![]() |
Bangla Golpo |
আমার নতুন বউ নীরা হারিয়ে যাওয়ার পর আমি দিশেহারার মতো হয়ে গেলাম। খানজাহান আলীর মাজারের এপাশ ওপাশ কয়েকবার দৌড়ে নীরাকে খুঁজলাম। জোরে জোরে ডাকলাম, নীরা নীরা ।
মাজারের প্রচন্ড ভীড়ে আমার ডাক হারিয়ে গেলো। কেউ সারা দিলো না। ভয়ংকর ধরনের ফকিরটাকেও দেখলাম না কোথাও।
যেখান থেকে নীরা হারিয়ে গিয়েছিলো আমি সেখানে ক্লান্ত বিধ্বস্ত হয়ে বসে পড়লাম। বাসায় জানালে তুলকালাম হয়ে যাবে। নীরাকে তার বাবা অতিরিক্ত স্নেহ করেন, ভীষন শকে তার কোন ক্ষতি হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক না।
আমি পুলিশকে ফোন দিলাম। কিন্তু মুস্কিল হলো পুলিশ নীরার হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা শুনে আমার দিকে সন্দেহের চোখে তাকাতে লাগলো। তাদের দোষ নেই, এই রকমভাবে হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা শুনলে যে কেউ অবিশ্বাস করবে। কিন্তু আমি আর কি বলতে পারি?
পরের কয়েকটা দিন আমার কাটলো ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের মতো। নীরার ফ্যামিলি প্রচন্ড প্রভাবশালী, পুলিশ আর প্রশাসনে নীরার আত্মীয়স্বজন ভরা। তাদের চাপাচাপিতে পুলিশ খানজাহান আলী মাজার আর তার আশেপাশের এলাকা চষে ফেলল। বিরাট দীঘিতে জাল ফেলা হলো। হাজার হাজার মানুষ ভীড় করে দেখতে লাগলো। কিন্তু কিছুই পাওয়া গেলো না।
পত্রিকার পাতাগুলো মুখরোচক খবর বের করতে শুরু করল।
'বিয়ের তিনমাসের মাথায় স্ত্রী নিখোঁজ, স্বামীর দিকে সন্দেহের তীর।'
'রিটায়ার্ড জাজের সুন্দরী মেয়ে গুম, তার বর গোয়েন্দা নজরে। '
খুলনার এক স্থানীয় পত্রিকা লিখলো, বেড়াতে নিয়ে এসে স্ত্রীকে গুমের সন্দেহ, কুমিরের পেটে লাশ?
নীরার বাবা মা আমাকে কিছু না বললেও তার কাজিনরা আমাকে সন্দেহ করতে লাগলো। পুলিশ নীরার ফোন ট্রাক করার চেস্টা করল। ফোন বন্ধ। লাস্ট লোকেশন খানজাহান আলী মাজার।
সবচেয়ে বিধ্বস্ত হয়ে গেলো আমার মা। এইরকম একটা পারিবারিক বিপর্যয় নিতে না পেরে মা অসুস্থ হয়ে পড়ল। আমি অসহায় বোধ করতে লাগলাম। মা একদিন আমাকে ডেকে বললেন, ইমন তুই আমাকে ছুঁয়ে বল, বৌমাকে কি করেছিস?
আমি মায়ের কথায় কেঁদে ফেললাম, আমি সত্যিই জানি না মা ।
মে মাসের পাঁচ তারিখে নীরা নিখোঁজ হয়েছে, এর তিনদিন পরও পুলিশ কোন রকম কোন ক্লু খুঁজে পেলো না। নীরার প্রভাবশালী আত্মীয়স্বজনের অব্যহত চাপে তাদেরও মাথা খারাপ অবস্থা। চারদিনের মাথায় পুলিশ আমাকে কেসের এক নম্বর সন্দেহজনক দেখিয়ে গ্রেফতার করে রিমান্ড চাইল।
কোর্টে দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়ে গেলো। রিমান্ড সম্পর্কে আমার ভীতি ছিলো কিন্তু নীরার এই অবিশ্বাস্য হারিয়ে যাওয়া আমাকে এতোই বিমূঢ় করে রেখেছে আর কোন কিছুই স্পর্শ করছিলো না। তাই রিমান্ডের প্রথম দিন দশাসই পুলিশ অফিসার যখন স্ত্রীকে খুন কবুল করে লাশ কোথায় লুকিয়েছি সেটা দেখিয়ে দেয়ার জন্য অব্যাহত হুমকি ধামকি দিচ্ছিলো সেটা আমার গাঁয়ে লাগছিলো না। লোকটা শেষে একটা প্রচন্ড চড় কষালেন, আমি চেয়ার শুদ্ধ ছিটকে পড়লাম।
পড়ে গিয়ে আমার হাত কেটে গেলো। ওই রাতে শরীরে প্রচন্ড ব্যাথা নিয়ে ঘুমিয়েছি সেই ফকিরকে স্বপ্নে দেখলাম, মাজারের আমগাছটার বাঁধানো গোড়ায় বসে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে ব্যাটা। ক্রোধ আর আতংকে আমার ঘুম ভেংগে গেলো বারবার।
দুইদিন পর হতাশ হয়ে পুলিশ আমাকে জামিনে ছেড়ে দিলো।
বের হয়ে আমি ঠিক করলাম, নীরাকে খুঁজে না পেয়ে বাসায় আর ফিরব না। হাতের কেটে যাওয়া জায়গায় ব্যান্ডেজ নিয়ে আমি খুলনা জেলা তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু কোথাও নীরা নেই। মাজারে গেলাম কয়েকবার , বহু লোককে ফকিরের বর্ননা দিলাম, কেউ তাকে চিনতে পারল না।
তীব্র মানসিক চাপে আমি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যাচ্ছি। নীরার কথা ভাবি সারাক্ষণ। সেই কাজিনের বিয়েতে প্রথম পরিচয়ের পর একদিন ইউনিভার্সিটিতে আমার ডিপার্টমেন্টের সামনে নীরার সাথে দেখা হয়ে গেলো।
সে খুব স্বাভাবিক ভাবে বলল, ইমন ভাই আমাকে হেল্প করেন, ভর্তি হবো ফিন্যান্সে।
এরপর নোট নেয়ার বিভিন্ন অজুহাতে নীরার ঘনিষ্ঠ হবার চেস্টা আর জটিলতা এড়াতে আমার সরে যাওয়ার চেস্টার গল্প। আমার মাস্টার্স শেষ হওয়ার পর একদিন মা এসে অবাক হয়ে বলল, ইমন তুই নীরা নামে কাউকে চিনিস? তাদের বাসা থেকে তোর জন্য বিয়ের প্রস্তাব এসেছে।
অথচ এখন এই কয়েকদিনের অবিশ্বাস্য মানসিক চাপে নীরার স্মৃতি গুলো অনেক দূরের মনে হয়। মনে হয় নীরা নামক অপ্সরা কখনও ছিলো না আমার জীবনে, সব কিছু কোনও দূরের স্বপ্ন। মাজারের বিশাল দীঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে মনে হয় ঝাপ দিয়ে দেই। দীঘির কুমির ছিঁড়ে খাক সবকিছু। যন্ত্রনা মিটুক আমার।
একদিন রাতে বাগেরহাট শহরের চৌরংগী মোড়ে বসে আছি। রাত বেশ গভীর হয়েছে। রাস্তাঘাট ফাঁকা। ভাবছি একটা দোকানের সামনের বারান্দায় শুয়ে রাতটা কাটিয়ে দেবো। অনেক ফকির শুয়ে থাকে এইভাবে। রাত বারোটার ঘন্টা বাজলো কোন দোকানের ঘড়িতে, মে মাসের তেরো তারিখ হয়ে গেলো, এক সপ্তাহ চলে গেলো নীরাকে হারিয়ে ফেলেছি। এই সময় আবছা আলোয় একটা লোককে হেঁটে আসতে দেখলাম। শুনশান রাতে লোকটার হাঁটার শব্দ শোনা যাচ্ছে। আমি আনমনা হয়ে ছিলাম। লোকটা আমার কাছে এসে থামলো।
কি সাহেব কেমন আছেন?
আমি গলা শুনে লাফিয়ে উঠলাম। সেই ফকির । আমি দৌড়ে গেলাম, ব্যাটাকে এখনই চেপে ধরতে হবে, আগে আমি ধোলাই দেবো তারপর পুলিশে দিতে হবে।
উহু, দাঁড়ান। আস্তে। আপনার শিক্ষা এখনো পুরাপুরি হয়নি দেখছি।
আমি থমকে গেলাম। লোকটার ঠান্ডা গলায় কটাক্ষ, এই নিঃশব্দ রাতে অদ্ভুত শোনাল।
আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম। কি করব বুঝতে পারছি না। ধরার চেস্টা করলে লোকটাকে ধরা যাবে কিনা সন্দেহ।
লোকটা আমার কাছে এসে আমাকে ভালো করে দেখে বলল, নাহ! ভালোই শিক্ষা হয়েছে মনে হচ্ছে। আর কোনদিন অবিশ্বাস হবে?
আমি যন্ত্রের মতো মাথা নাড়লাম।
লোকটা তখন হাসলো। গভীর রাতের নিস্তদ্ধতা ভেংগে গেলো তার উঁচু গলার হাসিতে। তারপর লোকটা তার হাতের কাপড় দিয়ে আমার মুখে বাড়ি দিলো। আমি চোখ বন্ধ করে ছিটকে সরে গেলাম।
চোখ খুলে অবাক হয়ে গেলাম। আমি দাঁড়িয়ে আছি প্রচন্ড রোদের দুপুরে সেই আম গাছটার নীচে, সামনে ফকিরটা দাঁড়িয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।
-- যা সবকিছু ফিরিয়ে দিলাম।
বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে দেখি নীরা দাঁড়িয়ে আছে, উদ্বিগ্ন মুখে জিজ্ঞেস করছে, কি হলো তোমার ইমন, হাতের নখে কিছু দেখলে?
আমি ছুটে গেলাম, নীরা... কোথায় গিয়েছিলে?
নীরা ভীষন অবাক হলো, কোথায় গিয়েছিলাম মানে? আমি তো এইখানেই ছিলাম। তুমি ফকির লোকটার সাথে তর্ক করছিলে। বলছ লোকটা নাকি ভন্ড। তোমাকে হিপনটাইজ করার চেস্টা করছে।
নীরা ঘুরে বলল, আরে ফকির লোকটা কোথায় গেলো?
আমি তাকিয়ে দেখি ফকির লোকটা নেই, আশেপাশে অনেক দূর পর্যন্ত ফাঁকা, কেউ নেই।
আমি বললাম, নীরা আজ কতো তারিখ?
--মে মাসের পাঁচ তারিখ আজ। কেনো?
আমি বিস্ময় চেপে বললাম, নাহ কিছু না। ঘোর লেগে গিয়েছিলো বোধহয়, দুঃস্বপ্ন।
--কি বলো এই দিনে দুপুরে তোমার দুঃস্বপ্ন কি ? আরে তোমার হাতে ব্যান্ডেজ করা কেনো? কি আশ্চর্য হাত কাটলো কখন? ব্যান্ডেজই বা করলে কখন?
আমি হাতের ব্যান্ডেজের দিকে তাকালাম। এখনো ব্যাথা করছে। সবকিছুই তাহলে শুধু দুঃস্বপ্ন না!
আমি নীরার হাত শক্ত করে চেপে ধরলাম। 'নীরা তুমি কি জানো, তুমি হারিয়ে গেলে আমি পাগল হয়ে যাবো। '
নীরা তার গালে টোল ফেলে হাসলো, কি আশ্চর্য! আমি হারাবো কেনো? গরমে তোমার মাথা নষ্ট হয়ে গেছে। চল ডাব খাই, মাথা ঠান্ডা হবে।
আমি কিছু বললাম না, শক্ত করে নীরার হাত ধরে রাখলাম।
( সমাপ্ত )
লেখক:
খোন্দকার মেহেদী হাসান
