> সাঁঝক বাতি পর্ব ৩, ৪ | Bangla Fiction | বাংলা জনপ্রিয় উপন্যাস
-->

সাঁঝক বাতি পর্ব ৩, ৪ | Bangla Fiction | বাংলা জনপ্রিয় উপন্যাস

শিফা আর ওর শাশুড়ির গল্প এখনো চলমান। 
তবে গল্পের প্রসঙ্গের বদল ঘটেছে।এখন চলমান 
প্রসঙ্গ; উনাদের পরিবার। এই যেমন, দিগন্ত খুব বাধ্য ছেলে! ঝোঁট-ঝামেলার মধ্যে নেই! বাসায় কখনো অভিযোগ আসে না। ছোট থেকেই শান্ত প্রকৃতির। নরম মনের। তবে হ্যাঁ, দাবা খেলায় বেশ পারদর্শী। কারো থেকে হেরেছে এমন রেকর্ড  নেই। ওদের বাবা আর দিগন্ত উনাদের ব্যবসায় ভালোই সুনাম কুড়িয়েছে। আর প্রশান্ত প্রাইভেট হসপিটালে প্রধানের দায়িত্বে নিযুক্ত! সেও তার দায়িত্বে অটল। হসপিটালের মালিক ডেনমার্কে
থাকেন। ওদের বাবার বন্ধু! উনি নিজে দায়িত্বটা প্রশান্তকে দিয়েছেন। আর নিহা তেমন কিছু করে না। পড়াশোনা, চাকরি, কোনোটাই পছন্দ নয়। 
গৃহকর্মরই তার ভালো লাগে। তাই উনার মতো সেও গৃহিণী। শিফা এতক্ষণ চুপ করে সব শুনে বলল,
-'আন্টি, আমার একটু বাইরে যাওয়া দরকার।'
ইয়ে মানে..! 

কথাটা বলে মাথানিচু করে ফেলল। এমনভাব
যেন লজ্জায়, মরি! মরি! শাশুড়ি হেসে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। মেয়েদের কত কী লাগে৷ সব কী আর সবাইকে বলা যায়! শিফা ঝটপট উঠে, 
শাশুড়ির থেকে শাড়ি নিয়ে পরে বেরিয়ে গেল।
কিছু জরুরী কাজ আছে, না করলেই নয়। অটো নিয়ে সে সাফার বাসায় চলে গেল। এইতো বিশ মিনিটের পথ। স্বপ্নীল দরজা খুললে শিফা ওকে সরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। স্বপ্নীলের ঠোঁটের কোণে হাসির ঝলক স্প্ষ্ট। সে মনে প্রাণে চাচ্ছে, ওর ভাবনা যেন সত্যি হয়। শিফা শুধু একবার বলুক, 'এসেছি, গ্রহণ করো আমায়।'
সাফার বাবা-মা ড্রয়িংরুমে বসে ছিলেন। শিফা
উনাদের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
-'মামানি, কালকে আমার বিয়ের অনুষ্ঠান করা হবে। আব্বু তোমাদের বলবে। আমিও এসে বলে গেলাম, অপেক্ষায় থাকব।'
শিফা কারো জবাব না শুনে সাফার রুমে প্রবেশ করে দরজা আটকে দিলো। সাফার ফটোফ্রেমের হাতে তুলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। কাঁদল না! 
তবে স্বাভাবিকভাবে বলল,
-'তোর ভাইকে আমার পথ থেকে সরতে বল।
নয়তো তাকে মূল্য চুকাতে হবে।' 
তখন স্বপ্নীল বেলকনি দিয়ে রুমে প্রবেশ করল। শিফার কথার জবাবে সেই প্রত্যুত্তর করল,
-'চুকাতে প্রস্তুত, তুই আমার হয়ে যা।'
-'ভালোবাসো আমাকে?'
-'প্রচন্ড!'
-যা চাইব দিবে?'
-'একবার চেয়ে তো দেখ।'
-প্রমিস।'
-'পাক্কা, প্রমিস।'
-'আমার পথ থেকে সরে যাও। নয়তো তুমিও মারা পড়বে।'
স্বপ্নীল এবার রেগে ওকে দেওয়ালে সাথে চেপে ধরল। মেয়েটা এবার অতিরিক্ত করছে। ওর'ও  ধৈর্য্যসীমা বলে কিছু বলে আছে৷ আর কত সহ্য করবে? ওর বিয়ের দাওয়াত দিতে এসেছে। অথচ
একবারও ভাবে নি, একথা শুনে স্বপ্নীলের কেমন লাগবে? কষ্টে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারতে এই মেয়ে উঠে পড়ে লেগেছে। কেন এত শাস্তি? শুধু ওকে ভালোবাসার অপরাধে? স্বপ্নীল শিফার দুই গাল শক্ত চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলল,
-'আমরা তোর হাতে মোয়া, হুম? দিগন্ত আর আমার জীবন সস্তা? আমরা তুচ্ছ? ওই ছেলেটা কি করেছে, তাকে কেন জড়ালি? কেন আমাদের
সাফার করাচ্ছিস? কিসের এত তেজ? এসবে কি সুখ পাচ্ছিস?'
শিফা হাসল। স্বপ্নীলে হাতটা কোনোমতে সরিয়ে চোখে চোখ রেখে বলল,
-'বেশ করেছি, পারলে ঠেকাও।'
-'শিফা অতিরিক্ত কিছুই ভালো নয়! কেন এমন করছিস? আচ্ছা বল না, তুই কী সত্যি আমাকে ভালোবাসিস না?'
-'বাসি তো, এখনো ভালোবাসি।'
-'তাহলে দিগন্তকে বিয়ে করলি কেন?'
-'ভালোবাসলে বিয়ে করতে হবে? কোথায় লিখা
আছে? অন্যরা করে বিধায় আমাকে করতে হবে,
কেন? আমি করলাম না, তো কি হয়েছে? আজ থেকে তোমাকে ভালোবাসব না। দিগন্ত'ই বেস্ট!
আমাদের অপ্রকাশিত সম্পর্কটাও এখানে শেষ করলাম।'

স্বপ্নীল ওকে ছেড়ে মাথা চেপে ধরে বসে পড়ল।
ভালোবাসে ওকে বিয়ে করল দিগন্তকে।এ'কেমন ভালোবাসা? এই মেয়ে কোন ধ্বংসলীলায় মেতে উঠল? সে কেন বুঝছে না, এটা জীবন! খেলনা নয়। স্বপ্নীলকে বসতে দেখে শিফাও পাশে বসল।স্বপ্নীল মুখ তুলে কাতর সুরে বলল,
-'এমন কেন করছিস শিফা? জীবন খেলার বস্তু
নয়।'
-'জানি। কেন করছি, বলব?'
-'হুম।'
-'তোমার বোন সাফা দিগন্তকে পছন্দ করত। সে চাইত, দিগন্ত ভালো থাক! সাফা নেই আমি তো আছে। আর সাফার পছন্দের জিনিস হারাতে দি কিভাবে? তুমি তো জানো সাফা আমার প্রাণ? এজন্য দিগন্তকে বিয়ে করলাম।'
-'সাফা কী বলেছিল, বিয়ে করতে?'
-'না তো।'
-'আমি বোকা নই, শিফা।'
-'বোকা বানানোর সুযোগ পেলে কে বা মিস করে বলো? আমিও করতে চাইলাম, হলে না। কি আর করার।'
স্বপ্নীল বাকশূন্য। তারমানে শিফা সত্যিই বোকা বানিয়ে এড়িয়ে যেতে চাচ্ছিল। কিন্তু কেন? শিফা উঠে সাফার ফোটোফ্রমটা হাতে নিয়ে যেতে যেতে বলল,
-'খবরদার, তোমার মুখ আর আমাকে দেখাবে না। নয়তো বুক বরাবর ছুরি চালাতে দু'বার ভাববো না। জানিয়ে দিলাম, পরে দোষ দিও না, গেলাম!'
কথাটা বলে শিফা গুনগুন করতে করতে বেরিয়ে গেল। তার মুখে আছে না কষ্টের রেশ; না চাপা আতনার্দের। একদম স্বাভাবিক। যেন কথাগুলো 
খুব সাধারণ। এতটাই সাধারণ ওর মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া কাজ করছে না। বরং গাইছে,

-'আ'ম সো লোনলি, ব্রোক্যান এঞ্জেল।
আ'ম সো লোনলি, লেস সাম টু মাই হার্ট।'

ব্রোক্যান এঞ্জেল! গানটা ওর পছন্দের তালিকার শীর্ষে। সর্বদা গুনগুন করে। শিফা সাফার বাবা মাকে বলে বেরিয়ে গেল। যতক্ষণ থাকবে দু'জনে কাঁদতে থাকবেন। এখন যেমন কাঁদছেন।যতবার সে আসে ততবার'ই কেঁদে বিদায় দেন। হয়তো সাফার কথা মনে হয়। একমাত্র আদরের মেয়ে ছিল। আর বাবা-মা সন্তানকে কখনো ভুলে না।পৃথিবীর সমস্ত সুখ হাতের মুঠোয় পেলেও না। 
এদিকে, স্বপ্নীল নিশ্চুপ হয়ে শিফার ভাবনায় মগ্ন। কারণ শিফা বরাবরই খুব কঠোর মনের অধিকারী। খুব সহজে আবেগ কনট্রোল করতে পারে। যেন সব স্বাভাবিক, হাতের মোয়া। এমন ধাঁচের মেয়ে স্বপ্নীল আগে দেখিনি। হয়তো তাই এতটা ভালোবাসে। শিফা অর্থলোভী নয়। আর
হলেও তাকে ছাড়ত না। কারণ দিগন্তের চেয়ে ওর অর্থসম্পদ কম নেই। তাছাড়া, শিফার বাবারও অঢেল সম্পদ। তাই অর্থলোভীর দূর্বল যুক্তিটা ওর সঙ্গে যাচ্ছে না। তবে ছলনাময়ী, হৃদয়হীনা, স্বার্থপর, তো বটেই।

শিফা দ্রুত কিছু কেনাকাটা সেরে বাসায় ফিরল। নয়তো মিথ্যে অজুহাত ফিঁকে হতো। শাশুড়িরও সন্দেহ করত। আসল কাজটা হয়েছে, এই ঢের!
শিফা ফ্রেশ হয়ে নিহার সঙ্গে রান্নার কাজে হাত লাগাল। বাসার কেউ বুয়ার রান্না খায় না। নিহা কিংবা ওর শাশুড়িই রান্না করেন। ওকেও করতে হবে। কথার ছলে যতটুকু বোঝা গেল, নিহা খুব বোকাসোকা। যে যা বলে তাই বিশ্বাস করে। সত্য যাচাই করার রেশ ওর মধ্যে নাই। হ্যাঁ পরহিংসাও 
বটে! বাসার কাজের মহিলা কাজ সেরে শিফার সঙ্গে গল্প করলেন। চারবছর ধরে উনি এবাসায় কাজ করেন, এখানেই থাকেন। বিয়ে করেন নি।
মধ্যবয়সী মহিলা, নাম হচ্ছে সুফিয়া। পছন্দের খাবার পান। উনার বক্তব্যেই জানা গেল। পান নিয়ে প্রশান্ত খ্যাচ খ্যাচ করলেও শোনে না। ভাত ছাড়তেও রাজি তাও পান নয়। এটা যেন অমৃত। 
দুপুর ছেলেরা কেউ বাসায় আসে না। একেবারে সন্ধ্যায় বা রাতে ফিরে। তাই কেউ বসে না থেকে গোসল সেরে খেয়ে নিলো। শিফাও খেয়ে রুমে গিয়ে ঘুম দিলো। সে বাবা আর ভাইয়ের প্রতি অভিমানে কথা বলে নি। অভিমান কমলে পরে বলবে। এখন অভিমান কবে ভাঙবে; এটা বলা দায়।

দুপুর গড়িয়ে বিকেলের আগমন ঘটল। এখনো রোদ আছে। রোদের তাপ'ও প্রচুর। সূর্য'টা রেগে ভালোই দাপট দেখাচ্ছে। যেন তার দৃঢ় সংকল্প,
'যতক্ষণ থাকব তেজ নিয়ে'ই থাকব। এই তেজে একেবারে ঝলসে দিবো। তাই লাগতে এসো না।' বিকাল সাড়ে পাঁচটার দিকে, নিহার টানাটানিতে শিফা ঘুম থেকে উঠে ছাদে গেল। রোদ নেই।বেশ লাগছে, ফুরফুরে বাতাস। সূর্যটা নত হয়ে বিদায় জানাচ্ছে। বেলাশেষে হার মানল! এদিকে ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামছে। নিহা আর শিফা ছাদে আর কিছুক্ষণ থেকে নিচে নামল। তারপর একে একে পুরো বাসায় জ্বালিয়ে দিলো, সাঁঝক বাতি।
-

-'ছ্যার আচার লইবেন, আচার? খুব মজাদার আচার। আমার আম্মা বানাইছে।'

কথাটা বলে ছেলেটা দিগন্তের দিকে তাকাল। জবাবের আশায়! বয়স বারো কি তেরো। পরণে 
জীর্ণবস্ত্র আর এলোমেলো রুক্ষ চুল। মলিন মুখ! হয়তো সারাদিনে বিক্রি হয় নি, খায়ও নি। দিগন্ত আচার দেখে বলল,
-'সবগুলো'ই দাও, এই আচার অনেকদিন ধরে খুঁজছিলাম।'
ছেলেটার চোখ দু'টো চকচক করে উঠল। হয়তো খুশিতে! তার খুশিটা ঠিক, চাতকপাখির অধীর হয়ে চাওয়ার পর একপশলা বৃষ্টি পাওয়ার মতো। পেটের ক্ষুধা আর শূন্য পকেট। এই দু'টো থেকে 
সীমিত সময়ের জন্য মুক্তি পাওয়ার খুশি। ওর হাসিটা, মাকে গিয়ে উৎফুল্ল হয়ে 'আম্মা আইজ সবডি বেইচ্চালাইছি' বলার প্রান্তবন্ত হাসি। এই হাসি ও খুশির তাৎপর্য বোঝা সবার কম্য নয়। 
যদিও যেঁচে কেউ বোঝার চেষ্টাও করে না। দিগন্ত ছেলেটার খুশি দেখে হাসল। অমায়িক হাসি।তবে ছেলেটা দাম কষতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে লজ্জিত কন্ঠে বলল,
-'আপনেই হিসাব করেন, ছ্যার। আমি এত বড় হিসাব পারুম না।'
দিগন্ত ফোনে হিসাবটা করে ওকে দেখাল। যাতে মনে না হয়, সে ঠকেছে। ছেলেটা খুশি হয়ে টাকা আর ঝুড়ি নিয়ে বিদায় হলো। হেঁটে নয়, দৌড়ে যাচ্ছে। হয়তো এভাবে ওর আনন্দটাকে প্রকাশ করছে। 
দিগন্ত কয়েকপ্যাকেট রেখে টোকাইদের সব দিয়ে দিলো। বাকিগুলো গাড়ির ড্রাইভারকে। ঢাকার জ্যাম নিয়ে কিছু বলাও বৃথা। রোজকার সমস্যা। 
জ্যামে আটকে প্রায় দেড়ঘন্টা যাবত বসে আছে। কখন ছুটবে, কে জানে! ড্রাইভার উঁকিঝুঁকি মেরে দেখে গাড়ি এগোচ্ছে। দিগন্ত সিটে মাথা হেলিয়ে চোখজোড়া বন্ধ করল। হঠাৎ শিফাকে স্মরণে আসল। মেয়েটাকে সারাদিনে খুব মিস করেছে।  দিগন্ত ওর ভাবনায় মগ্ন হলো। শিফাকে সে প্রথম দেখেছিল, ওর বাগানের ফুল ছেঁড়ার সময়। তাও পছন্দের ফুল। এতে প্রচুর রাগ ও বিরক্ত দু'টোই হয়েছিল। শিফা ফুল ছিঁড়ে সাফার লম্বা মোটা বেনুনিতে গেঁথে দিচ্ছিল। সাফা ভয়ার্ত দৃষ্টিতে আশেপাশে তাকিয়ে বারণ করছিল। দিগন্ত ঠিক ওদের পেছনে দাঁড়িয়ে সব দেখে বলেছিল,
-'ফুল গাছেই বেশি মানায়।'
শিফা একবার দিগন্তের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
-'এটা কে রে সাফা?'
-'বাড়িওয়ালার ছেলে, নাম দিগন্ত।'
শিফা অবিলম্বে আরেকটা ফুল ছিঁড়ে অকপটে উত্তর দিলো।
-'মনে করানোর জন্য, ধন্যবাদ। বাড়িওয়ালার ছেলে বিধায় ভাষণ দিবেন? তো শুনুন, এই যে আমার বান্ধবী, ওর বেনুনিতে ফুল দিতে ইচ্ছা করছিল। তাই সামনে ফুল দেখে ছিঁড়ে ফেলেছি।
বলা উচিত ছিল, এজন্য দুঃখিত। তবে সাফার আবার ইচ্ছে করলে, আমি আবার ছিঁড়ব এবার
আগেই বলে দিলাম।'
কথাগুলো বলে শিফা সাফাকে নিয়ে চলে গেল।
দিগন্ত চুপ করে দেখল। মেয়েদের সঙ্গে তর্ক করা, 
শোভনীয় নয়। এরপরেও শিফা ফুল ছিঁড়েছিল।
সেদিন ভদ্রভাবে নিষেধ করেছিল। গাড়ির হর্ণের শব্দে দিগন্তের ভাবনায় ছেদ ঘটল। জ্যাম ছুটে, গাড়ি দ্রুতগতিতে ছুঁটে চলছে। উফ,এবার শান্তি। 
যথাসময়ে দিগন্ত বাসায় পৌঁছে আগে ফ্রেশ হয়ে নিলো। শিফা ছুরি হাতে নিয়ে একটু একটু করে আপেল কেটে খাচ্ছে।
দিগন্ত শিফাকে রাগাতে হাতের ভেজা তোয়ালেটা ছুঁড়ে মারল। শিফা চোখ তুলে তাকিয়ে পুনরায় আপেল কাটতে মনোযোগ দিলো। দিগন্ত এবার হেসে ওর আপেলটা কেড়ে কামড়ে বসাল। তখন শিফা বলল,
-'খুব ইচ্ছে করছে।'
-'কী?'
-'ছুরিটা দিয়ে আপনার হৃদয়টা খুঁচিয়ে দিতে।'

দিগন্ত হতভম্ব। মুখের আপেলটুকু চিবাতে পারল না। চোখে অবাকের চাহনি। সামান্য আপেলের জন্য একথা কেউ বলে? এই মেয়ে মজাও বুঝে না। এমন কেন মেয়েটা? এমনভাবে বলল, যেন বিরাট অপরাধ করে ফেলেছে। দিগন্তের মুখভঙ্গি দেখে শিফা উচ্চশব্দে হেসে উঠল। হাসি আর থামছে না। দিগন্তকে বোকা বানানোই ছিল, তার উদ্দেশ্যে। সফল হয়েছে! 
এসবে সে বরাবরই পটু। এমনকি বাবা, ভাইকেও ছাড় দেয় না। এটা হয়তো দিগন্তের জানা ছিল না।




শিফাকে হাসতে দেখে দিগন্ত আর কথা বাড়াল না। বাবা ডাকছেন। জুরুরি নাকি কথা আছে।
সে ভেজা তোয়ালে বেলকনিতে মেলে চলে গেল। শিফাকে নাহয় পরে দেখে নিবে। বলার ভঙ্গিমা দেখে ঘাবড়ে গেছে। ফাজিল একটা! অকারণে ভয় দেখাল। সুযোগের সৎ ব্যবহার সেও করবে।
আগামীকাল বিয়ের অনুষ্ঠান। দাওয়াত দেওয়ার পর্ব প্রায় শেষ। আয়োজন বড় করেই করা হচ্ছে। 
শিফাদের আত্মীয়-স্বজনরাও আসবে। এখন কালকের দিনটা ভালোই ভালোই কাটলেই হয়। 
দিগন্ত বাবার সাথে হালকা নাস্তা সেরে অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা করছে। সবকিছু তার পরিপাটি  চায়। এজন্য অহেতুক বাসায় ঝামেলা করে নি। কমিউনিটি সেন্টারে সব আয়োজন করেছে।আর শিফার সব সাজ-পোশাক সকাল নয়টা নাগাদ পেয়ে যাবে। তারপর সবাই ওখানে চলে গেলেই হবে। খাবারের মেন্যুও ওর পছন্দ মতো জানিয়ে দিয়েছে। 
প্রশান্ত এখনো বাসায় ফিরেনি। সে জানিয়েছে, ফিরতে রাত হবে। হসপিটালে কী সমস্যা হয়েছে, সেটা মিটিয়ে আসবে। তাই অপেক্ষায় না থেকে, 
আলোচনা শেষে রাতে খেয়ে যে যার রুমে চলে গেল। রাত তখন বারোটা সাত। নিকষ কালো রাত। কোথায় থেকে কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছে। 
কুকুরটা অনবরত ডেকেই যাচ্ছে। রাতে ঘুমায় নি কেন, কে জানে! বেলকনির দরজা দিয়ে বাতাস রুমে ঢুকছে। এতে জানালার পর্দাগুলো নড়ছে।
দিগন্তের রুমটা আকাশি আর সাদার সংমিশ্রণে
সাজানো। কী জানি কেন? হয়তো এই দু'টো ওর পছন্দের। বাতাসের সাথে ফুলের সৌরভ ভেসে আসছে। হয়তো বাগান থেকে। মনমাতানো এক মুহূর্ত!
শিফা ড্রেসিং টেবিলের সামনে চুল বাঁধছে আর গুনগুন করছে। মনটা বেশ ফুরফুরে, অজানা  কারণে। শিফা সাফার ছবির দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে হাসল। অর্থাৎ বলতো কেমন দেখাচ্ছে? 
সাফার হাসি মুখের ছবিতে যেন শাড়ি পরিহিত শিফাকেই দেখছে। শিফা মনমতো উত্তর বানিয়ে পুনরায় হাসল। তখন দিগন্ত বলল,
-'কালকে নাকি তোমাদের বাসায় যেতে হবে?'
-'হয়তো!'
-'থাকতে হবে?'
-'থাকলে কী আপনার মান যাবে?'
-'এভাবে কথা বলো কেন? আমি তা বলেছি?'
-'আমি এভাবেই কথা বলি। জন্মের সময় বাবা মেয়াদ উত্তীর্ণ মধু খাইয়েছিল। তাই হয়তো এমন হয়েছি।'
দিগন্ত মুচকি হাসল। মেয়েটার কাছে জবাব তৈরী করায় থাকে। সে বলামাত্রই অকপটে উত্তর দেয়।
দিগন্ত উঠে শিফাকে পেছন থেকে জড়িয়ে কাঁধে থুতনি রাখল। শিফা নিজের কাজে ব্যস্ত। না হচ্ছে অস্বস্তি; না লজ্জাবোধ। দিগন্ত কাঁধে ঠোঁট ছুঁইয়ে আদুরে সুরে বলল,
-'সত্যিই চাও আমায়?'
-'হুম চাই তো।'
-'কতটা চাও?'
-'যতটা চাইলে, না পাওয়া অবধি মনটা অশান্ত থাকে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। কষ্টগুলো অশ্রু হয়ে ঝরে, ঠিক ততটা।'
-'আমি যদি না চাই?'
-'কারণ দেখান। নয়তো স্ব-ইচ্ছায় আত্মসমর্পণ করুন।'

দিগন্ত শিফাকে একটানে ঘুরিয়ে ওর চোখে চোখ রাখল। শিফা চোখ সরাল না। বরং দিগন্তের চোখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করল। দিগন্ত হাসল।
মেয়েরা নাকি ছেলেদের চোখে চোখ রাখতে পারে না। অথচ শিফা! এমেয়েটা সত্যিই অসাধারণ। 
আবেগপ্রবন ন্যাকা মেয়েদের ওর সহ্য'ও হয় না। এরা আবেগী হয়ে ভুল পদক্ষেপ নেয়। সবকিছু আবেগ দিয়ে বিবেচনা করে। তাই হয়তো ঠকেও বেশি। দিগন্ত শিফার গালে দুই গালে হাত রেখে মৃদু স্বরে বলল,
-'আমি তোমাতে বিলীন হতে চাই। অনুমতি দিবে?'
শিফা ওড়নাটা ছুঁড়ে ফেলে দাঁড়িয়ে গেল। অর্থাৎ প্রস্তুত। দিগন্ত হেসে শিফার অধরচুম্বন করে সরে গেল। মূলত দেখতে চেয়েছিল, শিফা কী করে? শিফার দিকে থেকে একতরফা ভালোবাসা। কিন্তু ওর মনে এমন কিছু নেই। তাই সম্পর্কটাকে সময় দিতে চাচ্ছে।এই শরীর টাকার বিনিময়েও পাওয়া যায়। কিন্তু মনের মিল, প্রণয়, টান, মায়া, গাঢ় অনুভূতি? আদৌ চাহিবামাত্রই সেটা জন্মে কি? হয়তো না! এখন ঘনিষ্ঠ হওয়ার মানে, শারীরিক চাহিদা হাসিল ছাড়া কিছু নয়। গতরাত থেকে সে শিফার সঙ্গে আছে। এতটুকু সময়ে কতটুকুই বা মায়া জন্মে? আগে শিফাকে সেভাবে দেখেও নি। তাই একটু সময় দেওয়াটা; বুদ্ধিমানের কাজ নয় কী? যদি ঘনিষ্ঠ হয়ও, তা হবে মোহ বা চাহিদার তাগিদে। এছাড়া কিছু নয়! আর সে এরকম কিছু চাচ্ছে না। তাই শিফাকে বলল,
-'সঠিক সময়ে আমার প্রাপ্য বুঝে নিবো, এখন ঘুমাও।' 

শিফা সুবোধ বালিকার মতো মাথা নাড়িয়ে শুয়ে পড়ল। চোখজোড়া বন্ধ করে হাসছে। সে জানত, এমন কিছুই হবে। দিগন্তও পাশে শুয়ে পড়ল।ওর দৃষ্টি শিফার দিকে। শিফাকে হাসতে দেখে গালে টোকা দিয়ে বলল,
-'ছাড় দিয়েছি ছেড়ে দেইনি।'
-'ছাড় চেয়েছে কে?'
-'তাহলে..!'
-'রাত অনেক হলো ঘুমান, শুভ রাত্রি!'

শিফা পাশ ফিরে শুয়ে নিরবে হাসছে। দিগন্তও 
হাসল। শিফা ভাংবে তবুও মচকাবে না।মেয়েটার ভালোবাসার ধরণ অদ্ভুত। হোক না, তাতে কী! অদ্ভুত ভালোবাসাকেই সে সাদরে গ্রহন করবে।
দিগন্ত ঘুমের রাজ্যে পাড়ি দিলো। বাকিটা নাহয় পরে দেখা যাবে!
পরেরদিন সকাল থেকে বাসায় তোড়জোড় শুরু হয়েছে। শিফার হেলদোল নেই।সে নিজের কাজে মগ্ন। ওর বাবা গতকাল থেকে ফোনে না পেয়ে দিগন্তের থেকে খোঁজ নিয়েছে। মেয়ে ঠিক আছে, শুনে শান্ত হয়েছেন। উনারাও অতিষ্ঠ। মেয়েটার এত রাগ, জেদ, বলার বাইরে। যখন যা বলবে তাই করবে! যে বাঁধা দিবে সেই তার শত্রুপক্ষ। 
জেদের বশে তাড়াহুড়ো করে বিয়েটাও করেছে। 
এমনকি উনাদের অনুষ্ঠান করতে বারণ করেছে। বারণ উপেক্ষা করে করলে, 'সে আর বাসাতেই যাবে না।' 
পরে দিগন্ত এসব শুনে উনাদের বুঝিয়ে বলেছে। 
আর আশ্বস্তও করেছে সব সামলে নিবে।

সকাল দশটার দিকে শিফা নিজেই তৈরী হয়েছে। নিহা সেজেছে পার্লারের মেয়েটার থেকে। মেয়েটা এসেছিল, শিফাকে সাজাতে। শিফা সরাসরি না করে দিয়েছে। দিগন্ত একটু বাইরে গিয়েছিল।এক ঘন্টার জন্য। শিফার জরুরি তলবে তাৎক্ষণিক ফিরতে হয়েছে। আসার পরে, ওকে দিয়ে শাড়ির কুচি ধরিয়েছে। এতক্ষণ এভাবেই বসেছিল। পরে
দিগন্ত এই অবস্থায় দেখে বলল,
-'ভাবিকে ডেকে দিবো?'
-'আমি ভাবির সূত্রধরে এবাসায় এসেছি?'
-'আচ্ছা বলো, কিভাবে, কী করব?'

শিফার কথামতো দিগন্ত সেভাবে সাহায্য করল।
দিগন্ত মনে মনে খুশি হয়েছে। এই অত্যাচার সহ্য করতে সর্বদা প্রস্তুত। সাথে এটাও অবগত, শিফা কোনো ইচ্ছেপোষণ করলে তাকে'ই পূরণ করতে হবে। নয়তো অভিমানে কথা বন্ধ। যেমনটা ওর বাবার সঙ্গে করছে। উফ, মেয়েটা প্রচুর জেদি! যা বলবে তাই ঠিক। তবে মুখ্য কথা, এমন প্রকৃতির মেয়েরা প্রচুর ভালোবাসতে পারে। সেদিক থেকে সে সৌভাগ্যবান।

তারপর যথাসময়ে সবাই নিদির্ষ্ট গন্তব্যে বেরিয়ে গেল। শিফার বাবা-মা ওখানেই অপেক্ষমাণ।
মেয়েটাকে একবার দেখার জন্য উনারা ব্যাকুল হয়ে উঠেছেন। না জানি ওখানে কেমন আছে?
শিফারা গাড়ি থেকে নামতেই সবাই উৎসুক হয়ে ওদের দিকে তাকাল। একটুদূরে, শিফার পরিবার দাঁড়িয়ে আছেন। বাবা-মা। বড় ভাই শিহাব তার পাশে তার স্ত্রী তমা। একটুদূরে ছোট ভাই রাফি, আর রাফির কোলে শিহাবের চার বছরের ছেলে তনয়। মোট ছয় সদস্যে পরিবার। শিহাব ব্যাংকে কর্মরত আর রাফি দশম শ্রেণিতে অধ্যায়নরত।
সুখী পরিবার। শিফা সেদিকে না এগিয়ে সাফার বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলল। ওয়েটারকে ডেকে স্পেশাল আপ্যায়নের তাগিদ দিলো। সাফার মা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
-'খুব সুন্দর দেখাচ্ছে আমার মাকে।'
-'এবার বলো, কে বেশি সুন্দর সাফা না শিফা?'

শিফা আর সাফা এসব নিয়ে খুব ঝগড়া করত। 
একটুপরে মিটেও যেতো। একজন আরেকজনকে ছাড়া যেন অচল। যেখানেই যেতো একজোড়ে। 
পোশাকও এক ;এমনকি চুলের স্টাইলও। ফিতা দিয়ে মেপে সাফার চুল একচিমটি বড় হলে শিফা কেটে দিতো। কোথাও বের হওয়ার আগে ফোনে আগে জেনে নিতো, কোন পোশাক, কিভাবে চুল বাঁধবে? তারপর দু'জনে বের হতো। অথচ আজ শিফার খুশির দিনে সাফা নেই। শিফা স্বাভাবিক
থাকলেও ওর কষ্টটা বুঝেছেন। এই মেয়েটা শক্ত হলেও মানুষ। উনি শিফাকে বুকে জড়িয়ে কেঁদে  ফেললেন। শিফাও উনাকে আঁকড়ে ধরল, তবে কাঁদল না। কেঁদে নিজেকে দূর্বল করার মানে হয় না। স্বপ্নীল আসে নি। তার নাকি জরুরি কাজ আছে। শিফার পরিবারের সবাই ওর সঙ্গে কথা বলল। ওর বাবা-মা ভালো-মন্দ কিছু জিজ্ঞাসা করলন। দিগন্ত সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করে সরে গেছে। তমা শিফাকে দিগন্তের পাশে বসিয়ে দিয়ে আসল। আত্মীয়-স্বজনরা ওদের উপহার দিয়ে দোয়া করে যাচ্ছে। ফটোশুট, খাওয়ারপর্ব, 
আরো যাবতীয় কাজের সমাপ্ত হলো। আজকে
শিফাদের বাসায় যেতে হবে। এটা নাকি নিয়ম।প্রশান্তরা বিদায় নিয়ে চলে গেল। আর দিগন্তরা এলো শিফাদের বাসায়।

দিগন্ত শিফার বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। তনয় তার কোলে। আসার পর থেকে ওকে ছাড়তে না।
এতক্ষণ কোলে নিয়ে থাকায় হাতটা ধরে গেছে। 
একটু নিচে নামালেই কাঁদছে। গলা তো না যেন বাঁশি। বিরক্তিকর শব্দ করলেও হুমকি দিচ্ছে,' 
ছবাইকে বলে ডিবো কুন্তু।' রাতের খাবারও ওকে কোলে নিয়ে খেতে হয়েছে। একটুপরে, তমা এসে ওকে নিয়ে গেল। দিগন্ত যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
শিফা এসে দরজা আটকে ফ্রেশ হয়ে বসল। খুব ক্লান্ত লাগছে। সে উঠে দাঁড়াতেই দিগন্ত ওর হাত মুঁচড়ে গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো। জুতো মেরে গরু দান করার মতো। শিফা ব্যথা পেলেও নিশ্চুপ। 
ব্যথায় নিচের ঠোঁট কামড়ে মুখ কুঁচকে নিয়েছে।
হাতটা বুঝি ভেঙেই যাবে। শিফাকে নিশ্চুপ দেখে দিগন্তই ফিচেল কন্ঠে বলল,
-'আমার সঙ্গে লড়াই করবা জান? কিন্তু ভুল চাল দিয়ে ফেললে যে। এটা কিন্তু মোটেও ঠিক হয় নি। ছিঃ! এই তোমার ভালেবাসা?'

শিফা খুব কৌশলে দিগন্তের হাঁটু বরাবর লাথি দিলো। দিগন্তের হাত দূর্বল হলে চুল খামছে ধরে সরিয়ে দিলো। দিগন্ত মুখ থুবকে পড়তে গিয়েও সামলে নিলো। শিফা তখন তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
-'ভালোবাসা মাই ফুট বাস্টার্ড। জলে-ডাঙ্গা করে অহেতুক সময় অপচয়। তাই তোর স্থলেই আমি জায়গা করে নিয়েছি। এবার খেল দেখা। মিথ্যে
উক্তিতেও ভালোবাসা হয় বুঝি? উফ, এত্ত শখ ভালোবাসা পাওয়ার, আহারে!'

দিগন্ত উচ্চশব্দ হেসে উঠল। মেয়েটা খুব বেশিই সাহসী। কথাটা অস্বীকার করার মতে নয়। এটা অপ্রিয় হলেও সত্য। ওর চালে ওকেই বাজিমাত, বাহ! শিফা তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারীণী। ইংলিশে বলে,'মাষ্টার মাইন্ড।' এবার লড়াই জমবে।আর
দিগন্ত সঙ্গী হিসেবে এমন কাউকে আশা করতো! পরিস্থিতি মোতাবেক পেয়েছেও। পারফেক্ট জুটি। শিফা ওর দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করেছে। যেন চোখ দিয়েই ভস্ম করে দিবে। 
তখন দিগন্ত এগিয়ে এসে শিফার ঠোঁটে আঙ্গুল বুলিয়ে বলল,
-'এই তেজের জন্য তোমাকে আমার এত্ত ভালো লাগে। নয়তো কবেই খেয়ে ছেড়ে দিতাম।'





চলবে...





Writer:- নূরজাহান আক্তার (আলো)


NEXT ARTICLE Next Post
PREVIOUS ARTICLE Previous Post
NEXT ARTICLE Next Post
PREVIOUS ARTICLE Previous Post
 

Delivered by FeedBurner