> ভেজাগোলাপ পর্ব ৪, ৫, ৬ | রোমান্টিক প্রেমের গল্প | Bangla Love Story | Love Story Bangla
-->

ভেজাগোলাপ পর্ব ৪, ৫, ৬ | রোমান্টিক প্রেমের গল্প | Bangla Love Story | Love Story Bangla

সোফায় বসে আছে নীরাদ।বেশ হাসসোজ্জল ভাবে কথা বলছে তার ভাইয়ের সাথে।"উনি এখানে কি করছেন?"প্রশ্নটা মাথায় আসলে মুখে বলার আগেই ভাবি পাশ থেকে বলল,

-তোর ভাইয়াই আসতে বলেছে,বুঝলি?ডিনারটা আমাদের সাথেই করতে বলেছে।সেদিন এত সাহায্য করল কিছু না করলে ব্যাপারটা খারাপ দেখায়।

-হুম,ভালো করেছো।

-তোর  ফিরতে এত দেরি হলো যে?

-পরে বলবোনে ভাবি।এখন একটু ফ্রেশ হয়ে আসি?

-আচ্ছা যা।

 ভাইয়ের সাথে দেখা করে,নীরাদকে সালাম দিয়ে নিজের রুমে চলে গেল রোদ্রি।

________________

অন্ধকার রুমে আধশোয়া হয়ে বসে আছে ফারহান।হাতে জলন্ত সিগারেট।পাশেই বিয়ারের কাঁচের বোতল।আজকাল এসবে তার নেশা হয়না।বোতলের পর বোতল বিয়ার খেলেও মাতাল হয়না সে।তার চোখেমুখে শুধু একটাই নেশা,আর সেটা হলো রোদ্রির নেশা।রোদ্রিকে কাছে পাওয়ার নেশা সে কিছুতেই কাটাতে পারে না।
গত একবছর থেকে রোদ্রিকে নানাভাবে কাছে পাওয়ার চেষ্টা করেছে সে।কিন্তু সব চেষ্টাই বিফলে গেছে।মেয়েটা অনেক ঘাড়ত্যাড়া।সামান্য ছুয়ে দিলে এত রাগের কি আছে বুঝতে পারেনা সে।বিছানায় নাহয় বিয়ের পরেই যাবে।

টেবিলে হরেকরকম খাবার সাজানো।নীরাদ বসে আছে চুপ করে।ভাবির কথায় মনে হচ্ছে সে এগুলো সব নীরাদকে খাইয়ে ছাড়বে।
"রোদ্রি কোথায় মিরা?"রিদানের প্রশ্নে মুখ তুলে তাকায় মিরা।ব্যস্ত কন্ঠে বলে,

-ডেকেছি...চলে আসবে।

মিরার কথা শেষ না হতেই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে রোদ্রি।নীরাদ কয়েক সেকেন্ড পলোকহীন তাকিয়ে চোখ নামিয়ে ফেলে।একটা মেয়েকে সাধারণভাবেই এতটা অসাধারণ কিভাবে লাগে?এর আগে যে দুইদিন দেখা হয়েছিলো তখন রোদ্রির মাথায় ঘোমটা দেয়া ছিল।কিন্তু আজ নেই।চুলগুলো হাতখোঁপা করা।

নীরাদের একেবারেই সামনের চেয়ারটায় বসেছে রোদ্রি।রোদ্রির পাশে মিরা।টুকটাক কথা হচ্ছে তাদের মাঝে।মিরা বারাবার ওঠে এটা ওটা দিচ্ছে নীরাদের প্লেটে।
রোদ্রি একমনে খাচ্ছে।খাওয়ার সময় কথা তার পছন্দ না।হঠাৎই নীরাদ বলে উঠল,

-আপনার বোন তো আমাকে রীতিমত চোরই বানিয়ে দিয়েছিল ভাইয়া।

রোদ্রি স্থির দৃষ্টিতে নীরাদের চোখে চোখ রাখে।লোকটার চোখে দুষ্টুমি খেলা করছে।মুখে প্রশস্ত হাসি।

-কি বলো!! রোদ্রি নীরাদকে তুই চোর বলেছিস?

রোদ্রি রাগি দৃষ্টি নিক্ষেপ নীরাদের দিকে।

-আমি কি জানতাম নাকি তুমি হসপিটালে?একজনের ফোনে অন্যকারো কন্ঠ শুনে যে কেও চোর ভাবাটাই খুব সাভাবিক নয় কি?

শব্দ করে হেসে ওঠে রিদান আর মিরা।

-ও একটু বাচ্চামো সভাবের।তুমি কিছু মনে করো না।

-হ্যাঁ সেটা তো আগেই বুঝেছিই।

"নীরাদ,তুমিতো কিছুই নিচ্ছো না।বলে মিরা আবারও উঠতে গেলে রোদ্রি থামিয়ে দেয়।

-তুমি এতবার উঠোনাতো।আমি দিচ্ছি।বলে তরকারির বাটি হাতে নেয়।

নীরাদের প্লেটে তরকারি দিয়েই যাচ্ছে রোদ্রি।নীরাদ বারবার না করা সত্তেও দিয়ে যাচ্ছে।নীরাদ থামানোর জন্য বেখেয়ালিভাবে রোদ্রির হাত ধরে শক্তকরে।রোদ্রি থেমে যায়।চমকিয়ে নীরাদের দিকে তাকায়।নীরাদ দ্রুত ছেড়ে দেয়।অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে দুজনেই।তবে রিদান আর মিরার সামনে কিছু বলেনা।

খাওয়া শেষে সব গুছিয়ে রাখে রোদ্রি।নীরাদের দিকে পানি এগিয়ে দেয়।গ্লাস নেয়ার সময় নীরাদের চোখে স্পষ্ট জলজল করে উঠে রোদ্রির অনামিকা আঙ্গুলে পড়ানো সাদা পাথরের আংটি।মনে মনে দীর্ঘ:শ্বাস ছাড়ে সে।
রিদানের থেকে কথার ছলে জানতে পেরেছে মাত্র দেড় মাস আগেই ওর বাগদান হয়েছে।ইশশ..কেন যে আর কিছুদিন আগে তার সাথে রোদ্রির দেখা হলোনা?হলে হয়তো তার সাথে এই হৃদয়ের অসহ্য দহন যন্ত্রণার সাক্ষাত হতোনা।




দুপুরে ভার্সিটির পর বিকেল পর্যন্ত কোচিং করে তারপর বাড়ি ফেরে রোদ্রি।আজকে কোচিং করে বের হয়েই দেখে,ফারহান গেটের সামনে গাড়ি নিয়ে দাড়িয়ে আছে।রোদ্রি এগিয়ে যেতেই হাত টেনে গাড়িতে বসায়।
রোদ্রি তাড়াহুড়ো করে বলে উঠে,

-আমি আপনার সাথে যাবোনা।বাড়ি যাবো প্লিজ।

ফারহান সবেমাত্র সিটবেল্ট বাঁধছিলো।রোদ্রির কথায় ওর দিকে ফিরে তাকায় সে।রোদ্রির চোখে চোখ রাখে সে।চোখ নামিয়ে মাথা নিচু করে রোদ্রি।একহাত দিয়ে নিজের সিটবেল্টটা মুঁচরাতে থাকে সে।সে জানে ফারহান তার ভাই ভাবির অনুমতি নিয়েই তাকে নিতে এসেছে।তাই এই অযৌক্তিক যুক্তি দেখিয়ে লাভ নেই।
নতুন কোন বাহানা খোঁজার জন্য মস্তিস্কের মধ্য কয়েকবার চিরুনি অভিযান চালায় সে।
গাড়ি স্টার্টের শব্দে হুস ফিরে তার।করুণ চোখে ফারহানের দিকে তাকাতেই ভরাট গলায় বলে উঠে ফারহান,

-সিটবেল্টটা মুঁচরানোর জন্য নয়।ওটা বাঁধো জান।নয়তো বাঁড়ি খেয়ে বাহানা খোঁজার সেই মাথাটাই থাকবে না।
একটা শয়তানি হাসি দিয়ে ড্রাইভিংয়ে মন দিলো সে।

বাধ্য হয়ে সিটবেল্ট বেঁধে সিটে মাথা এলিয়ে দিল রোদ্রি।খুব ক্লান্ত লাগছে তার।ঘুম পাচ্ছে অনেক।

আড়চোখে একবার রোদ্রির দিকে তাকাল ফারহান।এই মেয়েটাকে দেখলে ওর কামনা জাগছে ঠি কই তবে কোথায় যেন কিছু একটা বাঁধা দেয়।অনেক মেয়ের সাথেই সম্পর্ক ছিল ওর তবে ওই প্রথম মেয়ে যার সাথে জোর করে তেমন কিছুই করতে পারে না সে।মায়া লাগে খুব।

নিজের বাসার রোডে যেয়েও গাড়ি ঘুড়িয়ে ফেলে ফারহান।রোদ্রির বাসার সামনে এসে গাড়ি থামায়।
রোদ্রির কাছে যেয়ে হাল্কা করে ডাকে।রোদ্রি একটু নড়ে আবার ঘুমিয়ে যায়।ফারহান একদৃষ্টিতে কিছুক্ষন রোদ্রির গলার তিলটায় তাকিয়ে থাকে।হাল্কা করে ঠোঁট ছুইয়ে দেয়।ঘুমের মধ্যেই কেঁপে উঠে রোদ্রি।
ফারহান নি:শব্দে হেসে গাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।রোদ্রিকে কোলে তুলে নিয়ে বাড়িতে ঢুকে।
রিদান আর মিরার প্রশ্ন এড়িয়ে রোদ্রির রুমে যেয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয় আলতো করে।নরম বিছানা পেয়ে গুটিশুটি হয়ে শুয়ে পরে রোদ্রি।

ফারহান নিচে নামতেই মিরা প্রশ্ন করে,

-তুমি না বললে তোমার বাসায় নিয়ে যাবে?নিয়ে এলে যে?

-গাড়িতেই ঘুমিয়ে গেছে,ভাবি।ক্লান্ত লাগছিলো দেখে,আজকে রেস্ট নিক।অন্যদিন নিয়ে যাবোনে।

বিদায় জানিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে আসে ফারহান।ওকে ঘুমাতে দেখে যে শান্তিটা লাগছে সেটা জোর করে  বাসায় নিয়ে যাওয়ার মধ্য পেতোনা সে।

মেসেজের টুংটাং শব্দে ল্যাপটপ থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই ফোনটা হাতে নেয় নীরাদ।
মেসেজে ঢুকে কপাল কুঁচকে যায় তার।বেশ কিছু ছবি পাঠিয়েছে ইমন।ডাটা কানেকশন স্লো তাই দেখা যাচ্ছেনা ছবিগুলো।এক মধ্যই আরিফের কল আসে।রিসিভ করে সে,

-হ্যাঁ,আরিফ বলো।

-স্যার,রোদ্রি ম্যাডাম আর উনার ফিওনসের কিছু ছবি পাঠিয়েছে আপনাকে।দেখেছেন?

-না,দেখিনি এখনো।রোদ্রি ঠি ক আছে?

-জি স্যার।

-আচ্ছা,ঠি ক আছে।তোমার পেমেন্ট পৌছে যাবে।

-আচ্ছা স্যার।খুশিমনে ফোন রেখে দিল আরিফ।

ছবি নিয়ে বেশি মাথা ঘামালোনা নীরাদ।রোদ্রি ঠি ক আছে এটাই যথেষ্ট তার জন্য।ফারহান ছেলেটার উপর ভরসা নেই তার।ফোনটা পাশে রেখে আবারও কাজে মন দিলো সে।

সন্ধ্যার দিকে ঘুম ভাঙে রোদ্রির।নিজেকে নিজের বিছানায় আবিষ্কার করে বেশ অবাক হয় সে।সে তো ফারহানের সাথে ছিলো।তাহলে এখানে কিভাবে এল?

 দরজায় নক করার শব্দ হয়।

-রোদ্রি উঠেছিস?

-হ্যাঁ,আসো ভাবি।

রুমে ঢুকে লাইট জালায় মিরা।

-ভাবি?আমি না উনার সাথে ছিলাম?এখানে কি করে এলাম?

রোদ্রির কথায় ওর পাশে বসে মিরা।মাথায় হাত বুলিয়ে তখনকার কথা বলে।রোদ্রি অবাকের শেষ পর্যায়ে পৌছে যায়।তার ছোট্ট মাথায় একটা প্রশ্নই ঘোরে,"অসভ্য লোকটা এত ভালো হলো কেমনে"?

-ফারহান তোর অনেক খেয়াল করে রোদ্রি।দেখবি ওর সাথে তুই অনেক সুখী হবি।তোর ভাই তোর জন্য সঠিক মানুষই বেঁছে নিয়েছে।

মিরার কথার জবাবে কিছু বলেনা রোদ্রি।ভাবে,এই মানুষ দুইটাকে সে কিভাবে মানা করতো বিয়ের জন্য?

রাতের বেলা ফোন নিয়ে বসে নীরাদ।রোদ্রিদের ছবিগুলো বের করে অলস ভঙ্গিতে।প্রেয়সীকে দেখার প্রবল ইচ্ছা ফুটে উঠেছে তার।সামনে থেকে না হোক ছবিতেই তৃষনা মিটিয়ে নিবে সে।
তবে হয় তার উল্টো মুখে হাসির বদলে মুহুর্তেই চোয়াল শক্ত হয়ে আসে তার।মাথাটা ভারি ভারি লাগে।

ফোনটা পাশে রেখে চোখবন্ধ করে সে।রাগ কমানোর চেষ্টা করে।চোখের সামনে রোদ্রিকে চুমু খাওয়ার দৃশ্য ভেসে উঠে।কেমন এলোমেলো লাগে তার।কিনতু এটাতো সাভাবিক তবে সে কেনো মেনে নিতে পারছেনা?রোদ্রির মত থাকলে, এটাই তো হওয়ার ছিল, সে তো জানে রোদ্রি তার না।তবে কেন এত যন্ত্রনা?কেন নিজেকে কেন গুছিয়ে বোঝাতে পারছেনা সে?কয়েকদিনে এতটা এলোমেলো কেন হয়ে গেল সে?

হাজারটা "কেন" থাকলেও উওর একটারও নেই।নিজের জীবনের "প্রিয়" টাকে অন্যকারো "প্রিয়" হতে দেখার
ব্যাথাটা বুঝি এতটা তীব্র?




চারদিকে স্নিগ্ধ পরিবেশ।পশ্চিম আকাশে হেলে পরেছে সূর্য।পরন্ত বিকেলবেলা।
পার্কের এককোণে দাড়িয়ে আছে নীরাদ।পরণে তার সাদা রংয়ের টি-শার্ট।সাথে কালো ট্রাওজার।
একহাত পকেটে ঢুকিয়ে আরেকহাতে ফোন স্ক্রোল করছে সে।মাঝেমধ্য চোখ উঠিয়ে মার দিকে নজর রাখছে।

একটু দুরেই মনিরা আহমেদ অলস ভঙ্গিতে হাটাহাটি করছেন।নীরাদকে একপ্রকার জোর করেই নিয়ে এসেছেন তিনি।তার অবচেতন মন বারবার রোদ্রিকে খুঁজছে।সেদিনের পর মেয়েটাকে আর দেখেনি পার্কে।
একা একা হাঁটতে ভালোলাগেনা আর নীরাদ আজকে দুপুরেই বাড়ি ফিরেছে অফিস থেকে তাই তাকে সঙ্গে করেই নিয়ে এসেছে সে।হঠাৎই সামনে তাকিয়ে একটা দৃশ্য চোখে পড়তেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেল সেদিকে।

কাঁধে কারো সপর্শ পেয়ে চমকিয়ে পিছনে ফিরল রোদ্রি। রাস্তার কিছু বাচ্চাদের ঝালমুড়ি কিনে দিচ্ছিল ও।ভার্সিটির পর আজ আর বাসায় যায়নি ও।সোজা এখানে চলে এসেছে।
পিছনে তাকিয়ে মনিরাকে দেখে হাসিমুখে সালাম দিল সে।

-কেমন আছেন আন্টি?আপনার ব্যাথা কমেছে?

রোদ্রির ব্যবহারের আজও মুগ্ধ মনিরা আহমেদ।মেয়েটার মধ্যে বিরক্তি নামক শব্দটার অস্তিত্ব নেই।

-আমি ভালো আছি মা।তুমি কেমন আছো?

-আলহামদুলিললাহ ভালো আছি।আপনি আজকেও একা এসেছেন আন্টি?আবার ব্যাথা হলে?

-আজ আর একা আসিনি মা।আমার ছেলে এসেছে সাথে।

-ওহ্,আচ্ছা।

এরই মধ্যে ঝালমুড়িওয়ালা টাকা চেলে ব্যাগ থেকে টাকা বের করে দেয় রোদ্রি।

-বাহ্।তুমিতো বেশ ভালো মা।কজন ই বা ওদের সাথে এমন ব্যাবহার করে?

জবাবে মুচকি হাসল রোদ্রি।কিছু বললোনা।নিজের প্রশংসা শুনলে ওর কেমন জানো অসস্তি লাগে।
পরিচিত পুরুষালি কন্ঠে ধ্যান ভাঙে ওর।সামনে নীরাদকে দেখে বেশ অবাক হয়।

নীরাদ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রোদ্রির দিকে।আজকে দুইদিন পর রোদ্রিকে সামনাসামনি দেখলো ও।
এতক্ষনের বিরক্তিকর মেজাজটাও কেমন ফুরফুরে হয়ে গেছে।

-মিস রোদ্রি?আপনি এখানে?

রোদ্রি কিছু বলবে তার আগেই মনিরা আহমেদ বলল,

-তুই ওকে চিনিস নীরাদ?ওইতো সেদিন আমাকে বাসায় পৌছে দিয়েছিল।

-উনি আপনার মা?

ব্যাপারটা বুঝতে কয়েকসেকেনড লাগলে নীরাদের।মা সেদিন তাকে একটা মেয়ের কথা বলছিল কিন্তু সেটা যে রোদ্রি তাতো আর সে জানতোনা।

-জি,অনেক ধন্যবাদ আপনাকে সেদিন মাকে সাহায্য করার জন্য।

-না,ঠিকাছে।আমার জায়গায় অন্য কেউ থাকলেও এমনটাই করত।

-তোমরা কিভাবে একে অপরকে চিনো সেটা নাহয় পরে জানব।রোদ্রি মা,তুমি কিনতু আজকে আমার সাথে বাসায় যাবে।সেদিন কিছু না খেয়েই চলে গিয়েছিলে।

মনিরার কথা শুনে চিনতায় পরে গেল রোদ্রি।আজকে গাড়ি না নিয়েই বেরিয়েছে সে।এখন উনাদের বাসায় গেলে দেরি হয়ে যাবে।আর সন্ধ্যা  হয়ে গেলে একা একা বাড়ি ফেরার সাহস ওর মধ্যে নেই।আবার সামনে দাড়ানো মনিরাকেও না করতে পারছেনা।

না পেরে কিছুটা কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে বলল,

-আন্টি আমি অন্যদিন যাবোনে।বাসায় ভাইয়া ভাবি জানেনাতো।দেরি হলে চিন্তা করবে।এমনেও আজ একা এসেছি।

রোদ্রির কথার মাঝেই নীরাদ কিছুটা হন্তদন্ত গলায় বলল,

-আপনার ভাইয়াকে আমি জানিয়ে দিব সমস্যা নেই।আর আপনাকে বাসায়ও আমিই পৌছে দিব।

এবার আর কিছু বলতে পারেনা রোদ্রি।অগত্যা রাজি হতে হয় তাকে।

নীরাদ দের বাসার সামনের বাগানে ঘুরে ঘুরে দেখছে রোদ্রি।বাসার একপাশের এতবড় বাগানটা সেদিন তাড়াহুড়োয় খেয়ালই করেনি সে।ঠোঁটে প্রশস্ত হাসি নিয়ে বিস্মিত নয়নে ফুলগুলো দেখছে সে।বড় বড় রক্তলাল রংয়ের গোলাপ ফুটে রয়েছে একপাশে।আরো অনেক রকম ফুলের গাছও আছে তবে লালগোলাপের প্রতি তার একটা আলাদা আকর্ষন কাজ করে।সে নিজেও একটা গাছ লাগিয়েছিল তবে পরিচর্যার অভাবে কোনো ফুলই ফুটেনি।

-এগুলো কে দেখাশোনা করে মি.নীরাদ?

এতক্ষন রোদ্রির দিকে পলকহীনভাবে তাকিয়ে ছিল নীরাদ।তার ঠোঁটের প্রশস্ত হাসিটায় গভীরভাবে মশগুল ছিল সে।রোদ্রি আশেপাশে থাকলে অন্যদিকে তাকানোর ইচ্ছা বা ধ্যাণ কোনোটাই থাকেনা নীরাদের।

-মালীচাচা আছে।বাগানের দেখাশোনার জন্য।আর ছুটির দিনে সময়পেলে আমিও একটু আগাছা কেটে দেই।

জবাবে"ওহ্"বলে আনমনেই একটা গোলাপ ধরতে গেলে আঙুলের ডগায় কাঁটা বিধে যায় রোদ্রির।"আহ্" বলে মৃদু আর্তনাদ করে উঠে সে।
তড়িঘড়ি করে এসে রোদ্রির হাত চেপে ধরে নীরাদ।অস্থির কন্ঠে বলে,

-মিস.রোদ্রি কি করলেন?এটা ধরলেন কেন?জানেননা,গোলাপে কাঁটা থাকে।বলে খুব সন্তর্পণে কাঁটাটা
বের করে ফেলে।সাথে সাথেই রক্ত বেরিয়ে আসে।
ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে রোদ্রি।ছোট থেকেই রক্ত দেখতে পারেনা সে।

রোদ্রির রক্ত দেখে বিচলিত হয়ে উঠে নীরাদের মন।নিজেকে বারবার কথা শোনায়,ও একটু খেয়াল রাখলেই ব্যাথাটা পেতোনা রোদ্রি।

সোফায় চুপ করে বসে আছে রোদ্রি।খুবই যত্ন করে তার হাতে স্যাভলন লাগিয়ে দিচ্ছে নীরাদ।নীরাদের চেহারা দেখে ব্যাথার মধ্যেও হাসি পাচ্ছে তার।মনে হচ্ছে হাত হাতে নয় নীরাদের হাতেই কাঁটা ফুটেছে।আর ব্যাথাটাও তারই হচ্ছে।একবার স্যাভলন লাগাচ্ছে আর আরেকবার মুখ দিয়ে ফুঁ দিচ্ছে নীরাদ।রোদ্রিকে হাসতে দেখে শাসনের সুরে বলল,

-আপনি হাসছেন?কতটা রক্ত বের হলো দেখেছেন?বলে পাশে থাকা তুলাটা উঁচু করে দেখাল।

-আঙুলে কাটলে রক্ত একটু বেশিই বের হয় মি.নীরাদ।

-আর ব্যাথা?ব্যাথা পাচ্ছেন না?এরকম বাচ্চামো কাজ করলেতো ব্যাথাই পাবেন।কথায় কথায় তো কান্না করে দেন,আর আজ খুব হাসি পাচ্ছে না?

কথায় কথায় কান্না বলতে যে নীরাদ সেদিন হসপিটালের কথা বলেছে ব্যাপারটা বেশ বুঝতে পেরেছে রোদ্রি।রাগে গাল ফুলিয়ে সে বলল,

-ছাড়ুনতো,হাত ছাড়ুন আপনি।লাগবেনা আপনার কিছু করা।আপনি একটা..

আর কিছু বলার আগেই রোদ্রির ঠোঁটে আঙুল দিয়ে থামিয়ে দিল নীরাদ।শাসন ভরা গলায় বলল,

-একদম চুপ করে বসে থাকেন।কোন কথা বলবেন না।

লোকটার শাসনে কেমন যেন একটা মায়া আছে।উনার 
শাসন শুনে খারাপ লাগছেনা রোদ্রির।বরং একরকম ভালোলাগা কাজ করছে।

সুন্দর করে ব্যান্ডেড নাগিয়ে যখনই উঠতে যাবে নীরাদ,তখনই আকাশের মেঘ ডাকার শব্দ হয়।জানালার দিকে তাকিয়ে দেখে ঠান্ডা বাতাস হচ্ছে।হয়তো বৃষ্টি নামবে খুব জোরে।

-মি.নীরাদ।আমার এখন বাসায় যাওয়া উচিত।দেখুন বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে।

-আচ্ছা,ঠিকাছে।আপনি আসুন।আমি গাড়ি বের করছি।
______________
মাঝপথেই বৃষ্টি নেমে গেছে।বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা।এতক্ষন গাড়ির জানালা খুলে বাইরে তাকিয়ে ছিল রোদ্রি।শীতল বাতাসে কেঁপে উঠছিলো মাঝে মাঝে।নীরাদ জানালা বন্ধ করতে বললেও সে করেনি।বৃষ্টি শুরু হওয়ার পরও জানালা খোলা রাখায় পানির ছাঁট এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে রোদ্রিকে।

-মিস রোদ্রি এবার জানালাটা বন্ধ করেন।ভিজে যাচ্ছেনতো।
নীরাদের কথায় রোদ্রির কোনো হেলদোল নেই।বাধ্য হয়ে নীরাদ নিজেই কিছুটা ঝুকে যায় রোদ্রির দিকে,একহাতে সুইচ চেপে জানালাটা লাগিয়ে দেয়।বিরক্তি নিয়ে মুখ ঘুরাতেই নীরাদকে এতটা কাছে পেয়ে হচকচিয়ে যায় রোদ্রি।সাথেসাথেই সরে নিজের সিটে বসে পরে নীরাদ।

কিছু না বুঝেই ফট করে বলে রোদ্রি,

-আপনি এত আনরোমান্টিক কেন?কই বৃষ্টি উপভোগ করবেন,তা না করে জানালাটা বন্ধ করে দিলেন।

প্রশ্নটা করে নিজেই বেকুব হয়ে যায় রোদ্রি।ছিহ্,এটা কি বলল সে?বেশ লজ্জা পায় সে।

রোদ্রির প্রশ্নে হেসে দেয় নীরাদ।ব্যাপারটা সহজ করে দেয় রোদ্রির জন্য।হাসতে হাসতেই রোদ্রিকে বলে,

-আপনার কি এখন রোমান্স করতে ইচ্ছে করছে?হাউ ফানি।

সারাটা রাস্তা আর একটাও কথা বলেনি রোদ্রি।।চুপ করে বসে ছিল।নীরাদও কিছু বলেনি।
দুজনের মাঝেই কেমন একটা জড়তা।অসস্তির দেয়াল।যতবারই এ দেয়াল ভাঙতে চায় নীরাদ,ততবারই রোদ্রির হাতের জলজল করা আংটিটা তার "অন্যকারো"হওয়ার জানান দেয়।

বৃষ্টির বেগ বাড়ছে।ভিজিয়ে দিচ্ছে পুরো শহর।ধুয়ে মুছে সতেজ হয়ে যাচ্ছে প্রকৃতি।এভাবেই যদি তাদের মধ্যেকার জড়তাটাও মুছে ফেলতো পারতো এই বৃষ্টি।






চলবে...






Writer:- মালিহা খান



NEXT ARTICLE Next Post
PREVIOUS ARTICLE Previous Post
NEXT ARTICLE Next Post
PREVIOUS ARTICLE Previous Post
 

Delivered by FeedBurner