১৬
রাত এগারো টা।
বিছানায় শুয়ে আনমনা হয়ে ভাবছে শ্রবণা। হুট করেই আলাদিনের প্রদীপ পাওয়ার মত জীবনে অভাবনীয় কিছু পরিবর্তন চলে এলো। ডিপ্রেশন জিনিসটা নিজের ভেতর থেকে উধাও হয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে সমস্ত না পাওয়ার বেদনা। পুরোটা বিকেল মায়ের সাথে মন খুলে আড্ডা দিয়েছে ও। শুধু শীতুলের বিষয় টাই এড়িয়ে গেছে। এ ছাড়া নিজের যত কথা আছে সবই বলা হয়ে গেছে। এখন নিজেকে অনেক বেশি হালকা লাগছে শ্রবণার। শীতুলের মাকে সত্যিই নিজের মা মনে হচ্ছে। মাকে হারিয়ে আবার পাওয়ার মাঝে যে কি সুখ! শীতুলকে পাওয়ার চিন্তাটাও মন থেকে দূর হয়ে গেছে। শীতুলকে নিয়ে আর নতুন করে কিছু ভাবতে চায় না শ্রবণা। যা হবার তাই হবে।
এমন সময় দরজা খুলে মা ঢুকলেন ঘরে। শ্রবণার কাছে বসতে বসতে বললেন, 'কি রে একা ভয় করবে? না মা থাকবো সাথে?'
শ্রবণা মাকে জাপটে ধরে বললো, 'আপনি থাকুন মা। অনেকদিন মাকে জড়িয়ে ঘুমাই না, মায়ের শরীরের গন্ধ নেই না।'
- 'মা জিনিস টা যে কি, যার নেই শুধু সেই বুঝবে রে।'
শ্রবণা একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললো, 'হুম যেমন আমি এখন বুঝি। কোনোদিনো মাকে বলিনি আজকে তোমার রান্নাটা আমিই করি, তুমি খাও। কোনোদিনো মায়ের শাড়িটা ধুয়ে দিয়ে বলিনি, সবসময় তো তুমিই আমার টা করতে আজ নাহয় আমি করলাম। আজ বুঝি মায়ের শূন্যতা। কিন্তু করতে চাইলেও এখন আর উপায় নেই।'
মা শ্রবণার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, 'পাগলী রে, মন খারাপ করিস না। আমি তো আছি। আমি তোর মা না?'
শ্রবণার চোখে পানি চলে এলো। কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলো না। গলা ভিজে আসছে। মা শ্রবণার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, 'ঘুমাস না?'
- 'এত তারাতাড়ি তো কখনো ঘুমাই না। দেরিতে ঘুমানোটা অভ্যেস হয়ে গেছে।'
- ‘এখন থেকে তারাতাড়ি ঘুমানোর অভ্যাস করতে হবে এই বলে দিলাম।'
- 'আচ্ছা মা। এখন থেকে তাই করবো। খুশি?'
- 'আমারও আজকে ঘুম আসছে না। চল মুভি দেখি।'
শ্রবণা কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো মায়ের দিকে। মুভি দেখার কথা শুনে মায়ের কথা মনে পড়ে গেলো। মা মুভি দেখতে খুবই পছন্দ করতো। মাঝেমাঝে শ্রবণাকে এসে বলতো, 'তোর ল্যাপটপে একটা মুভি দে না দেখি।' শ্রবণা রাগ দেখিয়ে বিদায় করেছে। আজ মাকে বড্ড মনে পড়ে যাচ্ছে। কেউ আর এমন বায়না করবে না। ইস! মা না থাকাটা যে কি নির্মম কষ্টের।
মা শ্রবণাকে নিয়ে শীতুলের ঘরে চলে এলেন। শীতুল ল্যাপটপে সিনেমা দেখছে আর হাসছে। শ্রবণাকে ঘরে ঢুকতে দেখে বললো, 'মহারানীর ঘুম নেই?'
শ্রবণা কিছু বললো না। নিরবে বিছানার কাছে এগিয়ে গেলো। শীতুল শোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসলো। মনোযোগ সিনেমার দিকে। শ্রবণা নরম গলায় বললো, 'ফরেস্ট গাম্প মুভিটা আছে? আমার মায়ের খুব পছন্দের ছিলো। আজ আমার দেখতে ইচ্ছে করছে।'
শীতুল অবাক হয়ে শ্রবণার দিকে তাকালো। শ্রবণার চোখে মুখে কি যে মায়া এসে ভর করেছে। মাকে মনে পড়লে বুঝি এত মায়াবী লাগে! মেয়েরা বোধহয় ছেলেদের থেকেও মাকে বেশি অনুভব করতে পারে। শীতুল মাথা ঝাঁকিয়ে মুভি বের করতে করতে বললো, 'বাবাকে মনে পড়ে না?'
শ্রবণার স্পষ্ট উত্তর, 'মনে পড়ার মত বাবা উনি কখনোই ছিলেন না।'
- 'বাবাকে ঘৃণা করো?'
- 'না। বাবাদেরকে ঘৃণা করা যায় না। তবে পছন্দ করতে পারি না।'
- 'হুম। বসো, মুভি দেখো।'
- ‘মাঝেমাঝে নিজেকে আমার ফরেস্ট গাম্প মনে হয়। আমার গল্প শোনার কেউ নেই।'
- 'ধরে একটা থাবড়া দেবো, গালের সব দাঁত নড়বড়ে হয়ে যাবে কিন্তু পড়বে না। বুঝবি কি কষ্ট। আর যদি এসব কথা বলিস, ফালতু মেয়ে।'
শীতুলের শাসন দেখে অবাক হয়ে গেলো শ্রবণা। মুহুর্তেই ফিক করে হেসে ফেললো। মা শ্রবণাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লেন। শীতুলকে বললেন, আজ তুই বসে বসে মুভি দেখবি। আমরা শুয়ে থাকবো।
- 'যথা আজ্ঞা মা জননী।'
শীতুল বিছানা থেকে উঠে চেয়ারে গিয়ে বসলো। মায়ের কথামতো রুমের লাইট নিভিয়ে তিনজনে মিলে মুভি দেখায় মনোযোগ দিলো। কেউ কোনো কথা বলছে না। মাঝেমাঝে মা দু একটা মহান উক্তি শোনাচ্ছেন। শ্রবণার মুভি ছাড়া অন্য কোনোদিকে মনোযোগ নেই।
হঠাৎ শীতুলের নজর আটকে গেলো একটা দৃশ্যে। পুরো ঘর অন্ধকার। শুধু ল্যাপটপের সামনে শ্রবণার মুখটা আর মায়ের মুখটা আলোকিত। দুজনকে খুবই মায়াবী লাগছে। শ্রবণার চোখ কোনো অজানা কারণে ছলছল করছে। নিশ্চয় মায়ের সাথে জড়িয়ে থাকা কোনো স্মৃতি মনে পড়ে গেছে। এই বুঝি টুপ করে গড়িয়ে পড়বে। শীতুল অনেক্ষণ চোখ সরাতে পারলো না। শ্রবণার ছলছল চোখের সৌন্দর্যে বুদ হয়ে রইলো। অন্যরকম মায়া অনুভব করছে শ্রবণার প্রতি। মেয়েরা কাঁদলে তাদেরকে ভালো দেখায় না, কিন্তু ছলছল চোখে অপূর্ব লাগে। সমস্ত মায়া যেন সেই চোখে এসে চোখের জলে আটকে থাকে।
শ্রবণা আচমকা চোখ ঘোরাতেই অন্ধকারে বসে থাকা শীতুলের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেলো। যদিও শীতুলের মুখটা তেমন আলোকিত নয়, তবুও আবছা আলোয় শ্রবণার বুঝতে অসুবিধা হলো না যে শীতুল ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। বুকটা ধক করে উঠলো শ্রবণার। চোখের পাপড়ি ফেলতেই জল গড়িয়ে পড়লো চোখ থেকে। হন্তদন্ত হয়ে সেই জল মুছলো ও।
রাত একটা বেজে গেলে মা বললো, 'আমার তো ঘুমে চোখ ঢুলুঢুলু করছে। চোখ মেলে রাখতেই পারছি না। আমি বরং গিয়ে ঘুমাই।'
শীতুল বললো, 'মা, তুমি এখানেই ঘুমোও। আমি ওই রুমে গিয়ে ঘুমাবো। শ্রবণা তুমিও ঘুমিয়ে পড়ো।'
- 'এখনো ঘুম আসছে না।'
- 'আমারও আসছে না। মা তো ঘুমাবে।'
মা উঠে বসতে বসতে বললেন, 'তাহলে তোরা মুভি দ্যাখ, আমি গিয়ে ঘুমাই। শ্রবণার ঘুম পেলে চলে আসিস।'
- 'আচ্ছা মা। আমিও যাই?'
- 'মুভি দ্যাখ। শেষ করে আসিস।'
মা শ্রবণাকে রেখে বেরিয়ে গেলেন। এত রাতে অন্ধকার ঘরে শীতুলের সাথে একা বসে আছে ভাবতেই পারছে না শ্রবণা। বুকের ভেতর ধুকধুকানি বাড়ছে। চারদিক এত বেশি নিস্তব্ধ যে মুভির সাউন্ড বন্ধ করে দিলে শীতুলের নিশ্বাসের শব্দও স্পষ্ট শোনা যাবে। শ্রবণা ক্রমশ উত্তেজিত হয়ে উঠছে।
শীতুল বললো, 'আমি তোকে তুই করেই বলবো। আপনি তে আমার বিরক্তি চলে আসে।'
- 'আচ্ছা আপনার যা ইচ্ছে।'
- 'তুমি আমাকে তুই বলতে পারিস। এই যা, তুমি আর তুই এক হয়ে গেছে। হা হা হা।'
শ্রবণাও মুচকি হাসলো। এখন আর সিনেমার দিকে মনোযোগ নেই। শীতুলের উপস্থিতি ওর হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিচ্ছে। কেমন যেন ছটফট লাগছে। নাহ, এখানে আর থাকা যাবে না। কিন্তু এখানে থাকতেও ভালো লাগছে।
শীতুল বললো, 'দ্যাখ, ডিপ্রেশন জিনিসটা আমরাই টেনে আনি। তুই জাস্ট ভাববি তুই অনেক ভালো আছিস। অন্য সবার থেকে অনেক সুখে আছিস। তাহলেই আর কোনোকিছু নিয়ে মন খারাপ হবে না। এমনও অনেক মেয়ে আছে যারা ইয়াতিম। বাবা মা কেউ নেই। ওরা রাস্তায় ঘোরে আর ভিক্ষা করে। ফুল বিক্রি করে। ওদের তুলনায় তো ভালো আছিস। এসব ভাবলে আর কষ্ট হবে না দেখিস।'
শ্রবণা চুপ করে শুনলো শীতুলের কথা। এখন আর একটুও কষ্ট নেই মনে। মনে হচ্ছে সব পেয়ে গেছে। অন্তত মা কে তো পেয়েছে ই, পাশাপাশি শীতুলকে প্রতিদিন সারাক্ষণ দেখতে পারছে এটাই বা কম কিসে?
শীতুল জিজ্ঞেস করলো, 'কি ভাবছিস?'
- 'নাহ তেমন কিছু না। যাই বরং গিয়ে ঘুমাই।'
- 'ঘুম চলে এসেছে? যা তাহলে। সকাল সকাল উঠিস। বাসার পাশে শিউলি গাছ আছে। ফুল কুড়াবো।'
- 'সত্যি!'
- 'হুম। আমার সব’চে পছন্দের ফুল।'
শ্রবণা খুশি মনে হন্তদন্ত হয়ে বিছানা থেকে নামতে গিয়ে থেকে পড়ে গেলো। শীতুল হাত ধরে টেনে তুলে বললো, 'দেখে চলবি না?'
- ‘হ্যাঁ, এখন থেকে চলবো।'
- 'শ্রবণা, তোর চোখ দুটো অনেক মায়াবী রে।'
আচমকা এমন কথা শুনে হৃদস্পন্দন হুট করেই অনেক বেড়ে গেলো। লজ্জায়, উত্তেজনায়, বিস্ময়ে এক ছুটে নিজের ঘরে চলে এলো শ্রবণা। শীতুল কি সত্যিই তাহলে ধীরেধীরে শ্রবণার প্রেমে পড়তে আরম্ভ করেছে.. কে জানে! উফফ্! হার্টবিট হচ্ছে, খুব জোরে বিট হচ্ছে।
১৭
পাখির কিচিরমিচিরে রাতের নির্জনতা ম্লান হয়ে এসেছে। ভোর হওয়ার আগ মুহুর্ত থেকেই শত শত পাখি কানের কাছে এসে গল্প বলা শুরু করেছে যেন। পাখির ডাকেই শ্রবণার ঘুম ভেঙে গেলো। বিছানা ছেড়ে উঠতে উঠতে ভাবলো আজকে শেফালী ফুল কুড়োনোর কথা। কিন্তু এত সকালে শীতুলকে ডাকা কি ঠিক হবে?
ঠিক বেঠিক ভাবতে ভাবতে শীতুলের দরজায় এসে কয়েকবার শব্দ করলো শ্রবণা। দরজাটা ধাক্কা দিতেই খুলে গেলো। শ্রবণা ঘরে ঢুকে সবার আগে লাইট জ্বালিয়ে দিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে দিলো। এখনো চারিদিকে ভোরের অন্ধকার দূর হয়নি। শীতুল চোখ মিটমিট করে তাকালো। চোখ কচলে বললো, 'শুভ সকাল।'
- 'শুভ সকাল। হাঁটতে যাবেন না?'
- 'হুম যাবো তো। ফ্রেশ হয়ে এসেছো?'
- 'না। ফ্রেশ হলে তো এত সুন্দর সকালের আসল মজাটাই নষ্ট হয়ে যাবে। ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে হাঁটতে গেলেই তো মজা।'
শীতুল মৃদু হাসলো। শ্রবণা শীতুলের ঘুমাদুরে চেহারাটা দেখে অনেক্ষণ কি যেন ভাবলো। শীতুল উঠে শ্রবণাকে তাড়া দিলে হুশ ফিরে এলো ওর। বাইরে বের হতে হতে শীতুল জিজ্ঞেস করলো, 'কি ভাবছিলি?'
- 'তেমন কিছু না।'
বাইরের আলোয় এসে শীতুল আচমকা শ্রবণার হাত ধরে বললো, 'এক মিনিট দাঁড়া তো।'
শ্রবণা দাঁড়িয়ে পড়লো। শীতুল শ্রবণার এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে সরিয়ে কানের পাশে এনে গুঁজে দিলো। দু একটা চুলের গোছা কানের সামনে ঝুলিয়ে দিয়ে বাকি চুলগুলো ঠিক করে দিলো। শ্রবণা নিশ্চুপ হয়ে শীতুলের দিকে চেয়ে আছে। শীতুলের গালে, চোখে, মুখে এখনো ঘুম লেগে আছে। শীতুল চুল ঠিক করে দিয়ে বললো, 'মেয়েরা ঘুমালে কি সবসময়ই চুল এরকম এলোমেলো হয়ে যায়?'
শ্রবণা এমন প্রশ্ন শুনে খানিকটা ভড়কে গেলো। বললো, 'খুব শক্ত করে বেঁধে রাখলে এলোমেলো হয় না।'
- 'চুল এলোমেলো হবার জন্যই। শক্ত করে বাঁধার কি দরকার?'
শ্রবণা হাসলো। শীতুল শ্রবণাকে নিয়ে বাড়ির পিছন দিকের বাগানে চলে এলো। ঘাসের উপর মৃদু কুয়াশা পড়েছে। প্রকৃতি জানান দিচ্ছে, শীতকাল আসছে। শ্রবণা জুতা খুলে রেখে খালি পায়ে ঘাসের উপর পা ফেললো। আহা কি আরাম! শিশিরবিন্দু পায়ে লেপ্টে যাচ্ছে। এত দূর থেকেও শিউলীর ঘ্রাণ ভেসে আসছে নাকে।
শীতুল খুব দ্রুত শ্রবণাকে নিয়ে শিউলী তলায় চলে এলো। গাছের নিচে অজস্র ফুল দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলো শ্রবণা। কোনটা রেখে কোনটা কুড়োবে দিশেহারা হয়ে পড়লো। নিচে বসে অনেকগুলো ফুল হাতে নিয়ে আগে বুক ভরে ঘ্রাণ নিলো। তারপর শীতুলের দিকে তাকিয়ে বললো, 'একটা ফুলের গন্ধ এত সুন্দর কেন হবে?'
শীতুল বললো, 'ফুলের গন্ধ আর মেয়েদের চুলের গন্ধ দুটোই মারাত্নক।'
-'কি?'
- 'কই কিছু না তো। ফুল কুড়া। এরপর মালা গেঁথে খোপায় দিয়ে ঘুরে বেড়াবি।'
- 'ফুল তো বেশিক্ষণ তাজা থাকবে না।'
- 'যতক্ষণ থাকবে আর কি।'
দুজনে মিলে ফুল কুড়িয়ে শ্রবণার ওড়নায় জমিয়ে রাখলো। শ্রবণার উৎফুল্লতা দেখে আনন্দ হচ্ছে শীতুলের। গত কালকেও মেয়েটার মানসিক অবস্থা ভয়াবহ খারাপ ছিলো।
বাড়ি ফিরে হৈ চৈ করে পুরো বাড়ি সুঁই সুতা খুঁজে বেড়িয়েছে শ্রবণা। তারপর ফুলের মালা গাঁথতে বসে গেছে। মালা হয়ে গেলে রুমে এসে সুন্দর করে চুল আঁচড়ে নিলো। চুল খোপা করে মাকে বললো মালাটা খোপায় পড়িয়ে দিতে। মা দেখে বললেন, শিউলীর সাথে ভালো মানায় শাড়ি। শাড়ি পরবি?
শ্রবণা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো মায়ের দিকে। মা বললেন, 'এখনই তো বয়স এসবের৷ তোর বয়সী মেয়েরা শখ করে শাড়ি পরে, ফটোশুট করে, ফেসবুকে আপলোড ও দেয়। তুই এখনো এসব শিখলি না।'
- 'ওসব আমার ভাল্লাগে না মা।'
- 'ভাল্লাগেনা বলিস বলেই ভালো লাগে না। ফেসবুক করতে হবে না, তুই শাড়ি পড়ে একটু ঘুরে বেড়াও তো আমি দেখি।'
মায়ের কথা শুনে শ্রবণার ও ইচ্ছা করলো একবার শাড়ি পরতে। শখ আহ্লাদ সবই যেন হারিয়ে গেছে জীবন থেকে। মা খুব যত্ন করে একটা লাল পেড়ে সাদা শাড়ি পরিয়ে দিলেন শ্রবণাকে। শাড়ি পরে খোপায় শিউলী মালা পেঁচিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এবার ঠিক আছে। খাঁটি বাঙালী মেয়ের মতন লাগছে একেবারে।'
শ্রবণা হাসলো। ঠোঁটে হালকা করে লিপস্টিক দেয়ার জন্য আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, উপরের ঠোঁটে হয়ে গেছে কিন্তু নিচের ঠোঁট এখনো বাকি। এমন সময় ঘরের দরজায় শীতুল এসে দাঁড়ালো। শ্রবণা একবার ওর দিকে তাকানোর পরপরই মনে হলো, মাত্র এক ঠোঁটে লিপস্টিক দেয়া হয়েছে। লজ্জায় অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে ফেললো শ্রবণা। মা বেরিয়ে যাওয়ার সময় দরজা লাগিয়ে যান নি। ইস! কি লজ্জা লাগছে।
শীতুল এক পলক দেখেই হেসে ফেললো। লিপস্টিক দেয়ার মুহুর্তে কোনো মেয়েকে কেমন অদ্ভুত দেখায় সেটাই দেখার বাকি ছিলো। শীতুল দরজা থেকে সরে গেলো। শ্রবণা তারাতাড়ি লিপস্টিক মুছে বিছানায় বসে রইলো।
কিছুক্ষণ পর মা এসে বললেন, 'কি রে এভাবে ঝিম মেরে বসে আছিস কেন?'
- 'না মা। এমনি।'
- 'খাবি না? চল।'
মা শ্রবণাকে নিয়ে খাবার টেবিলে চলে এলেন। শীতুল শ্রবণার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে৷ শ্রবণা শীতুলের দিকে একবারও তাকাচ্ছে না। টেবিলে শীতুল ছাড়া আর কেউ এখনো আসে নি। মা শ্রবণাকে বসিয়ে রেখে চলে যেতেই শীতুল বলে উঠলো, 'খিদার ঠেলায় লিপস্টিক খেয়ে ফেলেছিস নাকি?'
শ্রবণা বাঁকা চোখে তাকালো। শীতুলের হাসি দেখে ওরও হাসি পেয়ে গেলো। মা খাবার নিয়ে আসামাত্রই শীতুল বললো, 'আচ্ছা আম্মু, মেয়েরা হা করে লিপস্টিক দেয়?'
মা ভ্যাবাচেকা খেয়ে শীতুলের দিকে তাকালেন। শীতুল খিকখিক করে হাসছে। মা এবার তাকালেন শ্রবণার দিকে। হঠাৎ শীতুলের মুখে এই প্রশ্নের কারণ নিশ্চয়ই শ্রবণা। মা বললেন, 'লিপস্টিক দিলে মেয়েদেরকে সুন্দর লাগে।'
- 'একটা ঠোঁটে দিলে আরো বেশি সুন্দর লাগে তাই না?'
মা আবার তাকালেন শ্রবণার দিকে। শ্রবণার মুখ দেখে নিশ্চিত হলেন শীতুল শ্রবণাকে উদ্দেশ্য করেই কথাগুলো বলছে। মিটিমিটি হাসতে হাসতে মা আবারো রান্নাঘরের দিকে গেলেন।
শীতুল বললো, 'লিপস্টিক দিস দিস, আমি কিছু মনে করি নি।'
এতক্ষণ ধরে শীতুলের ইয়ার্কি দেখে শ্রবণা আর চুপ থাকতে পারলো না। একটু পরে বলে ফেললো, 'ইস রে! আমি যখন লিপস্টিক দিবো আপনিও আমার রুমে যাবেন প্লিজ। আপনার গালে একটু মেকাপ লাগিয়ে দিতে হবে। মারের দাগের কারণে গালটা ট্যামা হয়ে আছে। ফাউন্ডেশন দিয়ে দাগ দূর করে দিবো। আহারে, মেয়ের হাতের মার বলে কথা।'
শীতুল তীক্ষ্ণ চোখে তাকালো। শ্রবণা এবার মিটিমিটি হাসতে লাগলো। এবার বুঝুক কেমন মজা।
মা চলে এলেন মুহুর্তেই। খাবার সব সাজিয়ে দাদুকে ডাকতে গেলেন। শীতুল ও শ্রবণা দুজনেই চুপচাপ। শ্রবণা শুধু মুখ টিপে হেসে চলেছে। খাওয়াদাওয়ার সময়েও দুজনের কেউই কোনো কথা বলে নি। দাদু, দাদী সবাই শ্রবণার শাড়ি পড়া সৌন্দর্যের প্রশংসা করছিলেন। শীতুল শুধু আঁড়চোখে দেখছিলো শ্রবণাকে।
১৮
মা শীতুল ও শ্রবণাকে নিয়ে বাড়ির বাইরে একটা টংয়ের উপর এসে বসলেন। শ্রবণা বসে পা দুলাচ্ছে। শীতুল ওর পা দোলানো দেখে ভাবছে এই পায়ে আলতা লাগালে দারুণ লাগতো দেখতে। শ্যামলতা চেয়েছিলো ওর পায়ে আলতা লাগিয়ে দিই! শ্যামলতার কথা মনে হতেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো শীতুল।
মা তার ছেলেবেলার গল্প শুরু করলেন । দুজনে মিলে গল্প শুনছিলো মনোযোগ দিয়ে। কিন্তু এতকিছুর মাঝে থেকেও শীতুলের আর কিছু ভালো লাগছে না। কিছু না বলে বাসার দিকে চলে গেলো ও। মা বুঝতে পেরেছেন শীতুলের ব্যাপারটা। শ্রবণার সাথে টুকটাক কথা বলে উনিও বাসার দিকে চললেন।
শীতুলের রুমের দরজা ধাক্কা দিয়ে দেখলেন শীতুল উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। মা কাছে এসে বললেন, 'শীতুল..'
মাকে দেখেও ভাবান্তর হলো না শীতুলের। ঠান্ডা গলায় বললো, ‘হ্যাঁ আম্মু বলো।'
- 'মেয়েটার কথা মনে পড়ছে?'
শীতুল মায়ের কোলে মাথা রেখে মাকে জাপটে ধরে বললো, 'এই যন্ত্রণা আরো কতদিন বয়ে বেড়াতে হবে আম্মু? আমি ওকে পাবো না জেনে আশাই ছেড়ে দিয়েছি। তবুও মন থেকে ভুলতে পারছি না। হঠাৎ মনে পড়ে যায়, তখন আর কিচ্ছু ভালো লাগে না আম্মু।'
- 'মন খারাপ করিস না বাবা। কয়দিন গেলেই দেখবি আর ওকে মনে পড়ছে না।'
- 'না। আমি ওকে ভুলে যেতে চাই না। আমি চাই ও আজীবন আমার সাথে থাকুক।'
- 'এটা তো সম্ভব না। তোকে নতুন করে একটা জীবন শুরু করতে হবে। যে মেয়েকে কখনো দেখিস নি, কখনো কথা হয়নি, তাকে এক তরফা ভালোবেসে যাওয়া মানে মরিচিকার পিছনে ছোটা।'
শীতুল এই কথার কোনো উত্তর খুঁজে পেলো না। সত্যিই তাই। বাস্তবে সবকিছুই অনেক কঠিন। কল্পনায় অনেকবার শ্যামলতার হাত ধরে হেঁটেছে ও। কিন্তু বাস্তবে তা কখনোই হয়তো সম্ভব হবে না। শীতুলের মানসিক অবস্থা দেখে মা বললেন, 'ডায়েরিটা আমাকে দিয়ে দে। আমি ওটা আমার কাছে রেখে দিবো। ওটা না পড়লেই তোর মন থেকে আস্তে আস্তে মেয়েটা মুছে যাবে।'
শীতুল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো, 'না আম্মু। ওটা আমার কাছে থাক। একটা মেয়ে তার হিরোর জন্য এভাবে অপেক্ষা করছে, আমি নিজেকে সেই হিরো ভাবতে শুরু করেছিলাম। জানি হয়তো আমাদের কখনো দেখাও হবে না, কিংবা হবে। কিন্তু আমার কল্পনায় তাকে আজীবন ধরে রাখতে চাই আম্মু।'
- 'এটা ঠিক না বাবা। তুই যতক্ষণ না ওর ভেতর থেকে বের হতে পারবি, ততক্ষণ অন্য কাউকে ভালোবাসতে পারবি না। কিন্তু একদিন তোর বিয়ে হবে, অন্য কাউকে ভালোবাসতে হবে।'
শীতুল নিশ্চুপ। মায়ের কথা ঠিক। কিন্তু শ্যামলতার মায়া চাইলেও ছাড়তে পারছে না ও। এ যে অন্যরকম একটা মায়া, অন্যরকম একটা যন্ত্রণা। এ যন্ত্রণা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার কি কোনো উপায় নেই?
শীতুল ডায়েরি বের করে একটা পৃষ্ঠা পড়তে আরম্ভ করলো,
প্রিয় অসুখ,
জানো আজকে মৃদু কুয়াশা পড়েছে। হিম হিম একটা ওয়েদার। আমার কি ইচ্ছে করে জানো? এই কুয়াশাভেজা রাতে তুমি আর আমি ল্যাম্পপোস্টের আলোয় হাঁটি। নিস্তব্ধ রাতে ল্যাম্পপোস্ট গুলোকে কেমন অসহায় দেখায় তাই না? আচ্ছা, ল্যাম্পপোস্টের কি ঠান্ডা লাগে না? মাঝেমাঝে আমার মনেহয় ওদের ঠান্ডা লাগে। আবার মাঝেমাঝে মনেহয়, লাগে না। ওদের গায়ে চব্বিশ ঘন্টা ইলেক্ট্রিসিটি লাগানো। যখন বাতি জ্বলে, ওরা গরম হয়ে থাকে। টিমটিমে হলুদ আলোয় তুমি আর আমি হাঁটবো, একটা শিরশিরে হাওয়া এসে গায়ে লাগবে। কুয়াশা পড়বে আমার মাথার ওড়নায় আর তোমার টুপিতে। তোমার চাদর কুয়াশায় ভিজে যাবে। আচ্ছা, আমরা তো চাইলে একটা চাদর দুজনে ভাগাভাগি করে নিতে পারি। কিন্তু একই চাদর দুজনে গায়ে মুড়িয়ে রাস্তায় হাঁটা যাবে তো?
এতদূর পড়ার পর শীতুল আর পড়তে পারলো না। মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো, 'মা, বিশ্বাস করো আমি যেভাবে কল্পনা করি, যেভাবে সবকিছু ভেবে রেখেছি, এই মেয়ের কল্পনার সাথে হুবহু সব মিলে গেছে। আমি ঠিক এরকম ভাবেই ওকে নিয়ে হাঁটতে চেয়েছিলাম। এভাবে ওর প্রত্যেকটা ইচ্ছের সাথে আমার দারুণ মিল গো আম্মু। আমার কেমন লাগে তুমি বলো?'
এমন সময় দরজায় এসে দাঁড়ালো শ্রবণা। ভেতরে আসার অনুমতি চেয়ে বললো, 'আসবো?'
মা বললেন, 'পারমিশন নিতে হবে কেন? আয় মা।'
শ্রবণাকে ভিতরে ঢুকতে দেখে শীতুল ডায়েরিটা বালিশের নিচে রাখলো। মা শীতুলকে বললেন, 'কি রে তারপর কি লিখেছে? পড়?'
- ‘এখন আর পড়বো না মা। ইচ্ছে করছে না।'
শ্রবণা বললো, 'আমি বুঝি কোনো প্রাইভেসিতে অনৈতিক ভাবে ঢুকে গেছি? আচ্ছা আমি চলে যাচ্ছি।'
মা বললেন, 'আরে না না। তোকে এ কথা কে বলেছে? শীতুল একটা মেয়ের চিঠি পড়ছিলো। এই শীতুল, আরেকটু পড় না। শ্রবণা শুনুক।'
শীতুল শ্রবণার দিকে তাকালো।
চলবে…
Writer:- মিশু মনি