![]() |
Bangla Short Story |
কী হয়েছে তোর? চোখ-মুখ ঘোলা হয়ে আসছে কেন?
আমি মাথা নিচু করে রাখি। কী বলবো বুঝতে পারি না। চোখে মুখে একরাশ লজ্জা।
আমার নিচু মাথা দেখে মা আমাকে বলল, আজ প্রায় একমাস হয় তুই অসুস্থ। ফকিরের ঝাড় ফুঁক থেকে ডাক্তারের রক্ত পরীক্ষা কোনটি করে দেখাই বাদ নেই। তোর চোখ ফ্যাকাশে-হলুদ দেখে ভেবেছিলাম জন্ডিস হলো নাকি, কিন্তু ডাক্তারী রিপোর্ট তো বলছে জন্ডিস হয়নি। একথা বলার পরই মা একটা হোমিওপ্যাথির খালি জার আমার হাতে দিয়ে বলল,
এক কাজ কর, টয়লেটে গিয়ে এটা ভরে ইউরিন নিয়ে আয়। আমি পাশের ডাক্তারের ডিসপেনসারিতে নিয়ে কাঠি পরীক্ষা করাতে নিয়ে যাচ্ছি। লক্ষণ দেখে কেন যেন মনে হচ্ছে তোর বাবু হবে।
আমি ভীষণ লজ্জায় লাল হয়ে গেছি ততক্ষণে। আসলকথা হচ্ছে গতদিন থেকে খাবার দেখলেই কেমন যেন অস্বস্তি বোধ হওয়ার পর থেকেই মনটা খচমচ করছিল। এরপর থেকে মায়ের পাশে অনেকবার ঘুরঘুর করেছি বিষয়টি বলতে কিন্তু কিছুতেই বলতে পারিনি। সময়টা ছিল ২০১২ সাল। তখনও নেট দুনিয়ার সাথে আমার পরিচয় ঘটেনি। আর আমি ছোটবেলা থেকেই অন্তঃব্যক্তিক ঘরানার কিছুটা বোকা আর ভীষণ লাজুক একটা মেয়ে। এসব ব্যাপার বান্ধবী বা ভাবীদের সাথে শেয়ার করাটাও অকল্পনীয় ছিল আমার কাছে। এমনকি হাজব্যান্ডের কাছে ফোনে একথা কীভাবে বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। কী যে এক সমস্যায় পড়েছিলাম সে সময়টায়! এদিকে অসুস্থতার মাত্রা দিনদিন বেড়েই যাচ্ছিল। চুপিচুপি হাসপাতালে গিয়ে চেক করাবো তাও সম্ভব ছিল না। ভাবটা এমন যেন ফরিদপুরের সবক'টি হাসপাতাল আমার চেনা আত্মীয়। গিয়ে কী বলবো এটা ভাবতেই লজ্জায় কুটি কুটি হয়ে যাচ্ছিলাম। প্রথমবার প্রেগন্যান্ট হওয়ার এসব বোকা বোকা অনুভূতির কথা মনে পড়তে এখন ভীষণ হাসিই পায়।
ছোটবেলা থেকেই আমার যেকোন কাজ বা সমস্যার একমাত্র সঙ্গী ছিল আমার মা। এই যেমন ক্লাস নাইনে আমাদের স্কুলেরই একটা ছেলে আমাকে একটা ঈদ কার্ড দিয়ে বলেছিল,
--ইদ কার্ডটা তোর জন্য কিনেছি। তোদের বাড়ির সবাইকে আমাদের বাড়িতে ঈদের দাওয়াত দেওয়ার জন্য।
আমি খুশি মনে ঈদকার্ডটা এনে মায়ের হাতে দিয়ে বলেছিলাম, ও মা দেখো না একটা ছেলে তোমাদের সবাইকে ঈদের দাওয়াত দিয়েছে। বলতে বলতেই আঠা দিয়ে লাগানো কার্ডের মুখটি ধরে টান দিচ্ছিলাম। সাথে সাথে ঠাস করে একটা কাগজ পড়েছিল নিচে। ভাজ করা কাগজটির উপরের দুটো লাইন দেখেই আমি কাঁপতে শুরু করেছিলাম। তুমি আমার ভালবাসা টাইপ ছন্দ মেলানো লাইন লেখা।
আমাকে কাঁপতে দেখে মা বলেছিল,
-- কাঁপছিস কেন? আর কখনও কোন ছেলে কিছু দিলে ধরবি না। চিঠিটা উঠিয়ে আমার হাতে দে, দেখি কে ছেলেটা...
অন্য যেকোন ব্যাপার মায়ের কাছে বলতে পারলেও আমার বাবু হবে কি না এটা কীভাবে পরীক্ষা করবো এ কথাটি বলা একদম অসম্ভবই মনে হয়েছিল আমার পক্ষে। কিন্তু আমার লজ্জামুখ দেখেই মা বিষয়টি বুঝে ফেলেছিল। মায়েরা বুঝি এমনই হয়, সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়েই এক ঝঁটকায় মনটাকে পড়ে ফেলতে পারে।
প্রেগন্যান্সি পরীক্ষার ফলাফল পজেটিভ, মা কয়েকমিনিটের মধ্যেই এ সংবাদ নিয়ে হাজির। তারপর থেকে আমার দেখাশোনা-খাওয়াদাওয়া এসব নিয়ে মায়ের ঝামেলার অন্ত ছিল না। প্রেগন্যান্সি পিরিয়ডে ভীষণ অসুস্থতা ঘিরে ধরেছিল আমাকে। একেতো খাবার খেতে গেলেই গড়গড় করে বমি হয়ে সব বের হয়ে যেত, তারপর আবার কোমড় থেকে বাম পায়ের উপরের অংশ পুরো অবস। কিছুসময় বসেও থাকতে পারতাম না আবার দাঁড়িয়ে থাকতেও পারতাম না, অবস অংশে ভীষণ জ্বালাপোড়া শুরু হত, হঠাৎ হঠাৎ সেন্সলেস হয়ে পড়ে যেতাম তখন তিন চার মিনিট আমার কোন জ্ঞানই থাকত না। শেষ দিকে শুরু হয়েছিল মাত্রাতিরিক্ত চুলকানি। সারারাত জেগে জেগে চুলকাতে হতো সারা শরীর। কোন ঔষধেই কোন কাজই হচ্ছিল না। সে সময়টায় মা পাশে না থাকলে হয়তো আমি এতদিন বেঁচেও থাকতে পারতাম না। মধ্যরাতে ঘুমের মধ্যে যখন কারেন্ট চলে যেত তখন ঘুমের ঘোরেও বুঝতে পারতাম কেউ এসে আমাকে হাত পাখা দিয়ে বাতাস দিচ্ছে।
মায়ের কাছে থাকা সময়টা চোখের কোণে জল এনে দিত শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার পর। দেখা যেত কিছুই খেতে পারছি না সেখানে গিয়ে। কিন্তু মায়ের মত বারবার কেউ জিজ্ঞেস করতে আসতো না,
--কী খাবি, আম রান্না করে দিবো? ছোট মাছের চচ্চড়ি করে দেই? বেগুন-আলুর সবজি রান্না করে দিব এক পিঠ লাল করে?
বারবার এমন করে খাওয়ার কথা বলতে আসলেই বরং একটা ঝাড়ি দিয়ে দিতাম মাকে। তবে ঝাড়ি খেয়েও মানুষটা মন খারাপ করতো না, বরং আমাকে বমি করতে দেখলেই দৌঁড়ে এসে কপাল ধরতো।
আর শ্বশুরবাড়িতে আমার অসুস্থতা দেখলেই উল্টো চিত্র দেখতে পেতাম। শ্বাশুড়ি বলতেন, এত নরম হলে চলবে কীভাবে- মা হতে হলে শক্ত হতে হয়। দেখা যেত ওখানে গিয়ে একা একা ডাক্তার দেখিয়ে ঔষধ কিনতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েছি। ঔষধের দোকান হতে আমাকে বাসায় পৌঁছে দিতে আসতো। এটা দেখে উল্টো চোখে টিপ্পনি কাটতে দেখতাম শ্বাশুড়িকে। আমি সেই সময়টায় একটি দাঁড়িপাল্লায় মা আর শ্বাশুড়িকে কল্পনায় দাঁড় করাতাম। আর বাথরুমের ট্যাপ ছেড়ে টপাটপ চোখের পানি ফেলতাম।
মা যে কতবড় বটবৃক্ষ তা সবচেয়ে বেশি উপলদ্ধিতে আসে প্রেগন্যান্সি থেকে এর পরবর্তী সময়টাতে। বাবুর জন্ম হওয়ার পরেও এই চিত্র আরো প্রবল হয়ে ধরা পড়েছিল। সেই হাসপাতাল থেকে শুরু করে পরবর্তী তিনটে বছর আমার আফিফের ছায়াসঙ্গী ছিল আমার মা। বাবুর জন্মের পর প্রথম তিনমাসও আমি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছি, কারণ ঐ তিনমাস মা আমার সাথে ঘুমাতো। মা বাবুকে কোলে করে রাতভর জেগে বসে থাকত। কেবল ব্রেস্টফিডিং এর সময়টাতে আমাকে ডেকে তুলত। বাবুর যখন দুইমাস বয়স তখন আবার আরেক ঝামেলার উদ্ভব। আমার মাস্টার্সের টেস্ট পরীক্ষার ডেট দিয়ে বসে হঠাৎ। তখন পর্যন্ত একটা অঙ্কও করা হয়নি আমার। টেস্ট পরীক্ষার পর থেকে ফাইনাল পরীক্ষার মধ্যকার তিনমাস স্যারের বাসায় পড়তে যাওয়া, এরপর মাস্টার্সে ফাস্ট ক্লাস পাওয়া সবকিছুর নেপথ্যে যে মানুষটি, সে আমার মা।
এরপরও মানুষটাকে স্বস্তি দেইনি আমি। এরমধ্যেই আবার শুরু করেছিলাম বিসিএস কোচিং, ছোট্ট বাবুকে মায়ের কাছে রেখে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষা দিতে ঢাকায় গিয়েছি শতবার। আমার পড়া বা চাকরির কোন ব্যাপারে মায়ের মুখে কখনও না শুনিনি। বরং সেই আমাকে আরো উসকে দিত এ ব্যাপারে। আমার জন্য বা আমার ছেলের জন্য আমার মা যা করেছে তার একবিন্দু কষ্টও হয়তো একজন মা হয়ে আমি আজো করে উঠতে পারিনি।
মা আছে বলেই জীবন আজো এত সুন্দর। তবে ঘুমের ঘোরে এখনও মাঝেমাঝেই কেঁদে উঠি মায়ের সেই ভয়ানক অসুখের দুঃস্বপ্নগুলো দেখে। আমার এইচ.এস.সি পরীক্ষার পরই আমার মায়ের শরীরে দেখা দেয় এক টিউমার। সেই টিউমারটিতেই ধরা পড়েছিল প্রথম পর্যায়ের ক্যান্সার। কান্নাকাটি আর আহাজারিতে শোকের মাতম লেগে গেছিল আমাদের সংসারে। সেই সময়টায় অপারেশন, কেমোথেরাপিসহ ডাক্তারি ঝামেলায় প্রায় এক বছর ঢাকা থাকতে হয়েছিল মাকে। ছোট ভাই, বোন, আব্বা, সংসার সব মিলিয়ে মা হীন একটা বছর যে কীভাবে কাটিয়েছিলাম সেটা কেবল আমিই জানি। সেই এক বছরে আমার বয়স দশবছর বেড়ে গিয়েছিল। ভাবি আল্লাহ্ যদি মাকে সুস্থ করে না দিত, তবে কতটা দূর্বিসহ জীবনের বাসিন্দা হয়ে বেঁচে থাকতে হতো আমাকে। আজও শত কষ্টের মধ্যে মায়ের কাছে যেতে পারলেই স্বর্গের সুখ মেলে। এক জীবনে এর চেয়ে নিশ্চিন্ত জীবন বুঝি আর হয় না।
গতমাসে মায়ের অপারেশনের জায়গাটির পাশে হঠাৎ করেই লাল হয়ে কয়েকটি গুঁটি দেখা দেয়। রাতে ফোনে সেকথা শোনার পর থেকে সারা রাত শুধুই কেঁদেছিলাম। পরদিন মাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে ডাক্তার মায়ের সারা শরীর চেকআপ করাতে দেয়। মাসের শেষ ছিল বলে হাতে তখন টাকা ছিল না তেমন। কিন্তু মনে হচ্ছিল মা না থাকলে পার্সভর্তি টাকা দেখলেও হয়তো শান্তি মিলবে না। বরং টাকার দিয়ে তাকিয়ে আজীবন কাঁদতে হবে। আব্বাকে জানাইনি টাকার কথা কারণ আমার কেবলই মনে হয়েছে এটা আমার বা আমাদেরই দায়িত্ব। বড় সন্তান হয়ে মায়ের এতটুকু কাজে আসতেই যদি না পারি তবে কেন আমি-আমরা এত কষ্টে সন্তান লালন-পালন করছি? তখনই আধাঘন্টা সময় নিয়ে ব্যাংকে গিয়ে ফিক্সড ভেঙেছি। নিজের মনকে তখন একটা কথাই জিজ্ঞেস করেছি বারবার,
--টাকায় কি সুখ পাওয়া যায়, না শান্তি?
আল্লাহ্ রহমতে মায়ের সবগুলো রিপোর্টই ভালো এসেছে, এলার্জিজনিত কারণে শরীরে ওঠা গুঁটি গুলোও কয়েকদিনের মধ্যেই মিলিয়ে গেছে।
এদিকে ছোটবেলায় নানুর কাছে বড় হয়েছে বলেই হয়তো নানুর কিছু হয়েছে শুনলে আমার ছেলের চোখও টলমল করে। তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ তার নানু। আজ বাবু তার জীবনের দ্বিতীয় রোজা রেখেছে। বাবুর দিকে তাকিয়ে মা বলছে, কী রে আমার ছোট্ট নানাভাইটা দেখতে দেখতে এতটাই বড় হয়ে গেল নাকি?
আমার ছেলে হঠাৎ বলে উঠল, আরো বড় হবো কবে নানু? আমি চাকরি করে তোমাকে কাপড় কিনে দিবো! নানী-নাতির কথা আমি দূরে দাঁড়িয়ে শুনছিলাম।
ছেলের কথা শুনে মা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলছিল,
--ততদিন তোর নানু বেঁচে থাকবে নাকি রে নানা ভাই?
এ কথা শোনামাত্রই ছেলে, নানুর কোলের মধ্যে গিয়ে দুইহাত দিয়ে তার মুখ চেপে ধরে রেখেছে.....
( সমাপ্ত )
লেখা: মিনা শারমিন
