কোনোদিন ভাবিনি এমন করে তোমায় খোলা চিঠি লিখবl তবুও লিখতে ইচ্ছা হল আজ l তুমি জানো না আমার এ ইচ্ছার কথা , ভাগ্যিস জানো না l জানলে হয়তো ধমকে উঠতে বরাবরের মতোই lবলতে
' তোমার মতোই তোমার ইচ্ছাগুলোও এতো নির্বোধ কেন '?
আর আমি কাঁচুমাচু মুখ করে ঝেড়ে ফেলতাম আমার ইচ্ছা l
আমার ইচ্ছাগুলো বিয়ের পর থেকেই তোমার কেন এতো নির্বোধ লাগতো বল তো ?
মনে আছে বিয়ের পরে আমি দিঘা যেতে চেয়েছিলাম হানিমুনে l তুমি ব্যাঙ্গের হাসি হেসেছিলে l তারপর যাওয়া হয়েছিল কার্শিয়াংl আমার খারাপ লাগেনি জায়গাটা l কিন্তু আমার ইচ্ছাটা জানতে চাওনি তুমি একবারও , খারাপ লেগেছিলো শুধু সেটাই l
শুধু হানিমুন কেন , আমার ইচ্ছা তুমি কবেই বা জানতে চেয়েছো বল ! মনে পড়ে নাl আচ্ছা তুমি কি দীর্ঘ বত্রিশ বছরের সংসারে কোনোদিনও জানতে পেরেছো আমি খয়রা মাছ খেতে ভালোবাসি ? তুমি কি কোনোদিন জানতে পেরেছো আমি ভালোবাসি বৃষ্টিতে ভিজতে ?
না , কি করেই বা জানবে? তোমার তো কোনোদিন মনেই হয়নি এগুলো জানা দরকার l আসলে আমায় নিয়ে আলাদা করে ভাবার কথা তোমার তো কোনোদিন মাথাতেই আসেনি l বাড়ির ফ্রিজ , টিভি বা খাট আলমারির থেকে আমায় আলাদা কোনোদিন হয়তো ভাবতেও পারোনি তুমি l ওরা যেমন তোমার সংসারে একবার এসে পড়েছে , তাই আর নড়বে না কোনোদিন , নিজেদের শেষ দিন পর্যন্ত থেকে যাবে তোমার বাড়িতেই , আমাকেও ওদের দলেই ভেবেছো বরাবর তাই না ?
আর ঠিক এই কারণেই বোধহয় তুমি চিরকাল বিশ্বাস করে এসেছো তোমার পরিবারের ইচ্ছাই আমার ইচ্ছা , তোমাদের সিদ্ধান্তই আমার সিদ্ধান্ত l
আমাদের মেয়ে , ওকে নাচ শেখাতে চেয়েছিলাম আমি l কিন্তু তুমি আর তোমার পরিবার হতে দাওনি সেটা l তোমাদের নাচ পছন্দ নয় যে l আর আমার ইচ্ছা ! ধুর সেটা আবার ধর্তব্যের মধ্যে নাকি !
আমি যে অতি মধ্যবিত্ত ঘরের , অল্প শিক্ষিত , রোজগার না করা একটা মেয়ে সেটা তো তুমি জেনেই আমায় নিয়ে এসেছিলে ঘরে l তবুও আমার কথা বার্তা , পোশাক পরিচ্ছদ , সব কিছু নিয়েই কেন এতো খোঁটা দিয়ে গেলে সারাজীবন ? আমার আদপ কায়দা , পোশাক আশাক সবই সস্তার মনে হয়েছে চিরকাল l আসলে তোমার কাছে আমিই যে বড় সস্তার l আর তাই তো তোমার অফিসের সুন্দরী সহকর্মীদের সাথে তুলনা করেছো আমায় বারবার l বারবার বুঝিয়ে দিতে চেয়েছো আমি কতটা তুচ্ছ , কতটা নগন্যl আমিও চুপ থেকেছি সব সময় l কারণ জানতাম প্রতিবাদ করলে আবার সইতে হবে তোমার বাক্যবাণ , অপমানl
আমি তুচ্ছ , তাই কোনোদিন আমার ইচ্ছার কথা জানতে চাওনি তুমি l জানতে চাওনি তোমার প্রতিটা অপমান আমায় কতটা রক্তাক্ত করে বারবার l আর আমিও জানতে দিই নি l জানতে দিইনি তোমার করা প্রতিটা অপমান একটু একটু করে খুন করেছে l খুন করেছে তোমার প্রতি থাকা আমার ভালোবাসাকে l আমি তোমার প্রতি দায়িত্ব পালন করে গেছি সব , কিন্তু ভালোবাসা ! সে তো মরে গেছে বহুদিন আগেই l
বিয়ে তো আমাদের দুজনেরই হয়েছিল l তাই ভালোবাসা হোক বা সম্মান , সেটা তো দুতরফা হবার কথা ছিল তাই না ? কিন্তু কেন কে জানে তুমি ভেবে নিয়েছিলে ভালোবাসা বা সম্মানের দায়িত্ব আমার একার l জানিনা কেন তুমি ভেবে নিয়েছিলে এই সম্পর্কে তুমি মালিক আর আমি তোমার অনুচর lতুমি তো তোমার বাড়িতেই ছিলে বিয়ের পরেও , নিজের পরিবারের সাথেই ছিলে l সব ছেড়ে তোমার বাড়িতে এসেছিলাম আমি l তাই ভালোবাসার দায়িত্বটা পুরুষদের একটু বেশিই হওয়া উচিত তাই না ? কিন্তু তোমরা কোনদিন সেটা বুঝতে পারনা কেন কে জানে ! কেন বোঝোনা ভালোবাসা কোন টেকেন ফর গ্র্যান্টেড বস্তু নয় l ছোট্ট চারাগাছের মতো সম্পর্ককেও বাঁচিয়ে রাখতে হয় , ভালোবাসাও ধরে রাখতে হয় l নইলে ভালোবাসা মরে যায় এক সময় l পড়ে থাকে শুধু সম্পর্কের কঙ্কাল , যাতে জমে থাকে শুধুই এক রাশ শুকনো কর্তব্য l
চিরকাল তুমি ভেবেছ তুমি জিতে গেছো l জিতে গেছো আমায় তোমার পদানত করে l তোমার ইচ্ছামতোই চিরকাল হয়ে এসেছে সব l আর আমি মুখ বুজে থেকেছি l আর আমার ওই চুপ থাকা দেখেই , সব মেনে নেওয়া দেখে ভেবেছো তুমি জিতে গেছো l কিন্তু তুমি কি জানো আসলে তুমি গোহারান হেরে গেছো ! কারণ তুমি হারিয়ে ফেলেছো তোমার স্ত্রীয়ের ভালোবাসা l সে তোমার সংসারে সব দায়িত্ব পালন করে গেলেও তোমার প্রতি তার ভালোবাসা ছিল না l হ্যাঁ আমি ভয় পেয়েছি তোমায় l তোমার অহংকার , তোমার রুক্ষ ব্যবহার সব কিছুকে ভয় পেয়েছি l কিন্তু ভয় যে ভালোবাসার থেকে অনেকটা ছোট l তাই তুমি হেরে গেছো তোমার অজান্তেই l
মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে একমাস l সিদ্ধান্ত নিয়েছি তাই আজ একটা নতুন করে lআমি চললাম তোমার সংসারে ইস্তফা দিয়ে l কোথায় যাবো জানিনা l শুধু জানি এই ভালোবাসাহীন সম্পর্কটা আর বয়ে বেড়াতে পারছি না l মেয়ে হয়তো প্রশ্ন তুলবে কেন এমন করলাম ! ওকে বলে দেব , আসলে আপোষের সম্পর্ক সারাজীবন বয়ে বেড়ানো যায় না l সম্মানহীন জীবন জীবনের শেষ দিন অবধি টানা যায় না l
মা কে ও সারাজীবন পাঞ্চ ব্যাগ হিসেবে দেখলেও , আজ না হয় জানুক মা ও একটা আলাদা মানুষ l আত্মসম্মানবোধ তারও আছে l
আর হ্যাঁ আমার জামাইকে দেখিও আমার এই খোলা চিঠিটা l সেও বুঝে নিক সম্পর্ক বাঁচিয়ে রাখতে যত্ন নিতে জানতে হয় l স্ত্রী মানেই সে ঘরে পড়ে থাকা সারাজীবনের কোন আসবাব নয় , স্ত্রীও আলাদা রক্ত মাংসের মানুষ l তাই পুরুষকে ভালো রাখার দায়িত্ব যেমন নারীর , তেমনই নারীকেও ভালোবেসে রাখার দায়িত্ব পুরুষের l নইলে সংসার টিকে গেলেও ভালোবাসাটা মরে যায় , মরে যায় সম্পর্কের উত্তাপটা l
Writer:- পল্লবী সেনগুপ্ত