শ্রবণার ঘুম জড়ানো কণ্ঠ আর ধারালো নিশ্বাসের শব্দ বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো শীতুলের কানে, বুকে, সমস্ত শরীরে। শিহরিত হয়ে শীতুল বললো, 'তুমি এমন কেন? আমার সাথেই কেন এমন করছো?'
শ্রবণা অবাক হয়ে জানতে চাইলো, 'আমি আবার কি করলাম?'
শীতুল বললো, 'না কিছু না। সরি তোমার ঘুম ভাঙানোর জন্য।'
- 'হুম।'
'হুম' বলার পর চুপ করে রইলো শ্রবণা। শীতুল বলার মত কিছু খুঁজে পেলো না। কিন্তু খুব করে শ্রবণার কথা শুনতে ইচ্ছে করছিলো। এমন কেন হচ্ছে কে জানে। মন কেমনের অনুভূতি গুলো বোঝা বড় কঠিন। একদিকে শ্যামলতার জন্য দুশ্চিন্তা, অন্যদিকে শ্রবণার কাছে আসতে চাওয়া, দুটো মিলিয়ে একটা মানসিক যন্ত্রণা তৈরি হয়েছে। শীতুল অন্য রকম একটা ঘোরের মাঝে চলে যাচ্ছে যার দিক কিংবা ইশারা কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না।
শ্রবণার আরেকটা ধারালো নিশ্বাসের শব্দে শীতুল বাস্তবতায় ফিরে এসে বললো, 'প্লিজ শ্রবণা, প্লিজ।'
- 'কি?'
- 'ভালো থেকো, বাই।'
সাথে সাথেই ফোন কেটে দিলো শীতুল। শ্রবণা'র চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এলো। নিঃশব্দে সেই জল মুছলো শ্রবণা৷ এ কান্নার কারণ, অর্থ, সমাধান কেউ জানেনা। কিন্তু তিনটারই একটাই উত্তর- শীতুল। বুকের বোবাকান্না অশ্রু হয়ে নিরবে গড়িয়ে পড়তে লাগলো। আর কিচ্ছু তো করার নেই।
কত রাত এভাবে কেঁদেছে নিজেও জানেনা শ্রবণা। দেখতে দেখতে কয়েকটা দিন কেটে গেলো। এর মাঝে একবারও কথা হয়নি শীতুলের সাথে। কেউ কাউকে একবারও ফোন করেনি। শ্রবণার বুক ফাটলেও এ দহন কেউ দেখে নি। সারাদিন ফোন দূরে ফেলে রেখে নিজের মত সময় কাটাচ্ছিলো শ্রবণা। কয়েকদিন প্রচন্ড কষ্ট হলেও ধীরেধীরে রাতগুলোতে যন্ত্রণা কমে আসতে শুরু করেছে। গত কয়েকটা রাত একটুও ঘুমাতে পারেনি শ্রবণা। এমনকি খাওয়া দাওয়াও ঠিকমতো করতে পারেনি। একা থাকার দরুন কেউ জোর করে খাওয়ানোর মত ছিলো না।
১৫
কয়েকদিন পর আজ বাইরে বের হয়েছে শ্রবণা। বাজার করতে হবে। আপনমনে হাঁটছিলো ফুটপাত ধরে। হঠাৎ কেউ একজন শ্রবণার নাম ধরে ডাকলো। পিছন ফিরে ব্যক্তিটিকে খোঁজার চেষ্টা করলো শ্রবণা। দেখলো কাউন্টার থেকে বেরিয়ে আসছেন শীতুলের মা।
উনি কাছে এগিয়ে এসে শ্রবণাকে বললেন, ‘কেমন আছো মা?'
শ্রবণা মাথা ঝাঁকালো, 'জ্বি আন্টি ভালো। আপনি?'
- 'আছি। তোমার চেহারার এই অবস্থা কেন? মাত্র কয়দিনেই একেবারে কেমন চুপসে গেছো। চোখের নিচ দেবে গেছে, কালো হয়ে গেছো। মা গো কি হাল হয়েছে চেহারার।'
শ্রবণা হাসার চেষ্টা করে বললো, 'ঠিক হয়ে যাবে আন্টি।'
আন্টি শ্রবণাকে নিয়ে এসে বাস কাউন্টারের ভেতরে বসলেন। গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে খেয়াল করছিলেন শ্রবণাকে। শ্রবণার মুখ শুকিয়ে গেছে, চোখ ফোলা ফোলা। চোখের নিচটা নিচু হয়ে বসে গেছে, চুল এলোমেলো। এরকম দেখানোর কারণ বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন উনি।
শ্রবণা বললো, 'কোথাও যাচ্ছেন আন্টি?'
- 'হ্যাঁ মা। শীতুলের সাথে কথা হয় না তোমার?'
- 'না। বোধহয় বারো দিন হয়ে গেছে কথা হয় নি।'
- 'ওহ। শীতুল একটা ঝামেলায় আছে। এই পাগল ছেলেকে নিয়ে আমি কি যে করবো।'
শ্রবণা অবাক হলেও চেহারার কোনো পরিবর্তন দেখা গেলো না। যেন অবাক হওয়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে ও। আন্টির দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো।
আন্টি বললেন, 'শীতুল একটা মেয়েকে খুব ভালোবাসে বুঝছো। সেই মেয়েকে পাওয়ার জন্য কত কি যে করছে। অথচ মেয়েকে এখনো নিজ চোখে দেখেনি পর্যন্ত। তাও কিসের জন্য এত পাগল আমি বুঝি না।'
শ্রবণার কোনো ভাবান্তর নেই। আন্টি কি বলছেন শুনেও যেন শুনছে না। কষ্ট বাড়ানোর সুযোগ নেই, মনটা এতটাই খারাপ যে নতুন করে আর মন খারাপ হবার অবস্থা নেই। শ্রবণা সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে আছে।
আন্টি বললেন, 'এর আগে এক মেয়ে নক করে বলেছিলো সে ওর প্রেমিকা। ওই মেয়ের সাথে দেখা করে ইচ্ছেমতো ঝাড়ি দিয়েছে। মেয়েটা নিজের এলাকার ছেলেপেলে ডেকে আচ্ছা করে মারধোর করেছে শীতুলকে। গত পরশু হসপিটাল থেকে রিলিজ পেয়ে আমাদের গ্রামের বাসায় বেড়াতে গেছে। শহরের নির্জনতা ওর একেবারেই পছন্দ না। আমার কাজ ছিলো তাই আমি আজকে যাচ্ছি।'
শ্রবণা নির্বিকার ভংগীতে শুধু উচ্চারণ করল, 'ও'
শীতুলের কিছু হয়েছে এটা ওর মাঝে তেমন কোনো পরিবর্তন আনলো না। সত্যি বলতে মেয়েটা কেমন যেন পাথরের মত হয়ে গেছে। মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজ সহজে বের হয় না, কোনো খবরই ওকে আহত করে না। নিজেই যেন প্রায় নিহত হয়ে গেছে এমন অবস্থা।
আন্টি ব্যাপারটা না বুঝলেও শ্রবণা আগের মত নেই এটুকু বুঝতে পারছেন। কিছু একটা তো হয়েছে ই। আন্টি কৌতুহলী চোখে জানতে চাইলেন, 'কিছু মনে কোরো না মা। তোমার কি কিছু হয়েছে?'
- 'না।'
আন্টি অনেক্ষণ শ্রবণার দিকে তাকিয়ে রইলেন। এটুকু নিশ্চিত হলেন যে মেয়েটা চরম ডিপ্রেশনে আছে। কাছে এসে বললেন, 'শ্রবণা, আমি তোমার মায়ের মত। কিংবা আমাকে নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধুটি ভেবে বলো। আমি একটা ভালো সলুশ্যন দিতে পারবো দেখো৷ প্লিজ বলো কি হয়েছে? তুমি কি কোনো সমস্যায় আছো?'
এতক্ষণ পর অবাক হয়ে আন্টির দিকে তাকালো শ্রবণা। বুঝতে পারলো সত্যিই কোনো সমস্যায় আছে। কি যে হয়েছে নিজেও বুঝতে পারছে না। আচমকা আন্টিকে জড়িয়ে ধরে অনেক্ষণ চোখ বন্ধ করে রইলো। তারপর হাত শিথিল করে দিয়ে বললো, 'মা গো, আমার মা নেই। এরকম করে কেউ কখনো আমাকে বলে নি।'
আন্টি শ্রবণার চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো, 'শোনো, আমিই তোমার মা। আমাকে খুলে বলো কি হয়েছে। মাকে বলা যাবে না?'
শ্রবণা কি বলবে বুঝতে না পেরে অনেক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর মাথা তুলে সোজা হয়ে বসে আন্টির কাঁধে মাথা রেখে ওনাকে জড়িয়ে ধরলো। তারপর বললো, 'আমি অনেক একা। আমার কেউ নেই এই শহরে। ব্যাংকে অনেক টাকা পয়সা আছে, তুলি আর খরচ করি। খাই, পড়াশোনা করি আর চুপচাপ একা বসে থাকি। আমার খুব কষ্ট হয় গো মা। আমি এত একা কেন!'
শীতুলের মা শ্রবণাকে বুকে জড়িয়ে ধরে চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। আস্তে আস্তে বললেন, 'এই পৃথিবীতে সবাই একা। খুব সেলিব্রেটি মানুষটাও দিনশেষে ফিল করে সে অনেক একা। আমরা সবাই খুব একা রে মা। পরিবার কিংবা বন্ধুবান্ধব থাকলে মাঝেমাঝে বুঝতে পারি না। কিন্তু প্রত্যেকেই একা। একমাত্র আপনজন হচ্ছে বাবা মা।'
শ্রবণা গম্ভীর কণ্ঠে বললো, 'সবার বাবা মা আপন হয় না গো। বাবা তো বউ নিয়ে মহাসুখে আছে, মেয়ের খোঁজ কে রাখে।'
আন্টি শ্রবণার হাত ধরে বললেন, 'চুপ কর তো। এখন থেকে তুই আমারই মেয়ে৷ দেখি কিভাবে একা একা লাগে? মন খারাপ করিস না। চল আমার সাথে কুমিল্লা যাবি। ছেলে মেয়ে দুটোকে একসাথে সুস্থ করে তুলবো আমি।'
শ্রবণা অবাক হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েই রইলো। এই মহিলাটিকে প্রথম দিনেই অনেক আপন মনে হয়েছিলো শ্রবণার। তার আদর ,স্নেহ পাওয়াটা তো শ্রবণার জন্য পরম সৌভাগ্যের বিষয়। কিন্তু এখন তো এই সৌভাগ্য কপালে সইবে না। কোনোভাবেই শীতুলের সামনে পড়তে চায় না শ্রবণা। শীতুল ভাববে শ্রবণা শীতুলকে পাওয়ার জন্য এতকিছু করছে, ছ্যাঁচড়া মেয়ের মত বারবার ওর কাছে ঘেষছে৷ এটা কিছুতেই হতে দেয়া যায় না। শ্রবণা কি বলবে বুঝতে না পেরে স্তব্ধ হয়ে রইলো।
আন্টি বললেন, ‘ভেবেছিলাম কলাবাগান থেকে যাবো। আয়াশ বললো টিটিপাড়া থেকে সরাসরি স্টার লাইনের এসি বাসে করে চলে যেতে। তোমার বাসায় চলো, জামাকাপড় গুছিয়ে আমার সাথে যাবা।'
শ্রবণা মাথা ঝাঁকিয়ে না না বলতে লাগলো। কিন্তু আন্টি নাছোরবান্দা। এমনভাবে শ্রবণাকে ধরে রইলেন যেন ও নিজেরই মেয়ে। আন্টির আচরণে শ্রবণারও ওনাকে ছাড়তে ইচ্ছে করছে না। তবুও নিজের সর্বসাধ্য চেষ্টা করতে লাগলো যেন কিছুতেই শীতুলের মুখোমুখি হতে না হয়।
আন্টি চোখ পাকিয়ে বললেন, 'মায়ের সামান্য একটা কথা যদি না শোনো, কিভাবে ভালোবাসা অর্জন করবা? কারো কাছ থেকে কিছু পেতে চাইলে তাকে দিতেও হয়, রেস্পেক্ট করতে হয়। আমাকে রেস্পেক্ট করছো না নাকি আপন ভাবতে পারছো না?'
এমন একটা কথা শোনার পর আর না করার সাধ্য নেই কারো। শ্রবণাও আর কিছু বলতে পারলো না। যিনি ওকে মেয়ের মত ভেবে নিয়েছেন তাকে এভোয়েড করলে চরম অন্যায় হয়ে যাবে। প্রয়োজনে আন্টিকে শীতুলের ব্যাপারটা খুলে বলতে হবে। তবুও এই মা যেন ভুল না বোঝেন। মা না থাকার যে কষ্ট, একজন মাকে কষ্ট দিয়ে আর সেই কষ্টটা দ্বিগুণ করতে পারবে না শ্রবণা।
আন্টি শ্রবণাকে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন, 'চলো।'
যাওয়ার ইচ্ছা না থাকা স্বত্তেও মা জোর করে শ্রবণাকে নিয়ে বাসে উঠলেন । বাসে ওঠার আগে জোরপূর্বক বিরিয়ানি নিজ হাতে তুলে খাওয়ালেন। আজ তিনটি বছর পর শ্রবণার মনে হচ্ছে নিজের মাকে পেয়েছে। কষ্টে, আনন্দে কান্না আসছিলো ওর। বাসে ওঠার পর মায়ের কাঁধে মাথা রেখে ওনাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়লো। মা ওর ঘুম ভাঙায় নি। মায়ের ডাকে ঘুম থেকে উঠে দেখলো কুমিল্লায় পৌঁছে গেছে। লজ্জিত মুখে বাস থেকে নামলো শ্রবণা। রাস্তায় নামতেই শীতুলের মুখোমুখি হয়ে দুজনেই অনেক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো।
শীতুল স্তব্ধ হয়ে একটা কথাই ভাবছে, 'শ্রবণা এখানে কি করছে? মায়ের সাথে খুঁজতে খুঁজতে চলে এসেছে নাকি?'
শ্রবণা শীতুলের কৌতুহলী চোখ দেখে মায়ের দিকে তাকালো। কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না। শ্রবণা কিছু বলার আগেই মা বললেন, 'শীতুল, শ্রবণাকে রাস্তায় পেয়ে ধরে নিয়ে এলাম। মেয়েটার চেহারার কি হাল হয়েছে দেখছিস?'
শীতুল এতক্ষণে শ্রবণার চেহারার দিকে খেয়াল করলো। গত কয়েকদিন আগেও যে মেয়েটাকে দেখলে পরিপূর্ণ সুন্দরী মনে হতো, এখন সে মেয়েটাকে দেখলে মনে হয় রোগা অসুস্থ অসুখী একটা মেয়ে। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে একি হাল হয়েছে মেয়েটার! চুলগুলোও বোধহয় আঁচড়ায় না, খাওয়া ঘুম বাদই দিলাম।
মা বললো, 'এই মেয়ের খুব দুঃখ বুঝলি। কারণ ওর কেউ নেই। তাই আমি ওকে আমার মেয়ে করে আমার কাছে রাখবো। তোর কোনো সমস্যা নেই তো?'
শীতুল সহজ গলায় বললো, 'না। আমার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সমস্যা ওর।'
ভয় পেয়ে গেলো শ্রবণা। ড্যাবড্যাব করে শীতুলের দিকে তাকিয়ে রইলো। ওর সমস্যা বলতে শীতুল কিসের কথা বোঝাতে চাইছে সেটাই ভাবছে অবাক হয়ে। শীতুল রাগী রাগী গলায় বললো, 'এই মেয়ে, কি সমস্যা তোমার?'
শ্রবণা আমতা আমতা করে শুকনো মুখে বললো, 'আমার সমস্যা বলতে?'
শীতুল উত্তরে বললো, 'সমস্যা যদি নাই থাকে তাহলে শরীরের এই হাল করেছো কেন? মা, ওকে একটু পিটিয়ে সোজা করতে হবে। বোধহয় খাওয়াদাওয়া একেবারেই করে না। জীবনের প্রতি এই মেয়ের ভীষণ হতাশা।'
শ্রবণা বিস্ময়ে চোখ বড়বড় করে খানিক্ষণ তাকিয়ে রইলো। মুখে কোনো কথা ফুটছে না। শীতুল সহজভাবে কথা বললেও মনে মনে কি ভেবে বসে আছে কে জানে। সে যাই হোক, শীতুলের গালে মারের দাগ স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে। কোনো মেয়ে এরকম শুভ্র টাইপের একটা ছেলেকে এভাবে বেদম প্রহার করিয়ে নিতে পারে এটা দেখে শ্রবণার অবাকই লাগছে। শীতুল শ্রবণার হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে সিনএনজি তে গিয়ে উঠলো।
সিএনজি তে বাসায় যাওয়ার সময় শীতুল অনবরত কথা বলে যাচ্ছিলো। এর আগে ওকে এত কথা বলতে দেখেনি শ্রবণা। হতে পারে মাকে অনেকদিন পর পেয়ে কথার ঝুড়ি মেলে বসেছে। শ্রবণার শুনতে ভালোই লাগছে। মুগ্ধ হয়ে শুনছিলো গ্রাম নিয়ে শীতুলের বলা কথা গুলো। শীতুল হঠাৎ শ্রবণাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমার কোনো খোঁজ খবর নেই কেন? অনেকদিন ফোনও দাওনি। ছিলে কোথায়?'
শ্রবণা উত্তরে বললো, 'ঢাকাতেই।'
- 'চেহারার এই হাল হয়েছে কেন? এই বয়সে থাকবে চনমনে, হাস্যোজ্জ্বল, দূরন্ত।'
শ্রবণা চুপ করে রইলো। ও চাইলেও এমন হতে পারে না। খুব ইচ্ছে করে চনমনে, উচ্ছল একটা মেয়ে হতে। যার জীবনটা হবে অনেক আনন্দময়। কিন্তু সেটা হয় না, সবসময় একা একা লাগে। সত্যিই তো শ্রবণা অনেক একা। বাবা নেই, মা নেই, কোনো বন্ধু বান্ধব নেই। একাকী কি আর জীবনকে আনন্দময় করে তোলা যায়? সবখানেই একাকীত্ব, হতাশা আর মলিনতা ভর করে। কারো সঙ্গ পেতে খুব ইচ্ছে হয়।
শ্রবণা মনে মনে ঠিক এই কথাগুলোই ভাবছিলো। ওকে চমকে দিয়ে শীতুল বললো, 'দেখো পৃথিবীটা অনেক কঠিন জায়গা। এখানে সবার ই পরিবার থাকবে এমন তো হয় না। পরিবারের বাইরেও অনেক আপনজন তৈরি করে নিতে হয়। তুমি যে সময়ে ভাবছো, অনেক কষ্টে আছো। ঠিক সে সময়েই কেউ তোমার চেয়েও আরো বেশি কষ্টে আছে। কাজেই নিজেকে এত হতাশ কোরো না। বুঝলে?'
শ্রবণা কিছু বলতে পারলো না। শীতুল সিএনজি থামিয়ে কিছু ফল কিনে নিয়ে এলো। শ্রবণার এখন কিছুটা ভালো লাগছে। আর আগের মত মন খারাপ ভাবটা নেই।
শীতুল সিএনজি তে উঠে বললো, 'আমি যেন কখনোই আর তোমাকে মুখ কালো করে থাকতে না দেখি। আমরা তো আছি রে মেয়ে৷ আমার মা তোমার মায়ের চেয়ে বেশি যত্ন করতে পারবে এটা মিলিয়ে নিও। আমার মাকে মা ভাবতে পারবে না?'
শ্রবণা পুরোপুরি অবাক! মা ছেলে দুজনের মনোভাব একেবারে একই রকম। দুজনই শ্রবণাকে একই দিক থেকে ভাবছে। খুব অন্যরকম একটা প্রশান্তি অনুভব করলো শ্রবণা।
শীতুল জিজ্ঞেস করলো, 'কি হলো? চুপ করে আছো কেন? পারবে না?'
- 'হুম পারবো।'
- 'আমার মায়ের সাথে সবসময় থাকবে। দেখবে খুব হাসিখুশি থাকতে পারছো।'
- 'আচ্ছা।'
শ্রবণা মাথা দুলিয়ে বসে রইলো। ঠিক এই মুহুর্তে ওর এত আনন্দ হচ্ছে যা নিজেই বুঝতে পারছে না। আনন্দ জিনিসটা পরিমাপ করা গেলে পরিমাণে এটা সব আনন্দকেই ছাড়িয়ে যেতো। এটা শীতুলের কাছাকাছি থাকার আনন্দ নয়। এ আনন্দ মা কে পেয়ে, শীতুলের মায়ের মত একজন মায়ের সাথে সবসময় থাকতে পারার আনন্দ। ওনার সাথে থাকলে নিঃসন্দেহে সবসময় অনেক ভালো সময় কাটবে শ্রবণার। আহ! বুকের ভেতরটা অনেক হালকা লাগছে। শান্তি লাগছে।
বাসায় পৌঁছে শীতুল ব্যাগ নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলো। মা শ্রবণাকে ধরে ভেতরে নিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রধান দরজায় দেখা হলো শীতুলের দাদীমার সাথে। শ্রবণা দেখেই সালাম জানালো। উনি হেসে ওদেরকে ভেতরে নিয়ে গেলেন।
বাসার ভেতরে ঢুকে এদিক ওদিক দেখছিলো শ্রবণা। বাড়িটা অনেক আগের বোঝা যাচ্ছে। সবকিছু বেশ গোছানো ও পরিপাটি। বাড়িটাতেও একটা বেশ শান্তি শান্তি ভাব আছে। সবচেয়ে সুখের কথা, বাড়িটা একেবারে নির্জন, শান্ত৷ শহর থেকে দূরে এসে এরকম শান্তিপূর্ণ বাড়িতে ঢুকে মনটা শীতল হয়ে এলো।
মা শ্রবণাকে বাথরুম দেখিয়ে দিলেন। গোসল করতে করতে মনের মেঘগুলো কেটে যাচ্ছে শ্রবণার। গোসল সেরে বেরিয়ে এসে খুব সতেজ অনুভূতি হচ্ছে।
শ্রবণাকে যে ঘরে থাকতে দেয়া হয়েছে, ঘরটায় প্রচুর আলো আসে। বিছানার একদিকে রয়েছে সুবিশাল জানালা। সেদিকে তাকিয়ে চুল মুছছে আর ভাবছে, হঠাৎ করেই সবকিছু কেমন বদলে গেলো। অথচ সকালবেলায় কত মন খারাপ ছিলো, সমস্ত শরীর জুরে হতাশা গ্রাস করেছিলো। সময় খুব দ্রুত পালটে যায়।
দরজায় ঠকঠক শব্দ হলো। শ্রবণা এগিয়ে এসে দরজা খুলতেই দেখলো শীতুল দাঁড়িয়ে। শ্রবণার ভেজা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। হাতে তোয়ালে দেখে শীতুল বুঝতে পেরেছে শ্রবণা চুল মুছছিলো। ও অপ্রস্তুত হয়ে বললো, 'সরি। আমি তাহলে আসি।'
- 'আরে ঠিক আছে। কোনো সমস্যা নেই। আসুন ভেতরে।'
শীতুল ভেতরে ঢুকে বললো, 'এই ঘরটা অনেক সুন্দর তাই না? আমি এ কয়েকদিন এ ঘরেই ছিলাম।'
- 'ওমা! তাহলে আমাকে এখানে পাঠালেন যে? আপনি বরং এখানেই থাকুন আর আমি গেস্ট রুমে যাই।'
- 'তোমাকে ভালো পরিবেশে থাকতে দেয়াটা আমার কর্তব্য 'র মধ্যে পড়ে। ডিপ্রেশনের মুহুর্তে এরকম একটা ঘরে থাকলে ডিপ্রেশন জানালা দিয়ে পালাবে।'
শ্রবণা মুচকি হেসে বললো, 'মানুষ কি করে যে পারে। মুখ দেখেই সব বুঝে ফেলে। আমাকে দেখে কি করে বুঝলেন আমি খুব ডিপ্রেশনে আছি?'
শীতুল উত্তরে বললো, 'এটা আমি বুঝতে পারি। তোমাকে প্রথমদিন দেখেই বুঝে গিয়েছিলাম তুমি হতাশায় জর্জরিত। কিন্তু তোমার অদ্ভুত সব আচরণের ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারিনি। এখন বুঝি।'
শ্রবণা শীতুলের দিকে তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিলো। কি লজ্জাজনক একটা পরিস্থিতি। কি বলবে ভেবে পেলো না ও। শীতুল জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে অনেক্ষণ একদৃষ্টে চেয়ে রইলো। শ্রবণা ওর পিছনে দাঁড়িয়ে জানতে চাইলো, 'কি দেখছেন?'
- 'আকাশ দেখছি, কিন্তু ভাবছি অন্যকিছু।'
- 'আমাকে কি বেহায়া ভাবছেন? বিশ্বাস করুন আমি একেবারেই আসতে চাইনি। মা আমাকে জোর করে নিয়ে এসেছেন।'
- 'মা আমাকে বলেছে। এটা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই।'
- 'আমার আসলে লজ্জা করছে আপনার সামনে দাঁড়াতে। কিন্তু পরিস্থিতি এমনভাবে আমাদেরকে দেখা করিয়ে দিলো যে কিছুই করার ছিলো না।'
- 'আমি তোমার ব্যাপারটা বুঝি। যাইহোক, এসব নিয়ে ভেবে সংকোচ কোরো না। স্বাভাবিক হও, ইজি হওয়ার চেষ্টা করো। দেখবে লাইফটা অনেক সুন্দর।'
- 'হুম। ধন্যবাদ। আমার অনেক সতেজ লাগছে।'
- 'তুমি চুল আচড়ে নাও, ভাত খেতে চলো।'
- 'ভেজা চুল আচড়াতে নেই।'
শীতুল শ্রবণার চোখের দিকে এমনভাবে তাকালো যে খেই হারিয়ে ফেললো শ্রবণা। লজ্জায় মাথা নামিয়ে নিলো। শীতুল চোখ সরাতে পারলো না। ভেজা চুলের স্নিগ্ধতাকে মন ভরে দেখছে আর ভাবছে আনমনে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে বলেই ফেললো, 'গোসলের পর স্নিগ্ধ চেহারায় মেয়েদেরকে অনেক নিষ্পাপ লাগে।'
শ্রবণা মুচকি হাসলো। লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছিলো একেবারে। শীতুল সাথে আরো যোগ করলো, 'পবিত্র লাগছে তোমাকে। আর অনেক মায়াবতী ও। আমার একটা বড় ভুল হয়ে গেছে, একইসাথে একটা বড় দর্শনও।'
শ্রবণা কৌতুহলী হাসি দিয়ে জানতে চাইলো, 'ঠিক বুঝলাম না। কি রকম?'
শীতুল মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, 'বড় ভুলটা হচ্ছে এই ভয়ংকর স্নিগ্ধতা দেখাটা আমার অন্যায় হয়েছে। আর দ্বিতীয়টা হচ্ছে, এই সময়ে না এলে এই পবিত্র নিষ্পাপ উপলব্ধিটা আমার হতো না।'
শ্রবণা লজ্জায় অন্যদিকে তাকালো। কিছু একটা বলে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে ইচ্ছে করছে কিন্তু বলার মত কিছুই খুঁজে পাচ্ছে না। পেটে আসছে তো মুখে আসছে না। শীতুল ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বললো, ‘যাইহোক, খেতে আসো। আমি গেলাম।'
শীতুল ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। শ্রবণার অবাকই হবার পালা। শীতুলের কাছ থেকে এমন অদ্ভুত আচরণ ও কল্পনাও করেনি। ভেবেছিলো শীতুল হয়তো ওকে দেখলে রেগে যাবে কিংবা ওর সাথে কথাই বলতে চাইবে না। সেখানে এরকম আচরণ তো আকাশ কুসুম কল্পনার মত। অবশেষে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো! তবে কি শীতুল এই কয়েকদিনে শ্রবণাকে নিয়ে ভেবেছে? সেও কি মনে মনে চেয়েছিলো শ্রবণার সাথে আচমকা দেখা হয়ে যাক? উফফ আর ভাবতে পারছে না শ্রবণা। আনন্দে, উত্তেজনায় পাগল হয়ে যাচ্ছে যেন।
বিছানায় শুয়ে অনেক্ষণ চুপ করে রইলো। চোখেমুখে খুশির ঝিলিক। অনেকদিন পর বুক ভরে নিশ্বাস নিলো শ্রবণা।
চলবে...
Writer:- মিশু মনি