-'এই তেজের জন্য তোমাকে আমার এত্ত ভালো লাগে। নয়তো কবেই খেয়ে ছেড়ে দিতাম।'
একথা শুনে শিফা শব্দ করে হেসে উঠল। যেন খুব মজার কথা শুনেছে। হাসি থামাতে পারছে না। দিগন্ত ভ্রু কুঁচকে তাকাল। হেসে যে অপমান করছে, বুঝতে বাকি নেই। মেয়েটা খুব ধূর্ত। পাল্টা জবাব দিবেই, হেসে হোক বা কথার খোঁচা মেরে। এই ব্যাপারটা দিগন্তেরও বেশ লাগে। সে পকেটে হাত গুঁজে শিফার দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েরা রুপবতী হলেও, তেজী। ঠিক গোলাপের মতো। গোলাপ যেমন সৌন্দর্য এবং কাঁটায় পূর্ণ। তেমনি এই মেয়েটা রুপ আর তেজে। এজন্যই ওর কাজে আকৃষ্ট হয়েছে। তবে রুপের ফাঁদে সে কখনোই গলবে না। এমন রুপবতীরা ভোগের যোগ্য, ভালোবাসার নয়। তাছাড়া ভালোবাসা, মায়া, টান, ওর মধ্যে নেই বললেই চলে। এটাও ওর কাছে গর্বের! কারণ এসব জিনিস পুরুষদের
কাবু করে। এসব ভেবে দিগন্ত ফিচেল হাসল।
শিফাকে সে ধীরে ধীরে আঘাত করবে। ওর ধৈর্য্য আর সহ্য ক্ষমতা দেখবে। কতদূর অবধি যায়; পরীক্ষা করবে। একেবারে মারলে কষ্ট কম হয়। এতে মজা পাওয়া যাবে না। আর খেলাতে টুইস্ট না পেলে ইচ্ছেও জাগে না। বিরক্ত এসে খেলার মজা নষ্ট করে দেয়। এজন্য টুইস্ট খুঁজতেই সে শিফাকে ব্যবহার করবে। লাগামহীনভাবে উড়তে দিবে। কারণ পিপীলিকা মরার জন্য বেশি উড়ে।
শিফাকে ক্ষুদে পিপীলিকা ছাড়া কিছু মনে হচ্ছে না। তখন শিফা বলল,
-'খাবেন জানতাম। এজন্য তো তোড়জোড় করে বৈধতা দিলাম।'
একথা শুনে দিগন্ত তালি বাজিয়ে মাথা নাড়াল।
শিফা তাচ্ছিল্যের হাসল। তখন দিগন্ত গদগদ হয়ে বলল,
-'ওহ হো, সত্যি জানতে? দারুন তো! তবে বেশ
ভালো অভিনয় পারো। একদম আমার'ই মতো। আমার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তুমি পারফেক্ট।'
কথাটা বলে দিগন্ত পায়ের উপর পা তুলে বসল।
শিফা ড্রেসিংটেবিলের সামনে এদিক-ওদিক ঘুরে বলল,
-'ড্রেসটাতে আমাকে বেশ মানিয়েছে না? আগুন সুন্দরী মানবেই তো।'
একথা বলে শিফা বেডে শুয়ে পড়ল। এমনভাব, ঘুমে তাকাতে পারছে না। দিগন্ত ওর পাশে শুয়ে হাত বাড়াতেই শিফা ওর হাত মুচড়ে দিলো।উফ, শব্দ করে বসে দিগন্ত হাত ঝাড়ল। চোখে রাগের ছাপ। বাঁধা দেওয়া ওর মোটেও পছন্দ নয়। দিগন্ত
শুয়ে পুনরায় হাত বাড়াল। শিফার দু'চোখ বন্ধ।
তবে ষষ্ঠইন্দ্রীয়ও জানান দিচ্ছে, মানুষটা এদিকে তাকিয়ে আছে। দিগন্ত ওকে ঝাপটে শুয়ে পড়ল।
শক্ত বাঁধনে নড়ার চেষ্টাও বৃর্থা। নিষিদ্ধ জিনিসে
ওর আকষর্ণ বরাবরই বেশি। কেউ বারণ করলে; আড়ালে সেকাজ করবেই, করবে। আর এটা ওর পুরনো অভ্যাস। নয়তো মনটা অশান্ত থাকে।
শিফা নড়ল না। নিশ্চুপ হয়ে শুয়ে রইল। কবুল বলে; সে শরীর এবং মনকে প্রস্তুত করে নিয়েছে। জান, মান, এবং যৌবণপূর্ণ শরীরের মায়াত্যাগ করেছে। বাঁধা দেওয়া এখন ফিঁকে। তাই ঢং করে দিগন্তকে বাঁধা দিচ্ছে না। কারণ অবগত, বাঁধা দিলে দিগন্ত সেটাই করবে। এজন্য দিগন্ত কাছে আসতে চাইলে বোঝায়, সেও প্রস্তুত। আর এটা দিগন্তের পছন্দ নয়। এজন্য গতদু'বারে সিদ্ধান্ত বদলেছে। কারণ দিগন্ত নিজের মর্জিমতো চলে। কেউ কিছুতে আগ্রহ দেখালে সেটাতে সে পিছিয়ে যায়। কেন? এর উত্তর কেবল দিগন্তেরই জানা।
ওকে যতটা ভালো দেখায় সে ততটাই ভয়ংকর।
যে ভদ্র ভাববে সেই চরম বোকা। বাহ্যিকরুপটা অমায়িক হলেও ওর অভ্যন্তরটা....!!
আর শত্রুপক্ষের খুঁটিনাটি তথ্য শিফার জানা। অহেতুক লড়াইয়ে নামে নি। জেনে, বুঝে, প্রাণের মায়া ত্যাগ করে স্বজ্ঞানে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কথায় আছে, করো নয়তো মরো। তাই সে লড়াই করে মরবে। এটা তার দৃঢ় কল্পনা! এর শেষটা দেখেই ছাড়বে।
আশ্চর্যজনক ভাবে দু'জনই ওদের পরিকল্পনার ব্যাপারে জ্ঞাত। তবুও নিখুঁত অভিনয় করেছে।যেন দু'জনেই এই বিয়েতে খুব খুশি। কারো মনে আক্ষেপ নেই। সুখী দম্পতি! শিফা কেন বিয়েটা করেছে; দিগন্ত জানে। আর দিগন্ত কেন সম্মতি
দিয়েছে; শিফা জানে। এজন্য দু'জন বেশ মজাও পাচ্ছে। জেনেবুঝে ভালো সাজতে এই অভিনয়। তা দু'জনেরই, স্বার্থে। শত্রুকে চোখে চোখে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। ওরা সেটাই করছে। চুন খেলে মুখ পুড়ে। কথাটা দু'জনেরই জানা। তাই দেখার পালা, সময় কি বলে?
______________________________
পরেরদিন রৌদ্রজ্জ্বল একটা দিন। রান্নাঘরে বেশ তোড়জোড় চলছে। মেয়ের জামাইয়ের সমাদরে ত্রুটি যেন না থাকে! সকালথেকে সেই অয়োজন চলছে। ঘন্টায় ঘন্টায় নতুন নতুন পদ জামাইকে দেওয়া হচ্ছে। দিগন্ত খুব বিরক্ত হলেও, নিশ্চুপ।
আদিখ্যেতা জিনিসটা ওর বরাবরই অপছন্দ।
তনয়ও খুব জ্বালাচ্ছে। মনটা চাচ্ছে, বুক বরাবর ঘুষি মেরে দম আটকে দিতে। যাতে চিরতরে শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। শিফা সকাল থেকেই বাসায় নেই।
জুরুরি কাজের জন্য বাইরে গেছে এখনো ফিরে নি। কি কাজ? একমাত্র সেই ভালো জানে। তবে এভাবে দিগন্ত মাথা ঘামাচ্ছে না। আপাতত রাগ
দমন করে তনয়ের সঙ্গে খেলায় মন দিলো।এবং প্রতিজ্ঞাও করল, সুযোগ বুঝে তনয়কে সে উচিত শিক্ষা দিবে। ঘন্টা দু'য়েক পর শিফা ফিরল।ওর
মুখে কুটিল হাসি। দিগন্ত দেখেও নিশ্চুপ রইল।
শিফা তনয়কে বাইরে রেখে ফিরে আসল। পানি খেয়ে গুনগুন করতে করতে ফ্রেশও হয়ে আসল।
এমনভাব, রুমে আর কেউ নেই। আর থাকলেও পাত্তা দেওয়ার সময় নেই। সে তার কাজে ব্যস্ত।
শিফা কিছু একটা ভেবে দিগন্তের দিকে খানিক ঝুঁকে বলল,
-'লোক লাগিয়েছেন। তবুও ফাঁকি দিয়ে গেলাম। আহারে, বৃথা কষ্ট।'
দিগন্ত শিফার গালের ঠোঁট ছুঁইয়ে আদুরে সুরে বলল,
-'বেশ করেছো। চলো আদর আদর খেলি।'
-'ওকে।'
একথা বলে শিফা ওর পাশে বসে পড়ল। দিগন্ত পুনরায় শুয়ে ফোন স্কল করতে লাগল। মুড চলে গেছে। সত্যি, শিফার পেছনে সর্বদা লোক থাকে।
শিফার কার্যকলাপের খবর দেওয়াই ওদের কাজ।
মেয়েটা ধরে ফেলেছে। বুদিমতী ধরা অস্বাভাবিক নয়। তখন শিফা হাসতে হাসতে বলল,
-'পুরুষত্বে অহংকার শেষ? এছাড়া পুরুষরা কী বা পারে?'
-'তোমাকে পুরুষত্বের জোর দেখাব না। আমাকে হারিয়ে দেখাও। যাও, এইটুকু ছাড় দিলাম। তুমি
বৈধ শত্রু বলে কথা। তবে না পারলে; শর্ত মেনে
আত্মসমর্পণ করতে হবে।'
শিফা দিগন্তের চোখে চোখ রেখে হাতটা বাড়িয়ে দিলো। অর্থাৎ সম্মত। দিগন্ত মৃদু হেসে করমর্দন করল। দু'জনের চোখে'ই তেজ। যেন কেউ কারো থেকে কম নয়। তাদের চাহনিতে স্পষ্ট অঘোষিত লড়াইয়ের পুনরায় আহ্বান।ফলস্বরূপ; নিঃশেষ।
ঠোঁটের কোণে ফিচেল হাসি। মস্তিষ্কও পরিকল্পনা
তৈরিতে সক্ষম। শিফা রুম থেকেই বেরিয়ে গেল। অর্ধদিন আর দিগন্তের সামনেই গেল না। রাগে অথবা ঘৃনায়! দুপুরে খেয়ে বিশ্রাম নিয়ে দু'জনেই বেরিয়ে পড়ল। শিফা ফোনে গেম খেলছে। আর দিগন্ত লেপটপে কিছু করছে। মুখটা বেশ গম্ভীর। হঠাৎ ফোনে কাউকে বলল,
-'একসপ্তাহ মুখ দেখাবি না। নয়তো শুট করতে দু'বার ভাববো না।'
কথাটা বলে কল কাটল। অপর ব্যাক্তির উপরে প্রচন্ড রেগে আছে। হয়তো ওর মনমতো কাজ হয় নি। শিফা ঠোঁট টিপে হাসল। সে জানত, এমন কিছুই হবে। কারণ সকালে দিগন্তের কাজে বাঁধা সৃষ্টি করতেই বেরিয়েছিল। সে ছদ্মবেশে কাজটা করেছে। সফলও হয়েছে। দিগন্তের লোক যখন ওকে খুঁজছিল, সে পেছনেই ছিল। দেখছিল ওরা কি করে? কাজ সম্পূর্ণ করে ফেরার সময়, ভিক্ষা চাওয়াতে তাদের থেকে ধমকও খেয়েছে। ধমকে প্রচন্ড ভয়ের ভান ধরে কেটে পড়েছে। পিছু ফিরে তাকায় নি। লোকগুলো হন্ন হয়ে খুঁজে না পেয়ে পরে ফিরে গেছে। ওরা ধরতে না পারলেও, দিগন্ত ঠিক বুঝে ফেলেছে। কারণ সে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পূর্ণ মানুষ। তাতে কী! কাউকে পরোয়া করে নি, আর করবেও না। তখন দিগন্ত লেপটপটা সরিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,
-'এবার শান্তি হয়েছে?'
-'প্রচুর।'
-' বাহ! তা স্বপ্নীলের বিরহে কাঁদছ না কেন? ইস, বেচারাকে কষ্ট না দিলেও পারতে। সময় আছে, ফিরে যাও।'
-'ভয় পাচ্ছেন?'
-'সো ফানি, বেইব।'
দিগন্তের কথায় পাত্তা না দিয়ে অবজ্ঞায় ভঙ্গিতে বসল। কয়েকবার শিষ বাজিয়ে কানে ইয়ারফোন গুঁজতে গুঁজতে শিফা বলল,
-'স্বপ্নীলকে মেরে দিন। নয়তো আমিই শেষ করে দিবো। সিংহ-সিংহীর লড়াইয়ে দূর্বল প্রাণীদের না থাকায় উত্তম। ঝামেলা মাত্র।'
শিফার বাসার সবাই খুব খুশি হয়েছেন।দিগন্তের বিনয়ী আচরণ উনাদের মন কেড়েছে। বেশ ভদ্র!
এমন অমায়িক ছেলে'ই হয় না। শিফা পারফেক্ট একজনকে সঙ্গী করেছে। মেয়ের জন্য আর চিন্তা নেই। দিগন্তকে দায়িত্ব দিয়ে সবার স্বস্তি মিলেছে। দু'টোতে ভালো থাকলেই হলো। এসব উনাদের উক্তি। তবে তনয় কিছু একটা বোঝাতে চাচ্ছে। বাচ্চা ছেলে বোঝাতে পারছে না। তাই বার বার বলছে,
-'করে দাও, করে দাও। আমি সব বুঝে নিবো।'
বাচ্চাটার কথা কেউ গুরুত্ব দিলেন না। দিগন্তকে কাজের কথা বলতে শুনেছে। তাই হয়তো এসব বলছে। শিহাব আর রাফি বোন চলে যাওয়াতে কষ্ট পেলেও, বোনের হাসিমুখ দেখে খুশি হয়েছে।
বোন ভালো থাকলেই হলো। খোঁজও নিয়েছিল, দিগন্ত খুব ভালো ছেলে। খারাপ কোনো রিপোর্ট নেই। বোন খুব সুখে থাকবে! তাছাড়া শিফাদের পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনরা দিগন্তের খুব প্রশংসা করেছে। মেয়েজামাই খুব ভালো হয়েছে। এতেই শিফার পরিবার খুশিতে গদগদ। সাফার বাবা-মা দেখা করতে এসেছিলেন। দিগন্ত আর শিফাকে নতুন পোশাক দিয়েছেন। কতশত দোয়া করে অশ্রু ঝরিয়েছেন।সাফা নেই। তবুও শিফার সুখে-দুঃখে উনারা অবশ্যই সামিল হবেন। কেউ না চাইলেও! কারণ সাফার মতো শিফাকেও খুব ভালোবাসেন। তাই ভেদাভেদ করা কারণ নেই।
এদিকে, স্বপ্নীল কানাডাতে যাওয়ার ব্যবস্থা করে ফেলেছে। আজকে রাতে চলে যাবে। ফিরবে কবে ঠিক নেই। মেয়ের শোকে; ছেলের ভবিষ্যতটা নষ্ট করা যায় না। তাই সম্মতিও দিয়েছেন। স্বপ্নীল শিফাকে ভালোবাসে একথা উনারাও জানেন। সাফা নিজে জানিয়েছিল। তবে শিফার থেকে এমন কিছু দেখেন নি। সাফা স্বপ্নীলকে প্রায়'ই বলত,
-'ভাইয়া বান্ধবীকে ভাবী বানালে কেমন হয় রে?
না মানে, পর যেন না হয়, তাই আর কি।'
স্বপ্নীল হাসত! ছেলের হাসি দেখে উনারা বুঝে নিতেন। শিফাকে উনাদেরও পছন্দ। তাই কখনো
অমত করেন নি। ছেলে-মেয়ের খুশিতে উনারাও খুশি। তবে স্বপ্নীল আগ-বাড়িয়ে শিফাকে কিছু বলত না। তবে হাব-ভাবে কিছু প্রকাশ করতো। শিফাও বুঝে না বোঝার ভান করত। আর মধ্যে থেকে সাফা মজা নিতো। পরিবারিকভাবে সবার
জানার আগেই, সাফা মারা গেল। এই ঝড়ে সব
লন্ডভন্ড হয়ে ব্যাপারটা অপ্রকাশিতই রয়ে গেল।
এর পনেরোদিন পরে, শিফা জেদ ধরল দিগন্তকে বিয়ে করবে। আগে থেকেই নাকি দিগন্তকে পছন্দ করে। বিয়ে দিতেই হবে। নয়তো সাফার মতো সে আত্মহত্যা করবে। সাফা তো স্মৃতিশক্তি হারিয়ে আত্মহত্যা করেছে। সবাই ভেবেছিল, সে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে কোনো ভুল করেছে। গর্ভবতী হয়ে মানসিক চাপে স্মৃতিশক্তি হারিয়েছে। কিন্তু
ময়নাতদন্তের রিপোর্টে এমন কিছু আসে নি।বরং এসেছে, 'সি ইজ ভার্জিন নট এ প্রেগনেন্ট।'
আর একজন মানসিক রুগীর আত্মহত্যা করাটা স্বাভাবিক। তাদের জ্ঞান থাকে না।ভালো-মন্দের
তফাত বুঝে না। হুজুগেরবশে আত্মাহত্যা করে।
এমন কেস অহরহ ঘটে। তাই সাফার কেস চাপা পড়ে গেছে। এই কেসের তদন্ত মানে সময় নষ্ট, বৈ কিছু নয়! তারপর শিফার জেদ রক্ষার্থে দিগন্তের বাসাতে প্রস্তাব পাঠানো হয়। দিগন্ত না করাতে; শিফা খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে জেদে'ই অটল। পরে
পারিবারিকভাবে আলোচনা করে বিয়েটা সম্পূর্ন হলো। ভালো না বাসলে কেউ এমন পাগলামি করে না! আর এখানে স্বপ্নীলের কথা কীভাবে'ই বা বলতেন? শিফা তো নিজে চাচ্ছে ; দিগন্তকে।
তাহলে?
স্বপ্নীলেরও গতি হয়ে যাবে। সবার জীবনে পূর্নতা আসে না। যদি আসতো, ব্যর্থতা, হৃদভঙ্গ, কষ্ট, আর বিচ্ছেদ নামক শব্দগুচ্ছের সৃষ্টি হতো না।
সময়ের ব্যবধানে তার জীবনও ধারাক্রমে চলতে থাকবে।
__________________________________
শিফাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে দিগন্ত চলে গেছে।
নিহা আর শাশুড়ির সঙ্গে কথা বলে শিফা রুমে গেল। রুমের দরজাটা আটকে ড্রেস নিয়ে ফ্রেশ হতে চলে গেল। ওয়াশরুমের বালতি উপুড় করে বসে ফোন বের করল। ফোনটা সবসময় লুকিয়ে রাখে। কারণ এবাসার কোনো জায়গা ওর জন্য নিরাপদ নয়। ওয়াশরুম বাদে। আর যাই হোক, দিগন্ত ওয়াশরুমে সিসি ক্যামেরা রাখবে না। এর কারণ সেও ব্যবহার করো। তাই এটাই আপাতত নিরাপদ। শিফা ফোনে কিছু টাইপ করে কাউকে পাঠিয়ে দিলো। তার পরপরই ওর ফোনে দু'টো মেসেজ আসল। হুম যা ভেবেছিল তাই'ই, দিগন্ত বিগত বাহাত্তর ঘন্টা ধরে ওর ফোন ট্র্যাক করছে। যাতে নজর রাখতে পারে। একেই বলে, 'ধূর্ততা।' দিগন্ত যত যায় করুক, ওর নাকের ডগা দিয়ে সে ঠিক বেরিয়ে যাবে। শিফা দ্রুত কাজ সেরে ফ্রেশ হয়ে আসল। হাতের তেয়ালে মেলে দিয়ে সাফার
ছবি বুকে জড়িত নিলো। ওকে, খুব মনে পড়ছে!
শিফা চোখের পলক ফেলতেই অশ্রুফোঁটা ঝরে গেল। দ্রুত মুছে নিয়ে ছবিটা রেখে বেরিয়ে গেল।
দিগন্ত লেপটপের সামনে বসে এতক্ষণ শিফাকেই দেখছিল। এ'রুমে চারটা সিসিক্যামেরা লাগানো আছে। শুধু দিগন্ত জানে! শিফাকে কাঁদতে দেখে দিগন্ত উচ্চশব্দে হাসল। আহারে, বউটা কাঁদছে! আবেগপূর্ণ মন নিয়ে লড়তে এসেছে। তার মুখে আবার বড় বড় কথা!
তেমন কিছু না পেয়ে দিগন্ত লেপটপ রেখে উঠে দাঁড়াল। কিছু কাজ বাকি আছে। আজকেই সব সারতে হবে।
রাত দশটা। শিফার ফোনে কল এসেছে। নাম্বার
ট্র্যাকে থাকায়; সংকেত দিচ্ছে। দিগন্ত ব্লু-টুথ'টা ঠিক করে শুনতে মনোযোগী হলো। শিফা শুয়ে আনমনে টিভি দেখছিল। রিংটোন শুনে ফোন হাতে নিলো। স্বপ্নীল কল করেছে। শিফা কলটা রিসিভ করে চুপ করে থাকল। অপরপাশেও চুপ!
স্বপ্নীল আপাতত এয়ারপোর্টের ওয়েটিংরুমে বসে আছে। চলে যাচ্ছে সে। তখন শিফা কেশে বলে উঠল,
-'আমার সময়ের দাম আছে। যা বলার, দ্রুত বলুন।'
-'সত্যিই আমার হবি না শিফা?'
-'না, বিধবা হলেও না।'
একথা শুনে দিগন্ত হাসল। মেয়েটার মুখে কিচ্ছু আটকায় না। কঠিন একথাটা কত্ত সহজে বলে ফেলল। মেয়েটার মন বলে কিছু আছে কী? সে
ভেবে পায় না! শিফার থেকে এরচেয়ে বেশি কিছু আশা করাও বোকামি। দিগন্ত ওর ভাবনার ছেদ ঘটিয়ে, ওদের কথা শোনাতে মনোনিবেশ করল।
মুখে তার কুটিল হাসি। স্বপ্নীল শিফার মুখে এই কথা শুনে বলল,
-'দোয়া করি, সুখে থাক। আর বিধবা তকমাটা যেন তোর শরীরে কখনো না লাগে। খু্ব ভালো থাকিস।'
কথাটা বলে স্বপ্নীল কল কাটলো। দুইহাতে মুখ ঢেকে নিশ্চুপ হয়ে বসে রইল। অনবরত অশ্রু
ঝরছে। তার উক্তি, মনটা পুড়ছে বিধায় দু'চোখ কাঁদছে। সে কিছুক্ষণ বসে নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়াল। পিছুটান নয়, অনেক তো হলো। শিফা ভালো থাকুক। ওর প্রিয় মানুষটাকে নিয়ে সুখে থাকুক। সে না পেলেও অভিশাপ বা অভিযোগ কোনোটাই করবে না। প্রকৃত প্রেমিকদের চাওয়া হয়তো এমনই হয়। নিজে পুড়ে ছাই হবো; তবুও প্রিয় মানুষটার হাসিটা যেন অটল থাকে। আর
চরম সত্যি; ভাগ্যের উপরে কারোর'ই জোর চলে না। ওর ক্ষেত্রেও তাই।
তারপর স্বপ্নীল কানাডার উদ্দেশ্যে পাড়ি দিলো। দূরেই সে ভালো থাকবে। এখানে কষ্ট পাচ্ছে, খুব
কষ্ট! এখানকার বাতাসও বিষাদপূর্ণ। তাই চলে যাওয়াই শ্রেয়।
রাত একটার দিকে দিগন্ত বাসায় ফিরল। শিফা ঘুমাচ্ছে। এটা দিগন্তের পছন্দ হলো না। পানির গ্লাসটা নিয়ে শিফার মুখে ছুঁড়ল। শিফা ধড়ফড় করে উঠে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছে। কাঁচা ঘুমটা ভাঙ্গানোর জন্য ওর মেজাজ তুঙ্গে। তবুও স্বাভাবিকভাবে বসে রইল। দিগন্ত হেসে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে বলল,
-'ঘুমাচ্ছিলে? সরি হ্যাঁ, প্রচুর ক্ষুধা পেয়েছে বউ। খাবার নিয়ে আসো।'
শিফা উঠে পা বাড়াতেই দিগন্তও এক পা বাড়িয়ে দিলো। খুব কৌশলে। ফলস্বরূপ; শিফা হোঁচট খেয়ে ওয়ার্ডড্রোপের সঙ্গে স্বজোরে ধাক্কা খেলো। ওর মুখ থেকে ব্যথাতুর একটা শব্দও বের হলো। কপালও তাৎক্ষণিক ফুলে নীল হয়ে গেল। প্রচন্ড ব্যথায় শিফা মেঝেতেই বসে পড়েছে। মনে হচ্ছে, মুখটা কেউ থেতলে দিয়েছে। তখন দিগন্ত বসে ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলল,
-'আরে, আরে, চোখেও কম দেখো নাকি? খুব ব্যথা পেয়েছো?'
শিফা ব্যথাটা সয়ে উঠে বেরিয়ে গেল । রান্নাঘরে গিয়ে নিঃশব্দে অশ্রু ঝরিয়ে বরফ ডলে নিলো।
মাথাটা ঘুরছে। একহাতে আইসব্যাগ অন্যহাতে খাবারের ট্রে নিয়ে ফিরে আসল। দিগন্ত টাওজার পরে বসে ভেজা চুল মুছছে। খাবার দেখে মুখটা অসহায় করে বলল,
-'ওহ, খেয়ে এসেছি বলতেই ভুলে গেছি। সরি জান, অযথা কষ্ট করানোর জন্য।'
শিফা নিশ্চুপ! দিগন্তের এটাও সহ্য হলো না। সে জ্বলন্ত সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়াল। শিফা শান্ত চাহনিতে দেখে যাচ্ছে। দিগন্ত সিগারেট ওর দিকে এগিয়ে খেতে ইশারা করল। মুখে ফিচেল হাসি। যেন, তোমাকে শায়েস্তা করা ব্যাপারই না।
শিফা উঠে দিগন্তের কোলে বসে পড়ল।আচমকা
বসাতে দিগন্ত হতবাক। সে কিছু বোঝার আগেই, শিফা দিগন্তের ঠোঁটে ঠোঁট ডুবাল। প্রথমে খুবই
ধীর গতিতে অধরসুধা পান করলেও, পরবর্তীতে স্বজোরে দাঁত বসিয়ে দিলো। দিগন্ত ছটফট করে ছাড়তে চাইলে শিফা শক্ত করে ধরল।একইভাবে পুনরায় কামড় বসাল। এবার নোনাস্বাদ পাচ্ছে। হয়তো রক্তের! ঠোঁট কেটে গেছে; দু'জনেই বুঝতে সক্ষম। দিগন্ত শিফার চুল টেনে স্বজোরে ধাক্কা দিলো। শিফা ছিঁটকে সরে গেল। দু'জনের ঠোঁটে রক্ত। দিগন্ত বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে ঠোঁট'টা চেপে ধরল। চোখে ক্রোধ স্পষ্ট! যেন এক্ষুণি ভস্ম করেই ক্ষান্ত হবে। শিফা ঠোঁটের কোণে হাসি।শান্তি পাচ্ছে সে; প্রচুর শান্তি।
ওর ঠোঁটজোড়া দিগন্তের রক্তে রাঙা হয়ে গেছে।
দেখতে ভয়ংকর লাগছে। মনে হচ্ছে, রক্তপিপাসু
মানবী। তখন শিফা হেসে বলল,
-'বউয়ের আদর নিতে পারেন না। কেমন পুরুষ আপনি, হুম? ছিঃ, এই ক্ষমতার এত গর্ব?'
দিগন্ত রাগী চোখে তাকিয়ে আছে। মেয়েটা বড্ড বার বেড়েছে। এত ব্যথায় পেয়েও তেজ কমে নি।
আরেক ডোজ দিতে হবে। শিফা মুখটা ধুয়ে এসে সাফার ছবি হাতে নিয়ে বলল,
-'দেখলি, ঠুনকো জোর কাকে বলে?'
দিগন্ত ঠোঁট থেকে টিস্যু'টা সরিয়ে পাশে দাঁড়াল।
সাফার ছবি দেখে শিফার পুরো শরীরে তাকাল।
দু'জনেই বিরক্তকর। দিগন্ত মুখ বেঁকিয়ে বিরক্ত নিয়ে বলল,
-'এখন যা বলবো সরাসরি জবাব দিবা।"
-'ওকে।'
সাফাকে আমি প্রেমের জালে ফাঁসিয়েছি?'
-'না।'
-'বেডপার্টনার বানিয়েছি? অথবা প্রেগনেন্ট করে ছেড়ে দিয়েছি?'
-'না।'
-'সুইসাইড করতে বাধ্য করেছি?'
-'না।'
-'তাহলে ওকে টানছো যে? শোনো তবে, আমার শত্রুতা তোমার সঙ্গে। আমাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখো।তাছাড়া তোমরা দু'জনই আমার পছন্দের লিষ্টের বাইরে; প্রেম তো বহুদূর! এই ভালোবাসা জিনিসটা আমার জীবনে কখনো আসে নি।এর কারণ অযথা সময় নষ্ট করা, আমার অপছন্দ। তোমাকেও আমার পছন্দ নয়। তাই নিজেকে এত শ্রেষ্ঠত্ব ভাবা বন্ধ করো। আর নয়তো মেরে গুম করে দিবো, যত্তসব!'
কথাটা বলে দিগন্ত ফোনটা নিয়ে বেরিয়ে গেল।
শিফা হাসল! দিগন্ত ভুল বলে নি। আসলেই সে এসব করে নি। দিগন্তের সঙ্গে পূর্বেও ওর সম্পর্ক ছিলো না। প্রেমজনিত কারণে দিগন্তকে বিয়েও করে নি। ওদের যুদ্ধ ভিন্ন কারণে। দু'জনেই সেটা অবগত। দিগন্ত মাফিয়া দলের লিডার অথবা নারী পাচারকারীও নয়। তবুও অপরাধী। ক্ষমার অযোগ্য!
শিফা দাঁড়িয়ে না থেকে শুয়ে পড়ল। অহেতুক ভেবে র্নিঘুম রাত কাটানোর মানেই হয় না। হ্যাঁ, ঘুমালে শরীর ও মন ভালো থাকে। মনটা ভালো থাকলে; বুদ্ধিও সচল হয়। পরিস্থিতি মোতাবেক এই দু'টোর বড্ড প্রয়োজন। বাকিটা পরে বুঝবে।
তাই শিফা চোখজোড়া বন্ধ করে বিরবির করে
বলল,
-'ফেইক আইডির শাস্তিও তোলা রয়েছে। শুধু সময়ের অপেক্ষা।'
চলবে...
Writer:- নূরজাহান আক্তার (আলো)