> ভেজাগোলাপ পর্ব ১, ২, ৩ | রোমান্টিক প্রেমের গল্প | Bangla Love Story | Love Story Bangla
-->

ভেজাগোলাপ পর্ব ১, ২, ৩ | রোমান্টিক প্রেমের গল্প | Bangla Love Story | Love Story Bangla

ফুল স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছে নীরাদ।একবার হাতঘড়িটার দিকে তাকাল।ঘড়ির কাঁটা এগারোটা ছুঁইছুঁই।আকাশে মেঘ ডাকছে।হয়তো বৃষ্টি নামবে।মা হয়তো তার অপেক্ষায় এখনো না খেয়ে আছে।অফিসে একটা জরুরি মিটিং ছিল।নয়তো দশটার আগেই বাড়ি ফেরে সে।
রাস্তা ফাঁকা মানুষজন নেই তেমন এই রাস্তায়।আনমনে গাড়ি চালাতে চালাতেই হঠাৎই ব্রেক কষে সে।
দ্রুত গাড়ি থেকে নামে।একটা গাড়ি এক্সিড্যানট হয়ে পড়ে আছে রাস্তার পাশে।অথচ কেউ ধরেনি পর্যন্ত।
অবশ্য এখানে মানুষজন নেই।গাড়ির সামনে যায় নীরাদ।ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জালিয়ে দেখে একটা যুবক কিছুটা আহত।তবে মাথায় আঘাতের ফলে অজ্ঞান হয়ে গেছে।আর কিছু না ভেবে তাকে নিজের গাড়িতে নিয়ে হাসপাতালের দিকে ছুটে চলে।

বারবার ভাইকে কল দিয়ে যাচ্ছে রোদ্রি।এত দেরি তো হয়না ভাইয়ার বাসায় ফিরতে।ফোন রিং হচ্ছে ঠি ক ই তবে ওপাশ থেকে রিসিভ হচ্ছে না।ভাইয়ায় চিন্তার ভাবির অবস্থা প্রায় কাঁদোকাঁদো।
-তুমি এত চিন্তা করোনাতো ভাবি।হয়তো ভাইয়ার ফোনটা চুরি হয়ে গিয়েছে অথবা কোথাও হারিয়ে ফেলেছে।সে জন্যই ধরতে পারছেনা।
ভাবি এবার কেঁদেই দিলো।হেঁচকি তুলে বললো।
-ফোন হারালে কি হয়েছে?এত দেরি তো ওর হয়না।ও তো অনেক আগেই চলে আসে।তোর কি মনে হয় ও এখন রাস্তায় রাস্তায় ফোন খুঁজে বেরাচ্ছে?
ভাবির কথার কি উওর দিবে বুঝতে পারেনা রোদ্রি।আরো কয়েকবার ফোন করে রিদান এর ফোনে কিন্তু না একবারও রিসিভ হলোনা।
-আমি বরং ম্যানেজার আঙ্কেল কে একটা ফোন দেই।
-দে।তারাতারি দে।
ম্যানেজারের নাম্বারে ডায়াল করার আগমুহূর্তে রিদানের কল আসে।
"ভাইয়া ফোন দিয়েছে"বলে দ্রুত রিসিভ করে রোদ্রি।প্রচন্ড উৎকন্ঠা নিয়ে বলে রোদ্রি,
-হ্যালো,ভাইয়া?কোথায় তুমি?ফোন ধরছিলে না কেন?কখন আসবে?এত দেরি হচ্ছে কেন?ঠি ক আছোতো তুমি?ভাইয়া?
একসাথে এতগুলা প্রশ্ন শুনে হচকচিয়ে যায় নীরাদ।তবুও নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বলে,
-আপনি একটু শান্ত হোন মিস।আপনার..

নিজের ভাইয়ের ফোনে অন্য মানুষের গলা শুনে বেশ অবাক হয় রোদ্রি।মুহুর্তেই রাগে দপ করে জ্বলে উঠে।
এতক্ষনের উৎকন্ঠামিশ্রিত গলায় মুহুর্তেই রাগি ভাব চলে আসে।

-এই কে আপনি?চোর নাকি?ভাইয়ার ফোন চুরি করেছেন তাইনা?এই একমিনিট..আপনি আবার ভাইয়াকে কিডন্যাপ করেননিতো?হ্যাঁ?

-আরে কি সব উল্টা পাল্টা বকছেন আপনি?মি.রিদান মানে আপনার ভাইয়ার গাড়ি এক্সিডেনট হয়েছে।..

-কিহ্?ভাইয়া কোথায়?বলতে বলতে কথার মাঝেই কেঁদে দিল রোদ্রি।

মেয়েটার এমন হঠাৎ কান্নায় অপ্রস্তুত হয়ে গেলো নীরাদ।মেয়েটার কান্না শুনে কেন  জানি প্রচন্ড খারাপ লাগছে ওর।সে নিজেও জানেনা কেন?নরম গলায় বলল,
-কাঁদবেননা মিস।আপনার ভাইয়ার কিছু হয়নি,উনি ঠিক আছেন।আপনি বা উনার ফ্যামিলির কেউ একটু হসপিটালে আসুন।

হসপিটালে পৌঁছে তড়িঘড়ি করে দোতালায় ছুটলো রৌদ্রি।ফোনের লোকটার লা কেবিনের সামনে এসে দাঁড়াল সে।একটা লোক..নাহ লোক বলা উচিত না।একটা ছেলে দাড়িয়ে আছে উল্টোদিকে ফিরে।ফোনে কথা বলছে।
সামনে এগোতেই কিছু কথা কানে এলো ওর।
-হ্যালো,মা তুমি খেয়ে নাও।আমার ফিরতে দেরি হবে।একটা জরুরি কাজে আছি।তুমি খেয়ে ঘুমিয়ে যাও।নয়তো কিন্তু অসুস্থ হয়ে পরবে।ওষুধ গুলোও খেয়ে নিও মনে করে।
ওপাশ থেকে কি বললো বুঝতে পারলোনা রোদ্রি।
-আমি এসে খেয়ে নিবো।তুমি ঘুমিয়ে যেও।জেগে থেকোনা।

-এক্সকিউস মি?আপনিই কি ফোন দিয়েছিলেন?
পিছন থেকে কারো মিষ্টি গলার ডাক শুনে ভ্রু উচিয়ে পিছনে ফিরে নীরাদ।
-আচ্ছা রাখছি।শুভরাত্রি।বলে ফোনটা কেটে দেয়।
সচেতন দৃষ্টিতে মেয়েটার দিকে তাকায়।মেয়েটার পরণে একেবারেই সাদামাটা একটা সালোয়ার কামিজ।মাথায়  ওড়না দিয়ে ঘোমটা দেয়া।গায়ের রং উজ্জল শ্যামলা।চোখদুটো লাল হয়ে আছে কান্না করার কারণে।
-জি আমিই ফোন দিয়েছিলাম।আপনার ভাইয়া কেবিনে আছে।ডকটরের সাথে কথা হয়েছে আমার।তেমন গুরুতর কিছু হয়নি উনার।মাথায় হাল্কা আঘাত পেয়েছে।আর হাতে একটু কেটে গেছে।ব্যান্ডেজ করে দেয়া হয়েছে।আপনারা ভেতরে গিয়ে দেখা করে আসেন।
-জি আচ্ছা,ধন্যবাদ।

ভাইয়ের সাথে দেখা করে ক্যাবিন থেকে বেড়িয়ে এলো রোদ্রি।ভাবি এখনও ভেতরে আছে।
ডকটরের সাথে কথা বলছিলো নীরাদ।রোদ্রিকে বের হতে দেখে একবার তাকিয়ে কথায় মনোযোগী হয়।

রোদ্রি ধীরপায়ে যেয়ে নীরাদ এর পাশে দাঁড়ায়।লোকটাকে তখন কতকিছু বলেছে?অথচ এই লোকটাই ওর ভাইকে হসপিটালে নিয়ে এসেছে।নিজের মধ্যেই একটা অপরাধবোধ কাজ করছে।
রোদ্রিকে এভাবে দাড়িয়ে থাকতে দেখে নীরাদই বলে উঠে,
-কিছু বলবেন?
নীরাদের ডাকে ভাবনা থেকে বেড়িয়ে আসে রোদ্রি।আমতা আমতা করে সে।কি বলবে বুঝে উঠতে পারেনা।
নীরাদ নি:শব্দে হাসে।মেয়েটাকে বেশ স্বাভাবিক লাগছে এখন।
-আপনার ভাইয়াকে বাড়িতে নিয়ে যেতে পারবেন।ঠিকমতো যত্ন নিলেই সুস্থ হয়ে যাবে।আর এইযে এটা নিন।
বলে একটা প্যাকেট বাড়িয়ে দিল রোদ্রির দিকে।
রোদ্রি প্যাকেটটা নিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল।
-এটার মধ্য মেডিসিন আছে।সাথে প্রেসক্রিপসন ও।টাইমলি খাইয়ে দিবেন।
এবার আরো একটু কাঁচুমাচু হয়ে যায় রোদ্রি।এই অসম্ভব ভালো লোকটাকে সে কিনা চোর বলে দিল?
-আসলে তখন..
-তখনকার কথায় আমি কিছু মনে করিনাই।আপনি নিতান্তই বাচ্চা মেয়ে।না বুঝে বলে ফেলেছেন।বাচ্চাদের কথা ধরতে নেই।সো ইটস্ ওকে।
বলে একটা মিষ্টি হাসি দিলো নীরাদ।
হাসিটা মিষ্টি হলেও রোদ্রির কাছে সেটা গা জালানো মনে হলো।লোকটা তাকে ঠান্ডা মাথায় অপমান করে দিলো?
-আপনার আমাকে বাচ্চা মনে হচ্ছে?(দাঁতে দাঁত চেপে কথাটা বলল)
-আপনি কি নিজেকে কোনোভাবে বয়সক প্রমান করতে চান?ওকে ফাইন।যান আপনি বাচ্চা নন একজন বয়সক মহিলা।এবার খুশি?
রাগে এবার কান্না পেয়ে গেল রোদ্রির।নীরাদ আবারও অপ্রস্তুত হয়ে যায়।মেয়েটা কখন কি করে বোঝা যায় না।
যখন তখন কান্না করে,রেগে যায়।আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়।সে তো একটু মজা করছিলো।কিন্তু মেয়েটা যে সিরিয়াসলি নিবে বুঝতে পারে নাই।
-আরে,আমি মজা করছিলাম।আপনি কাঁদছেন কেন?কাঁদবেন না প্লিজ।কাঁদলে কিন্তু আপনাকে সত্যিই বাচ্চা মনে হবে।
জোর গলায় চেচিয়ে উঠে রোদ্রি,
-কাঁদছিনা আমি।
বলে কেবিনের দিকে হনহন করে হেটে যায়।
রোদ্রির পিছে পিছেই কেবিনে ঢুকে নীরাদ।রিদানকে উদ্দেশ্য করে বলে,
-চলুন আপনাদের বাসায় পৌছে দিয়ে আসি।
রিদান কিছু বলতে যাবে তার আগেই রোদ্রি বললো,
-আমরা একাই যেতে পারবো।
রোদ্রির কথাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নীরাদ বললো-এত রাতে সিএনজি পাবেননা ভাইয়া।
-তোরা গাড়িতে আসিসনি?
-নাহ্।আঙ্কেল তো ছুটিতে।
-ওহ্।
-নীরাদ,তুমিই তাহলে একটু পৌছে দিয়ে আসো।আমাদের বাসা কাছেই।
-জি ভাইয়া অবশ্যই।আপনারা আসুন।

রোদ্রিদের বাসার সামনে থামল নীরাদের গাড়ি।ভাবি আর ভাইয়া উনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ভেতরে চলে গেল।রোদ্রি গাড়ি থেকে ব্যাগটা নিয়ে ভেতরে ঢুকতে যাবে তখনই নীরাদ ডাকল,

-মিস.রোদ্রি?

-জি?

-আপনার ভাইয়ার ফোন আর ওয়ালেট।উনার পকেটে পেয়েছিলাম।আর তখনের জন্য সরি।আমি আপনাকে কাঁদাতে চাইনি।আপনি খুবই মিষ্টি একটা মেয়ে।ভাইয়ার খেয়াল রাখবেন।আল্লাহ হাফেজ।
বলে একটা মুচকি হাসি দিলো নীরাদ।চেহারায় সারাদিনের ক্লান্তি ফুটে উঠেছে।

কিছুক্ষন আগে যতটা অসহ্যকর লাগছিলো লোকটাকে এখন ঠ ক ততোটাই ভালো লাগছে।কি চমৎকার অমায়িক হাসি।অনেক কিছুই বলতে ইচ্ছা করছিলো তবে কিছুই বলতে পারলোনা।

-আল্লাহ হাফেজ।

নীরাদ গাড়িতে বসে গাড়ি স্টার্ট দিলো।রোদ্রিও ভেতরে ঢুকে গেইট লাগিয়ে দিল।এটাই কি শেষ দেখা? নাকি কেবলই শুরু?আকাশে এখনো মেঘ ডাকছে।হয়তো জানান দিচ্ছে শুভসুচনার।



সকালে ভাইকে নাস্তা খাইয়ে দিচ্ছিল রোদ্রি।ভাবি রান্না করছে রান্নাঘরে।

-কালকে তোর অনেক কষ্ট হয়েছিলো বোন?তোর ভাবি প্রেগন্যানট এই অবস্থায় ওকে নিয়ে হসপিটালে গিয়েছিলি।তার উপর গাড়ি ছিলো না।

-কি যে বলোনা।তুমি হসপিটালে আর আমরা কি বাসায় বসে থাকবো নাকি?বাদ দাও তো এসব,তোমার ব্যাথা কমেছে?

-কমেছে...কালকে নীরাদ ছেলেটা না থাকলে যে কি হতো।ও  ঠি  ক সময়ে না আসলে ওইখানেই পড়ে থাকতাম আমি।ভীষন ভালো ছেলেটা।পাশের এলাকায়ই থাকে।তোকে ওই ফোন দিয়ে জানিয়েছিল না?

-হুম।এখন ওষুধ গুলা খাওতো ভাইয়া।

রোদ্রি ওষুধগুলো দিয়ে পানি খাইয়ে দিচ্ছিল রিদানকে।তখনই ফোন বেজে উঠল।ফোনের দিকে তাকিয়ে প্রচন্ড বিরক্তি লাগলেও ভাইয়ের সামনে তা প্রকাশ করলোনা।মুখে একটা কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে ফোনটা হাতে নিল।

-ফারহান ফোন করেছে?

-হু।

-যা তুই ঘরে যেয়ে কথা বল বোন।আমি একটু ঘুমাবো।

-আচ্ছা।

ঘরে এসে দরজা লাগিয়ে দিল রোদ্রি।ফোনটা এখনো অনবরত বেজেই চলেছে।লোকটার সাথে কথা বলতে হবে ভেবেই অসহ্য লাগছে।

-হ্যালো,আসসালামু আলাইকুম।

-ওয়ালাইকুম আসসালাম।কেমন আছো জান?

-দেখুন,আপনাকে আমি এসব বলতে মানা করেছি।আপনার সাথে এখনো বিয়ে হয়নি যে আপনি আমাকে জান ডাকবেন।

-রাগ করছো কেন জান?বিয়ে হয়নি কিন্তু হয়ে তো যাবে এবং খুব শীঘ্রই।

-অসহ্যকর।

কথাটা আস্তে বললেও ফোনের এপাশ থেকে ফারহান ঠি কই শুনে ফেলল।

-এই অসহ্যকর মানুষটাকেই তোমার আজকে সারাটা বিকাল সহ্য করা লাগবে।সো বি প্রিপেয়ার্ড।

কথাটা শুনে ভ্রু কুচকে এল রোদ্রির।খানিকটা অবাক হয়ে বলল,

-মানে?

-মানে দেখা করছি আমরা। তোমাকে নিতে আসব বিকালে।রেডি হয়ে থেকো।

-ইমপসিবল!!আমি যেতে পারবোনা।সরি।

-কেনো?

-ভাইয়া ভাবির অনুমতি না নিয়ে আমি কোথাও যাইনা।

-তোমার ভাবির থেকে পারমিশন নিয়েই আমি তোমাকে বলেছি।এরপর নিশ্চয়ই তোমার কোনো সমস্যা থাকার কথা না?

রৌদ্রি কিছুক্ষণ চুপ থেকে অনুরোধের সরে বলল,

-প্লিজ আজকে না..আমি..

-আর কোন কথা নয়।বিকেলে যেন লেট না হয়।....আই জাস্ট নিড ইউ টুডে।

খট করে কেটে গেল ফোনটা।ঠাস করে ফোনটা ছুড়ে মারলো রৌদ্রি।খুব করে কান্না পাচ্ছে ওর।খুব!!

রোদ্রির বয়স যখন ৬ বছর তখনই ওর বাবা মারা যায় হার্ট আ্যাটাকে।বাবার মৃত্যুর শোকে সাতদিনের মাথায় ওর মা ও স্ট্রোক করে।এতিম হয়ে যায় দুই ভাইবোন।।তারপর কয়েকবছর চাচাদের সাথে নিজেদের বাড়িতেই ছিলো।ধীরে ধীরে রিদান নিজের বিজনেস দাঁড়া করায়।সেই ভিত্তিতেই আজ সে সফল বিজনেসম্যান।বর্তমানে ওরা যেই বাসায় থাকে সেটা রিদান নিজের টাকায় কিনেছে।
ওদের বাবা যখন মারা যায় তখন ওদের বাসায় জমিজমা নিয়ে বেশ ঝামেলা চলছিল।কয়েকবার ওর চাচাদের সাথে ঝগড়াও হয়েছিলো ওর বাবার।এর মধ্যেই হঠাৎ ওর বাবার এট্যাক হয়।ডাক্তার বলেছিলো অতিরিক্ত টেনশনের কারনে এট্যাক হয়েছিলো।তখন থেকেই রিদান বাবার মারা যাওয়ার পিছনে ওর চাচাদের দায়ী করে।ওর ধারনা এই সম্পত্তিজনিত কারনেই ওর বাবা টেনশনে ছিলো।
বিয়ে করার পর রিদান আর ওই বাসায় থাকেনি।বউ আর বোনকে নিয়ে নিজের বাসায় চলে আসে।
ছোট থেকে এই ভাই ই রোদ্রিকে আগলে রেখেছে।আর ভাবি তো যেন ওর মা।নিজের সন্তানের মতোই আদর করে।ভাই-ভাবির উপর কখনোই কোনো কথা বলেনা রোদ্রি।কখনো বলতো পারবেওনা।আর বলতে চায়ওনা সে।
ফারহান ভাইয়ার বন্ধুর ছোট ভাই।ভাইয়ার পছন্দের ছেলে।রিদান যখন তার মতামত জানতে চেয়েছিলো তখন "না" বলতে পারেনাই রোদ্রি।তার সাথে বাগদান হয়ে গেছে রৌদ্রির।হয়তো বিয়েটাও হয়ে যাবে খুব তাড়াতাড়িই।
এমন না যে রৌদ্রি কাউকে ভালোবাসে।ফারহানকে বিয়ে করতে তার কোনো সমস্যাও ছিল না।কিন্তু লোকটা সবার সামনে যতটা ভালো দেখায় সে ততটা ভালোনা।সুযোগ পেলেই রোদ্রির সাথে অসভ্যতামি করে সে।তার কথাবার্তাও বিশেষ সুবিধার লাগেনা রোদ্রির কাছে।

_______________
সন্ধ্যা ৬:৩০ বাজে।গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছে নীরাদ।কোন উদ্দেশ্য নেই।এমনেই ঘুরতে বেরিয়েছে।কালকে রাতের পর থেকেই ভালো লাগছেনা তার।রাতে ঘুমও হয়নি ঠি ক মতো।মনের মধ্য বারবার একটা অদ্ভুত ইচ্ছা জাগছে।কারণটা তার জানা নেই তবে তার খুব মিস.রোদ্রিকে দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে।
রোদ্রিদের বাসার কাছেই একটা জায়গায় গাড়ি থামিয়ে অযথাই দাড়িয়ে আছে সে।
হঠাৎই একটা গাড়ি থামলো ওদের বাসার সামনে।রোদ্রিকে বের হতে দেখে মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠলো নীরাদের।দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেল সে।

-মিস.রোদ্রি।কেমন আছেন?

পাশ থেকে কারো ডাকে চমকে উঠলো রোদ্রি।চোখ ঘুড়িয়ে নীরাদকে দেখে বেশ অবাক হলো।

-জি,ভালো।..আপনি এখানে?

-এসেছিলাম একটা কাজে।আপনার সাথে দেখা হয়ে গেলো।বেশ উৎফুল্ল শোনায় ওর গলা।

রোদ্রি কিছু বলবে তার আগেই ফারহান পাশে এসে দাঁড়ায়।হাত ধরে রোদ্রির।রোদ্রি ছাড়াতে চায় কিন্তু পারেনা।শক্ত করে ধরে আছে ফারহান।বিষয়টা চোখ এড়ায়না নীরাদের।

-কে উনি?

-উনিই কালকে ভাইয়াকে হসপিটালে নিয়ে গিয়েছিলো।

ফারহানের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় নীরাদ।হাসিমুখে বলে,
-আমি নীরাদ আহমেদ।

ফারহানও হাত মেলায়।

-আমি ফারহান চৌধুরি।নাইস টু মিট ইউ।

রোদ্রিকে জিজ্ঞেস করে,

-কে হয় উনি আপনার?কাজিন?

-নাহ্।আমার বাগদত্তা...




রোদ্রির মুখে "বাগদত্তা" শব্দটি শুনে কিছুসময়ের জন্য নির্বাক হয়ে গেলো নীরাদ।তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে একটা ভদ্রতার হাসি দিয়ে বলল,

-ওহ,কংগ্রেচুলেশন।বিয়ে কবে আপনাদের?

নীরাদের প্রশ্ন শুনে রোদ্রিকে আরো কাছে টেনে নিল ফারহান।রোদ্রির অসস্তিবোধটা খুবই সুক্ষভাবে পর্যবেক্ষন করলো নীরাদ।মেয়েটা কেমন যেন উশখুশ করছে।কিন্তু কেন?

-সেটা হতে এখনও দেরি নীরাদ সাহেব।তার অনার্স শেষ হওয়ার আগে সে কিছুতেই বিয়ে করবেনা।

উওরে মৃদু হাসলো নীরাদ।বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসল।সিটে হেলান দিয়ে চোখবুজে রইল।মাথায় শুধু রোদ্রির বলা "আমার বাগদত্তা"কথাটাই ঘুরছে"।"উনি অন্যকারো"ব্যাপারটা ভাবতেই মনটা বিষিয়ে উঠছে।
ফারহানের প্রতি রোদ্রির আচরণও তাকে ভাবিয়ে তুলছে।মেয়েটার কি বিয়েতে মত নেই?নাকি শুধু সে সামনে ছিলো বলেই লজ্জা পাচ্ছিল।

ঘরে এসে ক্লান্ত ভঙ্গিতে বিছানায় গা এলিয়ে দিল রোদ্রি।বালিশে মুখ গুঁজে কিছুক্ষন পড়ে রইল।লোকটার সামনে কি একটা লজ্জাকর পরিস্থিতিতে পরেছিল কিছুক্ষন আগে।ফারহান কিভাবে ধরে ছিল তাকে,উনার সামনে কিছু বলতেও পারছিলো না।

________________
দরজা ঠেলে মায়ের রুমে ঢুকল নীরাদ।
মনিরা আহমেদ তখন একমনে তসবি গুনছিল।দরজা খোলার শব্দ শুনে মুখ তুলে তাকাল সে।নীরাদ কে দেখে খুশি হলেও পরক্ষনেই মুখে চিন্তার চাপ ফুটে উঠল তার।ছেলেকে কেমন যেন বিষন্ন দেখাচ্ছে।চোখগুলো লাল হয়ে আছে।চুল উষকোখুশকো।
-আসবো মা?
 
ছেলের ডাকে ধ্যান ভাঙল তার।

-আয় বাবা।

ধীরপায়ে মায়ের পাশে যেয়ে বসলো নীরাদ।মনিরা মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল,

-কি হয়েছে বাবা?তোকে এমন দেখাচ্ছে কেন?

নীরাদ কিছু বললোনা।মায়ের কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়লো সে।মনিরা বেগমের কপালের চিন্তার ভাঁজটা আরো একটু কুঁচকে এলো।তার ছেলের যে মন খারাপ এটা বেশ ভালোই বুঝতে পারলো।আদুরে গলায় বললেন,

-কি হয়েছে বাবা? বল আমাকে।শরীর খারাপ?

-উহু।আমি ঠিক আছি মা।

কিছুক্ষন চুপ থেকে আবার বলল,

-আচ্ছা মা,তুমিতো বাবাকে এখনো ভালোবাসো তাইনা?

ছেলের মুখে হঠাৎ এই প্রশ্ন শুনে যারপরনাই অবাক হলেন মনিরা।
ছেলের সাথে সে অনেকটাই সহজ।নীরাদের যখন দশ বছর বয়স তখনই ওর বাবা মারা যায়।স্বাভাবিক মৃত্যুই হয় ওর বাবার।এরপর আজ ১৯ বছর হতে চলল ছেলেকে একাই মানুষ করেছেন তিনি।বাসার লোকেরা অবশ্য বলেছিলো বিয়ে করতে কিন্ত প্রথমত ছেলের কথা ভেবে এবং দিতীয়ত তিনি নিজের স্বামীর জায়গা কাউকে দিতো পারবেন না এইজন্য বিয়ে করেননি মনিরা আহমেদ।স্বামীকে প্রচন্ড ভালোবাসেন উনি।হয়তো আজ মানুষটা নেই তবে ভালোবাসাটা এতটুকুও কমেনি।
স্বামীর কথা মনে পড়াতে চোখদুটোও ভিজে এল তার।একহাতে পানি মুছে সিক্ত গলায় বললেন।

-তোর বাবা মানুষটাই এমন উনাকে ভালো না বেসে থাকা যায় নারে।বড্ড ভালো ছিলেন উনি।আল্লাহর অনেক প্রিয় নয়তো কি আর আল্লাহ এত তাড়াতাড়িই নিয়ে যান?

-কিন্তু বাবা তো নেই।

ছেলের কথায় মৃদু হাসলেন উনি।

-তো কি হয়েছে!উনি নেই বলে কি আমি ভালোবাসতে পারবোনা?শোন বাবা,ভালবাসাটা একান্তই নিজস্ব অনুভূতি।কাউকে ভালবাসলে যে সেটা প্রকাশ করতেই হবে বা সবাইকে দেখাতে হবে যে আমি তাকে ভালবাসি এমনটা নয়।মুখে না বলেও ভালবাসা যায়।কাজকর্মেও ভালবাসা প্রকাশ করা যায়।ভালবাসাটাতো আর চাপিয়ে দেয়া যায় না।জোর করে আদায়ও করা যায় না।এটা আদায় করার মতো বস্তু না।তুই কাউকে ভালবাসলে বাসবি,সে বাসুক আর নাই বাসুক।.....এখন বলতো এসব কথা কেন বলছিস?

মায়ের কথা এতক্ষন মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো নীরাদ।বিষন্নে ভরা চেহারাটায় হাল্কা হাসির রেখা ফুটে উঠেছে।মায়ের কথাগুলো যেন বড্ড প্রয়োজন ছিল এইসময়।

-না এমনেই।আচ্ছা তুমি থাকো।আমি শাওয়ার নিয়ে আসি।তারপর একসাথে খেয়ে নিবো।

-আচ্ছা যা।

ছেলের এড়িয়ে যাওয়াটা বুঝতে পারলেন উনি।তাই আর বেশি কিছু বললেন না।তবে নীরাদ কথাবার্তায় ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরেছেন উনি।এইজন্যই ওই কথাগুলো বললেন।তিনি চাননা তার ছেলে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিক।

_____________

বিকালে হাঁটতে বেরিয়েছে মনিরা বেগম।বাড়ির পাশের একটা পার্কেই ঘুরে ঘুরে দেখছেন উনি।রোজ না হলেও প্রায়ই বিকালে হাঁটেন উনি।বাড়ির পাশেই এমন একটা পার্ক থাকায় বেশি দুরে যাননা।এখানেই ঘোরাফিরা করেন।এই দিকটায় গাছপালা বেশি তাই মানুষ নেই তেমন।
হঠাৎই হাঁটুতে প্রচন্ড টান অনুভব করলেন উনি।একহাতে হাঁটু চেপে উবু হয়ে গেলেন।চোখমুখ ব্যাথায় কুচকে এলো তার।ঘাসের উপরই বসে পরবেন তার আগেই পাশ থেকে  কেউ এসে ধরল উনাকে।

অস্থির কন্ঠে বলল,

-কি হয়েছে আন্টি?আমাকে ধরুন নয়তো পরে যাবেন।

পাশে থাকা মেয়েটার হাতটা শক্ত করে ধরলেন মনিরা।মেয়েটা তাকে ধরে ধরে পাশের একটা বেন্চে বসাল।

-আপনার কি হাঁটুতে ব্যাথা হচ্ছে আন্টি ?

-হ্যাঁ রে মা।এতদিন ছিলোনা।আজকে হঠাৎই কেন হলো বুঝতে পারছিনা।

-আপনি কার সাথে এসেছেন?আমি তাকে ডেকে নিয়ে আসি।

-আমি একাই এসেছি মা।পাশেই আমার বাসা।

-ওহ।তাহলে আপনার ব্যাথা একটু কমলে বাসায় দিয়ে আসি।

মেয়েটার ব্যবহারের রীতিমত মুগ্ধ মনিরা।চেহারার দিকে তাকিয়ে দেখলো বেশ মিষ্টি দেখতে মেয়েটা।

-নাম কি মা তোমার?

-জি,আমার নাম রোদ্রি।ইমিলা জাহান রোদ্রি।

-বাহ্।বেশ মিষ্টি নাম।নামের সাথে তুমি নিজেও বেশ মিষ্টি।

জবাবে মৃদু হাসলো রোদ্রি।মহিলাটার "মিষ্টি মেয়ে"কথাটা শুনে নীরাদের প্রথম দিন বলা"আপনি খুব মিষ্টি একটা মেয়ে" কথাটা মনে পড়ে গেল রোদ্রির।

মনিরা বেগমকে বাসায় নিয়ে এসেছে রৌদ্রি।গাড়িতে উঠতে কষ্ট হবে বলে হাত ধরে ধরেই নিয়ে এসেছে উনার বাসায়।আসার পথে সারাক্ষনই উনি এটা ওটা জিজ্ঞেস করেছে।অনেক মিশুক।
মহিলা বেশ বিওবান।
বাড়িঘর দেখলেই বোঝা যায়।

বাসায় বেল বাজাতেই একজন বয়সক মহিলা দরজা খুলে দিল। কাজের লোক হবে হয়তো।মনিরাকে সোফায় বসিয়ে দিল রোদ্রি।

-আন্টি,আমি তাহলে আসি।

-সেকি মা, কিছু খেয়ে যাও।আমার জন্য কতটা কষ্ট হলো তোমার।

-না না কষ্ট কেন হবে?আজকে আর কিছু খাবনা।সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে।বাসায় ফিরতে হবে।আল্লাহ হাফেজ।

-আচ্ছা সাবধানে যেও।আল্লাহ হাফেজ।

বাসায় এসে ঢুকতেই সোফায় বসা মানুষটাকে দেখে বেশ ভালোই অবাক হয়ে গেল রোদ্রি..





চলবে...





Writer:- মালিহা খান


NEXT ARTICLE Next Post
PREVIOUS ARTICLE Previous Post
NEXT ARTICLE Next Post
PREVIOUS ARTICLE Previous Post
 

Delivered by FeedBurner