![]() |
Bangla Golpo |
খুলনায় বেড়াতে গিয়ে খানজাহান আলীর মাজারে এসেছি নতুন বউ নিয়ে, সেখানে প্রচন্ড ভীড়। আমি আর নীরা ভীড় ঠেলে বিশাল দীঘির পাড়ে দাঁড়ালাম। আমি বললাম, এই দীঘিতে ধলা পাহাড় আর কালা পাহাড় নামে দুইটা কুমির আছে তুমি জানো?
নীরা তার গালে টোল ফেলে হাসল, এখন নাই। মারা গেছে ওরা।তুমি এতো ব্যাকডেটেড।
আমি বিব্রত হয়ে গেলাম। নীরার পড়াশুনা অনেক। সে সবসময়ই আপডেট আমার থেকে। কিন্তু আমার নানাবাড়ি এলাকার খবর আমার নতুন বউ যদি আমার থেকে বেশি জানে সেটা একটা বেইজ্জতি ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু নীরা এই দীঘিতে এখনো কুমির আছে, সাবধানে দাঁড়াও।
নীরা আবার গালে টোল ফেলে হাসলো, আমি সাবধানেই আছি সাহেব, তুমি কি জানো এই খান জাহান আলীর মাজারের দরবেশদের আগে একটা বিশেষ ক্ষমতা ছিলো, তারা হাতের নখে কোথায় কি হচ্ছে দেখতে পারতেন?
আমি মাজারের ভীড়ের দিকে তাকালাম। সেখানে বহু ধরনের তাবিজ বিক্রি হচ্ছে। পরিস্কার ভন্ডামি ছাড়া কিছু না। সরল বিশ্বাসের মানুষদের বোকা বানিয়ে এরা টু পাইস কামিয়ে নিচ্ছে।
এইবার আমি হাসলাম, নীরা তুমি আমাকে বোকা বানাচ্ছ। বেশী গল্পের বই পড়লে এইসব গাল গপ্পে বিশ্বাস চলে আসে।
নীরা কিছু বলল না। আমরা দীঘির কাছ থেকে সরে এলাম। মাত্র মাস তিনেক হয়েছে বিয়ে করেছি আমরা। বিয়ের পর বেড়াতে এসেছি আমার নানাবাড়ি বাগেরহাটে। আজ দুইজন ঘুরতে বেড়িয়ে চলে এসেছি খানজাহান আলীর মাজারে।
মাজার থেকে বের হয়ে একটা বড় আমগাছের নীচে বাঁধানো সিমেন্টের উপর বসলাম আমরা। গ্রীষ্মের দুপুর, প্রচন্ড গরম পড়েছে। কোথাও বাতাস নেই। আমি নীরাকে বললাম, নীরা ডাব খাই চল। শরীর ঠান্ডা হবে।
নীরা বলল, ইমন তুমি আমার কথা বিশ্বাস করোনি কিন্তু সত্যিই জানো এইখানে কিছু দরবেশ ছিলো তাদের বেশ কিছু ক্ষমতা ছিলো।
আমি এবার বিরক্ত হলাম।
এইসব ভন্ডামি নীরা। তোমার মতো শিক্ষিত মেয়েরাও যদি এইসব গালগপ্পো বিশ্বাস করে বসে থাকে তাহলে এই গ্রামের লোকদের কি অবস্থা একবার ভাবো? এইখানে হাজার হাজার তাবিজ বিক্রি হয় প্রতিদিন, কতবড় ব্যবসা খুলে বসেছে ভন্ডের দল।
নীরা আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। এতো সুন্দর করে মেয়েটা হাসতে পারে। আমি কোন কারনে বিরক্ত হলেই সে হেসে ফেলে। কি চমৎকার একটা মেয়ে। আমার এখনো মাঝে মাঝে ঠিক বিশ্বাস হয় না নীরার মতো একটা মেয়ে আমার মতো উড়নচন্ডী ধরনের একটা ছেলেকে বিয়ে করতে পারে। নীরার সাথে প্রথম দেখা আমার এক কাজিনের বিয়েতে। খাবার টেবিলে আমি নীরার পাশে বসেছিলাম। নীরার হাতের ধাক্কায় এক রেজালার বাটি উল্টে পড়ল আমার গাঁয়ে। জামা কাপড় সব মাখামাখি। আমি কোনমতে উঠে ওয়াশিং রুমে গেলাম কাপড় ধুতে, দেখি সেখানে নীরা হাজির। সে খুব অস্থির হয়ে আমার জামা কাপড়ে পানি ঢালতে লাগলো। আমার যখন প্রায় একটা গোসল কমপ্লিট তখন সে পানি ঢালা বন্ধ করল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে ভীষন অপরাধীর গলায় বলল, স্যরি ভাইয়া এক্সট্রিমলি স্যরি। আপনাকে বরবাদ করে দিলাম।
ঠান্ডা পানিতে ভিজে কাঁপতে কাঁপতে আমার তখন কেমন লাগছিলো সেটা বলা মুস্কিল। তবে এই দারুন সুন্দর মেয়ের অকৃত্রিম উদ্বেগ দেখে লোভ হচ্ছিলো এই মেয়েটাকে যদি জীবনে কোনভাবে বেঁধে ফেলা যেতো! আমার মতো ভ্যাগাবন্ডের জন্য সেটা ছিলো দুরাশা। কিন্তু দেখা গেলো ঠিকিই এক সকালে আমার মা এসে অবাক হয়ে বললেন, হ্যারে ইমন, তুই কি নীরা নামে কোনো মেয়েকে চিনিস? তাদের বাসা থেকে তোর জন্য বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। মার অবাক হওয়ার যথেষ্ট কারন ছিলো, আমার প্রায় উদ্দেশ্যহীন ছন্নছাড়া জীবনের সাথে বনানীতে বিশাল ডুপ্লেক্স বাড়িওয়ালা রিটায়ার্ড জাজের সুন্দরী মেয়ে বানরের গলায় মুক্তার হারের মতো। আমি আজও অবাক হই নীরা কেনো আমার জন্য এতোটা ব্যাকুল হয়েছিলো? এই রকম একটা মেয়ে যদি সারা জীবন পাশে থাকে তাহলে খুব বেশী আর জীবনের কাছে চাওয়ার থাকে না, আমার মনে হলো আমার জীবন পরিপূর্ন হয়ে গেছে।
বড় আম গাছের নীচে বসে আমি মুগ্ধ হয়ে নীরাকে দেখছিলাম এই সময় এক ভিক্ষুক ধরনের লোক এসে হাজির হল। নীরার দিকে তাকিয়ে বলল, মা জননী তাবিজ কিনবেন? একটা তাবিজ নেন মনের আশা পূরন হবে।
আমি বিরক্ত গলায় বললাম, না লাগবে না ভাই যান তো এখান থেকে।
লোকটা আমার দিকে তাকালোই না, সে নীরাকে আবার বলল, মা জননী একটা তাবিজ নেন, আপনার মনের আশা পূরন হবে।
এবার আমি ক্ষেপে গেলাম, এইসব ভন্ডামি ছাড়েন মিয়া, তাবিজে কি হবে? মনের আশা পূরন? আরে তাবিজ আগে আপনি বাঁধেন, চেহারা দেখে তো বোঝাই যাচ্ছে নিজের মনের আশা পূরন হয় নাই, ধাপ্পা দিয়ে ভিক্ষা করতে আইছেন।
লোকটা আমার দিকে ঘুরলো।
এতো ফাল পারেন ক্যা মিয়া? তাবিজে কাম হয় না? আপনারে যদি দেখাই কাম হয়, কি দেবেন?
হে হে কাজ হয়? কাজ হইলে আপনার এই অবস্থা কেনো? বলে আমি হা হা করে একচোট হাসলাম।
লোকটা হাসলো না। সে গম্ভীর গলায় বলল, আমি এখনি আপনারে প্রমান দিবো, তার আগে কন কি দেবেন?
তাকিয়ে দেখি নীরা উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে। আমার জেদ চেপে গেলো, নীরাও খানিকটা বিশ্বাস করে এইসব ভন্ড উজবুকদের। বিশ্বাস ভাঙ্গানোর এইই সুযোগ।
আমি তুমিতে নেমে গেলাম। বললাম, দেখাও তোমার কারিকুরি। তুমি যদি দেখাতে পারো তাইলে যা চাইবা তা-ই দিবো যাও, কথা দিলাম।
লোকটা তার জোব্বার ভিতর থেকে একটা ধূসর রঙের তাবিজ জাতীয় কিছু বের করল। তারপর আমাকে বলল, আপনের ডান হাতটা দেন।
আমি ডান হাতটা বাড়িয়ে দিলাম। লোকটা আমার হাতটা শক্ত করে ধরে হাতের বৃদ্ধ আংগুলে তাবিজটা জড়িয়ে দিলো। তারপর একটা শিশি থেকে এক ফোটা সরিষার তেল জাতীয় কিছু আমার আঙ্গুলের নখের উপর ঢাললো।
কি দেখবার চান বলেন?
আমি অবজ্ঞার হাসি দিলাম, দেখতে চাই আমার মা এখন কি করছে।
আপনার নখের দিকে তাকান।
আমি হাতের বৃদ্ধ আঙ্গুলের নখের দিকে তাকালাম। তেলতেলে নখের ভিতর হটাৎ দেখি আমার বাসার ছবি, মাকে দেখলাম রান্নাঘরে, আচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বিড়বিড় করছে, ‘বেকুবটা নতুন বউ নিয়ে ঘুরতে গেছে মেয়েটার কি অযত্ন হয় কে জানে!’
আমি কিছুটা হতভম্ব হয়ে নীরার দিকে তাকালাম, নীরা ঝুকে এসে জিজ্ঞেস করল, কি দেখলে?
আমি বললাম, কিছু না, ব্যাটা আমাকে হিপনাটাইজ করার চেস্টা করছে। উঁচু দরের ফ্রড মনে হচ্ছে।
লোকটা হাসলো। আর কি দেখবার চান?
নীরার বাবা কি করছে দেখতে চাই।
আমি হাতের নখের দিকে তাকালাম। তেলতলে নখে ভেসে উঠল নীরার বাবার মুখ। বাসার বারান্দায় চিন্তিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। পকেট থেকে ফোন বের করে আনমনে বললেন, নীরার খবর নাই দুই দিন হলো , বাগেরহাটে গিয়ে কি করছে মেয়েটা দেখি ফোন দিয়ে। দেখলাম উনি ফোন ডায়াল করছেন।
এই সময় নীরার ফোন বেজে উঠল। নীরা বলল, বাবা ফোন করেছে।
আমি বিস্ময় চেপে রাখলাম। লোকটাকে দেখলাম মিটিমিটি হাসছে। সে কোন ধরনের মাইন্ড গেম খেলছে আমার সাথে। হিপনাটাইজ ধরনের কিছু বিষয় রপ্ত করে এইসব ফ্রডেরা তারপর সেটা দিয়ে মোক্ষম চাল চালে । আমি নিশ্চিত সেটাই সে করছে আমার সাথে।
আমার জেদ চেপে গেলো। বললাম নীরার ভাই রানা কি করছে দেখান পারলে।
আমার নখে ভেসে উঠল। রানা নীরাদের বাসার বাগানে পানি ঢালছে। স্পষ্ট ছবি পানির তোড়ে বাগানের গোলাপ গাছটা কাঁপছে তির তির করে।
এইবার আমি হাসলাম। রানা কানাডায় থাকে। নীরাদের বাসায় গাছে পানি ঢালার কথা না। তারমানে ভন্ডটা আমাকে হিপনটাইজ করে আমার মনের পরিচিত জগতই দেখাচ্ছে অর্থাৎ আমি যা দেখিনি আমার স্মৃতিতে যেটা নেই সেটা দেখানোর ক্ষমতা তার নাই। ট্রিক্স আর কাকে বলে।
আমি ঠাট্টা করে বললাম, ভবিষ্যত দেখাবেন না বাবাজী?
লোকটা গম্ভীর গলায় বলল, না শুধু বর্তমান দেখতে পারবেন, এখন কোথায় কি হচ্ছে সেটা।
এই সময় নীরা ফোন রেখে বলল, ‘এই শোনো দারুন খবর আছে, বাবা বলল রানা কানাডা থেকে ঢাকায় আসছে, সে এখন বাসায়। দারুন সারপ্রাইজড করেছে সবাইকে, কোন খবরই দেয় নি আসার।‘
সে একটু থেমে বললো, আচ্ছা তুমি কি কিছু দেখলে নখের ভিতর?
আমি বিস্ময় গোপন করে বললাম, নাহ। আমাকে হিপনাটাইজ করার চেস্টা করছে লোকটা। পুরা বুজরুকি আর কি!
লোকটা আমার হাত থেকে তাবিজ সরিয়ে নিয়ে বলল, যা দেখতে চাইছেন দেখছেন, এখন আমাকে আমার পাওনা দেবেন।
নীরার সামনে লোকটার কথা মেনে নেয়া মানে নীরার উদ্ভট চিন্তা ভাবনা প্রশ্রয় দেয়া। কাজেই আমি লোকটাকে দূর দূর করে তাড়ালাম।
আরে ভন্ডামির আর জায়গা পান না? সস্তা দরের হিপনোটাইজের কিছু খেলা দেখিয়ে এখন বলতেছেন সব দেখাইছেন। ভাগেন মিয়া। ভন্ডামি ছেড়ে সৎ পথে ইনকাম করেন নইলে কখন ধোলাই খেয়ে মরতে হবে। সব পাবলিক কিন্তু বোকা না।
লোকটা অদ্ভুত ভাবে বলল, আপনি বড় উদ্ধত মানুষ,শিক্ষা হওয়া দরকার, বলেছিলেন যা চাইব তা-ই দিবেন। তাই আমি আপনার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটাকে নিয়ে গেলাম।
বলে লোকটা তার হাতের কাপড় দিয়ে আমার মুখে ঝাপটা দিলো। আমি রাগে চিৎকার করে উঠলাম। তেড়ে গেলাম লোকটার দিকে। তাকিয়ে দেখি লোকটা নেই, কেটে পড়েছে। আমি নীরার দিকে ঘুরে বললাম, দেখছো নীরা কি রকম ভন্ড এরা?
কিন্তু কোথায় নীরা? আমি আম গাছের চারপাশে ঘুরে আসলাম, কোথাও নীরা নাই। আমি যে গাছটার নীচে দাঁড়িয়ে আছি সেটার চারপাশে তিনশ গজের মধ্যে কিছুই নেই, পুরো ফাঁকা। এই ঝকঝকে রোদের দুপুরে চোখের সামনে থেকে ভোজবাজির মতো হাওয়া গেছে লোকটা। কিন্তু নীরা ? তার কি হলো? কোথায় গেলো আমার বউ?
চলবে.......
লেখক :
খোন্দকার মেহেদী হাসান
