শীতুল বালিশের নিচ থেকে ডায়েরিটা বের করতে যাবে এমন সময় শ্রবণা বাঁধা দিয়ে বললো, 'থাক। আমি শুনতে চাই না।'
শীতুল শ্রবণার কথা শুনলেও মা ওর কথায় জোর দিলেন না। বরং শীতুলকে জোর দিতে লাগলেন চিঠিটা বের করে পড়ার জন্য। এরকম একটা চিঠি পড়লে যে কেউ কল্পনার রাজ্যে অনায়াসে প্রবেশ করতে পারবে। শুনলে নিশ্চয়ই শ্রবণার ভালো লাগবে। শীতুল ডায়েরিটা বের করে সামনে আনলো। শ্রবণা সেদিকে না তাকিয়ে হনহন করে দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বললো, 'মা তোমাকে একটা কথা বলি, শীতুল আপনাকেও বলে রাখি। আমার এসবে ভীষণ রকম এলার্জি আছে। এসব পুতুপুতু প্রেম ভালোবাসা দেখলে রাগে গা জ্বলে যায়। দয়া করে আমার সামনে এসব আর কখনো বলবেন না। আমাকে আমার মত থাকতে দিন।'
কথাটা বলেই শ্রবণা দ্রুত বেরিয়ে গেলো। মা ও শীতুল দুজনেই স্তব্ধ। সামান্য চিঠি পড়তে বলায় এত বেশি রিয়েক্ট করে ফেলবে মা এটা আশা করেননি। শ্রবণার কথায় ভড়কে গেছেন মা। অবাক হয়ে উনি ছেলের মুখের দিকে তাকালেন।
শীতুল জানে শ্রবণা কেন চিঠিটা শুনতে চায়নি। ও যে মনেপ্রাণে শীতুলকে চেয়েছিলো, সেই মানুষটা অন্য কারো চিঠি পড়লে শুনতে ভালো না লাগারই কথা। শীতুলের অস্বস্তি লাগছে। শ্রবণা নিশ্চয়ই নিজের রুমে গিয়ে কান্নাকাটি করছে। উফফ কি বাজে একটা ব্যাপার।
শীতুল উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললো, 'মা, তুমি কিছু মনে কোরো না। ডিপ্রেশনের সময় মেয়েদের মাথা ঠিক থাকে না। আর একুশ বছর বয়সের পর কোনো মেয়ে যদি ডিপ্রেশনে পড়ে, বুঝতে হবে সত্যিই সে অনেক দুঃখী। আমি দেখছি।'
শীতুল শ্রবণার ঘরের দরজায় এসে শব্দ করলো। শ্রবণা বললো, 'দরজা খোলা আছে।'
শীতুল ঘরে ঢুকে দেখলো শ্রবণা জানালার পাশে বসে উদাস দৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে আছে। শীতুল এসেছে সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। শীতুল এসে শ্রবণার পাশে বসলো। অনেক্ষণ পর শীতুলের দিকে তাকালো শ্রবণা।
শীতুল বললো, 'মন খারাপ এটা অন্যকে বুঝতে দিতে নেই। অন্যের সামনে সর্বদা হাসিখুশি থাকতে হয়।'
- 'সুন্দর জ্ঞান দেয়ার জন্য ধন্যবাদ। পাশে বসে থাকতে চাইলে চুপ করে বসে থাকুন নয়তো চলে যান।'
- 'এত রেগে গেছো কেন? এত অল্পতেই রাগলে চলে? মানসিক ভাবে স্ট্রং হও মেয়ে। সবকিছু সহ্য করতে শেখো।'
- 'মোটিভেশন দিতে এসেছেন?'
- 'তা কিছুটা সত্য। আসলে মানুষের স্বভাব টাই এমন। সবাই নিজে যেমনই হোক না কেন, অন্যকে জ্ঞান দিতে ওস্তাদ। হা হা হা..'
শ্রবণা রেগে বললো, 'এটা কি জোকস ছিলো? জোকস হলেও হাসার মত কোনো জোক না। হা হা করে হাসছেন কেন?'
- 'তুমি কি খুব বিরক্ত হচ্ছো?'
শ্রবণা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, 'না। আমার মনে হচ্ছে আমি আপনাদের বিরক্তির কারণ হচ্ছি। প্লিজ আপনারা অনুমতি দিন, আমি চলে যাই। সম্পর্কগুলো দূর থেকেই সুন্দর। একসাথে থাকতে গেলে কেমন অসহ্য হয়ে যায়।'
শীতুল কিছু বললো না। এই মেয়ের চোখেমুখে জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা দীপ্যমান। ওকে কিভাবে বোঝাবে সেটাই বুঝতে পারছে না শীতুল। খানিকটা ভেবে বললো, 'দেখো শ্রবণা, তুমি ডিপ্রেশনে আছো। তোমার কোনোকিছু ভালো লাগে না, কাউকে সহ্য হয় না। এমনকি তুমি নিজের সাথেও সুখী নও। এভাবে তো একটা জীবন চলতে পারে না। সম্পর্ক দূর থেকে সুন্দর মানলাম। কিন্তু আমি যে জন্মের পর থেকে আমার মায়ের সাথে আছি, কই কখনো তো আম্মুকে আমার বিরক্ত লাগে নি। কখনো মাকে অসহ্যকর মনে হয়নি। বরং মা একটু চোখের আড়াল হলেই আমার খারাপ লাগে। তুমিও মাকে মা ভাবতে চেষ্টা করো, দেখবে অনেক ভালো আছো।'
শ্রবণা শান্ত হলো। শীতুলের কথাটা যৌক্তিক। কিন্তু শ্রবণা রাগ করতে না চাইলেও আচরণে রাগ প্রকাশ পেয়ে যায়। এটা আপনা আপনি হচ্ছে। এটাও সত্যি যে শ্রবণা নিজের সাথেই নিজে শান্তিতে নেই। সারাক্ষণ মনে একটা অশান্তি বিরাজ করে। তবে এটা মানতেই হবে, গতকাল দিনটা অনেক সুন্দর ছিলো। এরকম যদি প্রতিটা দিন হতো!
শীতুল প্রসঙ্গে পাল্টানোর জন্য বললো, 'তোকে শাড়িতে সুন্দর লাগছে রে।'
- 'আপনার মুখে আমাকে তুমি শুনতে সুন্দর লাগে।'
শীতুল হেসে বললো, 'হুমম, ঠিকাছে। তাহলে এখন মন খারাপ করে না থেকে বাইরে থেকে ঘুরে আসি চলো।'
শ্রবণা মুখ গম্ভীর করে বললো, 'আমার কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না। আপনি চাইলে চুপচাপ আমার পাশে বসে থাকতে পারেন।'
- 'বসে থাকতে পারবো তবে চুপচাপ থাকতে পারবো না। একটা কথা জিজ্ঞেস করি?'
শ্রবণা মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, 'হুম।'
শীতুল বললো, ‘তুমি কি সত্যিই প্রেম জিনিসটা অপছন্দ করো নাকি আমার মুখ থেকে অন্য কারো কথা শুনতে চাও না?'
শ্রবণা নির্বিকার ভঙ্গীতে শীতুলের দিকে তাকালো। এমনভাবে তাকিয়ে রইলো যে শীতুলের শ্রবণাকে অনেক অসহায় মনে হতে লাগলো। যেন প্রশ্নের উত্তর সে মুখে দিতে চায় না। উত্তরটা শীতুল বুঝে নিক এমন একটা ভাব।
শীতুল উঠে দাঁড়ালো। কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। শ্রবণা তাকিয়ে রইলো বাইরে। শাড়ির আঁচল জানালার উপর রেখে আলো ছায়ার খেলা দেখতে আরম্ভ করলো।
শীতুলের পায়ের শব্দ শুনেও মুখ ফেরালো না শ্রবণা। শীতুল আবারও এসে পাশে বসলো। শ্রবণার কোলে কিছু একটা এগিয়ে দিয়ে বললো, 'দেখো।'
শ্রবণা অনিচ্ছাসত্ত্বেও নিজের কোলের দিকে তাকালো। মুহুর্তেই রিখটার মাত্রার ভূমিকম্পন হলো শ্রবণার বুকে। এমনভাবে চমকে উঠলো যে হৃদপিন্ড পর্যন্ত লাফিয়ে উঠলো।
হারিয়ে ফেলা প্রিয় ডায়েরিটা দেখে শ্রবণা নিজেকে সামলাতে পারলো না। চিৎকার করে আনন্দ উচ্ছ্বাস করতে যাবে এমন সময় শীতুল বললো, 'দেখো না ডায়েরিটা? এটা আমার অপরিচিতার ডায়েরি।'
শ্রবণা যেভাবে লাফিয়ে উঠতে চেয়েছিলো ঠিক সেভাবেই থমকে গেলো। এই ডায়েরি শীতুলের কাছে কেন? আর এ কথার মানে কি!
শ্রবণা কৌতুহলী চোখে বললো, 'মানে!'
শীতুল দেয়ালে হেলান দিয়ে বসলো। তারপর মুচকি হেসে বললো, 'রাগ করলেও আজকে তোমাকে পুরোটা শুনতে হবে। কারণ আমি চাই না আজকের মত ওভার রিয়েক্ট তুমি আর কখনো করো।'
শ্রবণা ক্রমশ উত্তেজিত হয়ে উঠছে। নিশ্চয় ডায়েরির সাথে শীতুলের কোনো সম্পর্ক আছে। ও উৎসাহের সাথে বললো, 'আজকে আমিও শুনবো। আমাকেও শুনতে হবে। আপনি না বললেও জোর করে শুনতে হবে। বলুন এটা কোথায় পেয়েছেন?'
শীতুল অনেক্ষণ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলো। কত কথা যে মনে ভেসে উঠছে তার ইয়ত্তা নেই। শ্রবণা আগ্রহ নিয়ে শীতুলের চোখের দিকেই চেয়ে আছে। ওর চোখেমুখে রাজ্যের কৌতুহল। একদিকে হারানো ডায়েরি ফিরে পেয়ে আনন্দ, অন্যদিকে শীতুলের কাছে ডায়েরিটা দেখে হাজারো প্রশ্ন। রহস্যের জট খুলবে কখন?
শীতুল একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। শ্রবণা শীতুলের হাত ধরে বললো, 'বলবেন না? বলুন না প্লিজ?'
শীতুল বললো, 'হুম। ডায়েরিটা আমি কুড়িয়ে পেয়েছিলাম। কিন্তু কখনো মনে হয়নি আমি ডায়েরি পেয়েছি। বরং সবসময় মনে হয়েছে এটা একটা মেয়ের স্বচ্ছ মন। যে মনের দিকে তাকালে আয়নার মত আমি নিজেকেই দেখতে পাই। জানো, এই স্বচ্ছ মনে হাজারো অনুভূতি আছে, শত শত কাব্য আছে, গল্প আছে। আমি সমস্ত গল্প পড়েছি, সমস্ত অনুভূতিকে আমার মাঝে অনুভব করেছি। সেই অপরিচিতাকে ধারণ করেছি আমার নিজের সত্তায়। কারণ কি জানো? ওই স্বচ্ছ মনের মাঝে আমি আমাকেই খুঁজে পেয়েছি। এরকম মানুষ যদি থেকে থাকে, তবে সেটা আমিই। আমি যদি ওর স্বপ্নের মত নাও হতে পারি, তবুও ওর স্বচ্ছ মনের কাছে আমি হার মেনে গেছি। পরাজিত হয়েছি নিজের কাছে। মেয়েটাকে কখনো দেখিনি, কখনো কণ্ঠ শুনিনি, এমনকি কোথায় থাকে তাও জানিনা। কিন্তু তার মনকে জানি, মনকে চিনি, মনের রাজ্যে সারাক্ষণ ঘুরে বেড়াই। আমি এই মনটার ই প্রেমে পড়েছি। সবাই বলে আমি নাকি পাগল, কিন্তু বিলিভ মি শ্রবণা। এই ডায়েরিটা কোনো সাধারণ ডায়েরি নয়। এটা আমার নিজের অব্যক্ত সব অনুভূতি। আমি আমাকে যেভাবে কল্পনা করি, আমার স্বপ্নের রাজ্যের সমস্ত ভাবনার সাথে ওর ভাবনা মিলে গেছে। আমি ওকে ভালো না বেসে থাকতে পারি তুমি বলো?'
দীর্ঘ সংলাপ শেষ করে শীতুল থামলো। কিন্তু “শেষ হইয়াও হইলো না শেষ” এর মত এর মধুর রেশ শ্রবণার কানে বারবার ধ্বনিত হতে লাগলো। নিজের প্রিয়জনের মুখে নিজেকেই ভালোবাসার কথা শুনে শ্রবণার এমন অনুভূতি হলো যে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে ওর। আনন্দে নাকি কষ্টে সেটা বুঝতে পারছে না। কিন্তু বুকের ভেতর একটা অন্যরকম আর্তনাদ হচ্ছে, কিছু মেঘ সরে যাচ্ছে, কিছু শুভ্র ভালোলাগায় ছেয়ে যাচ্ছে। শ্রবণা স্থির হয়ে বসে থাকতেও পারছে না। আরো শুনতে ইচ্ছে করছে।
বললো, 'মেয়েটাকে আপনি ডায়েরি পড়েই এত ভালোবেসে ফেলেছেন?'
শীতুল উত্তরে বললো, 'বললাম তো এটা শুধু ডায়েরি নয়। আমার সমস্ত অনুভূতির গল্প গাঁথা এখানে। আমি যা, আমাকে ঠিক সেভাবেই এখানে আবিষ্কার করেছি। বিশ্বাস করো, আমি সেভাবে সকাল দেখি ওই মেয়েটাও সেভাবেই আমাকে নিয়ে সকাল দেখতে চায়। প্রত্যেকটা ভাবনায় আমার সাথে অদ্ভুত মিল। কি করবো বলো না তুমি?'
- 'কি করেছেন? ডায়েরিটার মালিককে খোঁজেন নি আপনি?'
শীতুল হেসে ফেললো। হাসতে হাসতেই বললো, 'প্রত্যেকটা মুহুর্ত খুঁজেছি রে। কোথায় খুঁজিনি বলতে পারবে? রাঙামাটিতে মনেহয় যত মেয়েকে দেখেছি সবাইকে জিজ্ঞেস করেছি, ডায়েরিটা কি আপনার? হাজারটা মেয়েকে জিজ্ঞেস করেছি আপনার নাম কি শ্যামলতা? কত জায়গায় পাগলের মত খুঁজেছি। ফেসবুকে ওর চিঠির উত্তর লিখে ওর চিঠিসহ পোস্ট করেছি। ফেসবুকে কম খুঁজিনি আমি ওকে। লাস্ট পর্যন্ত পোস্টার ছাপিয়ে শহরের দেয়ালে দেয়ালে লাগিয়ে দিয়েছি শ্রবণা।'
শ্রবণা অবাক হয়ে বললো, 'ওই পোস্টার গুলো তাহলে এই মেয়েকে খোঁজার জন্যই ছিলো? ও মাই গড!'
- ‘হ্যাঁ রে। পোস্টারগুলো কিভাবে পাগলের মত দেয়ালে লাগিয়ে দিচ্ছিলাম তুমি তো দেখেছো।'
- ‘হ্যাঁ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় আমি কখনো পোস্টারটার ভেতরের লেখাটা দেখিনি। কতবার আপনার আইডিতে গিয়েছি কিন্তু আপনার দেয়া পোস্ট আমার চোখে পড়েনি।'
- ‘তোমার আইডি ডিজেবল হয়ে যাওয়ার পর আমি পোস্ট দিয়েছিলাম মেয়বি।'
- 'হুম। বিধাতার অদ্ভুত খেলা তাইনা? আপনি শত শত মেয়েক জিজ্ঞেস করেছেন আপনার নাম কি শ্যামলতা? কিন্তু আমাকেই কখনো বলেননি।'
শ্রবণা নিশ্চুপ হয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। চোখের কোণে জল জমতে শুরু করেছে। শীতুল ওকেই এভাবে পাগলের মত খুঁজে বেরিয়েছে সেটা ভাবতেই পারছে না। এত আনন্দ হচ্ছে যে খুশিতে হয়তো পাগল হয়ে যাবে।
শীতুল বললো, 'তুমি শ্যামলতা নামে কাউকে চেনো নাকি?'
- 'আরে শ্যামলতা তো…'
এতদূর বলার পর আর বলতে ইচ্ছে করলো না শ্রবণার। আজকে সত্যিটা জানার পর আনন্দ হচ্ছে ঠিকই কিন্তু শীতুলকে ধরা দিতে ইচ্ছে করছে না। শ্রবণা যেভাবে কষ্ট পেয়েছে, সেই একই কষ্ট শীতুলকে দিতে না চাইলেও অন্তত শীতুলের মনে ভালোবাসাটা আরেকটু গাঢ় করে দিতে ইচ্ছে করছে। শীতুল যেন নিজে থেকেই বুঝতে পারে শ্রবণাই ওর শ্যামলতা। এইটুকু খেলা তো খেলতেই হবে। এতদিন যে এত কষ্ট শ্রবণাকে পেতে হয়েছে, তার কিছুটা কষ্ট তো শীতুলের বোঝা উচিৎ।
শ্রবণা বললো, 'না চিনি না। কিন্তু খুঁজে দিতে হেল্প করতে পারতাম।'
- 'সত্যি! আমি না পাগল হয়ে গেছি রে। শ্রবণা প্লিজ, ওকে এনে দিতে পারবি? আচ্ছা সরি এসব বলার জন্য। প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড।'
শ্রবণার চোখে পানি এসে গেছে। ও আচমকা শীতুলের বুকে মাথা রেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। শীতুল কিছু বুঝে উঠতে পারলো না। শ্রবণার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, 'পাগলী, কি হলো আবার?'
শ্রবণা শীতুলকে ছেড়ে দিয়ে একটা ভোঁ দৌড় শুরু করলো। ছুটতে ছুটতে বাসার পিছন দিকের বাগানের ঠিক মাঝামাঝি এসে একটা গাছে হেলান দিয়ে অনবরত কাঁদতেই লাগলো। শব্দ করে কেঁদে আজ থেকে সমস্ত কষ্টকে বিদায় জানাতে চায় শ্রবণা। বুকে জমে থাকা সব যন্ত্রণা ধীরেধীরে মুছে যেতে শুরু করেছে। কাঁদতে কাঁদতে হাফিয়ে যাচ্ছে তবুও শ্রবণার আজ কান্না থামাতে ইচ্ছে করছে না। এ জীবনে অনেক কষ্ট পেয়েছে ও। এই কান্নাই জীবনের শেষ কান্না হোক।
১৯
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। মশার কামড়ে ঘুম ভেঙে গেলো শীতুলের। চোখ মেলে দেখলো রুম ঘুটঘুটে অন্ধকার। পাখিদের নীড়ে ফেরার শব্দে চারিদিক মুখরিত হয়ে আছে। মনে পড়ে গেলো শ্রবণার কথা। তখন শ্রবণা রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর শীতুল শুয়ে একটা লম্বা ঘুম দিয়েছিলো। শ্রবণা কোথায় আছে দেখতে হবে তো।
বিছানা থেকে উঠে বাড়ির সবগুলো কক্ষে শ্রবণাকে খুঁজছিলো শীতুল। কোথাও না পেয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলো। রান্নাঘরে হাসির শব্দ শুনে এসে দেখলো শ্রবণা কোমরে শাড়ির আঁচল গুঁজে দিয়ে মায়ের সাথে রান্না করছে। দৃশ্যটা মুহুর্তেই মুগ্ধ করে ফেললো শীতুলকে। পৃথিবীর সুন্দরতম দৃশ্যগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে কোনো মেয়েকে কোমরে আঁচল গুঁজে রান্না করতে দেখা। গালের দুপাশে চুলের চিকন দুটো গোছা তারের মত ঝুলে আছে। কিছু চুল এলোমেলো হয়ে আছে কানের পেছনে। চুলের খোপায় শিউলী মালা শুকিয়ে জবুথবু হয়ে আছে। মেয়েটা রান্না করছে খুব আগ্রহ আর আনন্দ নিয়ে। আহা! এরচেয়ে সুন্দর দৃশ্য বোধহয় আর হয় না। মন ভালো করার জন্য এইটুকুই যথেষ্ট।
শীতুলকে দেখে শ্রবণা ম্লান হাসলো। শীতুলও হাসির বিনিময়ে হাসি ফেরত দিলো। শ্রবণা বললো, 'হাতমুখ ধুয়ে আসুন।'
শ্রবণার কথা শুনে মা দরজার দিকে তাকালেন। শীতুলকে দেখতে পেয়ে বললেন, 'কি রে কখন উঠলি ঘুম থেকে? কি লম্বা ঘুম দিয়েছিলি বাবাহ!'
-'এইতো এইমাত্র উঠলাম। তোমাদেরকে হেসেখেলে রান্না করতে দেখে কি মনে হচ্ছে জানো মা?'
- 'কি?'
শীতুল কাছে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, 'মনে হচ্ছে ছোট ছোট দুটো বালিকা রান্নাবাটি খেলছে।'
- 'পাগল ছেলের কথা শুনেছিস শ্রবণা?'
- ‘হ্যাঁ শুনলাম তো। পাগল ছেলে, আপনি দয়া করে হাতমুখ ধুয়ে আসবেন প্লিজ?'
- 'যাচ্ছি যাচ্ছি।'
শীতুল হাতমুখ ধুতে চলে গেলো। যাওয়ার সময় একবার পিছন ফিরে তাকালো। শ্রবণা হাসিহাসি মুখে তাকিয়ে আছে শীতুলের দিকে।
নাস্তা করার সময়েও শীতুল খেয়াল করে দেখলো শ্রবণা আজকে অনেক হাসিখুশি। এত আনন্দিত দেখাচ্ছে কেন কে জানে। পাক্কা গৃহিনীর মত কাজে লেগে পড়েছে একেবারে।
রাত্রিবেলা শ্রবণা ওর অনেক আগের একটা ফেসবুক আইডিতে লগ ইন করে আইডি নাম বদলে ফেললো৷ আইডিতে পোস্ট করা সমস্ত ছবি ডিলিট করে দিলো। যতগুলো প্রোফাইল পিক ছিলো সব অনলি মি করে দিয়ে একটা অন্ধকার ছায়ায় একটি মেয়ের ছবি দিয়ে প্রোফাইল পিক আপডেট করে দিলো। তারপর শীতুলের আইডি খুঁজে বের করে একটা টেক্সট পাঠিয়ে লিখলো, 'আপনার সাথে কথা ছিলো।'
শীতুল অনলাইনেই ছিলো। মেসেজ দেখে রিপ্লাই দিলো, 'জ্বি বলুন। কে আপনি?'
- 'মেসেজে এতকিছু বলা সম্ভব না। আপনার বাসার ঠিকানাটা দিন।'
- 'আমার বাসা! আগে আপনার পরিচয় দিন? আর কি দরকার বলুন?'
- ‘আপনার ঠিকানায় একটা উপহার পাঠাবো। দয়া করে ঠিকানাটা দিন। আমি বেশিক্ষণ ফেসবুক চালাতে পারবো না। তারাতাড়ি দিন।'
শীতুল কোনোকিছু না ভেবে এখন যেখানে আছে সেখানকার ঠিকানাটা পাঠিয়ে দিলো৷ এরপর অনেক্ষণ অপেক্ষা করলো কিন্তু মেসেজের কোনো রিপ্লাই পেলো না। হতাশ হয়ে অনলাইন থেকে বেরিয়ে এলো শীতুল। ঘুম আসছে না। শ্রবণার সাথে গল্প করার ইচ্ছা নিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে এলো ও।
শ্রবণা দরজা লাগিয়ে শুয়ে পড়েছে। শীতুল দরজায় ঠকঠক শব্দ করে জানতে চাইলো, 'জেগে আছো?'
শ্রবণার উচ্চস্বরে হাসির শব্দ শোনা গেলো। কৌতুহলী হয়ে কান খাড়া করলো শীতুল। দরজা খুলে গেলো এমন সময়। শীতুলকে দেখেও শ্রবণার হাসি থামছিলো না।
শীতুল বললো, 'কি হয়েছে?'
- 'আমি ভূল শুনেছিলাম তাই হাসছি।'
- 'মানে?'
- ‘আপনি বলেছিলেন জেগে আছো? আমি শুনেছি হেগে আছো? হা হা হা..'
শ্রবণার কথা শুনে শীতুলও হেসে উঠলো। হাসি থামতেই শ্রবণা বললো, 'এত রাতে আমার রুমে?'
- 'ঘুম আসছিল না। ভাবলাম কিছুক্ষণ গল্প করে আসি।'
- 'ভালো করেছেন। বসুন, চা খাবেন?'
- 'এখন আবার কষ্ট করবে?'
- 'কারো কারো জন্য কষ্ট করতে পারাটা সৌভাগ্যের। খাবেন নাকি সেটা বলুন?'
শীতুল মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ বললো। শ্রবণা রান্নাঘরে গিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই চা বানিয়ে হাজির। এসে দেখলো শীতুল রুম অন্ধকার করে বসে আছে। জানালা দিয়ে বাইরে থেকে দূরের আলো এসে পড়েছে রুমে। সেই আলোতে শীতুলের মুখশ্রী আবছা দেখাচ্ছে। শ্রবণা চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বললো, 'আলো জ্বেলে দি?'
- 'কিসের আলো?'
- 'জীবনের আলো তো জ্বালতে পারবো না। আপাতত রুমের আলোটাই জ্বালাই না হয়।'
- 'জীবনের আলো জ্বালাতেও তো আমি বাঁধা দেই নি।'
- 'বাঁধা না দিলেও অনুমতি তো দেন নি।'
- 'সবকিছুর জন্য অনুমতির প্রয়োজন আছে?'
- 'অনুমতি ছাড়া কিছু কিছু কাজ করাও ঠিক না। চা কেমন হয়েছে?'
শীতুল চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললো, 'ভালো হয়েছে।'
- 'থ্যাংক্স বলবেন না?'
- 'সন্ধ্যাবেলা থেকে তোমাকে অনেক উৎফুল্ল দেখাচ্ছে। এত আনন্দের কারণ কি জানতে পারি?'
শ্রবণা হেসে উঠলো। অকারণে অনেক্ষণ ধরে হাসতেই লাগলো। শীতুল শুধু অবাক হয়ে যাচ্ছে ওর হাসি দেখে। মেয়েটা পাগল হয়ে গেলো নাকি?
শ্রবণা বলল, 'আমি ঠিক করেছি এখন থেকে সবসময় আনন্দে থাকবো।'
-'অভিনয় করে আনন্দে থাকার উপকারিতা আছে?'
- 'আছে। অভিনয় করতে করতে আনন্দে থাকাটা একসময় অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। হা হা হা।'
শীতুল উঠে এসে শ্রবণার বাহু স্পর্শ করে বললো, 'কি হয়েছে তোমার?'
শ্রবণা একহাতে চায়ের কাপ ধরে আরেকহাতে শীতুলের হাত মুঠো করে ধরলো। শীতুল আরো কাছে এগিয়ে এসে বললো, 'এমন অচেনা লাগছে কেন তোমাকে?'
- 'টুউয়ু, টুউয়ু..'
শীতুল আরো ভড়কে গেলো। শ্রবণা কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বললো, 'ভয় পাবেন না। রেড সিগনাল বাজছে। অন্ধকারে কাছে আসতে নেই। বিপদ ঘটার সমূহ সম্ভাবনা থাকে।'
- 'দুষ্টু মেয়ে।'
শীতুল শ্রবণার হাত ছেড়ে দিলো। শ্রবণা শব্দ করে হাসতেই লাগলো, হাসতেই লাগলো। শীতুল একহাতে শ্রবণাকে হেচকা টানে বুকের উপর টেনে নিয়ে বললো, 'হয়েছে টা কি তোমার বলোতো? খাবার টেবিলেও হা হা করে হাসছিলে।'
শ্রবণাকে হেচকা টানে বুকে টান দিতেই শ্রবণার কাপ থেকে ছলকে কিছুটা গরম চা শীতুলের বুকের উপর পড়েছিলো। শ্রবণা শীতুলের কথার উত্তর না দিয়ে বললো, 'বুকটা পুড়ে যাচ্ছে।'
- 'সেজন্য হাসছো?'
- 'আমার না, আপনার বুকটা পুড়ে যাচ্ছে। গরম চা পড়েছে টের পাননি?'
- 'পড়ুক। তোমার কি হয়েছে সেটা বলো?'
শ্রবণা হাসতে হাসতে বললো, 'আমার কিছু হয়নি। আর বেশিক্ষণ এভাবে কাছাকাছি থাকলে আপনার কিছু হয়ে যাবে। সবচেয়ে ভালো হয়, রুমের লাইটটা জ্বালিয়ে দি।'
শ্রবণা শীতুলের কাছ থেকে সরে দাঁড়ালো। রুমের আলো জ্বালিয়ে দিয়ে শীতুলের থেকে খানিকটা দূরে বিছানার এক কোণে বসলো। শীতুল বসলো চেয়ারের উপর। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বললো, 'আমার অন্ধকারে গল্প করতে ভালো লাগে।'
শ্রবণা দুম করে প্রশ্ন করে বসলো, 'মেয়েদের সাথে?'
শীতুল ভ্রু কুঁচকে শ্রবণার দিকে তাকালো। মনমরা বিষন্ন মেয়েটা আজ কেমন উৎফুল্ল হয়ে গেছে। উচ্ছলতায় ফেটে পড়ছে একেবারে। চোখেমুখে আনন্দের জোয়ার। কি সুখে তার এত উন্নতি হয়েছে কে জানে!
শ্রবণা চায়ের কাপটা রেখে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। জানালা থেকে পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকিয়ে বললো, 'আজ কি পূর্ণিমা?'
- 'জানিনা।'
- 'বাইরে কুয়াশা পড়েছে না?'
- 'হুম।'
- 'বাইরে হাঁটতে যেতে ইচ্ছে করছে। মফস্বলের রাস্তায় কুয়াশাভেজা রাতে হাঁটতে অনেক মজা জানেন?'
শীতুল এই প্রশ্নের উত্তর দিলো না। শ্রবণাকে এত উচ্ছ্বসিত দেখানোর রহস্যটা নিয়েই ভাবছে ও। চেনা মেয়েটাও হঠাৎ অচেনা হয়ে গেছে। শ্রবণা কিছুক্ষণ জানালা ধরে দাঁড়িয়ে থেকে শীতুলের কাছে এগিয়ে আসলো। ওড়না দিয়ে শীতুলের বুক থেকে চা মুছে দিতে দিতে বললো, 'এই দাগ যাবে না।'
- 'যাবে।'
- 'আমার বুকের ভেতর যে দাগ হয়ে গেছে সেটা?'
শীতুল চমকালো। শ্রবণার চোখের দিকে তাকাতে গিয়েও তাকাতে পারলো না। শ্রবণা ম্লান হেসে বললো, 'অনেক রাত হয়েছে। রুমে যান এখন। আপনার ডায়েরিটা আপনার বালিশের পাশেই রেখে এসেছি। খুলেও দেখিনি।'
- 'কেন?'
- 'ক্ষতটায় নুনের ছিটা দিয়ে জ্বালাটা বাড়িয়ে দিয়েছেন। সেটাতে মলমের কথা বলে মরিচ লাগাতে আসবেন না যেন।'
শীতুল উত্তর দিলো না। সত্যি বলতে কোনো উত্তর খুঁজে পেলো না। শ্রবণার ব্যাপারটা ভাবলে ওর নিজেরও খারাপ লাগে অনেক। শীতুল 'সরি' বলতে যাবে এমন সময় শ্রবণা হো হো করে হেসে উঠলো। হাসি থামিয়ে বললো, 'আরে মজা করছিলাম। আমি মোটেও মন খারাপ করিনি। আমার খুব আনন্দ হচ্ছে জানেন তো? মনে হচ্ছে আমি এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মেয়ে।'
- 'কেন মনে হচ্ছে?'
- 'সেটা বলা যাবে না। ভাবছি, আপনার সেই অপরিচিতাকে খুঁজে পেতে সাহায্য করবো।'
শীতুল কিছু বললো না। চায়ের কাপের দিকে অনেক্ষণ তাকিয়ে থেকে আনমনা হয়ে কি যেন ভাবছিলো। কিছুক্ষণপর উঠে দাঁড়িয়ে বললো, 'রুমে যাচ্ছি। ঘুমিয়ে পড়ো তুমি।'
শ্রবণাকে কিছু বলার সুযোগ দিলো না। দরজার কাছে গিয়ে আরেকবার ফিরে তাকালো শীতুল। শ্রবণা হাসার চেষ্টা করলো। হাসির বিনিময়ে এবার হাসি এলো না শীতুলের। ও ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরের দিকে গেলো। শ্রবণা চেয়ারে বসে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। একটা অন্যরকম আনন্দের স্বাদ পাচ্ছে ও। প্রিয় মানুষটার প্রিয়জন হতে পারার আনন্দে ওর পুরো শরীর শিহরিত হচ্ছে। আনন্দে আজ সারারাত হয়তো ঘুম আসবে না।
২০
মাঝখানে দুটো দিন কেটে গেলো। শ্রবণার সাথে হাসি আনন্দে ভালোই সময় কাটছিলো শীতুলের।
দুদিন পর হঠাৎ একটা পার্সেল এলো শীতুলের নামে। শীতুল বেশ অবাক হলো। এই বাড়িতে শীতুলের থাকার কথা কারো জানার প্রশ্নই আসে না। এখানে পার্সেল আসবে কোথ থেকে? পার্সেলের উপরে একটা ছোট্ট বাচ্চার হাতের সাইন। ভ্রু কুঁচকে প্যাকেট টা খুলতে লাগলো শীতুল। পরক্ষণেই মনে পড়লো দুদিন আগে একটা মেয়ে ফেসবুকে ঠিকানা নিয়েছিলো। শীতুলের চোখেমুখে কৌতুহল। কাউকে ঠিকানা দিয়েছিলো সেটা তো মনেই ছিলো না।
প্যাকেট খুলতেই একটা কাঁচের কাপল পুতুল ঝিকমিক করে উঠলো। মুগ্ধ হয়ে সাথে থাকা চিঠিটা খুললো শীতুল। চিঠিতে চোখ পড়ামাত্রই হৃদপিন্ড লাফিয়ে উঠলো। কিছুক্ষণের জন্য দম বন্ধ হয়ে গেলো যেন। শীতুলের হাত পা রীতিমতো কাঁপতে শুরু করেছে। শিউরে উঠেছে পুরো শরীর।বসমস্ত ইন্দ্রিয় জুরে একটা অচেনা অনুভূতির খেলা শুরু হয়ে গেলো। সেই চিরচেনা হাতের লেখা। শ্যামলতার চিঠি!
জলে ঝাপসা হয়ে আসা চোখেই চিঠিটা পড়তে শুরু করলো শীতুল।
চলবে...
Writer:- মিশু মনি