> প্রিয় অসুখ পর্ব ১৯, ২০, ২১ এবং শেষ পর্ব | Bangla Story | বাংলা নতুন গল্প | Bangla New Story
-->

প্রিয় অসুখ পর্ব ১৯, ২০, ২১ এবং শেষ পর্ব | Bangla Story | বাংলা নতুন গল্প | Bangla New Story

প্রিয় অসুখ,
তোমার চিঠি পড়ে কতক্ষণ কেঁদেছি জানিনা। হঠাৎ আয়নায় চোখ পড়তেই দেখি চোখ দুটো ফুলে লাল হয়ে আছে। তখনই বুঝে গেছি তোমার চিঠিটা আমার অন্তরাত্নায় এ কোন নব্যপ্রেমের শিহরণ জাগিয়ে দিয়েছে। পেয়েও না পাওয়া একটা অনুভূতি আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। যার অপেক্ষায় এতগুলো বছর ধরে আছি, যে ডায়েরি হারিয়ে পাগলের মত হয়ে গেছি, তাকে দুচোখ ভরে দেখার বাসনা কিছুতেই কমছে না। কিন্তু আমি যে এখন একদমই দেখা করতে পারবো না। ভয় হচ্ছে, মুখে বসন্তের দাগে বিশ্রী চেহারা হয়ে গেছে আমার। পুরো মুখে কালো কালো গুটি। এই দাগ নিয়ে তোমার সামনে গেলে তোমার রাগ হবে। তারচেয়ে আমরা বরং চিঠিতেই কথা বলি। জানো, তোমাকে আমার একটুও অপরিচিত লাগছে না। কারণ এ যাবত অন্তত দুশো'র বেশি চিঠি আমি তোমাকে লিখেছি। তুমি আমার হাজার বছরের সবচেয়ে চেনা, সবচেয়ে আপন মানুষটা। আমার অস্তিত্বের সাথে মিশে গিয়েছো যে তুমি চরিত্রটা। আচ্ছা, কেমন আছো বলো? খাওয়াদাওয়া নিশ্চয়ই ঠিকমতো করছো না। গত রাতে স্বপ্নে দেখলাম একটা মেয়েকে কাছে টেনে নিয়ে গভীরভাবে তার চোখের দিকে তাকিয়ে আছো। স্বপ্নেই আমি রেগে তোমাকে মারতে গিয়েছিলাম। অমনি ঘুমটা ভেঙে গেলো। কি অদ্ভুত স্বপ্ন! তুমি কি সত্যিই এসব করে বেড়াচ্ছো? একদম এরকম করবে না বলে দিচ্ছি। তোমাকে, না না তোমাকে না। ওই মেয়েটাকেই একেবারে খুন করে দিবো। তুমি শুধু আমার এটা মনে থাকে যেন। তোমার মুখের মিষ্টি সুবাসটাকে ভীষণ মিস করছি। আমার আর তর সইছে না। এত বছরের স্বপ্নকে কাছে পেয়েও কাছে পাচ্ছি না। এরচেয়ে দুঃখের বোধহয় আর কিচ্ছু হয় না। শীতুল, আমি তোমাকে অসম্ভব পরিমাণে ভালোবাসি। তুমি আমার ডায়েরিতে যতটা না ভালোবাসা পেয়েছো, তারচেয়েও হাজারগুণে বেশি ভালোবাসি। কিন্তু আমি এখন তোমার সামনে যেতে পারবো না যে। আমরা বরং কয়েকদিন চিঠি চিঠি খেলি। তারপর দুম করেই একদিন এসে আমাকে তোমার বক্ষপিঞ্জরে আবদ্ধ করে ফেলো। 

তোমার শ্যামলতা

চিঠি পড়ে অনেক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো শীতুল। শরীরের সমস্ত লোম দাঁড়িয়ে গেছে। এখনো স্বপ্নের মত লাগছে চিঠিটা। উঠে দাঁড়ানোর মত শক্তি পাচ্ছে না। এমন সময় শ্রবণা কথা বলতে বলতে রুমে প্রবেশ করলো। শীতুলকে ঝিম মেরে বসে থাকতে দেখে বললো, 'কি হয়েছে আপনার?'

শীতুল শ্রবণার দিকে চিঠিটা এগিয়ে দিলো। শ্রবণা অবাক হয়ে বললো, 'ও মাই গড! এই মেয়ে কিভাবে আপনাকে চিঠি পাঠালো!'

পুরো চিঠিটা পড়ে মন খারাপের ভান করে বললো, 'আপনি আর কখনো আমার কাছাকাছি আসবেন না। নয়তো কখন আবার এই মেয়ে এসে আমাকে খুন করে ফেলে। আমি আপনার কাছে কোনো করুণা ভিক্ষা চাইনি।'

শীতুলের কোনো ভাবান্তর নেই। ও এখনো ঝিম মেরে বসে আছে। শ্রবণা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে স্বাভাবিক গলায় বললো, ‘ যাইহোক, দুজনের মনের টান দেখে আমি না অবাক। জাস্ট অব্বাক! আপনি একটা মেয়ের কাছাকাছি এসেছেন সে সেটাও বুঝে গেছে? কি ফিলিংস মাইরি। এই প্রেম তো রোমিও জুলিয়েটকেও হার মানাবে।'

শীতুল তবুও স্তব্ধ। কথা বলতে ইচ্ছে করছে না কিংবা শ্রবণার কথাগুলো ওর হৃদয়ে পৌঁছায়নি। ও শুধু অবাক হয়ে শ্যামলতার কথাই ভেবে চলেছে। শ্রবণা এগিয়ে এসে শীতুলের সামনে বসে পড়লো। মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, ' এই যে জনাব, কি হলো টা কি?'

শীতুল বাস্তবে ফিরে এসে বললো, 'কই কিছু না তো।'
- 'কোথায় হারিয়ে গেছেন শুনি?'

শীতুলের তবুও কোনো সাড়া নেই। শ্রবণা আর কোনো প্রশ্ন করলো না। মনোযোগ দিয়ে আবারও চিঠিটা পড়তে লাগলো। এদিকে শীতুল অবাক হয়ে একটা বিষয়ই ভাবছে, পার্সেলে প্রেরকের কোনো ঠিকানা দেয়া নেই। একটা ছোট ছেলে এসে বললো পার্সেল এসেছে। শ্যামলতা কি তাহলে এই এলাকাতেই থাকে? ভেবে ভেবে প্রশ্নের কোনো উত্তর না পেয়ে ফেসবুকে লগ ইন করলো শীতুল। মেয়েটাকে মেসেজ দিতে গিয়ে দেখলো আইডি ডিএকটিভ। মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেলো। শ্যামলতার হাতের লেখা চিঠি এটা, সেটা একেবারে নিশ্চিত। কিন্তু চিঠির উত্তর কোথায় পাঠাবে ও? এভাবে মানসিক অশান্তি নিয়ে কতক্ষণ থাকা যায়? 

শীতুলের মুখের অবস্থা দেখে শ্রবণা দুষ্টুমি করে বললো, 'কি ভাবছেন বলুন তো? আমি রাগ করেছি কিনা? না না আমি রাগ করিনি।'
- 'শ্রবণা..'
- 'হুম।'
- 'চিঠির উত্তর দিবো কোথায় আমি?'
- 'কেন? যে ঠিকানা থেকে চিঠিটা এসেছে।'
- 'ঠিকানা দেয়া নেই। একটা ছেলে এসে দিয়ে গেছে।'
- 'ও। মেয়েটা এখানকার ঠিকানা জানলো কিভাবে? '

শীতুল শ্রবণার দিকে তাকালো। শ্রবণা চোখেমুখে কৌতুহল নিয়ে তাকিয়ে আছে। শীতুল পুরো ঘটনাটা খুলে বললো শ্রবণাকে। সব শুনে শ্রবণা বললো, 'তাহলে অপেক্ষা করুন। মেয়েটা আবারও চিঠি পাঠাবে। উত্তর লিখে রাখবেন। এবার চিঠি এলে আপনার চিঠিটা ওই ছেলেকে দিয়ে দিবেন।'
- 'তুমি কিভাবে নিশ্চিত হচ্ছো ও আবার চিঠি পাঠাবে?'

শ্রবণা আমতা আমতা করে বললো, 'এটা তো স্বাভাবিক বিষয়। আপনি যেহেতু তাকে মিস করছেন তারমানে সেও আপনাকে মিস করছে। এটা তো হুমায়ূন আহমেদ স্যার বলে গেছেন। তাছাড়া শ্যামলতা যখন জেনে গেছে এটা আপনি, তখন সে এই ঠিকানায় আবার চিঠি পাঠাবে।'

শ্রবণার যুক্তি পছন্দ হলো শীতুলের। ওর মুখে হাসি ফুটে উঠলো। হাসিমুখে বললো, 'এটা ভালো বলেছো। কিন্তু আমরা তো কালই এখান থেকে ঢাকায় চলে যাবো। শ্যামলতার চিঠিটা..'

শ্রবণা একটু ভেবে বললো, 'টেনশন করবেন না। শ্যামলতা এখানে আপনাকে না পেলে আপনার আইডিতে আবার মেসেজ পাঠাবে। কথাটা মিলিয়ে নিবেন।'

এই যুক্তিটাও পছন্দ হলো শীতুলের। তাই যেন হয়। কিন্তু শ্যামলতা চিঠি পাঠিয়ে অস্থিরতা কমানোর বদলে আরো বাড়িয়ে দিলো। এখনই ওর চিঠির উত্তর দিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে শীতুলের। কি যে করবে! ভাবতে ভাবতে উত্তর লিখতে বসে গেলো। 

শ্রবণা দূরে বসে আছে আর দেখছে শীতুল কিভাবে অস্থির হয়ে চিঠি লিখছে। শীতুলের জন্য বড্ড মায়া হচ্ছে শ্রবণার। ইচ্ছে করছে এখনই শীতুলকে জানিয়ে দিতে, সে ই শ্যামলতা। কিন্তু পারছে না। এখন বললে তো শীতুল আরো রেগে যাবে, আসল মজাটাই আর থাকবে না। আরেকটু ধৈর্য ধরতে হবে। 

শ্রবণা উঠে বাইরে এলো। শীতুলের মায়ের কাছে এসে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে বললো। মা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, আমরা তো কাল চলে যাচ্ছি মা।
- 'আমি বাসায় যাবো। না জানি বাসায় কত ময়লা জমে আছে। পাতিলে তরকারি রেখে এসেছি, গিয়ে আমাকে পাতিলটা ফেলে দিতে হবে।'
- 'তোকে কে যেতে দিচ্ছে? তুই না আমার মেয়ে? আমার সাথে আমার বাসায় থাকবি তুই।'

শ্রবণা অবাক হয়ে বললো, 'কি যে বলেন। আমি অনেকদিন ছিলাম তো এখানে।'
- 'তুই আমাকে এখনো নিজের মা ভাবতে পারলি না রে।'
মায়ের মুখটা অন্ধকার হয়ে গেছে। শ্রবণা এই কথার জবাবে কি বলবে বুঝতে পারলো না। মায়ের মুখের দিকে তাকালে সত্যিই বড় মায়া লাগে। মা মায়াভরা মুখে শ্রবণার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আমাকে এখনো এত পর মনেহয় তোর?'

শ্রবণা মাকে জাপটে ধরে বললো, 'সরি মা, সরি। আর কক্ষনও কষ্ট দেবো না। আমি বুঝতে পারিনি তুমি আমাকে এত ভালোবাসো।'

মা শ্রবণাকে বুকে চেপে ধরলেন। একটা মেয়ের বড্ড অভাব ছিলো ওনার। শ্রবণাকে বুকে চেপে ধরে মেয়ের জায়গাটা পূর্ণ মনে হচ্ছে। শ্রবণা যেন আজীবন এভাবেই থাকে।

২১
রাতে আইডি একটিভ করে শীতুলকে মেসেজ দিলো শ্রবণা- 'কেমন আছেন?'

মুহুর্তেই শীতুলের রিপ্লাই। যেন মেসেজের আশাতেই চাতক পাখির মত বসে ছিলো এতক্ষণ। 
মেসেজ দেখে হাসলো শ্রবণা। শীতুল লিখেছে, 'এমন কেন তুমি! চিঠি পাঠিয়েছো তোমার ঠিকানা পাঠাওনি। আইডিটাও ডিএকটিভ। আমাকে কি পাগল করে ছাড়বা?'

শ্রবণা অনেক্ষণ মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইলো। কি যে ভালো লাগছে ওর! অনেক্ষণ পর রিপ্লাই দিলো, 'ঠিকানা দিলে যদি তুমি চলে আসো। তাই দেইনি।'

শীতুল দ্রুত লিখলো, 'পাগল নাকি তুমি? আমি একশোবার যাবো৷ শোনো,তোমার মুখে দাগ কেন, সর্বাঙ্গে ঘা থাকলেও আমি এখন তোমার কাছে ছুটে চলে যেতাম। তোমার মনটাকে ভালোবেসেছি শ্যামলতা, এ মনটা আজীবন একইরকম থাকলেই হবে। '
- 'সত্যি!'
- 'হুম সত্যি সত্যি সত্যি।'
- 'ঠিকাছে। আমি এখন তোমার কাছে আরেকটা চিঠি লিখতে বসবো। আমার খুব কান্না আসছে।'
- 'এই দাঁড়াও, আমি কাল ঢাকায় চলে যাচ্ছি।'
- 'তাহলে ঢাকার বাসার ঠিকানাটা দিন।'
- 'কিন্তু শ্যামলতা, আমি তোমাকে সামনা সামনি দেখতে চাই। এতদিন অপেক্ষা করার পর আবার চিঠির খেলা আমি নিতে পারছি না। পাগল হয়ে যাবো রে।'

শ্রবণার চোখ ভিজে আসতে শুরু করেছে। তবুও ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছে হাসি। এ লিখলো, 'তাহলে তো আরেকটু পাগল করার জন্য চিঠির খেলাটা আমাকে খেলতেই হবে। আর আমাদের ফেসবুকে কথা হবে না। আজ থেকে আইডিতে আসবো না। এখন থেকে শুধুই চিঠি। আগেকার দিনের প্রেমিক প্রেমিকাদের মত চিঠির জন্য অপেক্ষায় থাকবো। কেমন মজা হবে বলোতো?'

শীতুল কিছুক্ষণ চুপ থেকে লিখলো, 'আমার যে তোমাকে দেখার জন্য আর একটুও অপেক্ষা করতে ইচ্ছে করছে না।'
- 'আমাকে দেখার জন্য যদি একমাস অপেক্ষা করতে বলি করতে পারবেন?'
- 'পারবো। কিন্তু একমাস কেন? আমি তো বললাম আমার দাগ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। এটা নিতান্তই তুচ্ছ ব্যাপার।'
- 'হা হা হা। ঠিকাছে, এতদিন ধৈর্য ধরতে হবে না, তার আগেই দেখা করবো। কিন্তু চিঠির খেলাটা দীর্ঘস্থায়ী করতে চাইলে কি করতে পারবেন?'
- 'হুম পারবো। আমি সব করতে পারবো শ্যামলতা।'

শ্রবণা হাসতে হাসতে লিখলো, 'আমাকে না দেখেই যদি প্রথম দিন এসেই আমাকে বিয়ে করতে বলি, করতে পারবেন?'
- 'কিহ!'
- ‘হ্যাঁ। এটাকেই বলে বিশ্বাস। আমার ডায়েরি পড়ে আমাকে পুরোটাই জেনেছেন আপনি। আমাকে বিয়ে করার জন্য আর কি কিছু জানার প্রয়োজন আছে?'
- 'কিন্তু তোমাকে তো দেখিনি আমি।'
- 'হা হা হা। এজন্যই বললাম। আমাকে দেখার পর বিয়ের ভূত মাথা দেখে দৌড়ে পালাবে।'
- 'ওকে। আমি রাজি। তুমি যদি কালকেই গিয়ে তোমাকে বিয়ে করে আনতে বলো আমি কালকেই করবো। তোমাকে নিয়ে সারাজীবন থাকার জন্য যতটুকু জেনেছি, এতটুকুই এনাফ।'

শ্রবণা মুগ্ধ হয়ে গেলো কথাটা শুনে। মনে হলো এতদিনের মনের কথা জমিয়ে ডায়েরি লেখাটা সার্থক। কেউ একজন না দেখে, কথা না বলেই এমন অঙ্গীকার করতে পারছে। এরকম অটুট বিশ্বাস কোথ থেকে এসেছে! 

শীতুল লিখলো, 'তোমার কণ্ঠটা শোনার জন্য আর একটুও ধৈর্য ধরতে পারছি না। দেখা নাহয় পরে, প্লিজ কণ্ঠটা অন্তত শুনতে দাও।'

শ্রবণার ও খুব ইচ্ছে করছে শীতুলের সাথে ফোনে কথা বলতে। এত আপন একটা মানুষ, অথচ চাইলেও বুকের ভেতর চেপে ধরা যাচ্ছে না। কি যে অসহ্য দহন হচ্ছে বুকের ভেতর!

শ্রবণা ওর অন্য আরেকটা নম্বর টাইপ করে পাঠালো। এই নাম্বারটা শীতুলের কাছে নেই। নাম্বার পাওয়ামাত্রই কল দিলো শীতুল। শ্রবণা রিসিভ করে কানে ধরে চুপ করে রইলো। শীতুল শ্রবণার নিশ্বাসের শব্দ শুনেই উত্তেজিত হয়ে উঠলো। শীতুলের হাত, পা, বুক সব যেন কাঁপছিলো। ভালোবাসার পরম সুখের উষ্ণতায় ডুবে যাচ্ছিলো শীতুল। ও বললো, 'শ্যামলতা…'

ওপাশ থেকে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে একজন বললো, 'হুমমমম..'

হুম শব্দটা শুনেই শীতুলের হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলো। ও ফোনটাকে বুকে চেপে ধরে বললো, 'দেখা দাও না প্লিজ। একবার একটা মেয়ে শ্যামলতা সেজে আমাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে ধোলাই দিয়েছে। বকা দিয়েছিলাম বলে ছেলেপেলে ডেকে মার খাইয়ে নিয়েছে। তবুও আমি তোমাকে বিশ্বাস করছি। কারণ আমি জানি তুমিই শ্যামলতা। তোমার হাতের লেখা, তোমার চিঠির ভাষা সব আমার মুখস্থ। প্লিজ আমাকে আর কষ্ট দিও না। প্লিজ দোহাই লাগে।'

শ্রবণার চোখের জলে মোবাইল ভিজে যাচ্ছে। এত কান্না পাচ্ছে। শীতুল বুঝতে পেরে বললো, 'কাঁদছো কেন তুমি?'
- 'আমার এতদিনের জমানো ভালোবাসা আজ সত্যি হলো। আমি কাঁদবো না?'
- 'জানো শ্যাম, তোমার কণ্ঠ শুনে বুকটা কেঁপে উঠলো। মনে হলো তুমি আমার কত চেনা। এই কণ্ঠ যেন হতে বহুবার শুনেছি আমি।'
- 'বহুবার তো শুনেছেন, স্বপ্নে, অবচেতনে।'

শীতুল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো, 'হুম। তুমি কি করে স্বপ্নে দেখলে আমি একটা মেয়েকে কাছে টানছি? জানো সত্যিই আমার সাথে এরকম কিছু হতে যাচ্ছিলো। একটা বিভ্রান্তিতে পড়ে ভূল করতে যাচ্ছিলাম আমি।'

শ্রবণার ভেজা কণ্ঠ শুনে শীতুল কিছুতেই বুঝতে পারলো না এটা ওর পরিচিত কেউ। তাছাড়া এই মুহুর্তে শ্রবণার চিন্তা তো দূরের কথা, শ্যামলতাকে ছাড়া অন্য কোনোকিছু ভাবতে পারছিল না শীতুল। ও কেমন যেন স্বপ্নের ঘোরে চলে গেছে। 

শ্রবণা বললো, 'তুমি ঢাকায় এলেই দেখা করবো। আমরা কিন্তু তারাতারি বিয়ে করে নেবো। এটা আমার স্বপ্ন। কারণ, এখন তোমার চোখের দিকে তাকালে আমার যে অনুভূতি হবে, বিয়ের পর তাকালেও একই অনুভূতি হবে। কিন্তু এখন তাকালে আমার পাপ হবে, আর বিয়ের পর তাকালে আল্লাহর রহমত বর্ষিত হবে। তাই আমি বলবো, কাউকে ভালো লাগলে তাকে বিয়ে করে নেয়া উচিৎ।'

শীতুল মুগ্ধ হয়ে বললো, 'বাহ! খুব সুন্দর করে বললে তো তুমি! তুমি ভেবো না। ঢাকায় গিয়েই দেখা করবো। তুমি চাইলে সেদিনই বিয়ে করে নেবো।'
- 'চাপা?'
- 'না। আমি সিরিয়াস। ভালোবাসি যে। বোঝোনা কেন মেয়ে?' 


২২
সময় জিনিসটা বড্ড অদ্ভুত। কখনো অনুকূলে, কখনো প্রতিকূলে। দুদিন আগেও যে মানুষটাকে নিয়ে ভাবাটাও দুঃস্বপ্নের মত ছিলো, দুদিন পরে সময় তাকে সবচেয়ে কাছের মানুষ বানিয়ে দিলো। প্রকৃতির নিয়মটাই যেন কত অদ্ভুত!

ভাবতে ভাবতে বাসের সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজলো শ্রবণা। আজকে ওরা ঢাকায় ফিরছে। মা কড়া করে বলে দিয়েছেন কিছুতেই শ্রবণা নিজের বাসায় যেতে পারবে না। শীতুলদের সাথেই থাকতে হবে। মেয়ের শূন্যতা টুকু পূরণ হয়ে তিনি যেন একটা স্বর্গীয় সুখানুভূতি অনুভব করছেন। কিছুতেই আর শ্রবণাকে ছাড়তে চাইছেন না।
শ্রবণার পড়নে আজ একটা আসমানী রংয়ের থ্রি পিছ। ওড়নাটা মাথায় দেয়ায় ওকে একদম বউ বউ লাগছে। শীতুলের চোখ যতবারই শ্রবণার দিকে যাচ্ছে, ততবারই একটা কোমল অনুভূতি কাজ করছে শীতুলের। কিন্তু শীতুল শ্রবণার দিকে ভূলেও তাকাতে চাইছে না। বারবার চাইছে শ্যামলতাকে নিয়ে ভাবতে। 

এমন সময় শ্রবণার ফোন বেজে উঠলো। ও ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখলো শীতুল কল দিয়েছে। শ্রবণা সাথে সাথেই রিংটোন মিউট করে দিলো যাতে শীতুল বুঝতে না পারে। শীতুল বসেছে শ্রবণার দুই সিট পিছনেই। এ অবস্থায় কথা বলা যাবে কিনা ভাবতে ভাবতে কলটা রিসিভ করেই ফেললো শ্রবণা।

কানে ধরে বলল- হ্যালো।
- 'ওহে শ্যাম, তোমারে আমি নয়নে নয়নে রাখিবো..'

শ্রবণা হাসতে হাসতে বলল- 'রাখবা। তোমাকে তো আমি মানা করিনি।'

শ্রবণা বাসের সিটে এমনভাবে শুয়ে ফোনটা কানে চেপে ধরে রেখেছে যাতে শীতুল কোনোভাবেই বুঝতে না পারে শ্রবণার কানে ফোন। শীতুল ও সিটে হেলান দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলল- জানো শ্যাম, আমার খুব আনন্দ হচ্ছে। উত্তেজনায় রক্ত টলমল করছে।
- 'কেন কেন?'
- 'এই যে তোমার কাছে যাচ্ছি। তাই। তোমার লাগছে না?'
- 'আমি তো সারারাত একটা ঘোরের মধ্যে কাটাই।'
- 'শুধু রাত? আমার তো তোমার চিঠি পাওয়ার পর থেকেই ঘোর কাটছে না।
“কি এক পাগল নেশায় মাতালে আমায়। দিশেহারা হয়ে গেছি, কূল নাহি পাই”।

শ্রবণা হাসতে হাসতে বললো- 'কবি হয়ে গেছো মনে হচ্ছে?'
- 'হুম। তা কি হওয়ার বাকি আছে? কত কিছু যে হচ্ছি। জ্বলছি, নিভছি…'

এমন সময় বাসের হর্নের কারণে আর কথা শোনা যাচ্ছিলো না। দুজনে একই বাসে থাকার কারণে শীতুল বুঝতেই পারলো না শ্যামলতাও বাসে আছে। শ্রবণা চালাকি করে বলল, 'কিসের শব্দ এত?'
- 'বাসে আছি তো। আমি ঢাকায় পৌঁছে ফোন দেবো।'

কথাটা একরকম শেষ করে ফোন রাখলো দুজনেই। শ্রবণার খুব ইচ্ছে করছিলো শীতুলের মুখটা একবার দেখার। কিন্তু ইচ্ছে দমিয়ে রেখে আর পিছন ফিরে তাকালো না ও। পাছে আবার শীতুল বুঝে না ফেলে। কোনোভাবেই ওকে বুঝতে দেয়া যাবে না। যখন দেখবে শ্রবণাই ওর শ্যামলতা, তখন কি অনুভূতি টাই না হবে। সেটা ভেবেই শিহরিত হতে লাগলো শ্রবণা। বাসের জানালা দিয়ে আসা শিরশিরে বাতাসে মনটাও ফুরফুরে হয়ে উঠতে লাগলো।

শীতুল উত্তেজনায় স্থির হয়ে থাকতে পারছে না। গত রাতে অনেক্ষণ শ্যামলতার সাথে কথা বলার পর থেকেই ঘোর ঘোর লাগছে। কখনো উঠছে, কখনো বসছে, কখনো শুয়ে পড়ছে। কিন্তু স্থির হয়ে থাকতে পারছে না মোটেও। উত্তেজনায় পাগল হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা। প্রেমে পড়ার পর যে অনুভূতি হয়নি, তা এখন হচ্ছে। না কাউকে বলা যায়, না ভাষায় প্রকাশ করা যায়। শীতুলের ভেতরে কি অস্থিরতা চলছে তার বর্ণনা কোনো শব্দ দিয়েই হয়তো শেষ করা সম্ভব না। 

বাস ঢাকায় এসে থামলো। শীতুল মাকে হাত ধরে বাস থেকে নামানোর সময় শ্রবণা ওর দিকে তাকিয়ে রহস্যময়ী হাসি দিচ্ছিল। হাসির ভাবটা বুঝতে পারলো না শীতুল। শ্রবণাকে দুদিন ধরেই অন্যরকম লাগছে। এই শ্রবণাকে যেন চেনেও না শীতুল। 
শ্রবণা মায়ের ব্যাগ একহাতে নিয়ে আরেক হাতে মাকে ধরে গাড়িতে এসে উঠলো। শীতুলের বাবা রিসিভ করতে এসেছেন। বাবাকে এই প্রথম দেখলো শ্রবণা। দেখেই পা ছুঁয়ে সালাম জানালো। সালাম দিয়ে ওঠার পরপরই উনি বললেন, 'পা ছুঁয়ে সালাম দেয়াটা আমার পছন্দ না। তবুও করেছো যখন, এবারের মত কিছু মনে করলাম না। মেয়েটা আমার কেমন আছে?'

প্রথম দেখাতেই বাবা এত আপন করে নেবেন এটা ভাবতেই পারেনি শ্রবণা। ও বাবাকে জাপটে ধরে বলল, 'এমন একটা বাবা থাকলে কেউ কি খারাপ থাকে হুম? আমার বাবাটা কেমন আছে?'
- 'ভালো আছে খুব ভালো। তবে আমাকে কিন্তু বাবা বললে মাইন্ড করবো। আব্বু ডাকতে হবে।'

শ্রবণার চোখে পানি এসে গেলো। আব্বু ডাকটা দিয়েই কেঁদে ফেললো ও। বাবাকে জাপটে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললো, 'জীবনে এমন আদর পাইনি আমি আব্বু। আমার আব্বুটা তো পর হয়ে গেছে। আমার আজকে আনন্দে কান্না আসছে।'
- 'পাগলী মেয়ে। তোমাকে কিন্তু আমি তুই করেই বলবো। মাইন্ড করবে?'
- 'বাবার কথায় কেউ বুঝি মাইন্ড করে?'
- 'নো বাবা, কল মি আব্বু।'

হেসে ফেললো শীতুল ও মা। তিনজনের মুখের দিকে তাকিয়ে শ্রবণার কেবলই মনে হতে লাগলো সত্যিকার পরিবার পেয়েছে ও। মানুষ গুলো কত দ্রুত আপন হয়ে উঠলো! 

২৩
শীতুল অনেক্ষণ যাবত শ্যামলতাকে কল দিয়ে যাচ্ছে কিন্তু কল রিসিভ হচ্ছে না। শ্রবণার সাথে আড্ডা দেয়ার জন্য ওর ঘরে এসে দেখলো শ্রবণা নেই। শ্রবণার নাম্বারে কল দিতেই ফোনটা বিছানার উপর বেজে উঠলো। ভাগ্যিস শীতুল শ্যামলতার নাম্বারে ফোন করেনি। ফোন করলেই বিছানার উপর ফোনটা বেজে উঠতো আর শ্রবণা ধরা পড়ে যেতো। শীতুল ফোন করেছে অন্য আরেকটা নাম্বারে। বিছানার উপর বাজতে দেখে শীতুল আর ডাকাডাকি করলো না। নিজের অজান্তেই এগিয়ে এসে শ্রবণার ফোনের দিকে তাকালো। দেখলো লক স্ক্রিনের উপর শীতুলের নাম্বার ভেসে উঠছে। মিসড্ কল, ফোন নাম্বার সেভ করা “kolija” দিয়ে। চমকে উঠলো শীতুল। মনেমনে বললো, 'শ্রবণা আমাকে এত ভালোবাসে! আমার নাম্বার কলিজা দিয়ে সেভ করে রেখেছে। ওহ মাই গড! কিন্তু আমি যে কিচ্ছু করতে পারবো না। আমি যে আমার শ্যামলতাকে পেয়ে গেছি। সরি শ্রবণা, সরি।'

আপন মনে কথাগুলো বলে রুম থেকে বেরিয়ে এলো শীতুল। বাইরে এসে কল দিলো শ্যামলতার নাম্বারে। এবারও ঘরের ভিতরে শ্রবণার ফোন বেজে উঠলো। শীতুল সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করলো না। ভেবে নিলো অন্যকেউ হয়তো ফোন করেছে। তারপর হাঁটতে হাঁটতে নিজের রুমে চলে গেলো।

শ্রবণা ফোন হাতে নিয়েই অবাক। শীতুল ওর দুটো নাম্বারেই ফোন করেছে দেখে বেশ অবাক হলো। ফোনটা রুমে রেখে শীতুলের রুমের দরজায় গিয়ে বলল, 'আসবো?'
- 'এসো। তোমার রুমে গিয়েছিলাম।'

চমকে উঠলো শ্রবণা। ধরা পড়ে যাওয়ার আশংকায় ওর চোখমুখ শক্ত হয়ে উঠলো। শীতুল বললো, 'গল্প করতে গিয়েছিলাম। দেখলাম তুমি নেই তাই কল দিয়েছিলাম।'

হাফ ছেড়ে বাঁচলো শ্রবণা। শীতুল কিছু বুঝতে পারে নি। শ্রবণা বললো, 'একটু ছাদে গিয়েছিলাম। বলুন?'
- 'আহা তেমন কিছু না। মাইন্ড না করলে একটা কথা বলি?'
- 'হুম।'
- 'শ্যামলতার সাথে দেখা করতে গেলে কিভাবে ওকে সারপ্রাইজ দেয়া যায় বলো তো?'
- 'দেখা করতে গেলে তো আপনি নিজেই সারপ্রাইজড হয়ে যাবেন।'
- 'মানে!'

শ্রবণা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললো, 'না মানে এত অপেক্ষার পর দেখা। প্রথমবার দেখে সারপ্রাইজড তো হবেনই।'
- 'তা অবশ্য ঠিক। জানো মেয়েটা আমার অসুখে পরিণত হয়েছে। ওর কথা ভাবলেই পাগল হয়ে যাই। ছুটে চলে যেতে ইচ্ছে করে। পারি না রে!'
শ্রবণার শরীর শিউরে উঠলো। শীতুলের চোখের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো শুনতে শুনতে ওর সমস্ত ইন্দ্রীয় জানান দিচ্ছিলো, 'শীতুল আমাকে প্রচন্ড ভালোবাসে, প্রচন্ড।'

শীতুল কথা শেষ করলেও শ্রবণা ড্যাবড্যাব করে ওর দিকে তাকিয়েই রইলো। শীতুলের মনে পড়ে গেলো নাম্বারটা “kolija” দিয়ে সেভ রাখার কথা। ও আর শ্রবণাকে কষ্ট দিতে চায় না বলে প্রসঙ্গ এড়াতে বললো, 'চা খাবা?'
- 'আমি নিয়ে আসছি, বসুন।'

শ্রবণা দ্রুত চা বানাতে চলে এলো। চা চুলায় তুলে দিয়ে রান্নাঘরের দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বুজে শীতুলকে অনুভব করতে লাগলো। হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে। এ কেমন অনুভূতি বুঝতে পারে না শ্রবণা। 

তারাতাড়ি চা করে শীতুলের রুমে আসলো শ্রবণা। এসেই হাসিমুখে বলল, 'সারপ্রাইজ দিতে চাইলে একটা কাজ করতে পারেন। মেয়েটা যা পছন্দ করে সেরকম একটা খাবার নিজ হাতে রান্না করে নিয়ে যাবেন।'
- 'এটা কি সারপ্রাইজ হবে? রান্না প্রথমদিন নিয়ে যাওয়াটা কেমন দেখায় না?'
- 'তাহলে.. একটু ভেবে বলি?'
- 'আচ্ছা বাদ দাও। চা ভালো হয়েছে।'

শ্রবণা আরো আগ্রহ সহকারে আরেকটা আইডিয়ার কথা বললো। কিন্তু শীতুল বিষয়টা এড়িয়ে যেতে চাইছে। শ্রবণা যতবারই গিফট কিংবা সারপ্রাইজ নিয়ে কিছু বলে, শীতুল ততবারই বলে, থাক না। বাদ দাও এ ব্যাপারটা। শীতুল শ্রবণাকে কষ্ট দিতে চাইছে না। কিন্তু শ্রবণা যে কতটা আনন্দ পাচ্ছে সেটা শীতুলের অজানাই থেকে গেলো। 

নিজের রুমে এসে হাত পা ছড়িয়ে বিছানায় শুয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল শ্রবণা। এমন সময় ফোন বেজে উঠলো। কথা বলতে হবে শ্যামলতা হবে। একইসাথে দুটো চরিত্র হয়ে ওঠাটা খুবই কঠিন একটা কাজ। তারচেয়েও কঠিন হচ্ছে এখন শীতুলকে কি বলবে সেটা। কারণ রিসিভ করলেই শীতুল দেখা করতে চাইবে। ভাবতেই শিউরে উঠছে শ্রবণা। উফফ! 



শ্রবণা ফোন কানে ধরে কাঁপা কাঁপা গলায় বললো, 'হ্যালো।'

ওপাশ থেকে শীতুলের নরম কণ্ঠস্বর শোনা গেলো, 'আচ্ছা জীবনানন্দ দাশ কি বনলতাকে প্রচন্ড ভালোবাসতেন?'

শ্রবণা এরকম প্রশ্ন শুনে খানিকটা অবাক হলো। তবে অন্যকিছু না বলে ভিন্ন প্রসঙ্গে কথা বলায় কিছুটা খুশি হয়েই বললো, 'তা বলতে পারবো না। ভালোবাসতে তো দেখিনি, শুধু সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কবিতা লিখতে দেখেছি।'
- 'এটা বুঝো না? কাউকে প্রচন্ড ভালো না বাসলে কি তাকে নিয়ে কবিতা লেখা যায়?'
- 'এ আমার জানা নেই বাপু। হয়তো যায়, হয়তো যায় না।'
- 'আমার তো যায় না।'
- ‘আপনি আবার কবিতা লেখা শুরু করেছেন নাকি?'

শীতুল একটা জোরালো নিশ্বাস ফেলে বলতে আরম্ভ করলো, 
'আমার দিবস নিশিতে হৃদপিন্ডটুকুন প্রতি স্পন্দনে কারো কথা ভাবে, 
যাকে ভাবতে গেলেই আমার শিরা উপশিরা, সমস্ত শরীরে শিহরণ জাগে।
আমি প্রফুল্লিত হই, উন্মাদিত হই,
মাঝেমাঝে হয়ে যাই মাতাল,
বুকের ভেতর কিছু একটা হারিয়ে গেছে,
ফুড়িয়ে গেছে, কেড়ে নিয়ে গেছে আমার প্রাণের উচ্ছলতা।
আমি নির্জীব হয়ে গেছি, কোথাও ভয়াবহ শূন্যতা, আমার কিছু একটা চুরি হয়ে গেছে।
আমার মাঝে আমি নেই, আমি কোথায় যেন সবটুকু ফেলে এসেছি ,
কার কাছে যেন নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে এসেছি,
আমি সর্বনাশের শুরুটা দেখিনি, তবে শেষটা দেখেছি।
কেউ একজন আমাকে নেশাগ্রস্তের মত উন্মাদ করে দিয়েছে। 
বুকের ভেতর একটা অচেনা শব্দ শুনি,
বোধহয় কারো অস্তিত্বকে আমার ভেতর ধারণ করেছি।"

এতদূর বলার পর শীতুল থামলো। এটা কি কবিতা ছিলো? শ্রবণার শরীর শিউড়ে উঠেছে। গায়ের প্রত্যেকটা লোম দাঁড়িয়ে গেছে। শীতুলের উচ্চারিত শব্দগুলো কানে বারবার প্রতিফলিত হচ্ছে। কেবলই মনে হচ্ছে, শীতুলকে চুরি করতে পেরে এ জীবনটা ধন্য করেছে শ্রবণা। শীতুলকে ছাড়া যে কোনোভাবেই ওর চলবে না। 

শীতুল বললো, ‘তোমার কাছে একটা চিঠি লিখবো। ঠিকানা দাও, চিঠিটা পাঠিয়ে দিবো।'
শ্রবণা চমকে উঠে বললো, 'না না। আমার ঠিকানায় চিঠি পাঠাতে হবে না। আপনি বরং ফোনেই বলুন।'
- 'চিঠিতে যেভাবে সমস্ত অনুভূতিকে জড়ো করতে পেরেছি, ফোনে সেভাবে পারবো না।'

শ্রবণা চুপ করে রইলো। কি বলবে এবার? একই বাসায় আছে তো দুজনে। বাসার ঠিকানা কেমন করে দেবে সে। ভাবতে ভাবতে কোন কূল কিনারা না পেয়ে শ্রবণা বললো, ‘আপনাকে আগামীকাল সকালে একটা চিঠি পাঠাবো। যে চিঠি নিয়ে যাবে, তার হাতেই আপনার চিঠিটা দিয়ে দেবেন।'
- 'আমাকে আরো কিছুদিন যন্ত্রণায় রাখতে চাচ্ছো তো? রাখো। আমার কষ্ট নেই। তবু তুমি শান্তিতে থাকো। তবে আজ আমি এমন চিঠি লিখবো, তুমি আর দূরে থাকতে পারবে না।'

শ্রবণার বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করে উঠলো। বললো, 'ইস! তাহলে তো আমার এখনই চিঠিটা পড়তে ইচ্ছে করছে।'
- 'উহুম। এবার বোঝো কেমন লাগে।'

শ্রবণা কি বলবে বুঝতে পারলো না। অনেক্ষণ নিঃশব্দে রইলো ও। কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারছে না। ইচ্ছে করছে শীতুলের কাছে ছুটে চলে যাই। এ কেমন মন কেমনের ক্ষণ এলো কে জানে! 

শ্রবণা বললো, ‘আপনি চিঠির কথাগুলো ফোনে বলবেন প্লিজ? আমি না আর সইতে পারছি না। আমার খুব মন কেমন করছে।'

শীতুলের বুকটাও এখন ঢিপঢিপ করতে শুরু করেছে। ও উত্তেজিত হয়ে বললো, 'মন কেমন করছে?'
শ্রবণা উত্তরে বললো, 'মনের ভিতর একটা কিছু খুব করে লাফাচ্ছে। এটা বর্ণনা করার মত ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না।'
- 'আমি বলবো?'
- 'হুম বলুন?'

শীতুল কিছুক্ষণ থেমে আবারো কবিতার লাইন বললো দুটো। লাইন গুলো ছিলো এরকম, 

'বুকের ভেতর একটা অচেনা ব্যথা,
কেমন কেমন যেন করে,
আমাকে ভাঙে, আমাকে গড়ে,
কোথায় যেন সমুদ্রের মত উথাল পাথাল করে।
চোখে বালি ঢুকে গেলে যেমন খচখচানি হয়,
মনের ভেতর তেমন একটা জটিল যন্ত্রণা।
মনের মণিতে বারবার লেগে খোঁচা দেয়। 
তোমার থেকে দূরে থাকার যন্ত্রণা, 
চোখের খচখচানির চেয়ে এতটুকুও কম না।
পা মচকে গেলে, মাটিতে পা ফেললে যেমন ব্যথা অনুভূত হয়,
তোমাকে দেখার জন্য মনের ভিতর এমন উচাটন করে।
যেন মনটা মচকে গেছে, যতবার ভাবি ততবার ব্যথা পাই।
আশেপাশে কোথাও তুমি নাই।
তোমাকে দেখবার জন্য মনটা কেমন করে,
চোখের বালি পলক ফেললে যেমন যন্ত্রণা করে।'

শ্রবণার চোখ জলে টলমল করছে। নাহ, আর পারছে না ও থাকতে। এত কাছে থেকেও দূরে থাকার কষ্টটা ও আর নিতে পারছে না। মানুষটাকে জানাতে হবে, বলতে হবে সমস্ত অব্যক্ত অনুভূতির কথা। 

শীতুল বললো, 'বুকটা খা খা করে রে। তোমার সুগন্ধি তেলের সুবাস মাখানো মাথাটা খুব শক্ত করে বুকের ভেতর চেপে ধরতে পারলে শান্তি পেতাম। তোমাকে বুকের ভেতরে, না ঠিক কলিজার ভেতরে ঢুকিয়ে রাখতাম।'

শ্রবণা আর স্থির হয়ে থাকতে পারলো না। বলল, 'প্লিজ ফোনটা রাখো। রাখো, রাখো।'

কল না কেটে দিয়েই শ্রবণা ফোন রেখে দিলো। শীতুল অনেক্ষণ হ্যালো হ্যালো করলো কিন্তু কোনো সাড়া পেলো না। শীতুলও কল না কেটে ফোন কানে ধরে চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলো।

এভাবে কতক্ষণ কেটে গেলো শীতুল জানেনা। দরজায় ঠকঠক শব্দ করছে কেউ। শীতুল ফোনটা বিছানায় রেখে উঠে দাঁড়ালো। এত রাতে দরজায় শব্দ হওয়ায় মুখে বিরক্তির ছাপ। 

রাত বেড়েছে অনেক। নিস্তব্ধ রাত, আজ যেন চারিদিকে সব যানবাহন চলাচলও বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও কোনো শব্দ নেই। সবখানে নিঝুম, সবাই শীতুলের ব্যথায় নিরবতা পালন করছে। শীতুল একটা ঘোরের মধ্যে প্রবেশ করেছে। মৃদু পায়ে হেঁটে এসে দরজা খুলে দিলো। 

দরজায় ওপাশে একজন মানবী দাঁড়িয়ে। পড়নে আসমানী রংয়ের শাড়ি। তেল দেয়া চুলগুলো বেণী করে বাম কাঁধের উপর দিয়ে এনে সামনে ঝুলিয়ে রেখেছে। চুল থেকে সুগন্ধি তেলের সুবাস আছে। কপালে কালো টিপ, চোখে মোটা করে কাজল দেয়া। ঠোঁট দুটো নিষ্পাপের মত, থরথর করে কাঁপছে। চোখজোড়া কঠিন, কোনো ভাষা নেই সেই চোখে। কিন্তু জলের মত কিছু একটা চোখে পড়ছে। 

শীতুলের ঘোর আরো গাঢ় হয়ে এসেছে। ও বললো, 'তুমি! এই বেশে?'

শ্রবণার কোনো শব্দ নেই। শব্দহীন পায়ে ধীরেধীরে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলো ও। এগিয়ে গেলো শীতুলের টেবিলের কাছে। শীতুল দূরে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। শ্রবণাকে এই সাজে দেখে ওর ঘোর আরো প্যাঁচময় হয়ে যাচ্ছে। 

শ্রবণা টেবিলের উপর থেকে ডায়েরিটা নিয়ে খুব দ্রুত কি যেন লিখে চলেছে। শীতুল নিঃশব্দে এসে বিছানার উপর বসলো। কিন্তু শ্রবণা কি লিখছে সেদিকে ওর কোনো আগ্রহ নেই। ও কেবল নির্বাক হয়ে শ্রবণার মুখের দিকেই তাকিয়ে আছে। 

শ্রবণা লেখা শেষ করে পৃষ্ঠাটা ছিড়ে ডায়েরিটা এগিয়ে দিলো শীতুলের দিকে। শীতুল লেখাগুলোর দিকে তাকানো মাত্র বুকের ভেতর একটা বড়সড় কম্পন অনুভূত হলো। সেই চিরচেনা হাতের লেখা! শ্যামলতা! যতই পড়তে লাগলো ততই চোখ জলে ভিজে উঠছে ক্রমশই।

চিঠিটা ছিলো এরকম-

প্রিয় অসুখ,
এত খারাপ অসুখ কখনো কারো হয়েছিলো কিনা বলতে পারো? একই অসুখে দুজনে দিনের পর দিন, পুড়ে পুড়ে মরছি। এ অসুখের নাম, “তুমি”। তুমিময় একটা আমি হয়ে গেছি জানো তো? সেই ছোট্টবেলাকার কথা। আমি হাইস্কুলে পড়তাম। একটা ডায়েরি কিনে আনি, কিসব ভাবতে ভাবতে ডায়েরিতে লিখতে শুরু করি। তোমার কথা, আমার কাল্পনিক প্রেমিকের কথা। হুট করেই যে আমার জীবনে এসে সমস্তটা রাঙিয়ে দেবে। যাকে প্রথমবার দেখেই মনে হবে, এই আমার সেই প্রিয় অসুখ। যে অসুখে ভুগছি আমি নিরন্তর। এই অসুখ আমাকে সারাক্ষণ ভাবাতো, শুধুমাত্র তোমার কথা। তোমাকে নিয়ে জোৎস্নায় স্নান করবো, ল্যাম্পপোস্টের আলোয় হাত ধরে হাঁটবো। সকাল দেখবো, পেয়ারা পাতা আয়রনযুক্ত পানিতে  চুবালে পানি যে রং ধারণ করে, সেই রঙা একটা নিজস্ব ভোর থাকবে আমাদের। এই ভোরে তুমি আর আমি গায়ে চাঁদর জড়িয়ে কুয়াশায় ভিজবো। একজন আরেকজনকে দেখবো, জানবো, ভালোবাসবো, কলিজার ভিতর ঢুকিয়ে রাখবো৷ তোমাকে নিয়ে আমার শত শত, কোটি কোটি স্বপ্ন জানো তো? সবই লিখেছিলাম আমার প্রিয় ডায়েরিতে। ওমা, ডায়েরিটা একদিন হারিয়ে গেলো। আমি পাগলপ্রায় হয়ে গেলাম। কোথায় ফেলে এসেছিলাম জানিনা। পাগলের মত খুঁজলাম, পেলাম না। এরপর রুমে শুয়ে শুয়ে মন খারাপ করে কাঁদছিলাম। তোমার সাথে সেদিনই প্রথম দেখা হয়ে গেলো। আমার সমস্ত শরীরে আন্দোলন শুরু হয়ে গেলো। এই তো আমার প্রিয় অসুখ। আমি তোমাকে দেখেই ডায়েরি হারানোর ব্যথাটা ভূলে গেলাম। এরপর থেকে শুরু হলো আমার পাগলামি। তুমি রাগ করে আমাকে রিসোর্টে একা ফেলে চলে গেলে। আমি আরো পাগলের মতন হয়ে গেলাম। অনেক কাঁদলাম। তোমাকে ফেসবুকে নক দিলাম, পেলাম না। তোমার নাম্বারে ফোন দিলাম, বন্ধ। তোমার বন্ধুকে নক দিলাম, সে জানালো তুমি আরেকজনকে ভালোবাসো। কি কষ্টটাই না পেয়েছিলাম সেদিন। এরপর কয়েকটা দিন আমার প্রচন্ড কষ্টে কাটে। তারপর একদিন ট্রেনে দেখা হয়ে গেলো। সময় বড্ড অদ্ভুত, আমাদেরকে ঠিকই সবসময় একত্র করে রাখার চেষ্টা করলো। একজন আরেকজনকে ছাড়া থাকতে চাইলেও সময়টা চাইছিলো না। তবে আমার দিনগুলো কাটছিল চরম বেদনা নিয়ে। খাওয়া নেই, ঘুম নেই, শুধু তুমিময় একটা যন্ত্রণা। তুমি স্ট্যাটাস দিলে, আমি দেখলাম না। তুমি সব দেখলে, আমার আইডিতে ঢুকে আমার নিকনেম টাই দেখলে না। রাজ্যের সব মেয়েকে জিজ্ঞেস করলে তাদের নাম, আমাকে ই করলে না। কেন? পুরো শহরে পোস্টার লাগাতে দেখলাম, অথচ পোস্টার টা আমি নিজে কখনো দেখলাম না। এত অদ্ভুত সবকিছু! তুমি অন্যকারো ভেবে নিজেকে কত আঘাত করেছি। অথচ সেই অন্যকেউটাই আমি, এটা জানার পর থেকে আমার ভেতর কি বয়ে যাচ্ছে জানো? শীতুল, আমার প্রিয় অসুখ, এটা আমার সবচেয়ে বড় সুখে পরিণত হয়েছে। আমি এই মুহুর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে সবচেয়ে সুখী মেয়ে।

চিঠিটা পড়ার পর শীতুলের গাল বেয়ে শুধু জলের স্রোত বইছে। হাত টেনে ধরে হেচকা টানে শ্রবণাকে বুকে টেনে নিলো শীতুল। কাঁদতে কাঁদতে বললো, 'আমি অনেকবার বলতে চেয়েছিলাম। তুমি শুনতে চাওনি। আর আমিও কেমন যেন! তুমি যখনই রুমে আসতে, আমি ডায়েরিটা লুকিয়ে ফেলতাম। কি অদ্ভুত তাই না?'

শ্রবণা শব্দ করে জোরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। শ্রবণার কান্নার শব্দ শুনে শীতুলও কাঁদতে লাগলো। কাঁদতে কাঁদতে বললো, 'তোকে আমার কলিজার ভেতর ঢুকিয়ে রাখবো। দেখি আর কোথায় যাস তুই। ভালোবাসি রে, খুব ভালোবেসে ফেলছি।'

দুজনের কান্নার শব্দে বাবা মা ছুটে আসলেন। দেখলেন শীতুল খুব শক্ত করে শ্রবণার মাথাটা বুকে চেপে ধরে অনবরত কেঁদে চলেছে। মা বাবাকে দেখে শীতুল ছুটে এসে চিঠিটা দিয়ে বলল, 'মা, ও আমার শ্যামলতা। আমার অসুখ মা।'

শীতুলের চোখেমুখে যে আনন্দের ছটা মা দেখলেন, এমন আনন্দ বোধহয় আর কোনোদিনো তিনি দেখেননি। চিঠিটা পড়ে শীতুলের বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন ,'কালকেই ওদের বিয়ে দিয়ে দিতে হবে। নয়তো সুখটা আবার অসুখে পরিণত হবে বুঝলে?'

শীতুল খুশিতে মাকে জাপটে ধরলো। শ্রবণা গাল মুছতে মুছতে শীতুল ও মা দুজনেই বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে ফেললো। ঠিক মুহুর্তে শ্রবণা পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মেয়েদের একজন।




সমাপ্ত...





Writer:- মিশু মনি
NEXT ARTICLE Next Post
PREVIOUS ARTICLE Previous Post
NEXT ARTICLE Next Post
PREVIOUS ARTICLE Previous Post
 

Delivered by FeedBurner