> কাউকে ভুলে থাকার জন্য কি করা উচিত
-->

কাউকে ভুলে থাকার জন্য কি করা উচিত

ইনবক্সে ঠিক এমন প্রশ্নটাই করলেন একজন।খুব কমন প্রশ্ন।প্রেম বিরহ বিচ্ছেদ থেকেই এমন প্রশ্নটা আসে।আর সেটা কম বয়সী ছেলে মেয়েদের থেকেই বেশি আসে।তবে এবারে একটু অবাক হলাম।প্রশ্নটা যিনি করেছেন তিনি একজন বয়স্কা মহিলা।কথা বলতে গিয়ে বুঝলাম উনি আমার মায়ের বয়সি।বয়স হবে প্রায় আটান্ন ষাটের কাছাকাছি।

ইনবক্সে আমি আমার মত করেই উত্তর দিলাম।সবাইকে যেমন উত্তর দিই,তেমনি।বললাম,কাউকে ভুলে যাওয়া যায় না।যদি ভাবেন তাকে ভুলে যাব,পারবেন না।তাকে ভোলার চেষ্টা করা মানেই তাকে মনে পড়া।যত বেশি চেষ্টা করবেন,তত বেশি মনে পড়বে।ভালোর চেষ্টাটাই ছেড়ে দিন।বরং নিজেকে ব্যস্ত রাখুন অন্য কাজে।ব্যস্ততাই ভুলে থাকার ওষুধ।

আমার রিপ্লাই পেয়ে উনি বললেন,

বাবা,তোমার সাথে একটি বার কথা বলা যাবে?তাহলে কয়েকটা কথা তোমার সাথে শেয়ার করতাম।তোমার সময় নষ্ট করব না বেশিক্ষণ।

আমি বললাম,অবশ্যই মাসিমা।নিশ্চয়ই করবেন।

যার কথার মধ্যে এত মিষ্টতা তার সাথে কথা না বলে থাকি কি করে বলুন তো?মেসেঞ্জারেই উনি কল করলেন।কল করেই বললেন,

তুমি আমার ছেলের মত।মনে হল তোমাকে কথা গুলো বলি।জানো বাবা,তোমার লেখা গুলো পড়েই ভালো থাকি।

আমি বললাম,

আমরা লেখা পড়ে আপনাদের মত মানুষরা যদি ভালো থাকে তাহলে তো আরো লিখতে হয়।বলুন কি বলবেন।

উনি বলতে শুরু করলেন।

জানো এই বয়সে এসে বাবা মায়েদের বড় দুশ্চিন্তা।দুশ্চিন্তা আমার একমাত্র ছেলেকে নিয়ে।ছেলেটা আমার কত হাসি খুশি ছিল।এখন একে বারেই চুপচাপ হয়ে গেছে।বেশি কথা বলতে চায় না।ব্যবসা করছিল।ভালোই ইনকাম হত।সেদিকেও  মন নেই।একটু কিছু বললেই রেগে যায়।খাওয়া দাওয়া করতে চায় না।সব সময় মন মরা।শুধু বলে,"কিছুতেই ভুলতে পারছি না।" 

শুনে বললাম,

-ভুলতে পারছি না বলতে?

একটি মেয়েকে ভালো বাসত।চার বছর ধরে রিলেশন ছিল।মেয়েটির কথা মত আমার ছেলে বাড়ির দোতলাটা কমপ্লিট করল।তার পছন্দ মত রঙ,ঘরের ডেকরেটিং সব কিছুই।মেয়েটির ভালো থাকাতেই যেন ওর ভালো থাকা।আমরাও চাইতাম,ছেলের ভালো থাকা মানে আমাদের ভালো থাকা।মাস ছয়েক আগে মেয়েটির বাবা আমার ছেলেকে বলল,

তোমার ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স কি আছে আমরা দেখব।

আমার ছেলে তাই দেখাল।এমনকি মেয়েটি যখন যা চেয়েছে তাই দিয়েছে।আমাদের জানিয়েই দিত।বাড়ি কমপ্লিট হয়ে যাবার পর আমিই ছেলেকে  বললাম,বিয়ের ব্যাপারে কথা বল ওর বাবা মায়ের সাথে।আমার ছেলে বলল,বলেছি।ওর বাবা মা আমাদের বাড়ি আসবে বলেছেন।আমিই বললাম,বাবা মা যখন আসবেন তখন টিনাকেও আসতে বলিস।একদিন বাবা, মা আর মেয়ে তিন জনেই এলেন।সব কিছু দেখেও গেলেন।বাড়ি ফিরে গিয়ে বললেন,অত দূরে আমার মেয়ের বিয়ে দেব না।আমার একটা মাত্র মেয়ে।তাই ছেড়ে থাকতে পারব না।তাছাড়া ছেলে বিজনেস করে।চাকরি করলেও না হত।ওর কিছু যদি হয়েও যায় তাহলে আমার মেয়ে অন্তত চাকরিটা পেয়ে যেত।কিন্তু চাকরি তো করে না।

আমার ছেলে যখন টিনাকে বলল,টিনা বলল,

বাবা মা যা ভালো বুঝবে আমি সেটাই করব।আমি মা বাবাকে কষ্ট দিতে পারব না‌।

ছেলে জিজ্ঞেস করেছিল,

তাহলে আমি?চার বছর ধরে যে ভালো বাসলাম?

বলল,তোমার কথা ভাবার আমি কে?তার জন্য তোমার বাবা মা আছে।

ছেলের মুখে যখন সব শুনলাম,আমি আর তোমার মেসোমশাই দুজনেই গিয়ে ছিলাম ওদের বাড়িতে।বিশ্বাস করো বাবা,এত অপমানিত হয়েছি বলে বোঝাতে পারব না।আমি ওর বাবাকে বললাম,আপনার মেয়ের যদি  আমাদের বাড়িতে থাকতে অসুবিধা হয়,তাহলে আমার ছেলেই আপনার কাছে থাকবে।মেয়ের বাবা মা যদি তাদের মেয়েকে ছেড়ে থাকতে পারে,তাহলে ছেলের বাবা মা পারবে না কেন? আমি পারব আমার ছেলেকে ছেড়ে দিতে।আমার ছেলের ভালো থাকাতেই আমাদের ভালো থাকা।

মেয়েটির মা বলে বসল,

ভালোই প্ল্যান করে এসেছেন।ঘর জামাই রাখার ইচ্ছা নেই আমাদের।তাছাড়া লোকে কি বলবে?আমরা বিয়ে দেব না।আমার মেয়ের কোনো ভবিষ্যৎ আছে কি?এক কাজ করুন আপনার বাড়িটা আমার মেয়ের নামে লিখে দিন তার আগে।তারপর না হয় ভাবব।

আমি বলেছিলাম,আমার তো একটিই ছেলে।ভবিষ্যতে ওই বাড়ি তো আপনার মেয়েরই।প্লিজ এভাবে বলবেন না।আমার ছেলে আপনার মেয়েকে ভালোবাসে খুব।এই ভাবে দূরে সরিয়ে দেবেন না।ছেলেটাকে বাঁচাতে পারব না।

বললেন,সে দায় আমাদের নয়।

ভীষণ অপমানিত হয়ে ফিরে আসি।ছেলেটা একে বারে শেষ হয়ে গেল।একটা আটাশ বছরের ছেলে যখন চোখের সামনে হাউমাউ করে কাঁদে,তুমি বল তো বাবা আমি মা হয়ে কি করে এসব দেখে থাকি?তবুও ছেলের সামনে মনকে শক্ত রাখি।আড়ালে গিয়ে সেই আমিও কাঁদি।ভালোবাসার মানুষকে হারানোর যন্ত্রণা বড় কষ্টের।ওর শুধু একটাই কথা, কিছুতেই ভুলতে পারছি না।বাজারে কোনো ওষুধ আছে কি যেটা খেয়ে ভুলে থাকা যায়?

সব কথা শোনার পর আমিও তাই ভাবছিলাম,সত্যিই কি ভুলে যাওয়া যায়?সত্যিকারের ভালোবাসা গুলো ভুলে যাওয়া যায় না বোধহয়।উনি ছেলেকে এতটাই ভালোবাসেন,ছেলের ভালোবাসার জন্য অপমানটাও মুখ বুজে মেনে নিয়েছেন।আর সত্যিই তো ক'জন মা এমন কথা বলতে পারেন,আমার ছেলে আপনার বাড়িতেই থাকবে।ঘরের বৌ হওয়াটা ভীষণ গর্বের আজও,ঘর জামাই হওয়াটা বোধ হয় অপমানের।শুধু ছেলেরাই যে থাকতে চায় না তা নয়,অনেক মেয়ের মা বাবাই মেনে নিতে পারেন না তার বাড়িতে কোনো ছেলে ঘর জামাই হয়ে থাকুক।

যাইহোক,তবুও সেই নীতি কথার মত কয়েকটি কথা বললাম।বললাম,ছেলের পাশে থাকুন।হাসি খুশিতে রাখার চেষ্টা করুন।কাজে ব্যস্ত রাখুন।আসলে মুখে বলা যতটা সহজ,কাজে করা ততটা সহজ নয়।সময় হচ্ছে সব থেকে বড় মলম।আস্তে আস্তে ভুলে যাওয়া যায়।কি জানি পুরোপুরি ভুলে যাওয়া যায় কিনা।আর এটাও জানি না,সত্যি ভালো বাসলে ছেড়ে যাওয়া যায় কিনা।








Writer:- সরজিৎ ঘোষ
NEXT ARTICLE Next Post
PREVIOUS ARTICLE Previous Post
NEXT ARTICLE Next Post
PREVIOUS ARTICLE Previous Post
 

Delivered by FeedBurner