আমি বাসায় না থাকলে তুই কি এরকমই পাগলামি করিস?
--না,না।কি বলছেন এসব?আমি তো মাত্র পড়াশোনা শেষ করে মিউজিক টা অন করেছি।
নোমান তন্নির কথা শুনে বললো, মনে তো হয় না তুই আজ পড়তে বসেছিলি?এভাবে মিথ্যা কথা বলে কি লাভ তন্নি?এতে ক্ষতি কিন্তু তোরই হচ্ছে।যা পড়তে বস।এই বলে নোমান তানিশার দিকে একবার তাকিয়েই আবার তার চোখ ফিরে নিলো।আর রুম থেকে বের হয়ে গেলো।
তানিশা তার জায়গাতেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।নোমান রুম থেকে বের হওয়া মাত্র তন্নি বললো,
এখন কয়টা বাজে তানিশা? নোমান ভাইয়া আজ এতো তাড়াতাড়ি ফিরলো কেনো?
তানিশা ঘড়ি দেখে বললো ৯ টা বাজে।
--মাত্র ৯ টা।আর তাতেই ভাইয়ার ওয়ার্ড করা শেষ হয়ে গেলো?
তানিশা তন্নির কথা শুনে বললো, আজ হয় তো ওয়ার্ডের ক্লাস তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেছে।সেজন্য উনিও তাড়াতাড়ি ফিরেছেন বাসায়।
আসলে নোমানকে এখন সারারাত ওয়ার্ডেই থাকতে হয়। সারারাত ওটিতে থেকে আবার সকাল সাতটায় ক্লাসে এটেন্ড করে সে।সকল ক্লাস শেষ করে তবেই সে বাসায় ফেরে।কিন্তু আজ একটু নোমান তাড়াতাড়িই বাসায় ফিরেছে।সেজন্য তন্নি ভীষণ অবাক হলো।
তন্নি নোমানের কথা শুনে কিছুক্ষণ বই নিয়ে পড়াশোনা করলেও তার আর ইচ্ছে করলো না পড়তে। বাসায় তার বেস্ট ফ্রেন্ড এসেছে আর সে তাকে সময় দেওয়া বাদ দিয়ে বই নিয়ে বসে থাকবে?না,তা কিছুতেই হবে না।এজন্য তন্নি বই বন্ধ করে তানিশার কাছে চলে গেলো।
তানিশা একা একা বেলকুনিতে দাঁড়িয়ে আছে আর মনে মনে ভাবছে কবে যে সেও চতুর্থ ইয়ারে উঠবে?চতুর্থ ইয়ারে উঠলে তবুও ডাক্তার হবার স্বপ্নের প্রায় কাছাকাছি চলে যাওয়া যায়।কারণ তখন ওয়ার্ডে ক্লাস হয় নিয়মিত।ডাক্তার হওয়ার সকল নিয়মকানুন কিছুটা শিখে ফেলে স্টুডেন্টরা।
হঠাৎ তন্নি পিছন দিক থেকে তানিশাকে ধরায় সে একদম চমকে উঠলো।তানিশা ভয়ে বুকে থু থু ছিটিয়ে দিলো।
তন্নি তা দেখে হাসতে হাসতে বললো,ডাক্তারদেরকে সবসময় সাহসী হতে হয়।কিন্তু তুই তো একদম ভিতুর ডিম।
তানিশা তখন বললো,আমি মোটেও ভয় পাই না তন্নি।কিন্তু তুই যেভাবে হঠাৎ এসে ধরেছিস ভয় পাবারই তো কথা।
--আচ্ছা বাদ দে।চল না একটু গল্প করি এখন।
তানিশা সেই কথা শুনে বললো, তোর কি পড়াশোনা শেষ হয়েছে?
--রাখ তো পড়াশোনা। ছুটির দিনেও যদি বই নিয়ে বসে থাকতে হয় তাহলে সে ছুটি দেওয়ার কি মানে?তার উপর আবার তুই এসেছিস বাসায়।আজ হবে না এসব পড়াশোনা।চল কিছুক্ষন গল্প করি।
--কি গল্প করবি?
--যেকোন গল্প?
তানিশা তখন তন্নির দিকে ভালো করে তাকালো।তন্নির চোখেমুখে কেমন যেনো প্রেম প্রেম গন্ধ।নতুন প্রেমে পড়লে মুখে যেমন একটা আনন্দের ঝটকা দেখা যায় ঠিক তেমনি তন্নির মুখখানা জ্বলজ্বল করছে।তানিশা তখন নিজেই জিজ্ঞেস করলো,
একটা সত্যি কথা বলবি?
--কি?
--তোর হয়েছে টা কি বল তো?তোকে কেমন জানি আজ অন্যরকম লাগছে।তুই কি কিছু বলতে চাস আমাকে?
তন্নি তানিশার কথা শুনে চুপ করে থাকলো।কারণ সে সত্যিই কিছু একটা বলতে চায়।কিন্তু বলার সাহস হচ্ছে না তার।আর তন্নি তানিশাকে এজন্যই ডেকেছে তার বাসায়।কারণ সে কথাটা তানিশাকে না বলে থাকতে পারছে না।
হঠাৎ নোমান আবার আসলো তন্নির রুমে।আর তন্নি তন্নি বলে চিৎকার করতে লাগলো।তন্নি নোমানের ডাক শোনামাত্র রুমে চলে গেলো।নোমান তন্নিকে দেখামাত্র বললো,
কি রে?রাত কয় টা বাজে।রুমে আলো জ্বালানো কেনো?
--না মানে ভাইয়া এতোক্ষণ পড়লাম।এখন পড়া শেষ সেজন্য একটু বেলকুনিতে বসে গল্প করছিলাম তানিশার সাথে।
--এতো রাতে গল্প?যা ঘুমে পড়।
--আজ ছুটির রাত না!আরেকটু দেরীতে ঘুমাবো।
নোমান তখন বললো,না এখনি ঘুমাবি।আর যদি ঘুম না ধরে তাহলে আবার পড়তে বস।মেডিকেলে চান্স নিতে গেলে এক সেকেন্ডও নষ্ট করা যাবে না।প্রতিটা সেকেন্ডের অনেক মূল্য এখন।
তানিশা বেলকুনি থেকেই নোমানের সব কথা শুনছিলো।
হঠাৎ নোমান বললো,তোর বান্ধুবী তোকে উপদেশ দেয় না?তুই যে এভাবে সময় নষ্ট করছিস সে কিছু বলে না?
--হ্যাঁ বলে।
--কই তোর বান্ধুবী? ডাক দেখি?
তন্নি সেই কথা শুনে তানিশাকে ডাকতে গেলো।
তানিশা তন্নির কথা শুনে ভীষণ অবাক হলো।নোমান তাকে ডাকছে?যে ছেলে জীবনেও কথা বলে নি তার সাথে।সে আজ হঠাৎ ডাকতে যাবে কেনো?সে নিশ্চয় ভুল শুনেছে।
সে জন্য তানিশা বেলকুনিতেই দাঁড়িয়ে রইলো।
তন্নি তখন বললো, কি রে? কি হলো?শুনতে পাস নি?নোমান ভাইয়া ডাকছে তোকে?
তানিশা তন্নির কথা শুনে রুমে চলে আসলো।
কিন্তু তানিশা রুমে আসতেই নোমান তানিশাকেও একটা ধমক দিলো।নোমান বললো,
বান্ধুবীকে পড়াশোনার বিষয় এ সাহায্য করো না?না শুধু তা তা থই থই করে নাচানাচি করো?
তানিশা নোমানের কথাশুনে একদম বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো।
নোমান এবার শান্তসুরে বললো,তুমি তো মেডিকেলে চান্স পাইছো,তা তোমাকে তো আর বলতে হবে না মেডিকেলে চান্স নিতে গেলে কতটা পরিশ্রম করতে হয়?
--জ্বি।
--তুমি কি চাও না তোমার বান্ধুবীও মেডিকেলে চান্স পাক।
--হ্যাঁ অবশই।
--তাহলে সে কেনো এভাবে সময় নষ্ট করছে?কিছু বলো না কেনো তাকে?এভাবে সময় নষ্ট করলে তো সে এবারও সুযোগ পাবে না।
তানিশা সেই কথা শুনে তন্নির দিকে তাকালো।আর তন্নি তানিশার দিকে।
নোমান তা দেখে বললো এভাবে তোমরা একে অপরকে দেখছো কেনো?আমি কিছু বলছি কিন্তু।
তন্নি সেই কথা শুনে সেখান থেকে চলে গেলো। আর একটা বই হাতে নিয়ে আবার পড়া শুরু করলো।তন্নি মনে মনে ভাবতে লাগলো এই নোমান ভাই টা তাকে এতো শাসায় কেনো?আর মেডিকেলে যে চান্স পেতে হবে তার কি মানে?
তানিশা তার জায়গাতেই দাঁড়িয়ে থাকলো।সে মনে মনে ভাবতে লাগলো এই বাসাতে আসাটাই তার ভুল হয়ে গেছে।কেনো যে সে আসতে গেলো?
হঠাৎ নোমান তানিশাকে বললো,তুমি এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেনো?তোমার কি কোনো পড়াশোনা নাই?তানিশা সেই কথা শুনে নিজেও চলে যেতে ধরলো।
নোমান তখন বললো,ওয়েট!ওয়েট!আগেই কোথায় যাচ্ছো?আগে বলো তোমার পড়াশোনা কেমন চলছে?সবকিছু বুঝতে পারছো তো?
তানিশা কি উত্তর দেবে কিছুই বুঝতে পারলো না।
নোমান তখন বললো,শুধু এপ্রোণ গায়ে দিয়ে ঘুরলেই ডাক্তার হওয়া যায় না।মেডিকেলে চান্স পেতে যতটা পরিশ্রম করেছো তার থেকে হাজার গুন পরিশ্রম করতে হবে এই মেডিকেলে টিকে থাকতে গেলে।তাছাড়া তুমি মাত্র ভর্তি হয়েছো তো এখনো কিছু বুঝতে পারছো না।দুই দিন পরে ঠিকই টের পাবে।তখন এভাবে পাগলের মতো নাচানাচির সময় ই পাবে না।
তানিশা নোমানের কথা শুনে নিচ মুখ হয়ে থাকলো।কারণ নোমান সত্যি কথাই বলেছে।তানিশা ইতোমধ্যে সত্যি হাঁপিয়ে উঠেছে।ডাক্তার হওয়ার শখ তার অনেক আগেই ঘুচে গেছে।
তানিশাদের কলেজে ক্লাস নেওয়ার জন্য আলাদা ডিপার্টমেন্ট থাকে।এসব ডিপার্টমেন্টে গিয়ে গিয়ে ক্লাস করাটাই তো মারাত্নক রকমের ঝামেলা মনে হয় তানিশার কাছে।
বায়োকেমিস্ট্রির ক্লাস টা খারাপ না লাগলেও এনাটমির ডেমো ক্লাস টা এক বর্ণ ও বুঝে উঠতে পারছে না তানিশা।তার উপর আবার ফিজিওলজি তো আছেই।পড়তে পড়তে তানিশার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা!
আবার এসব বিষয়ে নিয়মিত পরীক্ষা লেগেই থাকে।
সবচেয়ে ছোট পরীক্ষা হলো আইটেম,যেটা প্রতিদিনই হয়ে থাকে।এটা মূলত ভাইভার মতো।
বেশ কয়েকটা আইটেম মিলে একটা কার্ড হয়।তারপর কয়েকটা কার্ড পরীক্ষা মিলে একটা টার্ম পরীক্ষা হয়।রিটেন,ভাইভা,প্রাক্টিটিক্যাল তো আছেই।সবশেষে তিনটা টার্ম মিলে একটা প্রফেশনাল পরীক্ষা হয়।
কার্ড, টার্ম আর প্রফ নামক যে পরীক্ষাগুলো হয়,
তানিশা মনে করে সেগুলো কোনো পরীক্ষায় নয়,তানিশার কাছে সেগুলো যন্ত্রনা,নির্যাতন,আর মানসিক চাপ মনে হয়।
পড়তে পড়তে একেক টা স্টুডেন্ট পাগলের মতো হয়ে যায়।তানিশার অবস্থাও এখন পাগলের মতো।কোথাও বেড়াতে যেতেও পারে না সে।দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছে তার।তার বাবা মা নিজেরাই ঢাকাতে এসে দেখে যায় তাকে।
কারণ মেডিকেল কলেজে কোনো লম্বা ছুটি থাকে না।ঈদের ছুটি,পূজার ছুটি ঠিক যতদিন সরকারি অফিসে থাকে, তাদের ছুটিও ততোদিন ই থাকে।
তানিশা এখন মনে মনে ভাবে কোন দুঃখে যে মেডিকেলে পড়তে এলাম?
তানিশা কিছুক্ষনের জন্য তার মেডিকেল লাইফ নিয়ে কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে গেলো।
তানিশা প্রথম যেদিন মেডিকেলে এপ্রোণ জড়িয়ে ক্লাস করতে গেলো, ভীষণ উত্তেজনা ভর করছিলো তার মনে।সাদা এপ্রোণ টাকে সবচেয়ে পবিত্র কাপড় মনে হয়েছিলো তার।প্রথম দিন স্যার দের জ্ঞানগর্ভ কথা শুনে ভেবেছিলো,আহা!কতই না সুন্দর হবে জীবন টা এখন।কত ভালো লাগবে মানুষের সেবা করতে পেরে।সেই খুশিতে আব্বু আম্মুকে ফোন করে বললো,
বাবা, আমার জন্য অনেক অনেক দোয়া করো,মা আমার জন্য বেশি করে দোয়া করো।আমি যেনো মানুষের মতো মানুষ হতে পারি।সারাজীবন অন্যের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পারি।
কিন্তু নবীন তানিশা সেদিন বুঝে উঠতে পারে নি মানুষের সেবা করতে যেসব পর্যায় পার হতে হবে তা পার করতে গিয়ে সে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়বে।
আসলে মেডিকেল কলেজ মানেই, ভীষণ পড়ার চাপ,প্রতিযোগিতা, কদিন যেতে না যেতেই শুধু পরীক্ষা আর পরীক্ষা,খিদে চেপে রেখে ক্লাসের পর ক্লাস করে যাওয়া।
তারপরও এতো কষ্টের মাঝে নিজেকে নিয়ে গর্ববোধ করে তানিশা।কারণ বাবা মার স্বপ্নটা যে পূরন করতে পেরেছে।তানিশার বাবার ভীষণ ইচ্ছা ছিলো,তানিশা একদিন অনেক বড় ডাক্তার হবে।এলাকার মধ্যে প্রথম এমবিবিএস ডাক্তার হবে সে।সেই স্বপ্ন পূরনের পথেই আছে তানিশা।
তবে সাদা এপ্রোণ টি গায়ে দেওয়ার পর থেকে তানিশার সম্মান যেনো বহুগুন বেড়ে গেছে।কোথাও যদি এপ্রোণ গায়ে দিয়েই যায় আজব ধরনের এক সম্মানিত ব্যক্তি হয়ে যায় সে।
কথায় আছে না,সূর্যের চেয়ে বালির উত্তাপ বেশি থাকে।তেমনি ডাক্তার দের থেকে মেডিকেল স্টুডেন্ট দের সম্মান যেনো অনেক বেশি থাকে।
একবার তানিশার বাবা হসপিটালে চেকাপ করানোর জন্য ঢাকায় এসেছিলেন।তানিশা কলেজ শেষ করেই বাবাকে নিয়ে হসপিটালে যায়।রিসেপশনে সিরিয়াল নিতে গিয়ে এমন খাতির করা শুরু করলো সবাই,তানিশার জীবনদশায় এরকম খাতির কখনোই পাই নি সে।
তানিশা সবসময় ভাবে,সে বড় কোনো ডাক্তার হতে পারবে কিনা জানে না,তবে এখন থেকেই সকল মানুষের ভালোবাসা পাচ্ছে প্রচুর।
এদিকে নোমান তানিশার প্রফের পরীক্ষার ব্যাপারে একের পর এক প্রশ্ন করেই যাচ্ছে।কিন্তু তানিশা এখনো তার কল্পনার রাজ্য থেকেই ফেরে নি।
আমি তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করছি।কোথায় হারিয়ে গেলে এভাবে?
নোমানের ধমকানি শুনে তানিশার ধ্যান ফিরে এলো।সে তখন তার কল্পনার রাজ্য থেকে ফিরে এসে বললো,সরি,আরেকবার একটু বলবেন প্লিজ।শুনতে পারি নি।
নোমান তখন তার ভ্রু কুঁচকিয়ে বললো,
তোমার কি প্রফের সব বিষয়ের পরীক্ষা হয়ে গেছে?
--জ্বি।
--তা পরীক্ষা কেমন দিয়েছো?
তানিশা নোমানের কথা শুনে এবার একটু ঢোক গিললো।তারপর আমতা আমতা করে বললো,জ্বি ভালোই দিয়েছি।
অথচ সে মোটেও ভালো দেয় নি পরীক্ষা। কিছুক্ষন আগেও সে তন্নির সাথে প্রফের পরীক্ষা নিয়ে আলোচনা করছিলো।
নোমান তখন বললো,গুড।
ভালো হলেই তো ভালো।তবে তোমার মুখ চোখ দেখে মনে হচ্ছে না ভালো পরীক্ষা দিয়েছো।কারণ প্রফের প্রতিটা সাবজেক্ট এ পাস করা এতো সহজ নয়।যেভাবে তুমি নাচ গান করছো মনেই হয় না তুমি মেডকেলের স্টুডেন্ট।
তানিশা নোমানের মুখে এমন অপমানজনক কথা শুনেও শান্ত থাকলো। কারণ সত্যিই তার প্রফের পরীক্ষা খারাপ হয়েছে।তানিশা সেজন্য সাহস করে বললো, আচ্ছা,এক্সিডেন্ট যদি পরিক্ষা খারাপ হয়েই যায় তখন কি অন্য উপাই নাই?
নোমান তখন বললো,অবশ্যই আছে।কেনো থাকবে না। প্রফের কোনো বিষয় এ যদি ফেল করো তাহলে ছয় মাস পরে আবার সাপ্লিমেন্টারী পরীক্ষা দিতে হবে।তবেই প্রফের পরবর্তী ইয়ারে উঠতে পারবে।তবে সবসময় চেষ্টা করবে এক চান্সেই যেনো পাশ করতে পারো।তা না হলে ইয়ার গেপ যাবে।
--জ্বি।
নোমান বুঝতে পারলো তানিশার পরীক্ষা ভালো হয় নি।আর সে নিজেই যখন পড়তে পড়তে হাঁপসে যাচ্ছে সেখানে এই মেয়ে কি করবে এটা ভেবেই নোমান তানিশাকে একটা অফার দিলো।নোমান তখন বললো,
তোমার যদি কোনো বিষয় এ বুঝতে অসুবিধা হয় আমাকে বলতে পারো।বা কোনো নোটসের প্রয়োজন হলে বলিও।
তানিশা নোমানের কথা শুনে বিস্ময়করা চোখ নিয়ে তার দিকে তাকালো।কারণ তার বিশ্বাসই হচ্ছে না নোমান নিজের মুখে এসব কথা বলছে তাকে।তবে সে নোমানের কাছে ছোট হতে চাইলো না?সেজন্য ডাইরেক্ট বলে দিলো লাগবে না নোট।আমি সব বিষয় ভালোভাবেই বুঝছি।
হঠাৎ অচেনা এক নাম্বার থেকে কল এলো তানিশার ফোনে।তানিশা দেখেই সাথে সাথে কেটে দিলো কলটা।আবার কল এলো।তানিশা আবার কেটে দিলো।নোমান এখনো সামনেই দাঁড়িয়ে আছে।তানিশা এভাবে বার বার কল কেটে দেওয়ায় নোমান ভাবলো হয়তো পার্সোনাল কেউ সেজন্য তার সামনে কল রিসিভ করছে না তানিশা। সেজন্য নোমান আর এক মুহুর্ত ও দেরী করলো না।তাড়াতাড়ি করে রুম থেকে বের হয়ে গেলো।
এদিকে অচেনা সেই নাম্বার থেকে অনবরত কল বেজেই যাচ্ছে।তানিশা এবার আর কেটে দিলো না কল।সে রিসিভ করতেই অপর পাশ থেকে একটা ছেলের কন্ঠ ভেসে আসলো।ছেলেটি জোরে ধমক দিয়ে বললো,
এই মেয়ে!আমাকে ফেসবুকে ব্লক দিয়েছো কেনো?তাড়াতাড়ি ব্লক খুলে দাও তা না হলে খুব খারাপ হয়ে যাবে কিন্তু।ভুলে যেও না আমি কিন্তু একজন পুলিশ অফিসার।আমার চ্যালেঞ্জের কথা মনে আছে কি?শনিবার কিছুতেই কলেজে ঢুকতে দেবো না।সোজা কাজি অফিস নিয়ে যাবো।
তানিশা সেই কথা শুনে সাথে সাথে কল কেটে দিয়ে নাম্বার টা ব্লক করে দিলো।সে বুঝতে পারলো এটা সেই ছেলে যে তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করবে বলে ভয় দেখাচ্ছে।
এবার তানিশার ভয় আরো বেড়ে গেলো।এখন কি হবে?এই ছেলে দেখি তার ফোন নাম্বারও জোগাড় করেছে।তানিশা এবার আর তন্নিকে কিছু বললো না।কারণ তন্নি কিছুতেই ব্যাপার টা সিরিয়াস ভাবে নিচ্ছে না।সে এবারও ব্যাপারটাকে সাধারণ ব্যাপার বলে উড়িয়ে দেবে।কিন্তু তানিশার কাছে এই ব্যাপারটা মোটেও স্বাভাবিক ব্যাপার মনে হচ্ছে না।সেজন্য তানিশা সিদ্ধান্ত নিলো কাল সকাল সকাল সে হোস্টেলে চলে যাবে।হোস্টেলে একবার পৌঁছলেই আর কারো সাধ্য নেই তাকে ধরার।কারণ হোস্টেলের সকল মেয়ে দল বেঁধে কলেজে যায়,সেজন্য ভয়ের কোনো কারণই নেই।
সারারাত তানিশা টেনশনে ঘুমাতে পারলো না।একবার ওপাশ হলো তো আরেকবার অন্য পাশ হতে লাগলো।বান্ধুবীর সাথে আনন্দ করবে বলে এসে অচেনা এক ভয়ে তার আনন্দটাই মাটি হয়ে গেলো।
এদিকে তন্নি গভীর ঘুমে ডুবে আছে।মনে হচ্ছে সে দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী ব্যক্তি,যার মধ্যে কোনো টেনশন নেই।
তানিশার ঘুম আসছে না দেখে সে বেলকুনির দিকে এগিয়ে গেলো।হঠাৎ সে খেয়াল করলো আগে থেকেই বেলকুনিতে আলো জ্বালানো।তানিশা বুঝতে পারলো হয় তো নোমান আছে বেলকুনিতে।
কারণ তন্নি আর নোমানের রুমটা পাশাপাশি। দুই রুমের জন্য একটাই বেলকুনি।বেলকুনিটা অনেক বড় আর সুন্দর করে সাজানো।বেলকুনির রেলিং ধরে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকলে মুহুর্তের মধ্যে মন টা ভালো হয়ে যায়।কারণ সুন্দর ঠান্ডা বাতাস পাওয়া যায় বেলকুনিতে।আর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ কুঞ্জলিকার সাথে অপরাজিতার সমাহার।দেখলেই চক্ষু যেনো জুড়িয়ে যায়।নোমান থাকায় তানিশা আর গেলো না বেলকুনির দিকে।আস্তে করে লাগিয়ে দিলো দরজাটা।
এদিকে নোমান দরজা খোলার শব্দ শুনে বললো,তন্নি তন্নি?ঘুমাস নি তুই?
তানিশা পড়ে গেলো মহা বিপদে।সে এক পা এগোতেও পারছে না আবার পিছিয়ে যেতেও পারছে না।
নোমান তখন নিজেই এগিয়ে আসলো।আর তানিশাকে দেখামাত্র বললো,তুমি?তা কথা বলবে না?
--না মানে,
--কি মানে মানে করছো?
তানিশা নোমানের ধমকানি শুনে বললো,ঘুমটা ভেংগে গেলো তো,তাই ভাবলাম বেলকুনিতে গিয়ে একটু পড়াশোনা করি।
--ও তাই?ভালো তো?এই বলে নোমান তানিশাকে বেলকুনি ছেড়ে দিয়ে তার বইপত্র নিয়ে নিজে চলে গেলো রুমে।
তানিশা তো এবার মহাবিপদের মধ্যে পড়ে গেলো।সে তখন বাধ্য হয়েই তার ব্যাগ থেকে বই আনতে গেলো।আর বিড়বিড় করে নোমানকে বকতে লাগলো। এই ছেলের কাছে সারাক্ষণ শুধু পড়ালেখার কথা।পড়ালেখার বাহিরে এ অন্য কথা বলতেই জানে না।
তানিশার পড়াতে একটুও মন নাই।তবুও একরকম বাধ্য হয়েই বই এর পাতা উল্টাতে লাগলো সে।হঠাৎ তানিশা খেয়াল করলো নোমানের একটা বই বেলকুনিতেই রেখে গেছে।যাতে স্পষ্ট করে লেখা মাইক্রোবায়োলজি।তানিশা বই টা হাতে নিয়ে এক এক করে তার পাতা উল্টাতে লাগলো।হঠাৎ সে খেয়াল করলো নোমানের বই এর মধ্যে তার ছবি।তানিশার মাথা যেনো ৩৬০ ডিগ্রী কোনে ঘুরে গেলো।এটা কি করে সম্ভব?নোমান কি জন্য তার ছবি এভাবে নিজের কাছে রেখেছে।নোমান যাতে বুঝতে না পারে সেজন্য যে জায়গার ছবি সেই জায়গাতেই রেখে তানিশা তাড়াতাড়ি করে রুমে চলে গেলো।
এমনিতেই অচেনা ছেলেটার হুমকি শুনে তার ভয় কিছুতেই দূর হচ্ছে না তার মধ্যে আবার নোমানের বই এর মধ্যে তার ছবি কেনো রেখেছে এ নিয়ে চিন্তা করতে করতে তানিশার মাথা একদম বনবন করে ঘুরতে লাগলো।সারারাত জাগিয়ে থেকে ভোরবেলার দিকে তার চোখ দুটি লেগে আসলো।
পরের দিন সকালবেলা এক এক করে সবাই নাস্তার টেবিলে আসলেও নোমান আর তানিশাকে দেখা গেলো না।নোমান সারারাত জেগে পড়াশোনা করেছে সেজন্য তার উঠতে লেট হচ্ছে।তাছাড়া আজ শুক্রবার দেখে একটু নিশ্চিন্তেয় ঘুমাচ্ছে সে। অন্যদিকে তানিশাও সারারাত কিছুতেই দুচোখের পাতা এক করতে পারে নি বিধায় এখন সেও গভীর ঘুমে মগ্ন আছে।
তায়েব চৌধুরী তন্নি কে নাস্তার টেবিলে একা দেখে বললো,
তন্নি,তানিশা কই?
--মামা ও ঘুমাচ্ছে।পরে নাস্তা করবে।
মামা সেই কথা শুনে বললো,বুঝতে পেরেছি,নিশ্চয় সারারাত জেগে থেকে পড়াশোনা করেছে সেজন্য উঠতে এতো লেট হচ্ছে।এগুলোই হলো আসল স্টুডেন্ট। কারণ রাতের বেলা কেউ ডিস্টার্ব করার থাকে না।নিরিবিলিতে খুব মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করা যায়।
তায়েব চৌধুরীর কথা শুনে তন্নির মা তাহমিনা চৌধুরী বললেন, ভাই আপনি তানিশাকে একটু বেশিই পছন্দ করেন।সেজন্য বোধহয় আপনার সবসময় তানিশাকে নিয়ে পজিটিভ চিন্তায় মাথায় আসে।কাল সারারাত তানিশা একবারও পড়তে বসে নি।আমি দুইবার গিয়েছিলাম ওদের রুমে।দুইবারই তানিশাকে শুয়ে থাকতে দেখেছি।বরং তন্নিই পড়াশোনা করেছে রাত জেগে।
তায়েব চৌধুরী তাহমিনা চৌধুরীর কথা শুনে আর কিছু বললো না।কারণ তাহমিনা যে তানিশাকে সহ্য করতে পারে না তা তায়েব চৌধুরী ভালো করেই জানে।তানিশার একটু প্রশংসা করলেই তাহমিনা তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে।তাহমিনা সবসময় নিজের মেয়েকে সাপোর্ট করে।
এবার আমান কথা বলে উঠলো।সে তখন বললো,কে পড়াশোনা করে আর কে করে না এটা বড় কথা না।যে তার নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে সেই একজন প্রকৃত মেধাবী স্টুডেন্ট।শুধু সারাক্ষণ বই খাতা নিয়ে বসে থাকলেই ভালো স্টুডেন্ট হওয়া যায় না।
আমানের কথাগুলো তন্নির কানে যেনো বিষের মতো লাগছিলো।কারণ আমান যে তাকে উদ্দেশ্য করেই কথাগুলো বলছে এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।তিন্নির প্রচন্ড রাগ হতে লাগলো সে তখন নাস্তা খাওয়া বাদ দিয়ে তার রুমে চলে গেলো।
আমান তখন চিল্লায়ে বললো,তন্নি, তুই আবার নাস্তা না করেই কই যাচ্ছিস?
তন্নি কোনো উত্তর দিলো না।সোজা নিজের রুমে চলে গেলো।
এদিকে তানিশা এখনো ঘুম থেকে ওঠে নি।হঠাৎ তন্নি রুমে গিয়ে তানিশাকে জোর করেই ঘুম থেকে ওঠালো।আর বললো,তানিশা নাস্তা করবি কখন?সবাই তোর জন্য অপেক্ষা করছে।
তানিশা তন্নির টানাটানি দেখে আর শুয়ে থাকতে পারলো না, এক লাফে বিছানা থেকে উঠে বসলো।আর চোখ ডলতে ডলতে ঘড়ির দিকে তাকালো।ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তানিশা আর এক সেকেন্ড দেরী করলো না, তাড়াতাড়ি করে ওয়াশরুমে চলে গেলো আর বের হয়েই রেডি হতে লাগলো।
তন্নি তা দেখে বললো,তানিশা রেডি হচ্ছিস যে?এখনি যাবি নাকি?
--হ্যাঁ রে দোস্ত।এখনি যাবো হোস্টেলে।পরেরবার এসে তোর সাথে ঘুরতে যাবো।আজ আমার একটু তাড়া আছে।
--কিসের তাড়া?
--হোস্টেলে পৌঁছে তোকে জানাবো।এখন আমাকে এক্ষুনি বের হতে হবে।
তন্নি তানিশার কথা শুনে ভীষণ মন খারাপ করলো।কারণ আজ তন্নি তানিশার সাথে বাহিরে ঘুরতে যাবে, সেজন্য কিছু প্লান করে রেখেছিলো।আর সেখানে গিয়ে নিরিবিলি সে তানিশাকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে চায়।
কিন্তু তানিশা তাড়াতাড়ি করে তন্নির থেকে বিদায় নিয়েই রুম থেকে বের হয়ে গেলো।
তানিশা যখন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলো ঠিক তখনি নোমানের সাথে দেখা তার।তানিশা আজ আর নোমানের দিকে তাকানোর সাহস পেলো না।তার শুধু এখন নোমানের বই এর মধ্যে রাখা তার ছবির কথাই মনে হতে লাগলো।তানিশা সেজন্য পাশ কাটিয়ে চলে গেলো।নোমানও নিজের থেকে কিছু জিজ্ঞেস করলো না।
কিন্তু তানিশা যখন ডাইনিং রুমে এসে পৌঁছলো,এসে দেখে বাসার সবাই নাস্তা করছে।তানিশাকে ব্যাগ ঘাড়ে দেখে তায়েব চৌধুরী বললেন, মা তানিশা নাস্তা না করেই কোথায় যাচ্ছো?
তানিশা তখন বললো আংকেল আমার একটু তাড়া আছে।এখনি যেতে হবে হোস্টেলে।
আমান তখন বললো,তাই বলে না খেয়েই চলে যাবে।কিছু মুখে তো দিবে।
--না ভাইয়া।সময় নেই আমার।এই বলেই তানিশা বাসা থেকে বের হয়ে গেলো।
বাসার কেউ কিছু বুঝতে পারলো না।হঠাৎ তানিশার কি হলো?সে এমন তাড়াহুড়ো করে কেনো বের হলো?তন্নি নিজেও কিছু বুঝতে পারলো না।
তানিশা শুধু ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে আর হাঁটছে।আর কিছুদূর গেলেই বাস স্ট্যান্ড পেয়ে যাবে সে।সেজন্য সে তার হাঁটার গতি আরো বাড়িয়ে দিলো।হঠাৎ অচেনা এক নাম্বার থেকে আবার ফোন এলো।তানিশা ভয়ের মধ্যে পড়ে গেলো।যদি আবার সেই ছেলেই হয়।সেজন্য সে রিসিভ না করে এবার দৌঁড়াতে লাগলো।
তানিশা দৌঁড়াতেই একটা রিক্সা এলো তার সামনে।সেজন্য সে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,মামা দাঁড়ান একটু।আমাকে একটু বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত রেখে আসেন।এই বলেই তানিশা এক লাফে রিক্সায় উঠলো।
কিন্তু তানিশা রিক্সায় উঠতেই কিছু ছেলে চলে এলো রিক্সার সামনে।আর রিক্সাওয়ালা মামাকে বললো,মামা দাঁড়ান।আগে ডাক্তার ম্যাডামের সাথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে নেই।
ছেলেগুলোর কথা শুনে তানিশা এতো ভয় পেয়ে গেলো যে তার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না।সে যে চিল্লাবে সে শক্তিটুকুও তার মধ্যে নেই এখন।
তানিশা চোখ মেলে তাকাতেই দেখে সে হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে।তানিশা বুঝতে পারলো না কিছু।তাকে আবার কে নিয়ে এলো হাসপাতালে ?সে তো অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলো রাস্তায়।তারপর কি হয়েছিলো তার সাথে সে কিছুই মনে করতে পারলো না।
তানিশা তার কপালের ব্যান্ডেজ টা বোলাতে বোলাতে উঠতে ধরলো।কিন্তু তন্নি এগিয়ে এসে বললো,
উঠছিস কেনো?শুয়েই থাক।তা এখন কেমন লাগছে তোর?
তানিশা তখন শান্ত কন্ঠে বললো,ভালো লাগছে।কিন্তু আমাকে হাসপাতালে নিয়ে এলো কে?আর তোর নোমান ভাইয়ার কি অবস্থা?উনি কি ঠিক আছেন?
তন্নি তখন বললো,আমান ভাইয়া নিয়ে এসেছে তোকে।আর নোমান ভাইয়া গুরুতর ভাবে আহত হয়েছে।সেও এই হাসপাতালেই আছে।এখন মোটামুটি সুস্থই আছেন।
তন্নি তখন বললো হয়েছিলো টা কি তানিশা?
তানিশা তখন বললো আমি বাসস্ট্যান্ডে যাবো বলে রিক্সায় উঠেছিলাম।হঠাৎ কিছু ছেলে এসে আমাকে এট্যাক করে।তারা আমাকে তুলে নিয়ে যেতে এসেছিলো।আমাকে নাকি জোর করেই বিয়ে করবে।হঠাৎ সেই পথে তোর নোমান ভাইয়া যাচ্ছিলেন।তোর নোমান ভাইয়াকে দেখামাত্র আমার ভয় কিছুটা দূর হলো।আমি তখন চিৎকার করে তাকে ডাকতে লাগলাম।তোর নোমান ভাইয়া আমার চিৎকার শুনে সাথে সাথে এগিয়ে আসে।এবং আমাকে ছেলেগুলোর হাত থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করেন।কিন্তু একটা ছেলে পিছন দিক থেকে তোর নোমান ভাইয়ার মাথায় আঘাত করলে তিনি সাথে সাথে মাটিতে পড়ে যান।আমি ওনাকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে জোরে জোরে চিৎকার করতে থাকি।কিন্তু কেউই এগিয়ে আসে না।তারপর একটা ছেলে আমার মুখ চেপে ধরলে আমি সাথে সাথে অজ্ঞান হয়ে যাই।তারপর আর কিছু বলতে পারি না।
নোমান ভীষণ ভাবে আহত হওয়ার কথা শুনে তানিশার খুব খারাপ লাগলো।তাকে বাঁচাতে গিয়ে আজ তার এ অবস্থা হলো।
হঠাৎ আমান এলো তানিশার বেডে।আর জিজ্ঞেস করলো তানিশা কেমন আছো এখন?
--জ্বি ভালো ভাইয়া।
আমান তখন বললো,আর কখনোই একা একা যাবে না কোথাও।আমি না থাকলে কি হতো তোমার একবার ভেবে দেখেছো?
--জ্বি ভাইয়া।
আমান এবার তার দুর্দান্ত সাহসের গল্প তানিশাকে শোনাতে লাগলো।
আমান বললো,ভাগ্যিস আমিও বাহিরে বের হয়েছিলাম তা না হলে ছেলেগুলো তো তোমাকে উঠিয়েই নিয়ে যেতো।তারপর কি হতো তা উপরওয়ালাই ভালো জানে।
তন্নি সেই কথা শুনে বললো,ভাইয়া আপনি ছেলেগুলোকে কিভাবে তাড়ালেন?যেখানে নোমান ভাইয়া গুরুতর আহত হয়েছে সেখানে তো আপনার কিছুই হলো না।
আমান তখন হাসতে হাসতে বললো,তুই খুবই বোকা তন্নি।আমি হলাম ভবিষ্যৎ এর একজন পুলিশ অফিসার।এরকম ছোটো খাটো সন্ত্রাসীদের তাড়ানোর ক্ষমতা আমার আছে।আমি যে ফাইট জানি নোমান কি সেই ফাইট জানে নাকি?যার সন্ত্রাসীদের তাড়ানোর ক্ষমতা নেই,সে গিয়েছে তানিশাকে উদ্ধার করতে।আমাকে ফোন করে ডাকলেই তো নোমানের আজ এ ক্ষতি হতো না।
তানিশা আমানের মুখে পুলিশ অফিসার হওয়ার কথা শুনে একদম স্তব্ধ হয়ে গেলো।কারণ তাকে হুমকি দেওয়া ছেলেটাও তো পুলিশ অফিসার পরিচয় দিয়েছে।তানিশা তখন বললো,ভাইয়া আপনি পুলিশ অফিসার হবেন?
--হবো মানে?ধরে নাও হয়ে গেছি।এবার পরীক্ষা অনেক ভালো হইছে।শুধু রেজাল্টের অপেক্ষায় আছি।রেজাল্ট বের হলেই এই আমান হয়ে যাবে পুলিশ অফিসার আমান চৌধুরী।
তন্নি তখন মুখ ভেংচিয়ে বললো,ভাইয়া আপনার এসব বড় বড় গল্প করা এবার বাদ দিবেন।যেদিন হবেন সেইদিন বলিয়েন।এ যাবতে তো অনেক পরীক্ষা দিলেন।
আমান সেই কথা শুনে বললো আগে নিজের চরকায় তেল দে।আমি এবার পুলিশ অফিসার না হলেও সমস্যা নাই,নেক্সট আবার ট্রাই করবো।কিন্তু তোর তো এবারই লাস্ট সুযোগ।মেডিকেলে চান্স না পেলে কিন্তু খবর আছে।বাসার সবাই উঠেপড়ে লাগবে।
আমান আর তন্নি এইভাবে একের পর এক ঝগড়া করতেই আছে।
কিন্তু আমানের পুলিশ হওয়ার কথা শুনে তানিশার মাথা টা যেনো এলোমেলো হয়ে গেলো।সে কিছুতেই এই হিসাব টা মেলাতে পারছে না।আর সত্যি যদি হুমকি দেওয়া ছেলেটাই আমান হয় তাহলে তিনি কেনো এভাবে তাকে জোর করে বিয়ে করতে চাইবে?
নাহঃ কি ভাবছি সে।তার ধারণা হয়তো ভুল।এমনও তো পারে সবকিছু কাকতালীয় ভাবে মিলে গেছে।
হঠাৎ তানিশার বাবা মিঃ তহিদুল সাহেব দৌঁড়ে চলে এলেন তানিশার বেডে।তারপর তানিশার মুখ চোখ বুলিয়ে বললেন,মা ভালো আছিস তুই?কি হয়েছিলো তোর?
তানিশা তার বাবাকে দেখে সাথে সাথে জড়িয়ে ধরে বললো,ভালো আছি বাবা।কিছুই হয় নি।একটু আঘাত পেয়েছি শুধু।
তহিদুল সাহেব তখন তন্নিকে বললো,মা এসব কি করে হলো?
তন্নি তখন বিস্তারিত ভাবে তহিদুল সাহেব কে সবকিছু খুলে বললো। তহিদুল সাহেব সব কাহিনী শোনার সাথে সাথে বললো,লাগবে না ডাক্তার হওয়া।এই শহরে তোকে আমি একলা একলা কিছুতেই রাখবো না।যদি সন্ত্রাসী রা খারাপ কিছু করতো তাহলে কি হয়ে যেতো?আমরা কোথায় পেতাম তোকে।
তানিশা সেই কথা শুনে বললো, তাই বলে কি ঘরের মধ্যে বসে থাকবো বাবা?
--হ্যাঁ ঘরের মধ্যেই বসে থাকবি।গ্রামের কেউ যদি শোনে তোকে সন্ত্রাসীরা ধরেছিলো তাহলে তো একদম নাক কাটা যাবে আমার।
আমান সেই কথা শুনে বললো, আংকেল কি বলছেন এসব?তানিশা অনেক মেধাবী স্টুডেন্ট আর একজন ভবিষ্যৎ ডাক্তারও।এভাবে ওর ক্যারিয়ার টা নষ্ট করবেন না।আমরা সবাই আছি তো?আমাদের কে বিশ্বাস করেন না?
তহিদুল সাহেব তখন বললো তোমরা আর কতদিন পাহারা দেবে তাকে।ঢাকা শহরে চেনা পরিচিত কেউ নেই তানিশার।আমার এতোদিন তেমন ভয় লাগে নি।কিন্তু এই ঘটনার পর কিছুতেই মন আমার সায় দিচ্ছে না।
আমান তখন বললো,তাহলে আংকেল আপনারা ঢাকাতে থাকছেন না কেনো?আন্টি আর আপনি থেকে যান এখানে।
তহিদুল সাহেব সেই কথা শুনে বললো,তা কি করে হয় বাবা।একলা মানুষ আমি।শহরে থাকলে গ্রামের জমিজমা গুলো কে দেখবে আমার?তাছাড়া তানিশার বড় বোনের এখন একের পর এক বিয়ের স্বমন্ধ আসতেছে।এই মুহুর্তে শহরে থাকা সম্ভব না আমাদের।
হঠাৎ তায়েব চৌধুরী প্রবেশ করলেন তানিশার রুমে আর বললেন,কেনো সম্ভব নয়?ইচ্ছা থাকলে সবকিছু করা সম্ভব।আপনি যদি কিছু না মনে করেন তাহলে তানিশা আমার বাসা থেকেই কলেজ করতে পারবে।আমার ছোটো ছেলেও তো তানিশার কলেজেই পড়ে।ওরা একসাথে যাবে প্রতিদিন।আর তা না হলে আমার সাথে যাবে।আমিও তো রোজ রোজ আটটায় অফিসে যাই।
তহিদুল সাহেব তায়েব চৌধুরীর কথা শুনে বললো,আপনাকে দেখলেই বোঝা যায় অনেক বড় মন আপনার।আপনাদের ফ্যামিলির প্রতিটা সদস্যই অনেক ভালো।আমার তানিশাকে যে আপনারা এতো বেশি ভালোবাসেন এই ঘটনা না ঘটলে সত্যি আমি বুঝতে পারতাম না।কিন্তু ক্ষমা করবেন আমাকে তানিশাকে আমি কিছুতেই আপনাদের বাসায় রাখতে পারবো না।নানান লোকে নানা কথা বলবে।তাছাড়া আমারও তো একটা মানসম্মানের ব্যাপার আছে।
তায়েব চৌধুরী তখন তহিদুল সাহেবের হাত ধরে বললো, তানিশাকে আমি আমার নিজের মেয়ের মতোই দেখে আসছি।তন্নি আর তানিশাকে কখনোই আমি আলাদা চোখে দেখি নি।আপনি নিশ্চিন্তে আমাদের বাসায় ওকে রাখতে পারেন।আমাদের বাসায় থাকলে ও বরং ভালোই থাকবে।হোস্টেলের সকল মেয়েই কিন্তু ভালো না।এমনও তো হতে পারে এসব ষড়যন্ত্র ওর চেনাজানাই কেউ করছে।সেজন্য আমি চাচ্ছি তানিশা আমাদের বাসা থেকেই ওর পড়াশোনা কম্পিলিট করুক।
তায়েব চৌধুরীর কথা শুনে তাহমিনা চৌধুরীর মাথায় যেনো আকাশ ভেংগে পড়লো।তার ভাই এসব কি বলে।বাসায় দুই দুই টা জোয়ান পোলা।তার মধ্যে এই মেয়েটাকে রাখা কি ঠিক হবে?তাদের তো একটা মানসম্মান আছে।তাছাড়া তানিশা বাসায় থাকলে তন্নি মোটেও পড়তে বসতে চাইবে না।সারাক্ষন শুধু গুজুরগুজুর করবে ওর সাথে।মেয়েটা আমার ভীষণ সহজ সরল।তানিশা ঠিকই তার লক্ষ্য পূরণ করবে মাঝখান থেকে তার মেয়েটা ছিটকে পড়বে।
সেজন্য তাহমিনা চৌধুরী বললো,তোমরা সবাই যেভাবে ভয় পাচ্ছো মনে হয় তানিশা একাই থাকে ঢাকা শহরে।আরে ওর মতো অহঃরহঃ মেয়ে থাকে এই শহরে।পরবর্তী তে একটু সাবধানে চলাফেরা করলেই আর এ বিপদ হবে না।আর তানিশা তুমি হুদাই এদিক ওদিক ঘুরে বেড়বা না,আমাদের বাসাতেও আসার দরকার নাই।হোস্টেল থেকে সকল মেয়ে এক সাথে বের হবে,আবার কলেজ শেষ করে আবার একসাথে ফিরবে।তাহলেই তো কোনো বিপদ হবে না।
তায়েব চৌধুরী তাহমিনা চৌধুরীর কথা শুনে ভীষণ রেগে গেলেন।তিনি তখন তাহমিনা কে বললেন, তুই মাঝখান থেকে নাক গলাস কেনো?তানিশা আমাদের বাসায় থাকলে তোর প্রবলেম টা কোথায়।তন্নি যেটুকু ভালো স্টুডেন্ট হয়েছে তা তানিশার সাথে চলাফেরা করেই হয়েছে।তানিশার সাথে চলাফেরা করে দেখেই পড়াশোনায় সে আজ এতো সিরিয়াস হয়েছে।জানিসই তো সৎ সংগে স্বর্গবাস,অসৎ সংগে স্বর্বনাশ।
তাহমিনা চৌধুরী তায়েব চৌধুরীর কথা শুনে একদম কেঁদেই ফেললো।তার ভাই তানিশাকে এতো বেশি পছন্দ করে।তানিশার জন্য সবার সামনে তাকে এতোগুলো গালমন্দ করলো।
অন্যদিকে তন্নি মনে মনে তো সেই খুশি।তানিশা তাদের সাথে থাকলে সে সবচেয়ে খুশি হতো।কিন্তু তার মা যেভাবে বাঁধা দিচ্ছে তাতে যে কি হয়? তন্নি চুপচাপই থাকলো।কারণ এখানে সে যদি একটা কথা বলে তার মা একদম গলা টিপে মেরে ফেলবে তাকে।
তহিদুল সাহেব সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না।তিনি কি করবেন এখন কিছুই বুঝতে পারছেন না।আবার তানিশাকে একা একা রাখার সাহস ও পাচ্ছেন না তিনি।যদি এক্সিডেন্ট কিছু হয় তখন তিনি মেয়ে পাবেন কোথায়?অন্যদিকে তায়েব চৌধুরী আর তার পরিবার কে তিনি চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতে পারেন।কারন তিনিও অনেকবার গিয়েছেন তায়েব চৌধুরীর বাসায়।তানিশা যখন তন্নির সাথে একসাথে কোচিং করেছে তখন প্রথম কয়েকদিন তিনি তায়েব চৌধুরীর বাসাতেই ছিলেন।তাছাড়া ঢাকাতে তানিশাকে দেখতে এলেও তিনি মাঝেমধ্যেই ওদের বাসায় গিয়ে থাকতেন।সেজন্য তায়েব চৌধুরীর সাথে তার সম্পর্ক টা মোটামুটি ভালোই।
তায়েব চৌধুরী তহিদুল সাহেব কে চুপচাপ থাকা দেখে বললেন,এতো কিসের চিন্তা করছেন আপনি?যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে নিয়েন।যে কয়দিন তানিশা সুস্থ হয় নি অন্তত সে কয়দিন তো আমাদের বাসায় থাকতে পারে।আর আপনিও এ কয় দিন থাকবেন তানিশার সাথে।তানিশা সুস্থ হলে তবেই গ্রামে ফিরে যাবেন।
তহিদুল সাহেব হ্যাঁ বা না কিছুই বললেন না।কারণ তিনি ভীষণ চিন্তার মধ্যে পড়ে গেলেন।না করলে তায়েব চৌধুরী ভীষণ মন খারাপ করবেন,আবার হ্যাঁ করলে তার মানসম্মান নিয়ে লোকে কথা বলবে।
নোমান আর তানিশা দুইজনই মোটামুটি সুস্থ হয়েছে।সেজন্য দুজনকেই বাসায় নিয়ে গেলো তায়েব চৌধুরী। নোমান সেই আগের মতোই চুপচাপ আর নিচ মুখ হয়ে থাকলো।এতোকিছু হয়ে যাওয়ার পরও সে এ বিষয়ে তানিশার সাথে একটি কথাও বললো না।
কিন্তু তানিশা নোমানের প্রতি অনেকটাই দূর্বল হয়ে গেছে।নোমান নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কি করে তাকে বাঁচাতে এলো।সে তো ইচ্ছে করলে মানুষ জন জড়ো করে তবেই তাকে বাঁচাতে আসতে পারতো।কিন্তু নোমান সেরকম কিছু না করে তার বিপদ আছে জেনেও তানিশাকে বাঁচাতে এসেছিলো।ছেলে গুলোর সাথে কিভাবে মোকাবিলা করছিলো!
নোমান যখন প্রতিটা ছেলেকে ঘুষি দিচ্ছিলো তানিশার মনে হয়েছে সেই ছেলেগুলোর মনে হয় সেই জায়গার হাড় একদম ভেংগে গেছে।তানিশার শুধু বার বার সেই দৃশ্যই চোখের সামনে ভাসছে।
চলবে...
Writer:- মুমতাহিনা জান্নাত মৌ