেলেমেয়ে দের একেবারেই নেই। সবাই একটা 'ডোন্ট কেয়ার' ভাব নিয়ে চলে। কিন্তু শীতুলের বন্ধুরাও শহুরে হলেও শ্রবণা এখনো ওদের মাঝে কোনো আলগা ভাবের রেশ দেখে নি। হয়তো বন্ধু বলেই।
- 'কি ভাবছো?'
শ্রবণা চমকে উঠে খেয়াল করলো শীতুল ওর পাশে বসে হাঁটুতে হাত রেখে, গালে হাত দিয়ে কেবল ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। লজ্জা নামক বস্তুটা যে শ্রবণার মাঝেও আছে সেটা এখন হারে হারে টের পেলো ও। নিজেকে আজকে পরিপূর্ণা মনে হচ্ছে। লাজুক হেসে বললো, 'ভাবছি আজকের সন্ধ্যাটা অনেক সুন্দর।'
- 'বলেছিলাম না তোমার মত সুইট। পাত্তাই দাও নি আমার কথায়।'
- 'চলুন না ওদিক টায় একবার হেঁটে আসি। বাতাসের ঝাঁপটায় নিশ্চয়ই অনেক বকুল ফুল পড়েছে। যাবেন?'
- ' এমনিতে বললে যেতাম না। বকুল ফুলের লোভনীয় ঘ্রাণ তো মিস করা যায় না।'
- 'তাহলে চলুন না প্লিজ।'
শীতুল উঠে দাঁড়ালো। আয়াশকে বললো, 'দোস্ত চল একটু হেঁটে আসি।'
শ্রবণা অপ্রস্তুত বোধ করছে। এটা কিছু হলো? আয়াশকে তো সাথে নেয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। শীতুলের সাথে আলাদা করে কিছু সময় কথা বলার মাঝে যে প্রশান্তি আসবে, আয়াশ সাথে থাকলে তার সমপরিমাণ বিরক্তি আসবে। দুজনের মাঝখানে একজন তৃতীয় ব্যক্তি কেন! উফফ।
শ্রবণা কিছু বলতে পারলো না। কি ই বা বলে আটকানো যেতে পারে। শীতুলকে রেখেই হাঁটতে শুরু করলো ও। মনেমনে রাগ হচ্ছে। এতক্ষণ বন্ধুদের সাথে বসে আড্ডা দেয়ার পরেও হয়নি? আবার একজনকে ডেকে নিয়ে হাঁটতে হবে। মনটা যে চায় সারাক্ষণ শুধু শীতুলকেই সামনে বসিয়ে রেখে তাকিয়ে থাকি।
শ্রবণার পাশে শীতুল হাঁটছে। শ্রবণা পিছন ফিরে তাকিয়ে আয়াশকে দেখতে না পেয়ে ভীষণ অবাক হলো। জানতে চাইলো, 'উনি আসলেন না?'
- 'না। ঊর্মী জোর করে ওকে বসিয়ে রাখলো।'
শ্রবণা অট্টহাসি হেসে সামনে আসা চুলগুলো এক ঘটকায় পিছনে পিঠের উপর ছুড়ে মেরে হাসতেই লাগলো। শীতুল অবাক বিস্ময়ে ওর হাসি দেখছে। মেয়েটা হাসছে কেন এভাবে!
শ্রবণা বললো, 'খুব মজা পেয়েছি।'
- ‘কিন্তু আমি তো মজা দেয়ার মত কিছু বলি নি।'
- 'হা হা হা। তাও পেয়েছি। ঊর্মি আয়াশকে ছাড়লো না কেন?'
- 'আয়াশ ছাড়া গান জমে না সে কারণে। তুমি কি ভেবেছো ঊর্মি আয়াশকে পাশে বসিয়ে রাখার জন্য ছাড়ে নি? হাও ফানি ইয়ার। হা হা হা।'
শ্রবণা মুখ কাচুমাচু করে শীতুলের দিকে তাকালো। আহা এভাবে কেউ ইনসাল্ট করে নাকি? কি অদ্ভুত ধরণের ফাজিল এই লোকটা। শ্রবণার মুখের হাসি মিলিয়ে গেছে।
শীতুল হাসি থামিয়ে বললো, 'আজকের সন্ধ্যাটা অসম্ভব ভালো কাটিয়েছি। বহুদিন পর ফ্রেন্ডদের সাথে আড্ডা। এই এক সপ্তাহ আমি একটা অন্যরকম ঘোরের মাঝে ছিলাম। আজ মনে হচ্ছে বাস্তবে ফিরে এসেছি।'
শ্রবণা কি ভেবে যেন আশার আলো দেখতে পেলো। কথাটা আনন্দ পাবার মত কিছুই না। কিন্তু ওর অদ্ভুত আনন্দ হচ্ছে। হঠাৎ করে প্রশ্ন করেই বসলো, 'আচ্ছা তাহলে আপনি বুঝতে পেরেছেন। যাক বাবা। এখন তাহলে নতুন কিছু ভাবুন।'
শীতুল ভ্যাবাচেকা খেয়ে বললো, 'সরি, তুমি কিসের কথা বলছো?'
শ্রবণা কি বলতে কি বলে ফেলেছে ভেবে লজ্জিত হলো। ধেৎ কি যে করে না মেয়েটা। হেসে বললো, 'প্রেমিকার ভূতটা মাথা থেকে নেমেছে না? সেটাই বললাম। এবার তাহলে নতুন করে কিছু ভাবুন।'
শীতুল একটা নিশ্বাস ফেলে বললো, 'ভূত! সে কি আর নামবে? আরো বেশি করে মাথায় চেপে বসেছে। আগে ছিলো ঘোর, এখন তাকে বাস্তবে সত্যিকারে পাওয়ার নেশা চেপেছে। যেভাবে হোক তাকে তো..
শ্রবণা শীতুলকে থামিয়ে দিয়ে বললো, 'প্লিজ আপনার প্রেম কিংবা প্রেমিকা নিয়ে আমার সামনে কিছু বলবেন না।'
- 'কেন? সমস্যা কি? তুমি আমার ফ্রেন্ড না?'
শ্রবণা কি উত্তর দেবে ভেবে না পেয়ে বলে ফেললো, 'প্রেম ভালোবাসায় আমার এলার্জি আছে। আমি এসব নিতে পারি না। আমার জাস্ট অসহ্য লাগে। দয়া করে এসব আর আমার সামনে বলবেন না।'
শীতুল একটা বেঞ্চির উপর বসতে বসতে বললো, 'আচ্ছা বলবো না। তোমরা বোধহয় একটু বেশি আপডেটেড হয়ে গেছো। প্রেমে তোমাদের বিশ্বাস নেই। অথচ আমার প্রেয়সী এখনো সেই পুরনো আমলের প্রেমিকা টিই রয়ে গেছে। যাকে ফিল করে করে আমিও শিখেছি ভালোবাসাটা আসলে কি!'
শ্রবণার গায়ে বিষের মত লাগলো কথাগুলি। জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে যেন। বললো, 'কি করে আপনার প্রেমিকা?'
- 'তা তো জানিনা। তবে সুন্দর একটা মন আছে তার।'
- 'দেখতে নিশ্চয়ই খুব সুন্দর?'
- 'তাও জানিনা। জানবো কি করে? আমি তো তাকে দেখিই নি।'
- 'দেখেন নি? তাহলে প্রেমে পড়লেন কিভাবে?'
- 'শুধু কি চেহারা দেখে প্রেম হয় রে পাগলী? তার মনটাকে জেনেছি যে। তার ধ্যান ধারণা, সাধনা, ভালোবাসা সবটা জানি যে।'
শ্রবণা'র মেজাজ খারাপ হলেও সামলে রেখেছে। বললো, 'পরিচয় কি তাহলে ফেসবুকে? নাকি রং নাম্বারে?'
শীতুল হেসে বললো, 'সে এক অদ্ভুত কাহিনী। তুমি শুনলে আমাকে পাগল বলবে। অবশ্য মাঝেমাঝে নিজেরই মনেহয় আমি পাগল হয়ে গেছি। “প্রত্যেকেই তার জীবদ্দশায় কোনো না কোনো সময় পাগলের ন্যায় আচরণ করে”, উক্তি টার প্রমাণ পাচ্ছি।'
শ্রবণা আর কোনো প্রশ্ন করলো না। মন খারাপ হয়ে যায় এসব শুনলে। যাকে নিয়ে এত বছর সাধনা করে এসেছে, আজকে সে বলছে অন্য কারো সাধনার কথা। কি অদ্ভুত সময়!
শীতুল বললো, 'শুনবে আমার প্রেয়সীর গল্প? আমি কিভাবে তার প্রেমে পড়েছি, কেন পড়েছি শুনবে?'
শ্রবণা শীতুলকে থামিয়ে দিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে বললো, 'না। এসবে আমার এলার্জি আছে। ভালো লাগে না এসব প্রেম টেম। প্লিজ…'
শীতুল আর কিছু বললো না। শ্রবণা মনেমনে কষ্টে ডুবে যাচ্ছে আর বলছে, ‘আমি তোমাকে তোমার প্রেমিকার চেয়েও আরো পুরনো ধাচে ভালোবাসি শীতুল। জানিনা সে কেমন কিন্তু আমি তোমাকে নিয়ে অনেক গুলো বছর যাবত কল্পনা করে এসেছি। সময় আদৌ অনুকূলে আসবে কিনা আমি জানিনা। শুরু থেকেই তোমার আমার মাঝে এক দৃঢ় দূরত্ব বেঁধে দিয়েছে যেন।'
ভাবতে ভাবতে একটা দীর্ঘশ্বাস!
শ্রবণাকে মন খারাপ করে বসে থাকতে দেখে শীতুল ভাবলো, মেয়েদের সহজাত বৈশিষ্ট্য'র মধ্যে একটি হচ্ছে কথায় কথায় মন খারাপ করা। শীতুলেরও তো কষ্ট আছে, কই মন খারাপ করে বসে থেকে সময় নষ্ট করার তো কোনো মানে হয় না।
এমন সময় বাতাসের ঝাঁপটা এসে লাগলো। ভ্যাপসা গরমের মাঝে এরকম দমকা খাওয়া খুবই দরকার ছিলো। শ্রবণা অভিভূত হয়ে সামনে তাকিয়ে বললো, 'উফফ অবশেষে!'
- ' হে পবন, তুমি বয়ে যাও বয়ে যাও। আমার প্রিয় শ্রবণার মন ফুরফুরে করে দাও হে দখিণা হাওয়া।'
শ্রবণা হেসে বললো, 'কি যে বলেন!'
- 'আমি তোমার বন্ধু না? মাঝখান থেকে আপনি টা সরিয়ে তুই কিংবা তুমিতে চলে আসো।'
- 'তুই করে বলতে আমার সংকোচ লাগবে।'
- 'তাহলে তুমিটাই চলুক।'
দুজনে মিলে পরিবেশ নিয়ে কথা বলছিলো। শীতুল হঠাৎ উঠে গিয়ে বকুল ফুল কুড়িয়ে দুহাত ভরে এনে শ্রবণার সামনে হাঁটুগেরে বসলো। দুহাতে ফুলগুলো শ্রবণার হাতে তুলে দিয়ে বললো, 'গ্রহণ করো হে প্রিয়, বকুলের মালা করে গলায় ঝুলিয়ে রেখো আমায়। শুকিয়ে গেলেও ফেলে দিও না যেন, পরম যত্নে হাতে পেঁচিয়ে রেখো।'
শ্রবণা দুহাতে ফুল নিতে নিতে শীতুলের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো। এত কাছ থেকে শীতুলের চোখ দেখে কোথায় যেন ঢিপঢিপ করতে আরম্ভ হয়ে গেছে। শ্রবণা তাকিয়ে থাকতে পারছে না। শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠছে। এই বুঝি দুম করে মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। ঘোর ঘোর লাগছে ভীষণ। শীতুল একটা ধাক্কা দিয়ে বললো, 'এই শ্রবণা..'
শ্রবণা চমকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলো। মাথা চুলকে বললো, 'সরি শীতুল, সরি সরি।'
- 'তুমি ঠিক আছো?'
- 'শীতুল আই লাভ ইউ।'
- 'কিহ!'
শীতুল আচমকা এমন কথায় বড়সড় ধাক্কা খেয়ে গেলো। চোখ মুখে বিস্ময় নিয়ে শ্রবণার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। শ্রবণা চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করছে। দুম করে এই কথা বলে ফেলবে এটা ও নিজেই বুঝতে পারে নি। হঠাৎ এরকম কেন হলো কে জানে!
শীতুল শ্রবণার পাশে ধপ করে বসে পড়লো। শ্রবণা এবার মাটিতে বসে শীতুলের মুখের দিকে তাকিয়ে হাত দুটো পরম আবেশে ধরলো। তারপর নরম গলায় দ্রুত বলতে লাগলো, 'প্রথম দেখেই আমার মনে হয়েছে তুমি আমার স্বপ্নের রাজকুমার। আমার ভালোবাসার মানুষটা নিয়ে বিশাল বড় ফ্যান্টাসি ছিলো আর সেই মানুষটা যে তুমিই, তোমাকে প্রথমবার দেখে আমার মন এটাই বলেছে। আমি বোধহয় তারপর থেকে অসুস্থ হয়ে গেছি। কি কি পাগলামি করে ফেলেছি তুমি তো জানো।'
এতটুকু বলতে বলতে শ্রবণা হাঁফাতে শুরু করলো। জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে নিতেও ওর যেন দম আটকে আসছিলো। তারাহুরো করে বললো, 'আমি তোমাকেই ভালোবাসি। হ্যাঁ, শুধুমাত্র তোমাকেই ভালোবাসি। আমার নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসি। প্রচন্ড প্রচন্ড প্রচন্ড ভালোবাসি শীতুল।'
কথাটা বলতে বলতে শীতুলের হাতের উপর মুখ চেপে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। শ্রবণার পুরো শরীর কাঁপছে। শীতুল পুরোপুরি স্তব্ধ। এরকম পরিস্থিতির জন্য সে একটুও প্রস্তত ছিলো না। মাথার ভিতর যেন বনবন করে ঘুরছে। শ্রবণা মুখ তুলে একবার তাকালো, তারপর উঠে শুরু করলো একটা ভোঁ দৌড়। কেন যে ছুটছে নিজেও জানেনা, ছুটে কোথায় যাচ্ছে তাও জানেনা। খামারবাড়ির দিকে ছুটতেই লাগলো। শীতুলের মনে হচ্ছিলো মেয়েটা একা একা যেতে পারবে না, হয়তো দুম করে উষ্ঠা খেয়ে পড়ে যাবে। তবুও শীতুল উঠতে পারলো না। থ মেরে বসে রইলো।
১৪
বন্ধুবান্ধবরা শীতুলকে দেখে নানান প্রশ্ন করতে আরম্ভ করেছে। কিন্তু শীতুল কারো সাথে একটা কথাও না বলে শুধু বললো, 'আমার কিছু ভালো লাগছে না। আমি বাসায় যাবো।'
সবাই কৌতুহল ভরা চোখে শীতুলকে দেখছিলো। ওর মুখ দেখে শ্রবণার কথা জিজ্ঞেস করার সাহস কেউই পেলো না। শীতুল আস্তে আস্তে হাঁটা ধরলো। হাঁটার সময় আনমনে কি ভাবছিলো তা নিজেও বুঝতে পারছে না।
এদিকে শ্রবণা খামারবাড়ি পর্যন্ত দৌড়ে এসে রিক্সা নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় শ্রবণার গালে জল চিকচিক করছিলো। মাঝেমাঝে হাত দিয়ে গাল মুছছে মেয়েটা।
বাসায় ফিরে শীতুল অনেক্ষণ শাওয়ারের নিচে বসে রইলো। বেরিয়ে এসে রুমের লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়লো বিছানায়। অনেক্ষণ ঝিম মেরে শুয়ে থাকতে থাকতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লো।
ঘুম ভাংলো রাত দেড়টায়। টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে শ্যামলতার ডায়েরিটা বের করলো শীতুল। কয়েকটা পৃষ্ঠা উল্টিয়ে একটা চিঠি বের করে পড়তে আরম্ভ করলো,
প্রিয় অসুখ,
আচ্ছা, আমার করা পাগলামি গুলো তোমার কেমন লাগবে? এই ধরো, কখনো রিক্সা থেকে নেমে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে রাস্তায় জ্যাম সৃষ্টির কারণ হলাম। ট্রাফিক পুলিশ এসে প্রশ্ন করলে তোমাকে জাপটে ধরে বলতাম, 'আমি এই ছেলেটাকে ভালোবাসি আংকেল।' পুলিশ ভ্যাবাচেকা খেয়ে আমাদের দুজনকে বেঁধে থানায় পাঠিয়ে দিতো। হি হি হি, খুব মজা হতো তাই না? প্রেমের দায়ে জেলে। না থাক, তোমার আবার জেলে যেতে ভয় লাগতো। এরকম পাগলামি করবো না যাও। শুধু ভালো বাসবো, ভালোবাসবো আর ভালোবাসবো। হবে তো? কিরকম করে বাসলে তোমাকে ঘায়েল করা সম্ভব বলো তো? আহা বলো না? চোখে কাজল, কপালে টিপ, লম্বা চুলে কাঠগোলাপ। হবে? আচ্ছা তোমার কাঠগোলাপ ভালো লাগে? আজ আমার চিঠি লেখায় মন নেই। আজকে ভীষণ একা একা লাগছিলো। মাঝেমাঝে নিজেকে এত একা লাগে যেন আমি এই সমাজের বাইরের কেউ। আমার কেন কোনো বন্ধু নেই? আমাকে কেন কেউ ভালোবাসে না? ভালো লাগছে না, কিচ্ছু না।
এখানেই শেষ হয়ে গেছে চিঠিটা। খুব সাধারণ অগোছালো একটা চিঠি। চিঠিটা লেখার সময় শ্যামলতার খুব মন খারাপ ছিলো এটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। এরকম অগোছালো চিঠি ও খুব কম লিখেছে। পড়তে পড়তে শ্রবণার চেহারাটা ভেসে উঠছিলো। শ্যামলতার চিঠিটা যেন শ্রবণারই হাতে লেখা। কেন এরকম হ্যালুসিনেশন হচ্ছে বুঝতে পারছে না শীতুল। যতবার চোখ বন্ধ করছে ততবারই শ্রবণার মুখ ভেসে উঠছে। মেয়েটা দুঃখী দুঃখী মুখে বসে আছে। শীতুলের ইচ্ছে করছে ওর একাকীত্ব ঘুচিয়ে দিতে কিন্তু পারছে না। এ কেমন যন্ত্রণা!
শীতুল নিজের ওয়ালে ঢুকে চিঠির কমেন্ট গুলো পড়তে শুরু করলো। অনেক শেয়ার হয়েছে কিন্তু কোনো লাভ হয় নি। এখনো ডায়েরির মালিকের কোনো খোঁজ পাওয়া গেলো না। উলটো মানুষের হাসির পাত্র ভালোমতো হওয়া গেলো। একটা বড় নিশ্বাস ফেলে ফোনটা পাশে রেখে দিলো শীতুল।
এমন সময় মনে হলো মেসেঞ্জারে নতুন মেসেজ রিকুয়েষ্ট এসেছে। একবার চেক করে নেয়া যাক। একটা মেয়ে আইডি, নাম Ondrila anita.। মেসেজটা দেখে বড়সড় ধাক্কা খেয়ে গেলো শীতুল। মেয়েটা লিখেছে,
Amr dairy haray gaca. Ami wnk bocor teke tmk neye vabci. Amar dairy te sb kicu like raktam. Ami tmk kub balobasi. Pls tmi amr pn e call daw. Ami tmk kub balobasi. Pls pls pls. Amr nmbr- 01840……
নাম্বার দেখে শীতুলের বুকের ভেতর ঢিপঢিপ শুরু হয়ে গেলো। অবশেষে শ্যামলতাকে পাওয়া গেছে! কিন্তু একটা জিনিস দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেছে। শ্যামলতার বাংলা বানানে কোনো ভুল ছিলো না, হাতের লেখাও অসাধারণ সুন্দর, আর শব্দেও মাধুর্যতা কিংবা পাগলামি ছিলো। এই মেসেজের বানান দেখে ভাষাই বুঝতে কষ্ট হচ্ছে শীতুলের। তবুও উত্তেজিত হয়ে তারাতাড়ি কল দিলো সেই নাম্বারে । ওপাশ থেকে একটা মেয়ে রিসিভ করে বলল, 'হ্যালো..'
কণ্ঠ শুনে হতাশ হলো শীতুল। শ্যামলতার কণ্ঠ মনে মনে যেমন শুনেছিলো, এটা মোটেও সেরকম নয়। খটকা লাগলো এসে। তবুও কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কে বলছেন?
- 'আপনি কে? এত রাতে মেয়েদেরকে ডিস্টার্ব করে আবার জিজ্ঞেস করছেন কে বলছে?'
- ‘আপনার নাম কি?'
- 'কুত্তার বাচ্চা আবার নাম জিগাস? পুদনের জন্য কল দিছিস বাইন… শালার ব্যাটা ফোন রাখ।'
শীতুলের ভয়ানক রাগ হলো। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, 'আমি একটা প্রশ্ন করেছি। নিজের লিমিট ক্রস করে ফেলবেন না আপনি। আপনার মত বেয়াদব মেয়ে শ্যামলতা কেন, হাজারটা শ্যামলতার গুন নিয়ে জন্মালেও আমি ভালোবাসতাম না। যত্তসব।'
- 'কিসের শ্যামলতা? কে আপনি?'
- 'আমি শীতুল। আমাকে এই নাম্বারটা দেয়া হয়েছিলো মেসেঞ্জারে।'
- 'মেসেঞ্জারে? হারামির পুত মাজরাইতে কল দিয়ে ফালতামো মারোস? জুতাইয়া তোর কথা বলার হাউস মেটামু খাড়া।'
শীতুল প্রচন্ড রাগে ফোন কেটে দিলো। ধেৎ, মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেছে। নিশ্চয় কেউ ইচ্ছেকৃত ভাবে এরকমটা করেছে। বন্ধুদের মধ্যে কেউ তো হবেই। এত বড় ফাজলামো করার সাহস কার হবে? ছিহ, নিজের উপরই রাগ হচ্ছে।
ওই নাম্বার থেকে আবারো কল আসলো। শীতুল রাগ সংবরণ করে ফোন রিসিভ করে বললো, 'হ্যালো।'
- 'শীতুল। সরি সরি শীতুল। আসলে আমি বুঝতে পারিনি, হঠাৎ ঘুম ভাঙিয়ে এত রাতে কল তাই ওভার রিয়েক্ট করে ফেলেছি। প্লিজ, ফরগিভ মি।'
শীতুলের ভ্রু কুঁচকালো। একটা মেয়ে কিভাবে এতটা ন্যাকামি মিশিয়ে কথা বলতে পারে এটা জানা ছিলো না শীতুলের। কথায় যে পরিমাণ ন্যাকামি মিশে আছে, তাতে বদহজম হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এটা যে শ্যামলতা নয় সেটা পুরোপুরি নিশ্চিত শীতুল।
তবুও জানতে চাইলো, 'আচ্ছা তোমার নাম কি?'
- 'অন্দ্রিলা।'
- 'চিঠিতে কি নাম লিখেছিলে?'
- 'ইয়ে.. শীতুল তুমি কেমন আছো? আমাকে চেনোনি? আমার কণ্ঠ শুনে বুঝতে পারছো না আমিই তোমার সেই।'
- 'হুম পেরেছি, ভালোভাবেই পেরেছি। তোমার নামটা শুনি?'
- 'শীতুল, আমি তোমাকে অন্নেক ভেবেছি। প্রত্যেকদিন তোমাকে নিয়ে ভেবেছি।'
- 'ওহ আচ্ছা। প্রত্যেকদিন আমাকে নিয়ে ভেবেছেন তাই না? খুব ভালো। তো ডায়েরিটা হারিয়েছিলেন কোথায়?'
- 'এটা তো ঢাকায় হারিয়েছি।'
- 'আচ্ছা। ঢাকা থেকে ডায়েরিটা হেঁটে হেঁটে রাঙামাটিতে গিয়েছে তাই না?'
- 'উমম, একচুয়েলি আমি রাঙামাটির নীলগিরিতে বেড়াতে গিয়েছিলাম কয়েকদিন আগে। তখন হয়তো হারাতে পারে। আমি রাইট বলতে পারছি না। ঢাকায় এসে ব্যাগে দেখি ডায়েরি নেই।'
- 'তুমি শিওর এটা তোমার লেখা চিঠি?'
- 'শিওর হবো না? আমি নিজের লেখা চিনবো না? আমিই লিখেছি এটা তোমাকে।'
- 'ওহ আচ্ছা। তাহলে কাল দেখা করো? দেখা করে আমাকে তোমার করে নাও।'
মেয়েটা খুশিতে লাফাতে শুরু করেছে। শীতুল তারাহুরো করে ফোন কেটে দিলো। এত রাগ হচ্ছে যে সামনে যা দেখছে ভেঙে ফেলতে ইচ্ছে করছে। নীলগিরি নাকি রাঙামাটিতে। এই মেয়েকে থাপ্পড় দিয়ে সব দাঁত ফেলে দিতে ইচ্ছে করছে। দেখা হলে বুঝিয়ে দেবে মিথ্যে নিজেকে শ্যামলতা দাবী করার শাস্তি কত কঠিন হতে পারে। এই অপরাধ কোনোভাবেই ক্ষমা করবে না শীতুল।
আয়াশের নাম্বার বের করে ওকে কল দিয়ে নিজে থেকেই বলতে লাগলো, 'ঘুমাইছিলি দোস্ত? আমার এত্ত রাগ উঠছে। নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছি না। জানিস কি হইছে? একটা মেয়ে মেসেজ দিয়ে নিজেকে আমার প্রেমিকা হিসেবে দাবি করছে। কি ফালতু।'
ওপাশ থেকে একটা ঘুম জড়ানো মায়াবী কণ্ঠস্বর শোনা গেলো, ‘আপনি বোধহয় আয়াশকে ফোন করতে গিয়ে ভুলে আমাকে কল দিয়েছেন।'
শীতুল চমকে উঠলো। ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখলো সত্যিই, শ্রবণাকে কল দিয়ে ফেলেছে। এরকম ভুল হওয়ার তো কথা নেই। হয়তো শ্রবণার কথা অবচেতন মনে ঘুরছিলো তাই এমন হয়েছে। শিট!
শ্রবণা একটা জোরে নিশ্বাস ফেলে চুপ করে রইলো। সেই নিশ্বাসের শব্দ ছুড়ির মত বিঁধলো শীতুলের বুকে। কেমন যেন ঘোর লাগতে শুরু করেছে। শীতুল ঘোরের মাঝে বলে ফেললো, ‘তোমার নিশ্বাসের শব্দটা অনেক ধারালো।'
চমকে উঠলো শ্রবণা। কল্পনায় প্রিয় অসুখ এ কথা ওকে বলেছিলো। এই একই কথা শীতুল কিভাবে বলতে পারে! মিল হলে এতটাই হতে হবে যে ডায়ালগ পর্যন্ত শীতুল জানে। অদ্ভুত!
চলবে...
Writer:- মিশু মনি